Skip to main content

স্খলনের বিরুদ্ধে জীবনজোড়া সংকল্পের প্রকাশ


বানপ্রস্থ সময়, জীবন সায়াহ্নে… ইত্যাদি শব্দ বা শব্দগুচ্ছ একটাই অর্থ বহন করে যা সাধারণ্যে সহজবোধ্য। তিন কুড়ি বয়স পেরোলেই মন মস্তিষ্ক জুড়ে বেজে ওঠে এক প্রস্থান সুর। পৃথিবীর বুকে গড়ে তোলা বসতবাসের সময় ফুরিয়ে আসার এক অলিখিত সংকেত অনুরণিত হতে শুরু করে চিন্তায় মননে।
আশির কোঠায় পদার্পণরত কবি হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত। ত্রিপুরার বাংলা কাব্যসাহিত্যে হয়তো সে অর্থে বহুল পরিচিত মুখ নয়। অথচ তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত ছাত্রজীবন থেকেই। আলোচ্য গ্রন্থের মুখবন্ধে এবং ব্লার্বে আছে সে কথা। কিয়দংশ সেখান থেকেই নাহয় নান্দীমুখে তুলে ধরা যাক। মুখবন্ধে কবিকন্যা সুজাতা সেনগুপ্ত লিখছেন - ‘…ছাত্র অবস্থায় ব্রজেন্দ্র কিশোর ইনস্টিটিউশনে পড়াকালীন বিদ্যালয়ের দেওয়াল পত্রিকায় লেখালেখি, ১৯৬৭ সালে ‘বিষাণ’, ১৯৬৮ সালে ‘শুক্লপক্ষ’, ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৯ পর্যন্ত (যৌথ উদ্যোগে) হাতে লেখা পত্রিকা ‘অগ্রণী’ সম্পাদনা এবং ১৯৭৫ সালে শিল্প সংস্কৃতি মেলার আয়োজনের মধ্য দিয়ে পরিশীলিত হতে থাকে, কিন্তু সরকারি চাকুরিতে যোগদানের পর এই নিয়মিত অভ্যাসে ভাটা পড়ে। স্মরণিকা ও বিভিন্ন পূজা সংখ্যায় কিছু প্রবন্ধ, কিছু কবিতা প্রকাশের মধ্যেই লেখালেখি সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। প্রচার বিমুখতা, উদাসীনতার জন্য অনেক কবিতা সময় মতো যত্ন করে সংরক্ষণ না করায় কালের গর্ভে সেই লেখাগুলো হারিয়েও যায়…।’ ব্লার্ব থেকে জানা যায় কবির প্রথম প্রকাশিত লেখা ১৯৬২ ইং স্কুলের দেয়াল পত্রিকা ‘অর্ঘ্য’তে।
সেই থেকে ত্রিপুরার বিলোনিয়া শহরের বাসিন্দা হরিনারায়ণ সেনগুপ্তের কোনও প্রকাশিত লেখালেখির তথ্য না থাকলেও সম্প্রতি আগরতলা বইমেলা - ২০২৫-এ প্রকাশিত হয়েছে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বানপ্রস্থ সময়’। এই দীর্ঘ নীরব যাপন হয়তো কিছু ব্যস্ততা, কিছু অভিমানকে সঙ্গী করেই কেটেছে। কিন্তু ফিরে দেখার তাগিদ যে হারিয়ে যায়নি তারই প্রকাশ আলোচ্য গ্রন্থটি। গ্রন্থ সম্পর্কে প্রথম ব্লার্বে বিলোনিয়াবাসী আরেক কবি চন্দন পাল লিখছেন - ‘...তিনি একবার ‘বানপ্রস্থ সময়’ নামে একটি কবিতা শুনিয়েছিলেন। তাতে আমাদের বর্তমান আত্মিক, সামাজিক সম্পর্কের টানাপোড়েন ও আশাবাদের সুন্দর প্রকাশ পেয়েছিলাম। কবিতায় তিনি কোনো কল্পনার আশ্রয় নেননি, বরং পরিবেশ পাঠের সূক্ষ্ম সারাংশ মেলে ধরেছিলেন শব্দ ও বাক্য চয়নে... যা সবাইকে ভাবিয়ে তোলে।’ আলোচ্য গ্রন্থের সার্বিক পাঠে কবি চন্দন পালের বয়ানের যাথার্থ্য খুঁজে পাওয়া যায় সর্বাংশে।
দীর্ঘ জীবনে উপলব্ধ অভিজ্ঞতার নিরিখে আরব্ধ অনুভব তথা কালের প্রবাহে স্খলিত আদর্শের ব্যথাতুর অনুভব মিশে আছে কবির প্রতিটি কবিতায়। পাশাপাশি এই স্খলনের বিরুদ্ধে কিছু ব্যথা, কিছু শ্লেষ, প্রতিবাদ। ভেসে আসে কিছু অতৃপ্তির বেদনা, এক এক করে পড়ে গেলে যেন চোখের সামনে ফুটে ওঠে এক ধারাবাহিক স্খলনের ইতিহাস। কবি তাই লিখেন -
