Skip to main content

মৃত্যুর পাশে বসে আমি কবিতা লিখেছিলাম... এক সুখপাঠ্য কবিতার সম্ভার


প্রচ্ছদে গ্রন্থনাম দেখে খানিক ধন্দে পড়তেই হয় বইকী। ১/৮ ক্রাউন পেপারের সংক্ষিপ্ত আকারের আবার হার্ডবোর্ড বাঁধাইযুক্ত গ্রন্থটির ভিতরে ঠিক কী আছে - কাব্যবিষয়ক কথা নাকি কথার কাব্যরূপ তা অনুধাবন করতে অনতিবিলম্বেই প্রবেশ করতে হবে গ্রন্থের অভ্যন্তরে। পৃষ্ঠাসংখ্যা নেহাত কম নয়। দেখে বোঝার জো নেই যে এই ক্ষীণাঙ্গ গ্রন্থের ৫০ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ৪০টি কবিতা। অর্থাৎ কিনা ‘কবিতার কথা’ আসলেই এক কাব্যগ্রন্থ।
গ্রন্থের কবিতাপর্ব শুরু হওয়ার আগেও মঙ্গলাচরণ হিসেবে রয়েছে একে একে একটি শুভেচ্ছা বার্তা, ‘শুভেচ্ছা নিরন্তর’ শিরোনামে কবি নারায়ণ মোদকের শুভেচ্ছাসংবাদ এবং কবির তরফে সাকুল্যে পাঁচ লাইনের একটি ‘ভূমিকা’ - যার পুরোটাই তুলে দেয়া যায় এখানে - ‘আমার এলোমেলো অনুভূতির বন্যায় ভেসে ওঠা কিছু শব্দ দিয়ে তৈরি করেছি আমার এই ‘কাব্য কথা’। সোহাগি শ্রাবণ, মায়াবী রোদ, হারানো শৈশব, কঠিন বাস্তব সবকিছুই খুঁজে পাবেন আমার এই দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থটিতে। কবিতা পড়তে পড়তে যদি পাঠকেরা নিজেদের জীবনের সাথে যৎসামান্য পরিমানও মিল পান, তবেই আমার কলম সার্থক।’ বাহুল্য বর্জিত এই ক্ষুদ্র ভূমিকার মধ্যে কবি সাজিয়ে রেখেছেন বৃহৎ পরিসর। কে বলে কবিতার কোনো বিষয় থাকে না ?
এবার যদি সটান হামলে পড়া যায় কবিতার সন্ধানে তাহলে পাতা উলটালেই ‘অবহেলার মুকুট’ শিরোনামে পাওয়া যাবে নিখাদ আত্মসিদ্ধান্তমূলক প্রত্যয়িত একটি কবিতা -
‘...আমি খুব সহজেই বদলে যাব...
প্রেমের গায়ে ক্লান্তি ছুঁড়ে,
এবার আমি পাষাণ হব।
বসন্তের ওই উচ্চ শিরে,
আমি, অবহেলার মুকুট দেবো -
এবার আমি নীরব হব...
এবার আমি একলা হব।
কোথাও এক প্রচ্ছন্ন ছন্দের অনুরণন ভেসে আসে নিশ্চিত। আসলে প্রায় সবকটি কবিতার গায়েই এভাবে কোনো না কোনোভাবে এক লুক্কায়িত ছন্দকে কবি বেশ খানিকটা মুনশিয়ানাতেই গেঁথে দিয়েছেন নিজের মতো করে।
রঞ্জিতার কবিতায় কোনো জটিলতা নেই। তা বলে অতিসরলও নয়। রঞ্জিতার কবিতা অতিদীর্ঘও নয় আবার অতিসরলীকৃতও নয়। ফলে পাঠজনিত জটিলতাও নেই, অবসাদও নেই। ভূমিকায় বলা মতো ছুঁয়ে গেছেন একের পর এক বোধসঞ্জাত, অনুভবসঞ্জাত বিষয়সমূহ - যদিও প্রেম-ভালোবাসার অনবদ্য সমীকরণ, সরল উপেক্ষা কিংবা অকপট শব্দে গ্রহণ-বর্জনের সিদ্ধান্তই মুখ্য উপজীব্য। সপাটে ব্যক্ত করেছেন বক্তব্য -
...উশৃঙ্খল ছুঁড়ে মারা
বৃষ্টি আমি চাই না -
আমি চাই ভালোবাসায় মোড়া, স্থির, পরিচ্ছন্ন,
এক ফালি রোদ। (কবিতা - এক ফালি রোদ)
কিংবা -
