‘পরম্পরা’
- একটি মৌলিক সাহিত্য পত্রিকা
প্রকাশিত হলো ‘একটি ভিন্ন স্বাদের গদ্য পত্রিকা
- পরম্পরা’। হাতে নিয়ে পাতা ওলটাতেই খটকা। জ্বলজ্বল করছে বেশ কিছু কবিতা। অচিরেই সন্দেহের নিরসন হলো সম্পাদকীয় পাঠের মাধ্যমে। সম্পাদক মিথিলেশ ভট্টাচার্য লিখছেন - “এই সংখ্যা
‘পরম্পরা’র অনেক কিছুই নতুন। যেমন কবিতা বিভাগ - - - - ”। অর্থাৎ গদ্য পত্রিকা
এবার নতুন রূপে করেছে আত্মপ্রকাশ। দেরিতে প্রকাশের জবাবদিহিও করেছেন সম্পাদক। আদ্যোপান্ত পাঠ করার ফাঁকে যে কথাটি বারংবার উপলব্ধিতে এসেছে তা হলো সাহিত্যের
বিচিত্র ধারার সমাবেশেই প্রকৃতপক্ষে পাঠকের পঠনসুখ পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়। গদ্যের অবিচল ধারার মধ্যে পদ্যের সন্নিবেশ অবধারিত ভাবেই মানোন্নয়ন করেছে ‘পরম্পরা’র।
‘পরম্পরা’র এই ‘হেমন্ত
১৪২৭’ সংখ্যাটি বলতে গেলে এক পূর্ণাঙ্গ সাহিত্য পত্রিকা। দু’দফায় স্থান দেওয়া হয়েছে মোট ৯টি ছোটগল্প,
১০জন কবির পঁচিশটি কবিতা, ১টি অনুবাদ গল্প এবং
৫টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ।
প্রথমেই একটি পৃষ্ঠা বরাদ্দ করা হয়েছে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত, পার্থ বসু ও সনৎ কুমার
কৈরির স্মরণে।
‘বাংলার সিলেটি উপভাষা-প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ’
শিরোনামে সুরমা-বরাক উপত্যকার সামগ্রিক পরিমণ্ডলে
বিরাজমান ভাষা-বাস্তবতার উপর তথ্যসমৃদ্ধ আলোচনা করেছেন বিশিষ্ট
প্রাবন্ধিক তপোধীর ভট্টাচার্য। নিবন্ধকার সুমিতা ঘোষ তাঁর বিস্তৃত নিবন্ধ ‘শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী - বরাক উপত্যকার গল্পবিশ্বে
উজ্জ্বলতম নক্ষত্র’ নিবন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খ হদিশ দিয়েছেন শ্যামলেন্দু
চক্রবর্তীর গল্প ও তার প্রাসঙ্গিকতার। নিবন্ধপাঠক অবধারিত
ভাবে নতুন করে বিলীন হবেন এই গল্পকারের গল্পবিশ্বে। নিবন্ধের পরিশেষে
গল্পকারের সংক্ষিপ্ত পরিচিতির উল্লেখ পাঠকের অনুসন্ধিৎসার অবসান ঘটাতে সক্ষম হতো নিশ্চিতই।
ছোটগল্প প্রথম বিভাগে রয়েছে মোট চারটি গল্প। লিখেছেন অরিজিৎ
চৌধুরী, রণবীর পুরকায়স্থ, ঝুমুর
পাণ্ডে এবং সত্যজিৎ দত্ত। বিশিষ্ট এই গল্পকারদের প্রতিটি গল্পের উপর পৃষ্ঠাজোড়া
আলোচনা করা যায়, কিন্তু এই স্বল্প পরিসরে তা সম্ভব
নয়। সত্যজিৎ দত্তের গল্পটি এক কথায় চমৎকার বলা চলে। রণবীর পুরকায়স্থের
অসাধারণ গল্পের মধ্যভাগের বিস্তৃতিটুকু এবং কিছু কল্পিত অতিকথন অনায়াসেই এড়িয়ে যাওয়া
যেত। সুলেখিকা ঝুমুর পাণ্ডের বর্ণনাত্মক গল্প ছিমছাম বলা চলে।
ডঃ ধ্রুবজ্যোতি পাল লিখিত নিবন্ধটি করোনার সাতকাহন। সময়োপযোগী বলা চলে। কবি সাহিত্যিক দিলীপ কান্তি লস্কর স্মৃতির সরণি বেয়ে দু”টি কবিতা সহ স্মরণ করেছেন তাঁর বন্ধু কবি পার্থসারথি বসুকে। বলা যায় সুখপাঠ্য।
