Skip to main content

কেউ ভোলে না কেউ ভোলে


এক শীতের তীব্র ঠান্ডার মধ্যেই হঠাৎ করে নির্দেশ এল পার্শ্ববর্তী রাজ্য নাগাল্যাণ্ডের এক অপরিচিত, অখ্যাত জায়গায় যাওয়ার। রাজ্য তথা এই দেশের একেবারে পূর্বসীমান্তে মায়ান্মার সংলগ্ন নতুন জেলা নকলাক-এর সদর নকলাক শহর। তখন কর্মরত ছিলাম ওই রাজ্যেরই ডিমাপুরে। কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান। স্বভাবতই দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা সব সহকর্মীরা। পদমর্যাদায় সিনিয়র মি: ধরচৌধুরী তাঁদেরই একজন যিনি হলেন আমার সফরসঙ্গী। কিংবা বলা ভালো আমি তার। ধরচৌধুরীর মূল বাড়ি কলকাতায়। আমুদে, আন্তরিক মানুষ। গুনগুনিয়ে গাইতে ভালোবাসেন। আমরা দুজনেই সদ্য যৌবনোত্তীর্ণ। বয়সে, মানসিকভাবে হয়তো নয় তখনও।    
সফরসূচি তৈরি হল ডিমাপুর থেকেই। ড্রাইভার সহ আমরা মোট পাঁচজন। নকলাক ডিমাপুর থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো কি:মি: দূর। যেতে অন্তত পনেরো ঘণ্টা। পাহাড়ি পথে এক দিনে এতটা পথ অতিক্রম করা সম্ভব নয়। তাই ভেঙে ভেঙেই পাড়ি দিতে হবে পথ। প্রথম গন্তব্য মাঝামাঝি দূরত্বের আরেক সমৃদ্ধ জেলা সদর মোককচঙ। সেখানেই প্রথম রাত্রিযাপন। ধরচৌধুরীর বাইরেও আমার সঙ্গে আছেন আরও দুজন সহকর্মী। সহায়িকা হিসেবে সোশিয়াল সার্ভে অ্যাসিস্টান্ট মিস রংমেই এবং আলো। আমি ও ধরচৌধুরীর বাইরে সবাই স্থানীয় নাগা উপজাতির। সবাই খুব ভালো হিন্দি জানে। নাগামিজ আমরাও অনেকটাই জানি। তাই ভাষা নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। সমস্যা আদপে কিছুতেই নেই। বরঞ্চ আন্তরিকতার বাহুল্যে শুরু থেকেই খুব উপভোগ্য সফরের সূচনা হল। ‘আলো’ নামটা নিয়ে খানিক আলোচনা হল। কী করে একটি নাগা মেয়ের নাম আলো হতে পারে, আলো শব্দের অর্থ কী এসব নিয়ে খোশগল্পে কেটে গেল বেশ কিছুটা সময়। ড্রাইভার মন দিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে। নিজের গাড়ি, তাই মায়া খুব বেশি। কথা বলে কম, তবে হাসতে জানে এই যা রক্ষে। গম্ভীর, মুখ ফোলানো মানুষ দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। 
