Skip to main content

বর্ধিত পরিসরে জমজমাট কবি সমাগম


‘…প্রকৃতির ছন্দকে আবিষ্কার করেন কবি, প্রকাশ করেন ভাষায়। তবে বয়নশিল্পীর ন্যায় কারুকার্য, রসগাথা, ভাব-অনুভূতি সহ নানা প্রকার শব্দালংকার প্রয়োগ করে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণই লক্ষ্য থাকা উচিত।’… যথাযথ লিখেছেন প্রবন্ধকার সন্তোষ কুমার দত্ত। কবির কবিতা - তা সে যতই শব্দভূষিত হোক না কেন কাব্যিকতাই কবিতার শেষ কথা এ অনস্বীকার্য যদিও অধুনা এই দিকটিতে অধিকাংশ কবি, বিশেষ করে নবীনরা খানিক উদাসীন বটে। বলতে দ্বিধা নেই এর অন্তর্নিহিত কারণ মূলত বোধজনিত অস্পষ্টতা।
‘বিশ্বমানবতায় কবিতার অবদান ভারত থেকেই শুরু হয়েছিল’ শীর্ষক এই একটিমাত্র প্রবন্ধই স্থান পেয়েছে শ্রীভূমি থেকে প্রকাশিত ‘স্বরিত’ পত্রিকার ১৮তম সংখ্যায়। প্রবন্ধের মাঝখানটায় কিছু সময় ধান ভানতে শিবের গীত থাকলেও (লেখক নিজেও তা স্বীকার করেছেন) একটি গোছানো প্রবন্ধ নি:সন্দেহে। ক্রৌঞ্চমিথুনের আদি শ্লোক নিয়েই মূলত এই প্রবন্ধ।
এছাড়াও ১০০ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক বাঁধাইযুক্ত পত্রিকার গদ্য বিভাগে রয়েছে তিনটি অণুগল্প। মধ্যবিত্তের ঘরে কাজের মাসিদের অপরিহার্যতা প্রশ্নাতীত। তাঁদের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে সাহিত্যবিশ্বে বহু গল্প লেখা হয়েছে। বন্দনা সেনগুপ্তের ‘মণির মা’ শীর্ষক অণুগল্পেও তেমনি করোনাকালে কাজের মাসির (মতান্তরে দিদির) কাণ্ডকারখানা নিয়ে রয়েছে কিছু কথা। গল্প হিসেবে জমে উঠতে গিয়েও ততটা জমে উঠেনি, কারণ লেখক মাঝে প্রসঙ্গান্তরে চলে যাওয়ায় এবং তথ্যাদির সন্নিবেশে ‘মণির মা’-এর চেয়ে ‘করোনা’ই মুখ্য হয়ে উঠেছে। যদিও লেখা যে সুখপাঠ্য হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মীনাক্ষী চক্রবর্তীর সোম-এর সংলাপহীন, বর্ণনাত্মক অণুগল্প ‘বিজন ঘরে’ এগিয়েছে তরতরিয়ে। সমাপন জুতসই মনে হয়নি। ভিন্নতর আঙ্গিকেও সমাপ্তিরেখা টানা যেত হয়তো। ঘটনার ঘনঘটা ও মায়াময় স্মৃতিকথার প্রকাশে অনিন্দিতা চক্রবর্তীর সংলাপহীন অণুগল্প ’পাথর’ অনেকটাই স্মৃতিচারণের মতো হয়ে উঠেছে যদিও সুলিখিত এবং সুখপাঠ্য।
