৯ম সংখ্যা অনুরণন - একটি সার্বিক পর্যালোচনা
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
গায়ে গতরে ক্ষুদ্র বলেই নাম তার লিটল
ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা। অন্যথায় বিষয় বৈচিত্রে, জ্ঞানে-গভীরতায় এক একটি
ছোট পত্রিকা নিঃসন্দেহে মহীরুহসম। কিছু সংখ্যক ছোট পত্রিকা আবার জন্ম
লগ্নেই বিশালবপু।
মধ্য অসমের নগাঁও শহর থেকে
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে
‘নগাঁও বাঙ্গালী সম্মিলনী’র বাৎসরিক সাহিত্য পত্র
- অনুরণন এর নবম সংখ্যা। ২০০৯ সাল থেকে বিশেষজ্ঞ সম্পাদক শংকর
দাস-এর
সম্পাদনায় অব্যাহত আছে অনুরণনের পথ চলা। কলেবরে অনুরণনের পূর্ববর্তী
সংখ্যাগুলোকেও ‘ছোট পত্রিকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়নি, এবারেও না। বিষয়গত
প্রাচুর্যে এবং মানগত উৎকর্ষতায় অনুরণন বরাবরই ওজনদার।
তবে এবারের বিশেষ সংখ্যা অনুরণন
সার্বিক রূপেই এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সযত্নে রক্ষিত থাকবে ভবিষ্যতের
গ্রন্থাগারে। নগাঁও বাঙালি সম্মিলনীর ১২৫ বছরের স্মারক হিসেবে প্রকাশিত
২৫৬ পৃষ্ঠার এই সাহিত্য পত্র এক কথায় নগাঁও শহর এবং সম্মিলনীর এক স্পষ্ট দর্পণ।
বর্তমান সময়ের ডাকসাইটে সব লেখক ও সাহিত্যিকের অনবদ্য লেখায় সমৃদ্ধ অনুরণন তাই
অচিরেই গবেষকবৃন্দের এক উৎকৃষ্ট সংগ্রহযোগ্য সংকলন হিসেবে পরিগণিত হবে নিঃসন্দেহে।
সম্মিলনীর ১২৫ তম বর্ষ উদযাপন
সমিতির সহায়তায় প্রকাশিত এই সংখ্যাটির মানানসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন অমিতাভ দাশগুপ্ত।
স্মৃতি তর্পণ ও শ্রদ্ধা-স্মরণ শেষে মোট ৪টি বিশেষ ও মূল্যবান প্রবন্ধের মাধ্যমে
নিবেদন করা হয়েছে শ্রদ্ধার্ঘ্য। ১২৫ বছরের শ্রদ্ধার্ঘ্য জ্ঞাপন করা হয়েছে চারজন
কালজয়ী সাহিত্যিককে - যাঁদের ১২৫তম জন্ম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে এ বছর। নিঃসন্দেহে
সম্পাদনা সমিতির পক্ষে এ এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ। প্রথম প্রবন্ধ ‘সূর্য কুমার ভুঞা : একটি
শ্রদ্ধাঞ্জলি’- লিখেছেন বাসুদেব দাস। নগাঁও শহরে জন্ম গ্রহণ করা এই কালজয়ী
সাহিত্যিকের জীবন ও সাহিত্য কীর্তির অনুপম বর্ণনা করেছেন শ্রী দাস তাঁর এই প্রবন্ধটির
মাধ্যমে। দ্বিতীয়
প্রবন্ধ জাহিদ আহমেদ তপাদারের ‘গল্প সম্রাট মহীচন্দ্র বরা’। প্রবন্ধটির মাধ্যমে মুন্সিয়ানা বজায়
রেখে মহীচন্দ্র বরার ছোটগল্পের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন শ্রী তপাদার। ‘বিভূতিভূষণের আখ্যান-
এক আশ্চর্য জীবনচর্যার পাঁচালীতে ভাঙনের কথকতা’। এই প্রবন্ধটির লেখক নগাঁও কলেজের বাংলা
বিভাগের প্রধান ডঃ সঞ্জয় দে। ‘পথের পাঁচালী’র অমর স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের জীবন, সাহিত্য
ও সাহিত্যের চরিত্রসমূহের অনবদ্য চিত্রণের মাধ্যমে এক অনবদ্য সংগ্রহযোগ্য প্রবন্ধ লিখেছেন