বোকাজানে প্রাতঃরাশ সেরে ফের চলা। নাগাল্যাণ্ড এলাকায় প্রথম জনপদ ভাণ্ডারি। আবার শুরু হলো নামকরণের বৈচিত্র নিয়ে আলোচনা। নাগা রাজ্যের জনপদের নাম কী করে ভাণ্ডারি হতে পারে সে কথার মীমাংসা আর হল না। গাড়ি এগিয়ে চলল মোককচঙ। সেখানেই রাত্রিযাপন। পরদিন সকালেই যাত্রা শুরু হল তুয়েনসাং হয়ে নকলাক। তিনটে জেলা সদরের সংযোগী রাস্তা এতখানি এবড়োখেবড়ো হতে পারে তা কল্পনাতেও ছিল না। ঘণ্টায় বড়জোর বিশ কিলোমিটার বেগে এবং দুই নম্বর গিয়ারেই চলতে লাগলো গাড়ি। এরই ফাঁকে সর্বভুক ধরচৌধুরী তাঁর খানা খাজানার গল্পে শামিল করে নিয়েছেন রংমেই আর আলোকে। ফড়িং থেকে মিথুন, ঝিঁঝি পোকা থেকে বাঁদর - সব আমিষ খাদ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ চলতে লাগল। বিস্বাদিত আমি সামনে বসে মগ্ন হয়ে রইলাম ঘন পাহাড়ের রহস্যময় সৌন্দর্যের রূপ আস্বাদনে।
নতুন জেলা সদর নকলাকে কোনও হোটেল নেই। কিছু সরকারি গেস্ট হাউস আছে। কিন্তু আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল সংলগ্ন একটি গ্রাম নকিয়ানের ব্যাপ্টিস্ট চার্চের গেস্ট হাউসে। নকলাক পয়েণ্টে গাড়ি থামতেই এগিয়ে এল দু’টি ছেলে। আগে থেকেই যোগাযোগ করা হয়েছিল। ওরা নকিয়ান গ্রামেরই ছাত্র। নেমে পরিচিত হলাম ওদের সঙ্গে। আলো জন্মসূত্রে ওই অঞ্চলেরই মেয়ে। তাই স্থানীয় উপজাতি ভাষা চাং খুব ভালো করেই জানে। চার্চের কম্পাউণ্ডের ভিতরেই গেস্ট হাউস। আমাদের জন্য দু’টি রুম আগে থেকেই বরাদ্দ করা ছিল। জিনিসপত্র নামিয়ে ঘরে ঢুকে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
কনকনে ঠান্ডায় ইতিমধ্যে হাত পা হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম। এর মধ্যেই সামনের বারান্দায় বেরিয়ে রাতের নকিয়ানকে একবার দেখে নেবার লোভ সামলাতে পারলাম না। তাকিয়ে যেন চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। রাতেরও এত নীরব সৌন্দর্য। উপরে পাহাড়ের ঢল বেয়ে গ্রাম। বাড়ি ঘরের আলোর ফুলকি দেখে মনে হয় যেন তারকাখচিত আকাশ নেমে এসেছে ধরণিতে। গেস্ট হাউসের কাছাকাছি আলাদা রান্নাঘর। নাগাদের রান্নাঘরের বিলাসিতা সবখানেই দেখার মতো। এখানেও ব্যতিক্রম নয়। প্রশস্ত প্রকোষ্ঠের ঠিক মাঝামাঝি খোলা উনুন জ্বলতেই থাকে। উনুনের উপর মাঁচা বেঁধে নানা রকম আমিষ খাদ্যসামগ্রী। ঝলসানো হচ্ছে দিনের পর দিন। এর চারপাশে বসে আগুনের তাপ নেওয়ার জন্য বসার ব্যবস্থা। এক পাশে খাওয়ার বেঞ্চ ও টেবিল। রাত তখন প্রায় সাতটা বাজে। খাওয়ার তাগাদা এসে গেল। খানিকটা তরতাজা হয়ে সবাই মিলে রান্নাঘরে গেলাম। আগুনের পাশে সার দিয়ে রাখা মোড়ায় বসে খাওয়ার প্রস্তুতি নিলাম। অনেকগুলো পদ রান্না করে রাখা আছে আমাদের জন্য। কিচেনের দায়িত্বে আছে একটি স্বল্পভাষী নাগা ছেলে। ওর নাম পুচং। সব চাইতে আশ্চর্য হলাম একটি