Skip to main content

কবিতায় অরণ্যের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসা


মঙ্গোলীয় চাঁদ লুটোপুটি খায় সুন্দি আর কমলার ফসিলের গায়...

উত্তরপূর্বের বিশেষত ত্রিপুরা রাজ্যের কবি হারাধন বৈরাগী কবিতা লিখছেন কয়েক দশক ধরে। শুধু কবিতা লিখছেন বললে ভুল হবে। বলা ভালো কবিতা নির্মাণ করছেন এক স্বতন্ত্র ধারায়। তাঁর কবিতার অবয়ব কিংবা বৈভব - উভয়েই তাঁর ব্যক্তিজীবন ধারার সঙ্গে খাপ খায় একশো শতাংশ। তাঁর এই কবিনাম, তাঁর কবিতা এবং ভাবধারায় এক স্বাতন্ত্র্য, এক বৈরাগ্য যেন সতত আবহমান। অথচ কবিকুলে কেউ লিখে রাখেনি তাঁর কথা। এই বিড়ম্বনা শুধু তাঁরই নয়। এমন অপাংক্তেয়করণের শিকার আরও বহু জন। কবির পঙ্ক্তিকরণের দায় যাঁরা নিয়ে রেখেছেন স্বতঃস্ফুর্ত হয়ে তারাই এর জবাবদিহির পাত্র।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে কবির কাব্যগ্রন্থ ‘কমলামথের শৃঙ্গার’। তথানুযায়ী এটি তাঁর পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ। গ্রন্থের শেষ প্রচ্ছদে প্রকাশক সংস্থার তরফে উল্লেখ আছে যে কবি - ‘…অসম্ভব জঙ্গলআউলিয়া। ভালোবাসা তাঁর জঙ্গল, পাহাড়ি স্রোত তাঁর আত্মা, মাটি তাঁর শরীর, জুম তাঁর অনন্ত জীবন…’। এই জঙ্গলআউলিয়া শব্দটি যেন হুবহু খাপ খেয়ে যায় আলোচ্য গ্রন্থের নির্যাসের সঙ্গে। অরণ্যের গভীর ব্যাপকতার মতোই এক আত্মস্থ আরণ্যক প্রেম যেন কবির সহজাত।
গ্রন্থটি যাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছে সেই ‘মন্ত্রকবি মিলনকান্তি দত্ত’-এর নান্দনিক তথা ইলাস্ট্রেটিভ প্রচ্ছদ গ্রন্থকে প্রদান করেছে অনন্য মর্যাদা। এবং যে কথাটি প্রথমেই বলে নেওয়া প্রয়োজন তা হচ্ছে এক অসাধারণ গ্রন্থনাম। গ্রন্থনামের প্রতিটি শব্দ যেন সুচিন্তিত এবং সুচয়িত। আলোচ্য এই গ্রন্থটি আসলে কবির পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহের ধারাবাহিকতায় যেন এক নতুনতর সংযোজন, যে গ্রন্থে তুলে ধরা আছে পার্বত্য ত্রিপুরার জম্পুই পাহাড়শ্রেণির জঙ্গল, তার অধিবাসী, তার অন্দরে খাপে খাপে লুকিয়ে থাকা ইতিহাস আর ভূগোলের সাকিন। জম্পুই-এর কমলা, তার সংগ্রাহক প্রেমিকমথ ও জঙ্গল মহলের প্রকৃতি, অধিবাসীর অনন্য শৃঙ্গারকথা। সব মিলিয়ে ‘কমলামথের শৃঙ্গার’।
১০৪ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাই গ্রন্থের ১০০ পৃষ্ঠা জুড়ে রয়েছে দু’লাইন থেকে শুরু করে দুই পৃষ্ঠা জোড়া মোট ৯৩টি শিরোনামবিহীন কবিতা। বলা ভালো এক এক করে একটি কবিতার সিরিজ যার ভেতর লুকিয়ে আছে আরও বহু সিরিজ - জম্পুই সিরিজ, বেতলংশিব সিরিজ, ফুলদেংসাই সিরিজ ইত্যাদি। সব মিলিয়ে আস্ত একটি কাব্য-আলেখ্য। যে আলেখ্যতে রয়েছে পাহাড়ের প্রতি এক অদম্য ভালোবাসা, হৃদয়ের টান। বাস্তবতা ও কাব্যিকতার এক অনন্য রসায়ন, অপূর্ব সমন্বয়। প্রথম থেকে অষ্টম লুসাই পাহাড় - বর্তমান মিজোরাম এবং ফের নবম কবিতা থেকে সেই যে শুরু হয়েছে জম্পুই পাহাড়ের চুলচেরা বীক্ষণ, যেন ভুগোল আর ইতিহাসের ভেতর লুকিয়ে থাকা যাবতীয় ইতিকথার উপস্থাপন। জম্পুই পাহাড়ের সম্পদ যখন হারিয়ে যাচ্ছে মানবিক আগ্রাসনে তখন কবিহৃদয়ে ধ্বনিত হয় বেদনার সুর -