ডঃ দে। ডঃ
সুব্রত ঘোষ লিখেছেন
‘বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের গল্পে হাস্যরসের অভিমুখ’। সমকালীন অপর যুগন্ধর সাহিত্যিক বিভূতিভূষণ
মুখোপাধ্যায়ের ছোটোগল্পের এই অনাস্বাদিত দিকটি খুব প্রাঞ্জল করে ফুটিয়ে তুলেছেন প্রবন্ধকার।
এই চারটি মূল্যবান প্রবন্ধের পর এসেছে
ছিমছাম ও সংক্ষিপ্ত সম্পাদকীয়। সম্পাদকীয়র শেষাংশে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে
স্মরণ করা হয়েছে সদ্য প্রয়াত বিশিষ্ট চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন-এর কথা যাঁর হাত ধরে
শুভারম্ভ হয়েছিল সম্মিলনীর শতবর্ষের উদযাপন অনুষ্ঠান।
এ তো গেল গৌরচন্দ্রিকা। এরপর সমাজের প্রায় সব স্তরের বিশিষ্ট
জনের শুভেচ্ছাবাণীর পর শুরু হয়েছে সুবিন্যস্ত কিছু বিভাগ। এই সুচিন্তিত বিভাগ বিন্যাস প্রকৃতপক্ষে
পাঠকের কাছে অনুরণনকে করে তুলেছে সহজপাঠ্য। প্রথম বিভাগ ‘অসমিয়া বাঙালি
- পাশাপাশি’। এই অংশে মোট ছয়টি প্রবন্ধ লিখেছেন
মন্দিরা দাস (বাংলা ভাষায় শঙ্করদেব চর্চা (১৮৭৯-১৯২০) ও উমেশ চন্দ্র দেব), পূর্ণিমা
দাস (অনুবাদকের চোখে অসমিয়া-বাংলা সংস্কৃতির
সমন্বয়, অস্তিত্বের সঙ্কট এবং উত্তরণ), মানিক দাস (প্রবাস-বাসে :
বাঙালি, বাঙালিয়ানা ও আত্মপরিচয়ের গ্লানি),
দেবযানী দেবনাথ (শতবর্ষ ডিঙিয়ে স্বমহিমায় উজ্জ্বল
নগাঁওয়ের কিছু প্রতিষ্ঠান), স্বপ্না দে (নগাঁওয়ের দুর্গোৎসব-এক সম্প্রীতির নিদর্শন) ও ডঃ মলয় রায় (স্মরণে বিস্মরণে)। বর্তমান পরিস্থিতিতে এবং সাহিত্যের
মূল্যে প্রতিটি রচনা অত্যন্ত মূল্যবান। প্রতিটি প্রবন্ধের আলাদা পর্যালোচনা
এই স্বল্প পরিসরে অসম্ভব যদিও বর্ষীয়ান সাহিত্যিক তথা বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
ডঃ মলয় রায়ের রচনাটি এখানে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য কারণ তাঁর এই একটি রচনার মাধ্যমেই
অত্যন্ত সাবলীল ভাবে ফুটে উঠেছে নগাঁও-এর সমকালিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক পুঙ্খানুপুঙ্খ
বিবরণ। শতবার্ষিকীর
মূল রূপকার হিসেবে সম্মিলনীর ও নগাঁওবাসীর খুব কাছের জন ডঃ রায়ের প্রবন্ধের সমাপ্তি
খুবই মর্মস্পর্শী- “স্মরণের কিছু কথা ধরা রইল কাগজের পাতায়, বিস্মরণের অগাধ
সমুদ্রে তলিয়ে গেল আরও অনেক কথা। স্মরণ-বিস্মরণের পরস্পর-সংঘাতী ঢেউয়ে আন্দোলিত হতে হতে আমার জীবনতরী হয়তো আরও কিছুদিন ভেসে চলবে কোনো
তীরের উদ্দেশ্যে। তারপর তরী যেদিন তীরলগ্ন হবে, আমি নেমে পড়ব বিনা
দ্বিধায়”।
পরবর্তী বিভাগ ‘নগাঁওয়ের বাঙালি যেখানে-যেমন’। এখানে যাঁরা লিখেছেন তাঁরা সবাই এই শহরের স্থায়ী বাসিন্দা। নন্দনতত্ত্বের প্রায় সব ক’টি বিষয় নিয়ে পুরুষানুক্রমে
ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার নিরিখে আহৃত জ্ঞানের ভিত্তিতে লিখা এই প্রবন্ধগুলি পরবর্তী প্রজন্মের