মেয়েকে দেখে। সে আমরা আসবো বলে স্বেচ্ছা সেবায় এসেছে। রান্না ঘরের দায়িত্ব অনেকটাই সামলেছে পুচং-এর পাশাপাশি। কথায় কথায় জানা গেল ও ইতিমধ্যে এনথ্রপোলোজি নিয়ে মাস্টার্স করেছে। অবাক হলাম উচ্চশিক্ষিত হয়েও এদের দায়বদ্ধতা আর এসব ব্যবস্থাপনা নিয়ে। এও জানা গেল - কাল অন্য কেউ আসবে এই দায়িত্ব সামলাতে। রাতেই এলেন গীর্জার প্যাস্টর। খবরাখবর নিলেন। ব্যবস্থাপনা সব দেখে নিলেন। এত কদর, আপ্যায়নের এত আন্তরিকতা দেখে ভীষণ ভালো হয়ে গেল মনটা। সারা দিনের অভুক্ত থাকার ব্যাপারটা যেন ভুলেই গেছি। কিন্তু খেতে বসেই বিপত্তি। সবগুলো পদেকেই বাঁশের গুড়ো (ব্যাম্বু শ্যুট) দিয়ে সুস্বাদু বানানো হয়েছে। কিন্তু এই বস্তুটির গন্ধ আমি মোটেই সহ্য করতে পারি না। তাছাড়া ছিল মিথুনের মাংসের চাটনি। ‘মিথুনের চাটনি’ ? আমি হতভম্ব ! মুখে দিতে পারলাম না কিছুই। শেষে শুধু লবণ মেখেই দু’এক গ্রাস ভাত মুখে তুলে নিলাম। ধরচৌধুরী গোগ্রাসে গিলছেন সব। অবাক হলাম ভেবে যে একজন বাঙালি কী করে এসব পাহাড়ি আমিষ খাদ্য খাচ্ছেন। কিছু বলতে গিয়েও ভাবলাম থাকগে। এটা ব্যক্তিগত রুচির ব্যাপার। এদিকে আমার খাওয়ার ধরন দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লো পুচং এবং সেই মেয়েটি। এবার মেয়েটি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ডিম খাবো কিনা। আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে ডিমের ওমলেট বানিয়ে দিল। আমারও খাওয়া হল আর ওরাও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। খাওয়া শেষে ফিরে এলাম রুমে। 
রাত বড়জোর আটটা হবে তখন। এত তাড়াতড়ি কি আর ঘুমোনো যায় ? খানিক বইপত্র পড়ে, মোবাইল হাতে নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে খানিক বিচরণ করে টয়লেটে যাব বলে বাইরে বেরোতেই আবার সেই সুন্দরী রাতের দৃশ্য নজরে এল। এবার আকাশ আলো করা চাঁদ যেন নেমে এসেছে পাহাড় পেরিয়ে একেবারে হাতের মুঠোয়। ওদিকে মোহময়ী পাহাড় যেন চাঁদের আলোয় আপাদমস্তক প্রসাধনে মগ্ন। দৃষ্টি যেন আটকেই রইল রইল সেখানে। দাঁড়িয়ে রইলাম একাকী। চোখ ফেরানো দায় হয়ে পড়েছে। ইস্‌ যদি কবিতা লিখতে পারতাম। কোন জন্মের পুণ্যফলে যে এসেছি এখানে। কত কথা, কত যাপন বেলার বৃত্তান্ত সব যেন এসে ভিড় জমালো অন্তরে। একে একে সামনে এসে দাঁড়াল যত আপন, যত মন উজাড় করা চিত্র - সে যে আমার স্বপনচারিণী। আহা, পাশে যদি দাঁড়াতো এসে। 