পত্রিকা সংখ্যাটির মূলত কবিতাই সম্পদ। রয়েছে বিশেষত উত্তরপূর্বের (এর বাইরেরও রয়েছে কিছু যদিও) কবিদের ভিন্ন মানসম্পন্ন একগুচ্ছ কবিতা। নানা বর্ণে, নানা স্বাদের কবিতা প্রকাশিত হয়েছে নানা আঙ্গিকে। রয়েছে মোট ৫৯ জন কবির কবিতা, কারও একাধিক। যাঁদের কবিতায় সমৃদ্ধ হয়েছে সংখ্যাটি তাঁরা হলেন - আসুতোষ দাস, শঙ্করী চক্রবর্তী, পার্থ বসু, আরণ্যক বসু, বিজন বোস, গীতা সাহা, শিখা দাশগুপ্ত, সুদীপ ভট্টাচার্য, গৌতম চৌধুরী, গীতশ্রী ভট্টাচার্য, ছন্দা দাম, চান্দ্রেয়ী দেব, রঞ্জিতা চক্রবর্তী, সৌম্যজিৎ দাস, মন্টু দাস, রাণা চক্রবর্তী, শিপ্রা শর্মা, সুবল চক্রবর্তী, জহর দেবনাথ, নির্মল দেবনাথ, রাজকুমার ধর, ঋতা চন্দ, বিমলেন্দু চক্রবর্তী, শতদল আচার্য, শিবানী গুপ্ত, চাতক বিদ্যুৎ, পরিমল কর্মকার, সুমি দাস, অকেলা মধুশ্রী ডি., শমিতা ভট্টাচার্য, নিবারণ নাথ, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, সৌরভ চক্রবর্তী, দেবলীনা সেনগুপ্ত, কমলিকা মজুমদার, সমীরণ চক্রবর্তী, অভিষেক সেন, শুক্লা মিশ্র, রতন চন্দ, আরমেদা আহমেদ, বাহারুল ইসলাম, রফি আহমেদ মজুমদার, অনামিকা শর্মা, গোপাল চক্রবর্তী, গীতাঞ্জলি রায়, ধ্রুবজ্যোতি দাস, জয়শ্রী ভট্টাচার্য, পি কে রায়, গোপাল চন্দ্র দাস, সুমিতা গোস্বামী, শর্বরী পাল, রাজন সাহা সরদার, প্রতিমা শুক্লবৈদ্য, নারায়ণ মোদক, অনুপ কুমার বণিক, ও প্রদীপ কুমার দে। শঙ্করীপ্রভা আচার্যের কবিতা ‘মেঘবালিকা’ পঙ্‌ক্তিবিন্যাস দোষে দুষ্ট হয়েছে। গীতা মুখার্জির ‘অমিতা খুব ভালো আছে’ আসলে অণুগল্প। কবিতার ধারাবাহিকতার মধ্যে ছাপা হয়েছে। এটি ছোটোগল্পও হতে পারত। বিশাল ঘটনাক্রম ও ভিন্ন আঙ্গিকের সমাপন অণুগল্পে সেভাবে ফুটে উঠল না। জয়ন্তী নাথের ‘কবিতা ও কিছু কথা’ শীর্ষক অণুনিবন্ধটিও কবিতার মাঝে ছাপা হয়েছে।
সূচিপত্রে আলাদা বিভাগ বিন্যাস নেই যদিও এসব বিন্যাসজনিত অস্বস্তি ও বেশ কিছু বানান বিভ্রাটের বাইরে এক মননশীলতার পরিচয় অনুভব করা যায় প্রকাশের ধারাবাহিকতা ও কবি সমাগমের বিশালতায়। রয়েছে এ অঞ্চলের বাঙালি জাতিসত্তা নিয়ে এক গভীর সম্পাদকীয় যা ভাবায় নিশ্চিত। ছাপা, অক্ষরবিন্যাস যথাযথ। মানস ভট্টাচার্যের প্রচ্ছদ নান্দনিক ও আকর্ষণীয়। সংখ্যাটি উৎসর্গ করা হয়েছে সদ্যপ্রয়াত সাহিত্যিক ‘শংকরকে’।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘স্বরিত - অষ্টাদশ সংকলন’
সম্পাদক - নারায়ণ মোদক ও গৌতম চৌধুরী
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯ 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...