Skip to main content

কাব্যোৎকর্ষে উদ্ভাসিত মায়াজীবন


কবির জীবনে একটি সময় আসে যখন কবিসৃষ্ট অগণিত কবিতা থেকে যথাযথ ঝাড়াইবাছাই করে শ্রেষ্ঠতর কবিতা নিয়ে একটি সংকলন প্রকাশিত হয়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে দুটি বিষয় এখানে ক্রিয়া করে। শ্রেষ্ঠ কবিতার চয়ন ও প্রকাশের দায়িত্ব। উভয় ক্ষেত্রেই আবার দুটি করে অনুষঙ্গ জড়িয়ে থাকে। চয়নের ক্ষেত্রে যা হল এই কবিতার চয়ন কে করবেন ? কবি/পাঠক, নাকি প্রকাশক ? প্রকাশের ক্ষেত্রেও তথৈবচ। কোনও প্রকাশক কি নিজে থেকে আগ্রহ দেখিয়ে এই দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসবেন ? নাকি কবিই স্বত:প্রণোদিত হয়ে এই কাজে তৎপর হবেন।
এই সমগ্র বিষয়টি আলোচনা করতে গেলে এক বৃহৎ পরিসরের প্রয়োজন, যা এক্ষেত্রে নেই বলেই সংক্ষেপে বলে নেওয়া ভালো। জন্ম উত্তরবঙ্গে হলেও বিকাশ সরকার উত্তরপূর্বের কবি বলেই পরিচিত। শুরুটা বঙ্গে হলেও কবিতাকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা এই অসমে। বিকাশ সরকার আসলে কবি নাকি গদ্যকার ? এমন প্রশ্ন এলে অনেকেই অবাক হবেন। কিন্তু ঘটনা এই যে তাঁর নিজের মূল্যায়নে তিনি গদ্যকার বেশি এবং কবি কম। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে সাহিত্যবিশ্বে তিনি কবি বিকাশ সরকার নামেই বহুল পরিচিত। তবে এটাও ঠিক যে পিছিয়ে নেই তিনি কোনোদিকেই। সুতরাং কাব্যভুবনে এক ব্যতিক্রমী আঙ্গিকের কাব্যস্রষ্টা হিসেবে তাঁকে নিয়ে যদি কোনো প্রকাশক এগিয়ে আসেন নিজে থেকে তাতে অবাক হবার কিছু নেই।
বিকাশ সরকারের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০১৬-তে যদিও তার দ্বিতীয় পরিবর্ধিত সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি জানুয়ারি ২০২৬-এ। অর্থাৎ কিনা শ্রেষ্ঠ কবিতার সংখ্যাও বেড়েছে এই এক দশকে। তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা গ্রন্থের সৃষ্টি নিয়ে ‘কবিকথা’য় তিনি লিখছেন - ...। ‘‘কনিষ্কের মাথা’ ৩০ বছর পর পুনর্মুদ্রণ করেছে ‘সৃষ্টিসুখ’। এরপর আমার দুটি বই প্রকাশিত হল, ১৯৮৫ এবং ১৯৮৭ সালে ...গত এক দশকে আরও কিছু লিখেছি এবং বেশ কয়েকটি বই বেরিয়েছে, এইটি আমার দ্বিতীয় জন্ম। এরপর এই সেদিন ভ্রাতৃপ্রতিম প্রকাশক ও কবি গোবিন্দ ধর যখন ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশ করবার প্রস্তাব দিলেন, তখন বিষয়টি নিয়ে যে দ্বিধায় ছিলুম তাতে সন্দেহ নেই। কেননা আমার নিজের কবিতাগুলিকে নিয়ে আমি চিরকালই অত্যন্ত সন্দেহপ্রবণ...। ‘স্রোত’-এর কর্ণধার গোবিন্দ নিজে একজন কবি, সম্ভবত এ জন্যই আমার মতো একজন অপরিচিত ও অপর কবির কবিতা নিয়ে এমন একটি সংকলন প্রকাশ করবার সাহস তাঁর হয়েছে...।’
কুমারঘাট, ত্রিপুরার ‘স্রোত’ প্রকাশন-এর পক্ষ থেকে ১৭৬ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাইযুক্ত, সম্প্রতি দ্বিতীয় সংস্করণ হিসেবে প্রকাশিত আলোচ্য এই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট হয়েছে মোট ১৪৬টি কবিতা। প্রথম সংস্করণে কবিতার সংখ্যা কত ছিল কিংবা দ্বিতীয় সংস্করণে কয়টি কবিতা যুক্ত হল সেই বিষয়ে কোন তথ্য নেই যদিও কবির অধিকাংশ সাড়া জাগানো কবিতাই সন্নিবিষ্ট হয়েছে এই গ্রন্থে। ‘বাবা’ ও ‘মা’ শিরোনামে দুটি কবিতা দিয়েই শ্রীগণেশ হয়েছে গ্রন্থের। ‘সাড়া জাগানো’ কিছু কবিতার উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না মোটেও। রয়েছে - অন্ধকারাচ্ছন্ন লাশ (গদ্যকবিতা), কনিষ্কের মাথা, বিরুদ্ধ পৃথিবী, হ্যালুসিনেশন সিরিজ, ভারতবর্ষ, বারুদের গন্ধ, যুদ্ধবিরোধী কবিতা, মহাকাশতত্ত্ব, ব্লেডবাজনা, ভালোবাসাঘুঙুর, পরিত্যক্ত সেতার ও আমি, চিরভক্ত, নিওলিথিক ঘোড়া, লক্ষ্মীর পাঁচালি, মায়ের বিয়ের ট্রাংক, জর্জ বিশ্বাসের রবীন্দ্রসংগীত, গয়েরকাটাসমগ্র, বিকাশঝোরা, জোছনাপ্রহার, অনন্তছুতোর, আনন্দদোতারা, বিশ্বনাথ চারালির মেয়ে, কচি মুখোপাধ্যায়, মায়া আলো মায়া অন্ধকার, ভাতপঙ্‌ক্তিমালা, আত্মজীবনীর পরাবাস্তব, ব্রাত্য কবিতার চর, মেছুয়াপাড়ের এক গূঢ় হরিয়াল ইত্যাদি।
