Skip to main content

এক পঙ্‌ক্তির আত্মবিষে আত্মস্থ দ্রোহের বার্তা


গোবিন্দ ধর ত্রিপুরা রাজ্য তথা উত্তরপূর্বের এক নিরলস আখরচাষী সাহিত্যিক কলম বেয়ে তাঁর নিরন্তর প্রসবিত হতে থাকে বোধসঞ্জাত সংলাপ প্রকাশিত হতে থাকে নানা আঙ্গিকের সাহিত্য, বই-পুস্তক-সংকলন-গ্রন্থাদি
সম্প্রতি হাতে এসেছে সদ্য পেরিয়ে আসা বর্ষে প্রকাশিত তাঁর ত্রয়ী অণুগ্রন্থ যাঁর এপিগ্রাফ বা নির্যাস হচ্ছেএক পঙ্ক্তির আত্মবিষদ্রোহবিষয়ক শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে একের পর এক তিনটি ১/৪ লেটার বা ১/৮ ট্যাবলয়েড সাইজের পাকা বাঁধাইয়ের অণুগ্রন্থ প্রতিটি গ্রন্থই ৬৪ পৃষ্ঠার রয়েছে প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে আত্মবিষ অর্থাৎ জাগতিক সকল অশুভের বিরুদ্ধে শ্লেষ, প্রতিবাদ ও দ্রোহের প্রতিফলন। এক ব্যতিক্রমী চিন্তা, ব্যতিক্রমী ফসল নি:সন্দেহে। পাশাপাশি রয়েছে মুক্তিচিন্তা, প্রেম ইত্যাদিও। তিনটি গ্রন্থের ফসলকে একত্রে একটি সাধারণ মাপের গ্রন্থেই যেখানে সংকলিত করা যেত সেখানে তিনটি কেন এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে। এর উত্তর গ্রন্থকারের কাছেই শুধু পাওয়া যেতে পারে ধরে নিয়েও যা অনুধাবন করা যায় তা হল - বীজ থেকেই যেখানে সকল কার্যের সূত্রপাত তাই এক এক করে এগোলে যে ক্রমটি পাওয়া যায় তা হচ্ছে - ‘দ্রোহবীজ’, ‘দ্রোহকাল’ ও ‘দ্রোহ’। এবং ঠিক এই ধারাবাহিকতায়ই আলোচনার টেবিলে উঠে এল তিনটি বই। প্রসঙ্গত বলে নেওয়া ভালো যে প্রতিটি প্রকাশেরই প্রকাশক কলকাতার দৌড় প্রকাশনা এবং প্রতিটি বইয়ের মূল্য ১২০ টাকা। পরিসরের অভাবে প্রতিটি পঙ্‌ক্তি তুলে ধরা সম্ভব নয়। তবু কিছু নির্মোহ, কিছু তেজোদীপ্ত, কিছু মোক্ষম পঙ্‌ক্তি তুলে ধরতেই হয়।
 
দ্রোহবীজ
৫৮টি এক পঙ্‌ক্তির কবিতাযুক্ত গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘তৈমুর খান - সময়ের দ্রোহপুরুষ’কে। কিছু শিরোনামহীন পঙ্‌ক্তি -
ভাগ না হলে অনুপ্রবেশ থাকত না।
রাতজাগা সব পাখি হামিংবার্ড নয়।
নিজেকে হত্যা করার আনন্দই আলাদা।
ছলনার কী আছে, মেখেছি চাঁদের কণা।
বন্ধুরাই প্রকৃত বন্দুক।
রং উঠে গেলে প্রতিটি সম্পর্কই ভুল জ্যামিতি।
পৃথিবীর মানচিত্র থাক কিন্তু দেশ না।
মায়াকান্না বা ঠিকেদারি সাহিত্য নয়।
আমি এলেই তুমি চলে যাও ?
অনন্ত ভ্রমণ শেষে আমিই চৈতন্য ফকির। 
 
দ্রোহকাল
৫৮টি এক পঙ্‌ক্তির কবিতাযুক্ত গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘বিকাশ সরকার - যিনি হাজিরাশ্রমিক থেকে কথাশ্রমিক হতে পেরেছেন’কে। কিছু শিরোনাম থাকা পঙ্‌ক্তি -
নিজের ছায়ার কাছে নিজেই আমরা খাটো।
নদীর মতোই আপনি একটি কবিতা।
মানুষ পদার্থবিদ্যার জটিল রসায়ন।
শর্তসাপেক্ষ আত্মসমর্পণই প্রেম
ঘুম থেকে জাগা মানে জাগরণ নয়।
সংকট ও সংশয় থেকেই কবিতার জন্ম।
অনন্ত প্রতীক্ষার পর শীতকাল আসে।
সব মহাশূন্যই কৃষ্ণগহ্বর নয়।
তোমার আনন্দপুর অবধি আমার সকাল।
নয়নতারার মতো দু:খগুলো সেলাই করতেন মা।
 
দ্রোহ
৫৬টি এক পঙ্‌ক্তির কবিতাযুক্ত গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক মানবর্ধন পাল - তিনি শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়া নয় বাংলাদেশ ও ভারতের সাহিত্য সংস্কৃতির জগতে আছড়ে পড়া তিতাসের ঢেউ’কে। ‘কথামুখ’-এ কবিতা, বিশেষ করে অণুকবিতা বা এক পঙ্‌ক্তির কবিতার যাথার্থ্য তথা গ্রন্থকারের বিষয়ে কিছু কথা নান্দনিকতায় লিপিবদ্ধ করেছেন অধ্যাপক মানবর্ধন পাল। কিছু শিরোনামহীন পঙ্‌ক্তি -
প্রতিটি শরীর বঙ্গোপসাগরের নুন।
তুমিই গোপন ঈশ্বরী যেখানে আমার মুক্তি লেখা।
তোমার কুহুতান শীতল হাওয়ার পাসওয়ার্ড।
কখনো কখনো তুমি ঊনকোটি টিলায় পাথরপ্রতিমা।
পতনের শব্দে তোমাকে হিরণ্ময়ী লাগে।
সকালের রোদগুলো আনবাড়ি যায় ব্রাহ্মমুহূর্তে।
দ্রোহকাল থেকে ঝরে পড়ে আঁতর বৃষ্টি।
চিরকুটে ভাসিয়ে দিলাম অসমাপ্ত আত্মজীবনী।
আমিই পতন যার কোন শব্দ নেই।
স্বরচিহ্নে লিখি প্রতিটি প্রেমিকার শরীর।
দু-একটি পঙ্‌ক্তি একাধিক গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়ে গেছে, দু-একটি পঙ্‌ক্তি রয়ে গেছে অসম্পূর্ণ, কিছু বানানবিভ্রাট। এর বাইরে এক অভিনবত্ব, এক ব্যতিক্রমী প্রকাশ আলোচ্য অণুগ্রন্থগুলি। কবির মানসভাবনায় আসা অগুনতি ভাবের সহজ, সটান, সুখপঠনের সুলিখিত প্রকাশ।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...