Skip to main content

কাব্যগ্রন্থ ও অনুবাদ - দুই প্রথমের যুগলবন্দি


উত্তরপূর্বের সমকালীন বাংলা সাহিত্য পরিমণ্ডলে অনুবাদ সাহিত্যের প্রকাশ সততই সীমিত। বর্তমান সময়ে গল্প, কবিতা আদি গ্রন্থ প্রকাশের বহর অনেকটাই বেড়ে গেলেও অনুবাদ কর্ম সেভাবে প্রকাশিত হতে দেখা যায় না। এমনকী নিকটবর্তী ভাষা অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদের ক্ষেত্রেও বলা যায় শূন্য না হলেও হাল নিতান্তই দীন।
এমনই এক সমকালে দাঁড়িয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে অনুবাদক সত্যজিৎ চৌধুরীর অনুবাদ কাব্যগ্রন্থ ‘একবার শুধু রাধা হয়ে দেখো কানাই’। অসমিয়া ভাষার কবি নিবেদিতা শইকীয়ার মূল কাব্যগ্রন্থ ‘এবার মাথোঁ রাধা হৈ চোয়া কানাই’-এর বাংলা অনুবাদ। প্রসঙ্গত মূল এই গ্রন্থটি যেমন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ তেমনি অনুবাদকেরও এটাই প্রথম অনুবাদ গ্রন্থ। স্বভাবতই কিছু জড়তা থেকে গেলেও এ এক শুভযাত্রা নি:সন্দেহে। হার্ডবোর্ড বাঁধাইয়ে ৬৮ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে রয়েছে পৃষ্ঠাজোড়া থেকে একাধিক পৃষ্ঠা অবধি বিস্তৃত ৪২টি কবিতা। প্রথমেই রয়েছে দুটি শুভেচ্ছা বার্তা, ভূমিকা, কবির কথা ও অনুবাদকের কথা। এসবের মধ্য থেকেই উঠে এসেছে আলোচ্য গ্রন্থের অনেকখানি নির্যাস যদিও মূল পাঠের আগে এতগুলো পৃষ্ঠার সংযোজন পাঠকের কাছে কতটুকু আরামদায়ক সে সন্দেহ থেকেই যায়। অনুবাদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অনেকের কাছেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন অনুবাদক সত্যজিৎ।
‘ভালোবাসি তোমাকে, কানাই
ভুল আমার এতটুকুই
কিন্তু সেই ভুল কি শুধু আমার একার ছিল ?
তুমি কি ছিলে না সেই ভুলে অংশীদার ?
তাই কলঙ্কিনী
শুধু রাধা কেন ?
কেন ? কানাই, কেন ?...
এভাবেই এক আকুতিময় আবহে প্রথমেই শুরু হয়েছে গ্রন্থনামশীর্ষক ছয় পৃষ্ঠার বিস্তৃত কবিতাপর্ব। বস্তুত এই কবিতাটিই গ্রন্থের মূল কবিতা। কবিতার শেষে আছে কানাইয়ের কাছে রাধার সমর্পণ ও অভিলাষ -
‘হয়তো কোনো জন্মে আমি
আবার দেখা পাব, কানাই...
এই মিনতি
সেই জন্মে আমি যেন তুমি হতে পারি
আর তুমি হবে আমি
তোমার বুকেও একবার জ্বলুক
অদেখা এই অনল
তুমিও যেন বুঝতে পারো
রাধা হওয়ার কত যাতনা !
অপেক্ষার দহন কত !...’
অনবদ্য একটি কবিতা। অসমিয়া কবিতায় স্বল্প শব্দযুক্ত পঙ্‌ক্তির নমুনা এখানেও প্রত্যক্ষ করা যায়। বাকি সব কবিতায় ধরা আছে প্রে‌ম-প্রীতি-ভালোবাসা, অনুভব-অনুভূতি, বন্ধুতা, জীবনের উপলব্ধি, নারী জীবনের সুখদুঃখ আদি নানা বিষয় ও অনুষঙ্গ। সব কবিতার মান এক নয় যদিও সচরাচর প্রকাশিত প্রথম কাব্যগ্রন্থের সঙ্গে মানানসই ভিন্নতর আঙ্গিকের কবিতার এক সমাবেশ - এটা বোধগম্য। তবে ‘সৈনিকের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য’ শীর্ষক কবিতাটি গ্রন্থের এক মূল্যবান সম্পদ। এমনতরো সুখপাঠ্য কবিতা আছে আরও। 
কাগজের মান, অক্ষর বিন্যাস, ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ হলেও বেশ কিছু বানানবিভ্রাট ও অনুবাদের ক্ষেত্রে তৎসম শব্দের অধিক ব্যবহার পরিলক্ষিত হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই ‘প্রথম’-এর জড়তা কাটিয়ে উঠতে হবে পরবর্তী প্রয়াসে। অনুবাদক গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন ‘সকল পাঠকদের প্রতি যাঁরা অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি আগ্রহী’। নীলাভ সৌরভের প্রচ্ছদ নান্দনিক।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
'একবার শুধু রাধা হয়ে দেখো কানাই'
প্রকাশক - বিল্বতুলসী প্রকাশনী, কলকাতা
মূল্য - ১৫০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...

বিষয়-মানসে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ - সপ্তদশ সংখ্যা

কোনও দ্বিধা কিংবা ভয়কে অবলীলায় উড়িয়ে দিয়ে জলকে জল , মাটিকে মাটি কিংবা দেশকে দেশ ( দ্বেষ , দ্যাশ কিংবা রাষ্ট্রযন্ত্র নয় ) বলতে পারেন যে ক ’ জন , তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি , লেখক , সম্পাদক নারায়ণ মোদক । বরাক উপত্যকার শ্রীভূমি থেকে ২১ মার্চ বিশ্ব কবিতা দিবসে প্রকাশিত হয়েছে বার্ষিক পত্রিকা ‘ স্বরিত ’- এর সপ্তদশ সংখ্যা । দ্বৈত সম্পাদনায় নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী। এবারের বিষয় ছিল প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অব্যবস্থা , অত্যাচার , সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নিপীড়ন ইত্যাদি নিয়ে প্রতিবেদন ও সহমর্মিতা ইত্যাদি । স্বভাবতই এর প্রতিবাদ হওয়া উচিত । এই নির্ভীক , বলিষ্ঠ পদক্ষেপের উদ্যোগ কতটা সফল হয়েছে , কতটা সহমর্মিতা বর্ষিত হল , কতটা প্রতিবাদ স্বরিত হল তার এক নির্মোহ বিশ্লেষণ সংখ্যাটির আলোচনার এক অমোঘ অনুষঙ্গ ।   ভূমিকার আধারে ‘এ সংখ্যার বিষয়ে আলোকপাত’ করতে গিয়ে অন্যতম সম্পাদক নারায়ণ মোদক লিখছেন - ‘… আমাদের সমাজে একদল নিজেকে মানবতাবাদী সাজিয়ে নিরাপদ দূরত্বে বসে সমাজ এবং সরকারের সব রকম সুবিধা ভোগ করে বিজ্ঞতার সাথে বলতে থাকেন সারা বিশ্বের যেখানেই সংখ্যালঘু আছে সেখানেই তারা অত্যাচারিত। আমাদ...