ঘুমের ভিতরই জম্পুই পাহাড়
উজাড় করে ফেলেছে বনদস্যুরা
আর উধাও হয়ে গেছে তার
শরীর থেকে কমলামথের শৃঙ্গার। (কবিতা - ১৪)
জম্পুই শুধু পাহাড় নয়
এক স্বপ্নবিলাসী অরণ্য
মেঘ এসে এখনও চুমু খায়
সুন্দি কমলার ফসিলের গায়… (কবিতা ৯১)
কবির কাছে জম্পুই হল ‘চিরবসন্তের আশ্রম ইডেন কানন’। এমনই একের পর এক অমোঘ, অনবদ্য পঙ্ক্তি জুড়ে ধরা আছে জম্পুই পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্যের জয়গান আর কবিমনের অবাধ ভালোবাসা। আঞ্চলিক শব্দের বহুল ব্যবহার একদিকে যেমন প্রাসঙ্গিক করেছে বয়ান অন্যদিকে দূরান্তের পাঠকের কাছে হয়তো কিছু জটিলতার অনুভবও। তাই সতর্ক কবি প্রথম থেকেই ইতিহাস ও ভূগোলকে সঙ্গী করে এঁকেছেন কাব্যচিত্র যাতে এসেছে একে একে - মিজোরাম, জম্পুই, বেতলংশিব, মুনপুই, কাঞ্চনপুর, ভাংমুন, ফুলদেংসাই, উজানমাছমারা ফরেস্ট, দেও উপত্যকা, দেও নদী…। ইতিহাস কিংবা ভূগোলকে লিপিবদ্ধ করা এবং এক একটি উপজাতীয় স্থাননামবাচক, জাতিনামবাচক শব্দের অর্থ সহ কবিতার পঙ্ক্তি নির্মাণ করা বড় সহজ কথা নয়। ফলত দুয়েকটি জায়গায় কাব্যিকতা আঘাতপ্রাপ্ত হলেও কিছু করার ছিল না। তবু হৃদয়ের আকুলতা থেকে পাঠকের কাছে পৌঁছে যেতে সেই কাজটিই কবি করেছেন প্রায় সর্বত্র, অপার যতনে।
৮২ নম্বর কবিতাটি যেন গোটা গ্রন্থের এক সারমর্ম, সাথে কবির হৃদিকথা -
স্মৃতির কুয়াশায় ঢেকে আছে কমলা-পাহাড়/ কমলা-ফুল হেসে উঠত/ কমলামথের ডানার শব্দে/ ভেসে আসত কামনার ঘ্রাণ।/ ফুলের চোখে ফুটে উঠত/ কমলামথের শৃঙ্গার/ জঙ্গল কেটে নিয়েছে লোভ/ সুন্দি করই গামাই নাগেশ্বর -/ সকলেই নিঃশব্দে কাত হয়ে গেছে/ কুঠারের কাছে…/ ঘরের খুটা ভেঙে গেলে/ হারিয়ে যায় শীতের কুয়াশা--/ ধ্বংস হয় জঙ্গলের বর্ণমালা/ ঝাঁকঝাঁক/ কমলামথের ডানা/ শীতল বাতাস কমে আসে/ উধাও হয়ে যায় কালাসুন্দরী মেঘ।/ কমলাফুলের মধুমিলনে/ নেমে আসে মড়কের ঘুণ/ পাতায় পাতায় দংশন/ দুধ-শিশির, ডাইব্যাক, মাকড়ের মহামারি/ শুকিয়ে যায় কমলা-নারী/ ডুবে যায় প্রজন্ম…/ জীবিকার জাল বুনে/ পাহাড় আবার দাঁড়ায় সময়ের শিকড়ে/ ফসল ছড়িয়ে পড়ে বাজারে/ ভরে উঠে বুক কুহবা বাগানে।…/ পাহাড় এখনও ঋণী আদা, পেঁপে, কফি কচু/ লেবু, আম, জাম আর সাতকরার কাছে।/ এখনও জ্বলে ওঠে ঝুমখেতের আগুন/ ধোঁয়া ওড়ে আকাশে/ মিশে যায় অদম্য হাতের ঘাম/ শেকড় আর মাটির ভালোবাসায়।
এই জীবনের শেকড় আর স্বভূমের মাটির ভালোবাসাতেই আসলে গড়ে ওঠে এমন মায়াময় সব পঙ্ক্তি আর সৃষ্টি হয় এমন কুহকজড়ানো এক কাব্যগ্রন্থ। হাতে গোনা কিছু বানানবিভ্রাটের বাইরে কাগজের মান, ছাপার স্পষ্টতা, অক্ষর ও পঙ্ক্তিবিন্যাস যথাযথ। ভূমিকাবিহীন গ্রন্থটি কবিতাপ্রেমী ও প্রকৃতিপ্রেমী পাঠকের কাছে নি:সন্দেহে এক সুখপঠনের আকর হয়ে থাকবে তার পাতায় পাতায় থাকা আরণ্যক আচ্ছন্নতার ছটায়।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘কমলামথের শৃঙ্গার’
হারাধন বৈরাগী
প্রকাশক - স্রোত প্রকাশনা, ত্রিপুরা
মূল্য - ৩০০ টাকা

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...