মাঝে মধ্যে নিয়ম ভাঙতে হয় -
নিজেকে ভালো রাখতে হলে,
নীল আকাশে হারিয়ে গিয়ে,
ঘুড়ির মতো উড়তে হয়।...
মাঝে মধ্যে নিয়ম করে,
নিয়মগুলো ভাঙতে হয়। (কবিতা - নিয়ম ভাঙা)
এই পৃথিবীর রং, রূপ, রস, গন্ধের হদিশ পেতে কিংবা তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা অনিয়মকে প্রত্যক্ষ করতে বিশাল জীবনকাল দরকার হয় না। তরুণ কবি রঞ্জিতা জীবনের অনেক পটবদল দেখে দেখে ঋদ্ধ হয়েছেন জীবনের প্রথমার্ধেই। তারই অনবদ্য কিছু প্রকাশ - জাগতিক ও বৌদ্ধিক প্রেম-ভালোবাসার অনন্য ও অনন্ত স্বরূপকে কাটাছেঁড়া করেছেন শব্দ ও পঙ্‌ক্তির মোহনীয় মেলবন্ধনে। ‘প্রকৃতি’ শিরোনামযুক্ত কবিতায় কবি লিখছেন - আমি জড়িয়ে গেছি তোমার মায়ায়.../ তোমার সবুজ আঁচলে ঝেড়ে ফেলেছি,/ আমার সব ক্লান্তি।/ ...এক যাজকীয় সুখ পেয়েছি আমি,/ নীল পাহাড়ের নিসর্গ শোভায়!/ মস্ত আকাশের মাথায় ছেড়ে দিয়েছি, যত বানান বিভ্রান্তি;/ আর একনাগাড়ে আমি লিখে চলেছি,/ কত আনন্দের কবিতা...। - নিখাদ এক মায়াকবিতা, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে প্রকৃতিপ্রেম আর কাব্যপ্রেমের যুগলবন্দি আবহ, অনবদ্য আবেশ। 
অনেকগুলো সুলিখিত কবিতার মধ্যে বিশেষ কয়েকটির শিরোনাম উল্লেখ করা অসংগত ও নিষ্প্রয়োজন। অধিকাংশ কবিতাই সুখপাঠ্য। তবে কিছু কবিতায় যতিচিহ্নের বাহুল্য প্রত্যক্ষ করা গেছে, কিছু কবিতায় ব্যবহৃত কিছু শব্দ/পঙ্‌ক্তি কাব্যিকতার পথে ক্ষণিক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছে। সেগুলো অধ্যয়ন করে, চিহ্নিত করে পরবর্তী কবিতাসমূহ যে অধিকতর নান্দনিক, অধিকতর সুখপাঠ্য হয়ে উঠবে এমন প্রত্যয় অনায়াসেই খুঁজে পাওয়া যায় রঞ্জিতার কবিতায়। বিস্তৃত জীবনরেখা সামনে আছে কবির। তাই কবিতার মহাবৃক্ষে রং-বেরঙের রাশি রাশি ফুল যে ফুটে উঠবে আপন বৈভবে তাতে কোনো সন্দেহ থাকার কথা নয়।
গ্রন্থের কাগজের মান, ছাপা, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। বানান ‘প্রায়’ বিভ্রাটবিহীন। গ্রন্থ যতই নিজ খরচে প্রকাশিত হোক না কেন, প্রকাশকের নাম না থাকাটা গর্হিত। এদিকটায় নজর রাখতে হবে। গ্রন্থটি কবি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘দীক্ষাগুরু শ্রীমৎ স্বামী গিরিশানন্দজিকে’। শকুন্তলা দাশের প্রচ্ছদ ‘ছিমছাম সুন্দর’। সব মিলিয়ে এক প্রত্যয়িত সুখপঠনের গ্রন্থ - ‘কাব্য কথা’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
মূল্য - ১২০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৬৩৮৪২০১৮৭

Comments

Popular posts from this blog

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...