Skip to main content

সবুজ রাতের কাছে জমা আছে উপোসী দিনের কথকতা... 'জোনাকিপ্রহর'


‘আমি সেই পাহাড়টার কাছে যেতে পারিনি
যার সানুদেশে ছেড়ে আসা যায়
সব ঘৃণা ও অবসাদ,
পাপ ও প্রতীক্ষার নীল-জল।
আমি সেই নদীটির কাছেও যেতে পারিনি
যার তীরে মানুষ তর্পণ সাজায়
পূর্বপুরুষ ও পূর্বনারীর তরে।
বিসর্জনের মন্ত্রে ভাসিয়ে দেয়
কাম ও লোভের ছলাকলা। ......
তাই এ অক্ষম বেঁচে-বর্তে থাকা
সব আলো নিভিয়ে, জোনাকিপ্রহরে।
প্রথম কবিতায়, যা আবার গ্রন্থনামশীর্ষকও, যিনি ছড়িয়ে দিতে পারেন এমন কাব্যিকতা, এমন অনুভব ও অনুভূতির উৎকর্ষ - সেই কবির বাকি সব কবিতাও যে অবধারিতভাবেই হয়ে উঠবে সুপাঠ্য ও সুখপাঠ্য তাতে কোনও সন্দেহ থাকার কথা নয়।
কার্ডস্টক পেপারে স্যাডল স্টিচের ৪৮ পৃষ্ঠার গ্রন্থটির ৪২ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে মোট ৪০টি কবিতা। স্বভাবতই পৃষ্ঠা ছাড়িয়েছে দুটি কবিতা। এর বাইরে সব এক-পৃষ্ঠার আবেগিক নিবেদন। কবি প্রথম পুরুষেই কবিতা লিখতে পছন্দ করেন সাধারণত, যেখানে উঠে আসে জীবনের নানা প্রাপ্তিতে, ঘাত প্রতিঘাতে অনুভূত সব অনুভবের নান্দনিক প্রকাশ - শব্দে, শব্দদ্বৈতে, পঙ্‌ক্তিতে, চরণে। প্রতিটি কবিতা থেকেই তুলে আনা যায় রাশি রাশি ট্যাগলাইন, অসংখ্য হৃদয়ছোঁয়া পঙ্‌ক্তি। যেমন -
...উৎসব শেষে যারা ফিরেছে ঘরে/ তারা কেউ আনন্দিত নয়।/ কেউ শোকগ্রস্ত নয়, যারা/ এইমাত্র ফিরে এল টাটকা কবরে/ তাজা ফুল ছড়িয়ে।/ শোক ও সুখ সমার্থক আজ...। (কবিতা - বিষণ্ণ শহর।) কিংবা - এবার পঙ্‌ক্তিভোজনে যাবো/ তুমি থাকবে পাশে/ আধখানা চাঁদ খাওয়াবো তোমায়/ আধখানা জ্বলবে আকাশে...। (কবিতা - ক্ষুধা।)
পূর্ণগর্ভা নারীর মতো/ চাঁদ যখন একাকী হয়, নি:সঙ্গ/ তখনই পুরোনো ভালোবাসা/ বসে এসে তার পাশে/ আদরে আশ্লেষে মূক করে তাকে।/ আমি পূর্ণ চন্দ্রালোকে একা হতে চাই...। (কবিতা - নৈঃশব্দ্য।) কিংবা - যে শব্দ প্রোথিত থাকে বুকের গভীরে/ অজানিতে, আচম্বিতে,/ যে শব্দ ঝরে পড়ে বৃষ্টিধারায়/ কুয়াশাজলে অথবা শিশিরের ফুটে ওঠায়/ তৃণশস্পে, বৃক্ষমূলে জনান্তিকে -/ তাঁকে খুঁজে বেড়াই এক জন্ম ধরে/ আত্মকথা লিখব বলে...। (কবিতা - আত্মগত।)
এসব পঙ্‌ক্তি, কবিতা লিখব বলেই লেখা যায় না। মনের গভীরে, হৃদয়ের অলিন্দে অলিন্দে ভাব, অনুভূতির স্ফুরণ ও কাব্যিক সক্ষমতার যুগলবন্দিতেই এমন সম্ভব। কবির হৃদয়ে ধরা আছে অনুভূতির পাহাড়। তারই উদ্‌গীরণ আলোচ্য গ্রন্থের এক একটি কবিতা। জন্মদাতাকে নিয়ে লেখা কবিতায় অনর্গল নি:সারিত হয়েছে একাধারে ভাবসৌন্দর্য ও অনুভববৃত্তান্ত - ...সন্ধিপুজোর প্রদীপ/ নি:স্ব হয়ে আসছে ক্রমশ।/ শারদীয় বাতাস/ সুবাস সামলে থমকে গেছে/ হাসপাতালের আইসিইয়ুর দরজায়...।/ আমি খুঁজে ফিরি সেই অব্যর্থ তর্জনী/ যার দিকনির্দেশে বহুবার ফিরে পেয়েছি/ নিষ্পাপ কাশবন, আশ্চর্য মায়াবী আলো/ আর একাকী হেঁটে যাওয়ার পথ...। (কবিতা - খোঁজ।)
এভাবেই একের পর এক কবিতায় কবি ধরে রেখেছেন তাঁর সমকাল। তুলে দেওয়া যায় বহু কবিতাই কিন্তু পরিসর সেই অনুমতি দেয় না। তবু কিছু কবিতার নামোল্লেখ করতেই হয় - বেফিকর, নিভৃতবাস, নামতা, আত্মীয়, প্রজন্ম, প্রস্থান, কাঁঠালিচাঁপা, বিষাদবালিকা ইত্যাদি। এতসব নিনাদিত, অমোঘ উচ্চারিত কবিতার পরও কবি আত্মগত কাব্যতৃষ্ণার অনুষঙ্গে লিখেন - এখন আর আমি কবিতা লিখতে পারি না.../ কবিতা লিখতে না পেরে/ আমি শেষ হয়ে যাই।/ চোখ বোজার আগে দেখি/ ব্যালকনির টবে ফুটেছে ফুল/ কবিতার মতো কোমল/ শব্দের মতো উজ্জ্বল/ আর, উঠোনের তারে টানটান মেলা/ মায়ের ধান-রং শাড়ির/ গঙ্গা-যমুনা পাড়ে দোল খায়/ অমলকান্তি রোদ্দুর।/ “এই আমার দেশ, এই আমার কবিতা”/ বলে, ঘুমিয়ে পড়ি আমি - আর উঠি না। (গ্রন্থের শেষ কবিতা - অপারগ।) এই হিপনোসিস্‌, এই মায়াচ্ছন্নতা কবির কবিতাকে পোঁছে দিয়েছে এক অনতিক্রম্য নন্দনশিখরে। 
উত্তরপূর্বের সমকালীন বাংলা কবিতার পরিমণ্ডলে আলোচ্য কবি বহুদিন ধরেই ধরে রেখেছেন স্বীয় অবস্থান। আলোচ্য গ্রন্থটি তারই এক উজ্জ্বল প্রকাশ। কবি তাঁর এই চতুর্থ কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন - ‘কবিতাভুবনের দুই অগ্রজ সঞ্জয় চক্রবর্তী ও গৌতম ভট্টাচার্যকে’। জ্যামিতিক অ্যাবস্ট্রাক্ট আর্টযুক্ত প্রচ্ছদের সৌজন্যে রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ। গ্রন্থের কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ হলেও ফন্ট, কিছু বানান (বিশেষ করে বহুবার ব্যবহৃত ‘রং’ ও ‘একাকিত্ব’ শব্দ দুটি), কিছু যতিচিহ্নের ব্যাবহারের ক্ষেত্রে অধিক সচেতনতা ও সতর্কতার পরিসর রয়ে গেছে। সব মিলিয়ে নিবিড় পাঠের উপযুক্ত একগুচ্ছ কবিতার সমাহার আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ যার অধিকাংশ কবিতায় রয়েছে মায়াবী অনুভবের বিচিত্র ছোঁয়া - যা প্রত্যক্ষ করা যায় বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য কবি শঙ্খ ঘোষের বহু কবিতার মধ্যেও। হৃদয়ে জায়গা করে নেয় অনবদ্য বহু পঙ্‌ক্তি... বহু শব্দসুষমা...।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘জোনাকিপ্রহর’
দেবলীনা সেনগুপ্ত
প্রকাশক - রাজেশ চন্দ্র দেবনাথ, দৈনিক বজ্রকণ্ঠ, ত্রিপুরা
মূল্য - ১৩০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

