শেষ পর্যন্ত ওই আলাপটাই স্থির হল। হাঁফ ছেড়ে বেঁচে গেল ঝুমকি। হবু শ্বশুরবাড়ি কিছুটা দূরে হলেও এই বাড়ি ছেড়ে ফাইনালি বেরোতে পারছে সে এটাই আপাতত সবচেয়ে স্বস্তির ব্যাপার। মনে মনে এমনই ভাবলেও তা তো আর জনসমক্ষে বলা যায় না। লোকে হাসবে তাহলে, বলবে কেমন বিয়েপাগল মেয়ে। অনেকেই আড়ালে বলবে - একবার বিয়ে হয়ে যা শ্বশুরবাড়ি, এরপর বুঝবি কত ধানে কত চাল।
তা বলুক যে যা বলে। ঝুমকির মন আজ ফুরফুরে। এখানে, এই ঘরে ঝুমকির বাস বহুদিন। ছোটবেলা থেকেই বাবার ট্রান্সফারের চাকরির ফাঁকে এই কোয়ার্টারে ঝুমকিরা আছে অন্তত বছর দশেক ধরে। এলাকার সবাইকে সে মোটামুটি চেনে। আগে ভালোই লাগত। কিন্তু গত দু-আড়াই মাস ধরে বলতে গেলে আর টেকাই যাচ্ছিল না এখানে। সকাল-সন্ধ্যা পাশের ঘোষকাকুদের বাড়িতে যেন কুরুক্ষেত্র। কত আর কানে তুলো গুঁজে রাখা যায় ? রোজকার এই দুবেলার চিলচিৎকার শুনে শুনে কান ঝালাপালা। পেছনের জানালাটা আর খোলাই হয় না আজকাল। মা বলেন -
– কিছু একটা ঘোরতর হয়েছে ওদের বাড়ি। খোঁজখবর করার দরকার নেই বাবা। শেষে না আবার জড়িয়ে পড়তে হয় গৃহকোন্দলে।
বাবা নতুন কোয়ার্টারের খবর নিচ্ছেন যদিও ক্রমে ক্রমে একদিন গা সওয়া হয়ে গেল এসব। আজকাল ঝগড়াঝাঁটি চলছে যদিও মনমগজে আর সেরকম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে না। তবু একেবারেই যে ফুরিয়ে গেছে তাও নয়। ঝুমকি ভাবছিল কী করে এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আর ক’দিনের মধ্যেই বয়ে এল সেই সুসংবাদ। পরের মাসে শুভদিনে কেঁদেকেটে একশা হয়ে শ্বশুরবাড়ি অভিমুখে যাত্রা করল ঝুমকি।
একদিকে দুঃখব্যথা আর অন্যদিকে এক শাপমুক্তির আনন্দদোলায় দোদুল্যমান ঝুমকি সপ্তাহখানেক শ্বশুরবাড়িতে থেকে দ্বিরাগমনে এল। ভেতরে একটাই চিন্তা - ওবাড়ির চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু হলে কী ভাববে নতুন জামাই ? কী বলবে ঝুমকি ? কিন্তু ঝুমকি অবাক হয়ে গেল এটা দেখে যে কেমন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে পরিপার্শ্বে। কান পেতেও কিছুই শোনা যাচ্ছে না। পরদিন সকালেও একই আবহ। ঝুমকির কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে শুরু হল। শেষে রান্নাঘরে মায়ের পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেসই করে ফেলল -
– ঘোষকাকুরা সব কোথায় গেল গো ?
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments
Post a Comment