না, কোনও স্বপনচারিণী নয়, ঠিক তখনই পাশে এসে দাঁড়ালেন মি: ধরচৌধুরী। আমার হাতে ধরা আধপোড়া সিগারেট দেখে বললেন - 
– ‘যা ঠান্ডা পড়েছে। সিগারেট থাকলে দিন তো একটা।’
দুপ্যাকেট সিগারেট এনেছিলাম সঙ্গে করে। কিন্তু পদমর্যাদা ভুলে ধরচৌধুরী যে এসে সিগারেট চাইবেন তা ভাবতে পারিনি। টানতে দেখেছিলেন বোধহয়। না হলে চাইবেন কেন ? প্যাকেট থেকে একটি বের করে এগিয়ে দিলাম। সেই শুরু। এরপর সিগারেট যা ছিল সবই ভাগ করে খেতে হয়েছে। শুধু তাই নয়। ধরচৌধুরীর সঙ্গে আন্তরিকতা যেন বেড়ে গেছে এক অদম্য উচ্চতায়। কয়েক দিনের যাপনে ব্যক্তিগত জীবনের অনেক সুখদু:খের কথাও আমরা ভাগ করে নিলাম অকপটে। সত্যি মানুষের হৃদয় যে কত সহজেই মিলে মিশে যায় আরেকটি হৃদয়ের সাথে।
দ্বিতীয় দিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই নজরে এল কাল রাতের উদ্ভাসিত চাঁদের জায়গা নিয়েছে শীতের আমেজ মাখানো রোদের উৎস সূর্য। এবার স্পষ্ট দেখতে পেলাম চারপাশের পরিবেশ। সামনেই বড়জোর বিশ পা দূরেই বিশাল গির্জা। শান্ত সমাহিত জিশুখ্রিস্টের পবিত্র ক্রসখচিত গির্জা যেন প্রেম ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের মূর্ত প্রতীক। ভাবলাম একবার ভেতরে ঢুকে দেখতে হবে। গির্জার ভেতরে কখনো ঢোকার সুযোগ হয়নি। ইতিমধ্যে সকালের চা নিয়ে হাজির পুচং। চা খেয়ে চানটান সেরে বেরিয়ে পড়লাম কাজে। সারা গাঁ ঘুরে বেড়াতে হবে তাই সঙ্গে নিলাম স্থানীয় সেই ছাত্র ছেলেদের। বড়ই অমায়িক এবং নম্র স্বভাবের ছেলেগুলো। পইপই করে ঘুরে দেখালো গ্রাম। চড়াই আর উতরাই-এর পদযাত্রায় যতটুকু না কষ্ট হচ্ছিল তার চাইতে ঢের বেশি আনন্দ হচ্ছিল নতুন জায়গার সাথে, মানুষজনের জীবনযাত্রার সাথে পরিচিত হয়ে। রংমেই আর আলোও খুব আনন্দিত। বস্তুত রাতে আকাশের চাঁদ আর দিনে ‘আলো’ই যেন ওর রূপের আলোর নিরন্তর বন্যায় আলোকিত করে রেখেছে আমাদের বন্য সফরযাপন। 
বিকেলে কাজকর্ম সেরে এসে দেখি পুচং আমাদের অপেক্ষায় না খেয়ে বসে আছে। ভীষণ মায়া লেগে গেল ছেলেটার উপর। না খেয়ে আছে অথচ মুখের হাসিটি কিন্তু অম্লান। খেতে গিয়ে আরও অবাক। আজ কোনও পদেই বাঁশের গুড়ো নেই। অর্থাৎ আমার উপযুক্ত খাদ্য। বিকেলে একটু বিশ্রাম নিয়ে সন্ধে নাগাদ একটু চায়ের কথা বলব ভাবছি অমনি দেখি চায়ের পেয়ালা হাতে হাজির পুচং। প্রচণ্ড কর্মদক্ষ। রাতে রান্নাঘরের উনুনের চারপাশে বসে আছি। পুচং এসে জিজ্ঞেস করলো – কাল মাছ খাবেন ? আমার তো শুনেই মুখে মুচকি হাসির ছোঁয়া। 
জিজ্ঞেস করলাম - কী মাছ পাওয়া যায় ? 
