Skip to main content

বিষণ্ণতার হাত ধরে উৎকর্ষের প্রথম প্রতিশ্রুতি


আবারও একটি নৈরাশ্যবাদী গ্রন্থনামযুক্ত প্রথম কাব্যগ্রন্থ - অধিকাংশ কবি-লেখকের ক্ষেত্রে হয়তো বা অজান্তেই ঘটে যাওয়া একটি কার্যকারণ। তরুণ কবি সঞ্জয় দত্ত দুঃখ, ব্যথা, নৈরাশ্য, বিষণ্ণতা, ব্যর্থতা, বিরহ, বিচ্ছেদকেই সম্বল করেছেন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থে আরও পাঁচজন কবির ধারাবাহিকতায়। আসলে এই ধারা আজকের নয়। কবিগুরুর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘কবি কাহিনী’তেও এই ধারা প্রত্যক্ষ করা যায়। সেই থেকে এ চলে আসছে যুগ থেকে যুগান্তরে।
বুকের একদিকে গ্রামত্রিপুরার মাঠ-ঘাট, ফসলপ্রান্তরের প্রকৃতিপ্রদত্ত নৈসর্গিকতা ও আউল বাউল সুরের মাদকতাকে আর অন্যদিকে এই প্রকৃতির বুকে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা সোজা হয়ে দাঁড়ানোর টানাপোড়েনকে জমা রেখে তরুণ কবি সঞ্জয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থকে সাজিয়েছেন বুকপকেটে ধরে রাখা যাবতীয় বিপত্তি ও বিষাদসম্ভারের ব্যঞ্জনায়। দুঃখ এবং দুঃখবিন্দুগুলিকে দিয়েই শুরু কবিতার যাত্রা -
বাবা বলেন
বুকের উপর দিয়ে
যে নদী চলে গেছে মাঝ বরাবর
এই নদীর অন্ত নেই।
অথচ দুঃখ আছে।
সে নদীতে
বাবা না চাইলেও স্নান করতে হয় প্রতিদিন
আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি,
বাবার শরীর মেয়ে ঝরে পড়া দুঃখবিন্দু। (প্রথম কবিতা - নদী)।
মা-বাবাকে নিয়ে বেশ কয়েকটি কবিতায় কবি ধরে রেখেছেন একবুক ব্যথা। যেমন - পা, মেঘগুচ্ছ ইত্যাদি। ৪৮ পৃষ্ঠার আলোচ্য পাকা বাঁধাই গ্রন্থের ৩৮ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মোট ৩৫ টি কবিতা। স্বভাবতই পৃষ্ঠা ছাড়িয়েছে একাধিক কবিতা। স্বল্পদৈর্ঘ্যের চরণসংবলিত প্রতিটি কবিতা। বিষয়ভিত্তিক কবিতাসমূহের মধ্যে রয়েছে কিছু বিশেষ কবিতাও। যেমন - ফুল, ইঙ্গিত, বোবা, ইচ্ছে, ঘর ইত্যাদি। বুকপকেটে থাকা বিষণ্ণতার খণ্ড খণ্ড বিচ্ছুরণ প্রত্যক্ষ করা যায় বহু কবিতার অসংখ্য পঙ্‌ক্তি জুড়ে -
হঠাৎ একপশলা বৃষ্টির পর/ আকাশে যা দেখা যাচ্ছে,/ মনে হয়,/ পাহাড় সমান দুঃখ ভেঙে/ বসন্ত এসেছে এবার...। (কবিতা - বিষণ্ণতা প্রথম খণ্ড)। কিংবা - পৃথিবীটা গোলাভর্তি ধানের মতো,/ কেউ পচে গেছে,/কেউ ভিতর ভিতর পচে যাচ্ছে,/ কেউ সেদ্ধ হচ্ছে,/ আর কেউ বেঁচে আছে মরে যাওয়ার জন্য।... ( কবিতা - বিষণ্ণতা দ্বিতীয় খণ্ড)। এছাড়াও বিষয়ভিত্তিক এইসব কবিতার সন্নিবেশে রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু কবিতা - ‘চলে যাওয়ার আগে’, ‘আলো’ ইত্যাদি। ‘ছবি’ শিরোনামযুক্ত কবিতাটির শিরোনাম ‘সেতু’ হলে অধিকতর প্রাসঙ্গিক হতো হয়তো। ‘পাখি’ শিরোনামে পাঁচচরণযুক্ত কবিতাটি এক বিশেষ স্থান ধরে রেখেছে আলোচ্য গ্রন্থে যার উল্লেখ রয়েছে প্রকাশক বিজন বোসের ‘প্রকাশকের কথা’য় - একটি চরণ সেখান থেকেই তুলে ধরা হল বিষয়নৈপুণ্য ধরিয়ে দেওয়ার জন্য -
…আমার প্রবল দুঃখের দিনে পাখি দেখি,
প্রশ্ন করি তোমার দুঃখ নেই ?
নির্ভয়ে উত্তর দেয়
দুঃখ থাকলে ডানা মেলে ওড়ার সাহস পাই ?
আমি কেবল পাখি হতে চাই।
এত এতসব অমোঘ পঙ্‌ক্তির সন্নিবেশ সত্ত্বেও প্রথম কাব্যগ্রন্থের বা প্রথমদিককার কিছু কবিতার মধ্যে থাকা জড়তার ছাপ অস্বীকার করা যায় না। কখনও দু-একটি বেয়াড়া শব্দ কিংবা পঙ্‌ক্তি যেন কবিতার চলনকে ব্যাহত করেছে। ফলত ট্যাগলাইনে আসার ক্ষমতা হারিয়েছে সেইসব পঙ্‌ক্তি। এ নিয়ে অধিকতর কিছু চর্চা, কিছু ঘষামাজার পরিসর রয়েছে। আর যতিচিহ্নের ব্যবহারেও অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ‘কমা’র অত্যাধিক্য অনুভূত হয়েছে। এসব কাটিয়ে পরবর্তীতে একজন প্রতিষ্ঠিত কবি হয়ে ওঠার যাবতীয় গুণ প্রত্যক্ষ করা গেছে কবির কাব্যিকতাবোধ ও ভাবনাসঞ্জিত পঙ্‌ক্তি জুড়ে।
কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘পিতা-মাতার চরণ কমলে’। মিলনকান্তি দত্তের প্রচ্ছদচিত্র ও অরুণকুমার দত্তের প্রচ্ছদ রূপায়ণ প্রাসঙ্গিক ও যথার্থ। কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষর, শব্দ ও পঙ্‌ক্তিবিন্যাস যথাযথ। বানান ‘প্রায়’ নির্ভুল। সব মিলিয়ে বিকাশ, উত্তরণ, উৎকর্ষ ও  প্রতিশ্রুতির এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আলোচ্য গ্রন্থটি।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘বিষণ্ণতার বুকপকেট’
সঞ্জয় দত্ত
প্রকাশক - মনু থেকে ফেনী প্রকাশনী, ত্রিপুরা
মূল্য - ১৭০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...