এত এত শ্রেষ্ঠ কবিতা ও সাড়া জাগানো কবিতার থেকে কিছু পঙ্‌ক্তি তুলে আনার কাজটি সহজ নয় মোটেও। তবু কিছু পঙ্‌ক্তির উল্লেখ না করলে কবিকে চেনার সহজতম উপায় থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় গোটা দুই পঙ্‌ক্তি তুলে ধরতেই হয় -
কচির হলুদ তাঁতের শাড়ি, আমরা বসেছি এক হরিতের তীরে/ রোদ নিভে আসে শ্লথ, অসুখী পাখিরা রয়েছে আমাদের ঘিরে/ ডবলির হাট শেষ হলো, আদিবাসী মেয়েগুলি চলে যায় দূরে/ আঁচলে চশমা মুছে কচি, সবুজে নিজেকে দেয় ছুঁড়ে/ আমি হলুদ ছুঁয়েছি তার, সবুজও স্পর্শ করি ইতস্ততভাবে/ টিকেট কাটা শেষ, কচি কাল আমাকে ফেলে রেখে যাবে...। (কবিতা কচি মুখোপাধ্যায়)। সাড়ে চার পৃষ্ঠার কবিতা থেকে মাত্রই ছয়টি লাইন অথচ অনুভূতির কী ভীষণ প্রয়োগ লুকিয়ে রয়েছে ছত্রে ছত্রে। প্রেম-ভালোবাসা, আবেগ, গ্রামের মোহময় সবুজ এক আবহ, সুখ-অসুখের কী এক বিচিত্র অনুভব। আর সবকিছু ছাপিয়ে শব্দব্রহ্মের অপার কারিকুরি। কবি বিকাশের কবিতায় স্বর, প্রতিস্বর এভাবেই ছলকে উঠে অনুভূতির হড়পা বানে ভাসিয়ে নেয় পাঠক-হৃদয়। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই এভাবে দীর্ঘপঙ্‌ক্তির ছন্দময় আখ্যান। অন্ত্যমিলে সুখ সমাপন।
বিখ্যাত তাঁর ‘অনন্তছুতোর’ থেকে কয়েকটি পঙ্‌ক্তি উল্লেখ না করলেই নয় -
আমি যা কিছু লিখি তার আধখানা লিখে দেন বাবা/ বাবা এক জাদুর মানুষ, দুহাতে আগুন নিয়ে তাঁর খেলা.../ বাবা এক স্বপ্নমণ্ড, দুই চোখে প্রজাগর স্বপ্নের ঘুম/ বাবার আঙুল ধরে ঘুরি, চারদিকে আলুথালু স্বপ্ন নিঝুম.../ বাবা ছেড়ে গেছে সব নদীজলপাখিপাতাবিলখালবন.../ তখন শহরে বসে আমি দেখি ফোটে এক অভিশপ্ত দিন/ আংরাভাসা পাড় থেকে উড়ে আসে মরণের ছাই/ আমি এক দুখি গ্রামীণ যুবক, আমি যেন কবি এসেনিন/ আত্মহননগাথা লিখি, আমি আজ নিজেকে পোড়াই...। নানা ছন্দের সংমিশ্রণে, গদ্যে পদ্যে উনিশ পৃষ্ঠাব্যাপী পিতৃতর্পণের এক অনন্য অঞ্জলি। আসলে সবগুলি কবিতা না পড়লে পাঠক যেমন একাধারে বঞ্চিত হবেন তেমনি স্বপ্নভঙ্গের বেদনায় আক্রান্তও হবেন। মাঝখানে থেমে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই পাঠকের। এক ভিন্ন পরিচিতি নিয়ে ভিন্ন আঙ্গিকের কবিতায় যে জাদুমাখা আখর বুনেছেন কবি তার থেকে বেরিয়ে আসা বড় সহজ কথা নয়।
কাগজ, ছাপার স্পষ্টতা, প্রচ্ছদ, অক্ষর বিন্যাস সবকিছুই মান অনুযায়ী হয়েছে। দুয়েকটি অনবধানের বাইরে শুদ্ধ বানান গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। শুধু কিছু কবিতার কিছু পঙ্‌ক্তি হয়তো অধিকতর/অন্যতর বিন্যাসে বিন্যস্ত হতে পারত এমন মনে হতে পারে। নান্দনিক ও প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ - যা কবির ভাষায় ‘আমার কবিতাপৃথিবীর এক ধূসর সারাৎসার’-এর সৌজন্যে দেবাশিস সাহা।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ - বিকাশ সরকার
প্রকাশক - স্রোত প্রকাশন, ত্রিপুরা
মূল্য - ৩০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৬১৬৭২৩১

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...