– রুই আর পাংগাশ। 
– রুই হলে চলবে। খুব খুশি হল পুচং। আমাকে উপযুক্ত খাওয়া জুগিয়েই যেন ওর যত আনন্দ। মাঝে মাঝে উদাস দৃষ্টিতে তাকায়। জিজ্ঞেস করায় বলল - আপনি কিছুই খেতে পারছেন না। 
বললাম - কোথায় খাচ্ছি না। সবই তো খাচ্ছি এখন। কিন্তু এরকম না করে অন্যদের পছন্দের খাবারও বানাবে। 
ওর দৃঢ় বিশ্বাস আমি নাগামিজ বুঝতে পারব না। তাই আমার সাথে হিন্দিতে কথা বলে। খুব ধীরে ধীরে কিন্তু একেবারে নির্ভুল। রাত আটটার মধ্যে দ্বিতীয় রাতের খাওয়াও শেষ। ফিরে এলাম রুমে। দিনের কাজের কিছু নোট লিখে রাখতে গিয়ে প্রায় দশটা বেজে গেল। ঠান্ডায় হাত পা যেন জমে যাচ্ছে। কাজ শেষ করে এই প্রথম পেছনের বারান্দার দিকের দরজাটা খুললাম কৌতূহলবশত। দরজা খোলার সাথে সাথেই যেন আরেক বিশ্বদুয়ার খুলে গেল চোখের সামনে। আশ্চর্য, কাল কেন খুলে দেখলাম না এ দরজা ? এই পাহাড়গুলোকেই তো খুঁজছিলাম কাছে থেকে দেখবো বলে। দিনের বেলা সময় করে উঠতে পারিনি। ওই পাহাড়গুলোর ওপারেই তো ভিন দেশের সাকিন। সেই ব্রহ্মদেশ, রেঙ্গুন - শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের পটভূমিকা। আজকের মায়ান্মার। পাহাড়গুলো কি তা জানে ? দেখে তো মনে হল না। কাল্পনিক সীমারেখাকে যেন বিদ্রুপের হাসিতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে রাতের কুয়াশা, চাঁদ আর অসীম আকাশকে সাথে নিয়ে আরেক নতুন রসায়ন। বিশাল পাহাড়ের সারিগুলো দীর্ঘ ঢল বেয়ে যেন এ ওর গায়ে শুধুই ঢলাঢলি। আমার মন প্রাণ জুড়ে শুধু মগ্ন বিস্ময়ের উথালপাতাল। 
পরদিন সকালে উঠে এক অবাক দৃশ্য। মাঝেমাঝেই দেখছি কেউ কেউ আসছেন হাতে করে এক একটি মুরগি নিয়ে। এক ফাঁকে গিয়ে পুচংকে জিজ্ঞেস করলাম - ব্যাপার কী ভাই ? 
মুচকি হেসে বলল - স্যার, আপনি যে অন্য কিছু খান না এই খবরটা সবাই জেনে গেছে। তাই। 
আমি তো এসব শুনে একেবারে হতভম্ব। এমনও হয় ? যাই হোক, কী আর করা যাবে। এতগুলো মুরগি শেষ করতে হলে আমাকে নির্ঘাত আরোও সপ্তাহখানেক এখানেই থাকতে হবে। তাই, পুচংকে বললাম সবাইকে মানা করতে। 
জীবনে প্রথম বারের মতো স্থানীয় একজন লোককে সঙ্গে করে গিয়ে ঢুকলাম গির্জার অভ্যন্তরে। মঞ্চে মস্ত বড় ক্রস। ফাদার এবং প্যাস্টরের বসার জায়গা। নিচে প্রায় হাজার মানুষের বসার জায়গা। ভক্তিভরে অনুভব করলাম পরিবেশ। এইসব পর্বতবাসীদের আধুনিকতার ছোঁয়ায় শিক্ষিত করে তুলতে খ্রিশ্চিয়ান মিশনারিদের অবদানও কিছু কম নয়। আজ থেকে বহু বছর আগে দুর্গম, প্রত্যন্ত পাহাড়ে এসে আস্তানা গেড়ে অসীম কষ্টে ছড়িয়ে দিয়েছেন আধুনিকতার আলো।