শেকড়ের টানে নান্দনিক স্মরণিকা - ‘পরিযায়ী’

রামকৃষ্ণনগর । প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবহে বরাক উপত্যকার এক ঐতিহ্যময় শহর । বিশেষ করে শিক্ষাদীক্ষার ক্ষেত্রে চিরদিনই এক অগ্রণী স্থান হিসেবে উচ্চারিত হয়ে আসছে এই নাম । বৃহত্তর রামকৃষ্ণনগরের গোড়াপত্তনের ইতিহাস বহুদিনের । দেশভাগের আগে ও পরে , উত্তাল সময়ে স্থানচ্যূত হয়ে এখানে থিতু হতে চাওয়া মানুষের অসীম ত্যাগ ও কষ্টের ফলস্বরূপ গড়ে ওঠে এক বিশাল বাসযোগ্য অঞ্চল । শুধু রুটি , কাপড় ও ঘরের স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রই নয় , এর বাইরে শিক্ষা অর্জনের ও শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে মমনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন সেইসব মহামানবেরা । ফলস্বরূপ এক শিক্ষিত সমাজব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যদিও উচ্চশিক্ষার জন্য পরবর্তী প্রজন্মকে বেরোতে হয়েছিল নিজ বাসস্থান ছেড়ে । শিলচর তখন এ অঞ্চলের প্রধান শহর হওয়ায় স্বভাবতই শিক্ষা ও উপার্জনের স্থান হিসেবে পরিগণিত হয় । এবং স্বভাবতই রামকৃষ্ণনগর ছেড়ে এক বৃহৎ অংশের মানুষ এসে পাকাপাকিভাবে থাকতে শুরু করেন এই শিলচরে । এই ধারা আজও চলছে সমানে । শিলচরে এসেও শেকড়ের টানে পরস্পরের সাথে যুক্ত থেকে রামকৃষ্ণনগর মূলের লোকজনেরা নিজেদের মধ্যে গড়ে তোলেন এক সৌহার্দমূলক বাতাবরণ । এবং সেই সূত্রেই ২০০০ সালে গঠিত হয় ‘ ...

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...