‘ফুলেদের পরিবারে পরিবারে/ স্বভাবজ ঘটকালি -/ প্রজাপতি ভ্রমরের নিত্যনতুন.../ অথচ ফল প্রসবের পর/ কোন ফুল কি কদাচিৎ/ ধরে রাখে সেই স্মৃতি/ বৃন্ত সহ বহুদিন ?/ নি:সঙ্গ প্রজাপতি ভ্রমর/ পরাগ চিহ্ন কি বয়ে বেড়ায়/ তাদের বিষণ্ণ ক্লান্ত পাখায় ?/ কিংবা মানুষেরা মনে রাখে/ সিঁড়ি ও সেতুর ঋণ ? (কবিতা - ঋণ)
কবি তাঁর উত্তরসূরিদের তাই বলে যেতে চান - ‘…ওগো অজ্ঞাত কবি,/ নতুন একটা কবিতা জন্ম নেবার আগে/ তোমার প্রমাতামহীর পঁচাত্তরতম মোমে/ ফুঁ দেবার সন্ধিক্ষণে/ ভেবে দেখ সাতবার/ কোথায় দাঁড়াবে তুমি/ এবং নবজাত আত্মজ তোমার। (কবিতা - অবস্থান)।
এই কয়েকটি পঙ্ক্তি ধরেই পূর্বজ থেকে পরবর্তী প্রজন্মের এক অসাধারণ যাপনগাথাকে যেন তুলে ধরেছেন কবি। সাবধানবাণী শুনিয়েছেন নিষ্ফল যাপনের বিরুদ্ধে। আজকের কবিদের দায়হীনতায়, শব্দের ঝংকারে লেখা বোধগম্যতাবিহীন কবিতায় বীতশ্রদ্ধ, ব্যথাতুর কবি তাঁর কবিতায় লিখেন স্বীয় অতৃপ্তির কথা - ‘…এখন কবিতা মানে/ চোখ বুজে কানে পায়রার পালক গোঁজা আরাম;/ ফুল লতা পাতা নয়/ কোকিল, ময়ূর, পাপিয়া নয়/ বাস ট্রাম ট্রেনের ঘর্ঘরের মতো কিছু শব্দের/ পরিমিত স্বচ্ছন্দ নড়াচড়া। এবং সুড়সুড়ি,/ নইলে কবিতা শুনে/ আমি কেন পারি না ঋজু হতে/ বর্ষার খরস্রোতা ফুলে ওঠা নদীর মতো ?’ (কবিতা - একগুচ্ছ নিকৃষ্ট কবিতা - ২)। এমনি আরও অনেক কবিতা হয়তো মন ছুঁয়ে যাবে পাঠকের। যেমন - দেবতা করো না আমায়, অক্ষয় ভিক্ষাভাণ্ড যার, শব্দভেদী বাণ, বাগানে যদি নিড়ানি পড়ে, শবযাত্রীদের উদ্দেশে অগ্রিম পঙ্ক্তিমালা, বিশ্বকবির উদ্দেশে কিছু বিলম্বিত সংলাপ ইত্যাদি।
শারদ ভট্টাচার্যের নান্দনিক প্রচ্ছদযুক্ত ৫৬ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাইয়ের ভিতর রয়েছে মোট ৩৮টি কবিতা। কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ হলেও পঙ্ক্তিবিন্যাসে আরও সচেতন হওয়ার পরিসর রয়ে গেছে। কিছু কঠিন তৎসম শব্দের ব্যবহারেও নিয়ন্ত্রণের পরিসর ছিল। পুরোনো বানান যথেষ্ট পরিমাণে রয়ে গেছে। প্রকাশকের এক্ষেত্রে অধিক সচেতনতার দরকার ছিল। কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর বাবা সুরেন্দ্র চন্দ্র সেনগুপ্ত ও মা ছায়াবতী সেনগুপ্তকে। 
‘শবযাত্রীদের উদ্দেশে অগ্রিম পঙ্ক্তিমালা’ কবিতার কিছু আবেগিক পঙ্‌ক্তি যেন গ্রন্থের মূল নির্যাস হিসেবে রয়েছে লিপিবদ্ধ যা নিশ্চিতই দাগ কাটবে পাঠকমনে -
কার মৃত্যু কখন কীভাবে এবং কোথায়/ অজ্ঞাত সকলের/ কারা আমার শববাহী/ অজানা সেসব।/ কিন্তু মৃত্যু আমার নিশ্চিত।/ যেমনটা হাসি ও কান্নার/ চিরন্তনী পাশাপাশি বসবাস.../ অথচ স্বাভাবিক মৃত্যুর প্রত্যাশা/ প্রায় সকলের এবং আমারও।/ এই অগ্রিম পঙ্‌ক্তিমালা / শুধু তোমাদের উদ্দেশে।/ শব যাত্রাকালে,/ জানতে চায় যদি কৌতুহলী কেহ/ শবের পরিচয় -/ অসংখ্য দ্বন্দ্ব সংঘাতের সাথে,/ অবশ্যই একদিন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার/ দীর্ঘ পথে যুযুধান,/ সে এক শব নি:সঙ্গ পথিক.../ আজ যারা শবযাত্রী তারাও পথিক/ এই যাত্রা জীবন থেকে মৃত্যুর পথে,
কিংবা বিপরীত।/ বন্ধুরা,/ অন্তিম ইচ্ছা আমার/ সমস্ত পথ হোক মুখরিত/ শুধু মাত্র মনুষ্যত্বের দীপ্ত জয়গানে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
বানপ্রস্থ সময়
হরিনারায়ণ সেনগুপ্ত
প্রকাশক - জ্ঞান বীক্ষণ প্রকাশনী, উদয়পুর, ত্রিপুরা
মূল্য - ১৮০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...