আবার কাজের তাড়নায় কেটে গেল দিন। দুপুরের খাওয়া সেদিন বাইরেই খেতে হল। তাপমাত্রার পারদ ক্রমাগত নামতে নামতে এদিন ছয় ডিগ্রিতে পৌঁছেছে। কাবু হয়ে পড়ছি যেন ক্রমশঃ। এরকম অবস্থায় গরম গরম ডালভাত ভালোই খেলাম। সঙ্গীরা পর্ক সহযোগে ভুরিভোজন সারলেন। কাল শেষ রাতের পর থেকেই ঘন কুয়াশার চাঁদরে যেন অবগুণ্ঠিত হয়ে আছে অপরূপা নকলাক। আমার যেন দেখে দেখে আর আশ মেটে না। যাই হোক। কাজ সেরে আবার ফিরে এলাম ডেরায়। আজ আর দেরি নয়। দিনের আলো ফুরিয়ে যেতেই পেছনের বারান্দায় চেয়ারখানা পেতে তাকিয়ে রইলাম দূর পাহাড়ের দিকে নির্নিমেষ। এদিন পাশে ধরচৌধুরীও বসে গোটাদুয়েক সিগারেট পুড়িয়ে অবলোকন করলেন প্রকৃতির সৌন্দর্য। সাথে গুনগুন আর খোশগল্প দুজনে। 
পরদিন সকাল থেকেই শুরু হল ঝিরিঝিরি বৃষ্টির আনাগোনা। তাপমাত্রা নেমে চারের কোঠায়। তবে কি বরফ পড়বে ? বিদায় বেলায় সবার মন খারাপ। চা-পর্ব শেষ হতেই ধীরে ধীরে জড়ো হতে থাকলেন গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। প্যাস্টর মশাই এসে দুঃখ করে বললেন - আপনাদের ঠিক মতো দেখভাল করতে পারলাম না। এসেছেন গ্রাম সভার সব পদাধিকারীরাও। বিদায় নহবত যেন বেজে ওঠার অপেক্ষায়। সবাই মিলে সমস্বরে আমাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য গেয়ে উঠলেন প্রার্থনা সংগীত। সবাই লাইন ধরে দাঁড়িয়ে। এ এক অনন্য অভিজ্ঞতা। কৃতজ্ঞতায় কানায় কানায় ভরে উঠছে হৃদয়। চোখদু’টো যেন সিক্ত হওয়ার অপেক্ষায়। আমি তাকিয়ে আছি পুচং-এর বিষণ্ণ মুখটির দিকে। কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। শুধু মনে মনে বললাম - তোমায় ভুলবো না পুচং এ জীবনে। এত যত্ন, এত আদর - এ কি ভোলার ? 
গাড়িতে উঠে বসলাম সবাই। ফেরত যাত্রার নহবতে এবার পূর্ণ সংগত করতে লাগল অঝোর ধারায় বৃষ্টি। যেন আমাদের বিদায়ে প্রকৃতিও আমাদেরই মতো হয়ে আছে সিক্ত। নকলাক-এ কিছুই নেই। কিন্তু যা আছে তার মূল্যায়নে, তার স্মৃতির রোমন্থনে কেটে যাবে বাকি থাকা দিনগুলো। 
###
এক বছর হয়ে গেল নকলাক থেকে ফেরার। ততোদিনে ধরচৌধুরী বদলি হয়ে চলে গেছেন কলকাতায়। যাওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে আন্তরিকতা পৌঁছেছিল চরম ও পরমে। কষ্ট পেয়েছি তাঁর চলে যাওয়ায়। কলকাতা গেলে অবশ্যই তাঁর ঘরে যেতে হবে - আবদার করেছেন বারবার। আমিও কথা দিয়েছি। প্রথম দিকে ফোনে কথা হয়েছে দুয়েকদিন। পুচং কিংবা আলোদের কথা প্রায় ভুলতে বসেছি ততোদিনে।
###
এর কয়েক মাস পর কলকাতায় একটি সাহিত্য অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গেছি উদ্যোক্তা গোষ্ঠীর আমন্ত্রণে। পৌঁছেই ফোন করেছি ধরচৌধুরীকে। ফোন ধরে কোথায় আছি জিজ্ঞেস করে বললেন -
– অফিসে খুব কাজের চাপ। আমি চেষ্টা করছি অফিস থেকে বেরিয়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে।
ধরচৌধুরীর সঙ্গে সেই শেষ কথা। আসেননি সে রাতে আর এরপর কোনোদিন আমার ফোনও ওঠাননি। নিজেও করেননি। 
গতকাল আচমকাই অজানা নম্বর থেকে একটি ফোন আসতে ধরলাম -
– ‘হ্যালো!’
– ‘হ্যালো স্যার! মুইখান পুচং কইছে। ক্যায়সে হ্যাঁয় আপ?’

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...