কবিতার প্রথম বিভাগে রয়েছেন কবি জিতেন নাগ, সুতপা
চক্রবর্তী, কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী, মমতা
চক্রবর্তী, মণীশ সিংহ রায়, দিলীপ কান্তি
লস্কর, শুভব্রত দত্ত, দীপক চক্রবর্তী এবং
মৃণ্ময় রায়। প্রতিটি কবিতাই সুলিখিত। বিশেষ উল্লেখ করতেই হয় জিতেন নাগ, সুতপা চক্রবর্তী ও মমতা চক্রবর্তীর কবিতা।
‘কেন পড়ি’ শিরোনামে অসাধারণ একটি নিবন্ধ উপহার
দিয়েছেন স্বপ্না ভট্টাচার্য। পড়া নিয়ে মুক্ত গদ্য। পাঠক মনে অনায়াসেই
চালান করে দিতে পেরেছেন জিজ্ঞাসা। সমাপনে আরোও সাবলীল এই নিবন্ধকার।
এর পরেই আছে কবিতার দ্বিতীয় ভাগ। লিখছেন কবি আশুতোষ দাস এবং পার্থপ্রতিম সেন। গুচ্ছ কবিতা লিখেছেন বিশিষ্ট কবি বিজয় কুমার ভট্টাচার্য। ‘করোনা কালের কবিতা’য় তাঁর
প্রতিটি কবিতার সমাহারে লিখিত হয়েছে অতিমারীর সন্ত্রস্ত বেলার বিস্তারিত ইতিহাস। ভাবীকালের নিশ্চিত রসদ হয়ে থাকবে করোনা বেলার মানবিক অবস্থান, যদিও কিছু কবিতায় পদ্য সুষমার চাইতে বর্ণনার ঘটেছে পয়োভার। দাগ কেটেছে কবিতা - ‘কথা, কথাবার্তা’ ও ‘প্রত্যহ অশৌচ’ -
মানুষ মরতে পারে মরে
না মানব
এ কথাই বলেছেন বাংলার
কবি
প্রত্যাঘাতে তৈরি আছে
যারা কুশীলব
সে আশায় কবিতায় আঁকি
তার ছবি।
এরপর আছে গল্পবিভাগ ২। লিখছেন অমিতাভ সেনগুপ্ত, শংকরজ্যোতি দেব, মনোমোহন
মিশ্র, দেবযানী ভট্টাচার্য এবং মিথিলেশ ভট্টাচার্য। এ ভাগে প্রতিটি গল্পই দাগ কাটে
পাঠক মনে। রূপকধর্মী কল্পকথায় মনমাতানো গল্প লিখেছেন শংকরজ্যোতি দেব। করোনা
পরবর্তী সুখের ছবি মুন্সিয়ানায় এঁকেছেন মিথিলেশ ভট্টাচার্য। অসহায় করোনা বেলার
মর্মান্তিক মৃত্যুর করূণ ছবি নিখুঁত ধারাবাহিকতায় ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পকার মনোমোহন
মিশ্র।
শিখা ভট্টাচার্যের অনুবাদ গল্পটিও দারুণ। তবে মূল গল্প ও গল্পকারের বিস্তারিত
উল্লেখ নেই।
সব মিলিয়ে সাহিত্যের প্রতিটি ধারার এক মূল্যবান সংমিশ্রণ বলা যায় ‘পরম্পরা’র
এই হেমন্ত সংখ্যা। পাঠক মহলে নিশ্চিতই একটি সংগ্রহযোগ্য পত্রিকা।
সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা মতো ‘পরম্পরা’র প্রকাশে উদ্ভুত সমস্যার কিছু প্রতিফলন
ঘটেছে পত্রিকায়। বানান ভুলের আধিক্য লক্ষ করা গেছে স্পষ্ট। কবিতা বিভাগে পংক্তি
বিন্যাসে আরোও একটু যত্নবান হওয়ার প্রয়োজন অনুভূত হয়েছে। এসব কিছু ছোটখাটো
ভ্রান্তি নির্দ্বিধায় দূরে সরিয়ে শুধুমাত্র মৌলিক সাহিত্য সম্ভারের ধারে ও ভারে
‘পরম্পরা’ নির্দ্বিধায় একটি সুখপাঠ্য এবং অবশ্যপাঠ্য পত্রিকা হিসেবে নিজের জায়গা
ধরে রাখতে পেরেছে - এ কথাটি বলা যায় হলফ করে।
‘পরম্পরা’
সম্পাদক - মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ০৩৮৪২২৪১৫২৯।
- - - - - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
Comments
Post a Comment