লেখকের এটি তৃতীয় প্রকাশিত গ্রন্থ। বলা বাহুল্য যে ইতিপূর্বে প্রকাশিত দুটি গ্রন্থই পাঠক মহলে যথেষ্ট সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছিল। এর প্রধান কারণ তিনটি। প্রথমত ফিচারধর্মী লেখা যা সততই পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য, দ্বিতীয়ত জনসাধারণ্যে নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাবলি সংবলিত বিষয়বস্তু এবং তৃতীয়ত সরল অথচ ব্যতিক্রমী লিখনশৈলী। এই তিনের সংমিশ্রণে আজকের দিনে তাই উত্তরপূর্বে এক জনপ্রিয় লেখক হয়ে উঠেছেন সঞ্জয় গুপ্ত এতে কোনও সন্দেহ থাকার কথা নেই।
আলোচ্য গ্রন্থ ‘পেজ ফোর’ও একই ধারায় প্রকাশিত ১২৮ পৃষ্ঠার একটি ফিচার সংকলন যার ১১৫ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে ২৪টি ভিন্ন ধারার অধ্যায়। গ্রন্থপাঠের খেই ধরিয়ে দিতে ভূমিকার যে এক বিশেষ স্থান আছে তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করা যায় বিশিষ্ট লেখক ও কবি বিকাশ সরকারের ভূমিকায় যেখানে তিনি সবিস্তারে লিপিবদ্ধ করেছেন ফিচার বিষয়ক যাবতীয় তথ্যাদি এবং পাশাপাশি ফিচার ও প্রবন্ধ রচনার ফারাক নিয়েও উদাহরণ সহ আলোচনা করেছেন। লেখকের লেখার ধরন নিয়ে তিনি লিখছেন - ‘...প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষার উপর দখল না থাকলে প্রকৃত ফিচার লেখা অসম্ভবপ্রায়। সঞ্জয়ের রচনাসমূহের মধ্যে এর সবকটি গুণই বিদ্যমান, যা আমাকে প্রতিনিয়ত চমকিত করে। এমনকী ফরমায়েশি লেখাতেও তিনি অসামান্য...’। দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে ভূমিকাকার ও লেখকের মধ্যে থাকা সম্পর্কের সূত্র ধরে লেখক সঞ্জয়ের লেখা একাধিক রচনার বিষয়েও তিনি উল্লেখ করেছেন সবিস্তারে যদিও এই উল্লিখিত রচনাগুলির অধিকাংশই আলোচ্য গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত নয়। এক সার্বিক আলোচনা রয়েছে ভূমিকায়।
গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত অধ্যায়গুলির মধ্যে রয়েছে চাল কাহিনি, ভাষার মৃত্যু, দেশের আয়কর ব্যবস্থা, প্যালিয়েটিভ কেয়ার, মিড-ডে-মিল, র্যা গিং, বিশ্ব জনসংখ্যা, বিদেশে অধ্যয়ন, কঙ্গনার চড় বৃত্তান্ত, বিত্তীয় লেনদেন, অ্যাপ-ঋণ, অসম-মেঘালয়ের পর্যটন চিত্র, বাহন বিদায়, রহস্যের সমাধান, সুপ্রিম কোর্টের শুনানি, ইলিশ, থিমপুজো, উত্তরপূর্বের দূরপাল্লার ট্রেন, টিন্ডার স্ক্যাম, রোডসাইড পার্কিং, বইমেলা, শ্রমিকদের বাসস্থান ইত্যাদি হাল আমলের গুরুত্বপূর্ণ ও বহুচর্চিত বিষয়। এসব বিষয়ের উপর লেখকের তথ্য ও তত্ত্বের রয়েছে বিশাল উপস্থাপন যা পাঠকের মনজানালায় নিশ্চিতই ফুটিয়ে তুলবে নবতর ভাবনা। সাধারণ জনতা শুধু বিষয়ের বাইরের চাকচিক্যই দেখে থাকেন। তার ভেতরে যে কত কাণ্ড, কত কার্যকারণ থাকে তা সাধারণ্যের ধারণার বাইরে। আর ফিচার লেখকের কাজই হচ্ছে তা প্রাঞ্জল ও উপাদেয় করে পরিবেশন করা। বিষয়ভাবনাকে একেবারে গোড়া থেকে শেষ অবধি বিস্তৃত করে এসবেই বাজিমাত করেছেন লেখক। যার ফলে প্রতিটি অধ্যায়ের অধ্যয়ন শুরু করলে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চোখ সরিয়ে নেওয়া শুধু দুরূহই নয় একেবারেই অসম্ভব।
সরকারি বহু পরিসংখ্যান, চমকে দেওয়ার মতো বহু তথ্য, মানুষের ধারণার বিপরীতে ঘটমান কর্মপ্রবাহের খতিয়ান এবং সত্যিকারের বহু সমস্যার কিছু সন্তোষজনক সমাধানের ইঙ্গিতও লেখক সাধারণত লিপিবদ্ধ করে রাখেন তাঁর রচনায়। ব্যত্যয় ঘটেনি এখানেও। আবার ঘটনার বয়ান বর্ণনায় বহু কথ্য শব্দের প্রয়োগে একাধারে যেমন সরলীকরণ হয়ে যায় বর্ণনা তেমনি সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে সবাকার জন্য। এই মুনশিয়ানা নিয়েই লেখক সঞ্জয় আজ পাঠকের দরবারে জনপ্রিয়তার শিখরে। আলোচ্য গ্রন্থ নিশ্চিতভাবেই তাঁকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আরও বহুদূর।
গ্রন্থের ছাপাই, বাঁধাই, অক্ষরবিন্যাস সবই যথাযথ। তবে লেখকের একটি ভূমিকা থাকলে এবং শেষ প্রচ্ছদে লেখক পরিচিতির পাশাপাশি গ্রন্থবিষয়ে প্রকাশকের বয়ান খানিক বিস্তৃত হলে ভালো হতো। আঙুলে গোনা কিছু বেয়াড়া শব্দের বাইরে সব নির্ভুল বানান গ্রন্থের অন্যতম সম্পদ। বিকাশ সরকারের প্রচ্ছদ অনবদ্য এবং প্রাসঙ্গিক। সব মিলিয়ে সুপাঠ্য এবং উপভোগ্য একটি ফিচার সংকলন।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘পেজ ফোর’সঞ্জয় গুপ্ত
প্রকাশক - মজলিশ বইঘর, গুয়াহাটি
মূল্য - ২০০ টাকা।

পড়লাম। চমৎকার আলোচনা।
ReplyDeleteআঙ্গুলে গোনা কিছু বেয়াড়া শব্দের বাইরে...বাক্যটি খুব মনে ধরলো।
ধন্যবাদ দাদা
Delete