কাছে এক মহা মূল্যবান সম্পদ হিসেবে গচ্ছিত থাকবে। এ পর্যায়ে মোট সাতটি নিবন্ধ সন্নিবিষ্ট
আছে।
‘নগাঁও শহরে সাংস্কৃতিক চর্চা ও বাঙালি’- লেখক
সত্যজিৎ রায়। ‘নগাঁও শহরের উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে বাঙালি
অধ্যাপক ও অধ্যাপিকাদের অবদান’- লিখেছেন কামাখ্যা প্রসাদ চৌধুরী। ‘নগাঁও শহরে চিকিৎসার
আঙিনায় বাঙালি’- লেখক শংকর দাস। ‘নগাঁও শহরের মৃৎশিল্পী’-
লেখক ধ্রুবজ্যোতি দেবনাথ। ‘বাংলা পত্র পত্রিকা
প্রকাশনে নগাঁও শহর’- লেখক অসীম কুমার নন্দী। অসীম কুমার ভাওয়াল লিখেছেন ‘ক্রীড়াক্ষেত্রে নগাঁওয়ের
বাঙালিদের অবদান’ন এবংএবং অমিতাভ দাশগুপ্ত লিখেছেন ‘নগাঁওয়ের বাঙালি চারুশিল্পীরা’। এটি অনস্বীকার্য যে প্রবন্ধকারদের
গভীর অধ্যবসায় ও নিরলস অনুসন্ধানের ফলশ্রুতিতে উপস্থাপিত হয়েছে সব ক’টি প্রবন্ধ।
শেষ বিভাগ ‘নগাঁও বাঙ্গালী সম্মিলনী
- কথায় কথায় ১২৫’। আরোও একটু বেশি মানাতো - যদি হতো
‘চলতে চলতে ১২৫’ কিংবা ‘কথায়
ছন্দে ১২৫’। ১২৫
বছরের স্মারক সংখ্যা হিসেবে পত্রিকাটির এই পর্বেই রয়েছে সম্মিলনীর সাতকাহন। সভাপতি, সম্পাদকের কলম থেকে
সংক্ষিপ্ত আকারে একদিকে যেমন বেরিয়ে এসেছে কিছু স্মৃতির ঝলক তেমনি রয়েছে আগামীর প্রত্যয়। স্মৃতি হাতড়ে একগুচ্ছ নিবন্ধ লিখেছেন
তাঁরা - যাঁরা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ উপায়ে কোনো না কোনো ভাবে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন
সম্মিলনীর অঙ্গ হিসেবে। লিখেছেন শৈলেন সাহা, শুভপ্রসাদ নন্দী মজুমদার,
ইলোরা দাসগুপ্ত, মালা চক্রবর্তী, সপোনটি বরদলৈ, রণদীপ নন্দী, তুষার
কান্তি সাহা ও রতীশ দাস। শেষোক্ত জন আবার অনুরণনকে নিয়েই লিখেছেন
দীর্ঘ এই প্রবন্ধ। এই
প্রবন্ধকাররা প্রত্যেকেই সাহিত্য সংস্কৃতির বিভিন্ন
ধারায় নিজ নিজ ক্ষেত্রে যথেষ্ট পরিপক্ক এবং সমাজে বহুল পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। প্রতিটি নিবন্ধে নগাঁও বাঙালি সম্মিলনীর
প্রতি এঁদের অন্তরের মর্মকথা ব্যক্ত করা হয়েছে প্রাঞ্জল অভিব্যাক্তির মাধ্যমে।
নিবন্ধের পরই স্বতন্ত্র শিরোনাম -‘কবিতায় নগাঁও বাঙ্গালী
সম্মিলনী’র আওতায় ছাপা হয়েছে ক্রমান্বয়ে পাঁচটি কবিতা। প্রথমেই মন্দাক্রান্তা ছন্দে ১০০ লাইনের
দীর্ঘ কবিতা -“সম্মিলনীর শতেক গাথা’ লিখেছেন বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। এরপর সঞ্জীব ভট্টাচার্যের ‘কিছু কথা হৃদয়ের’,
মণি পাল গাঙ্গুলির ‘নগাঁও বাঙ্গালী সম্মিলনী’,
বিনিময় দাসের ‘একতায় আছে শক্তি’ ও সন্টু কুমার দে’র ‘সম্মিলনী যুগ
যুগ জিও’।
এই পর্বে একেবারে শেষে সম্পাদক শংকর
দাস লিখেছেন একটি চমৎকার দীর্ঘ প্রবন্ধ - ‘নগাঁও বাঙ্গালী সম্মিলনীর সওয়াশো বছরের ইতিবৃত্ত
- সময়ের দূরবীণে ফিরে দেখা’। প্রবন্ধটি সত্যিকার অর্থেই একটি ইতিবৃত্ত। জন্মলগ্ন থেকে সম্মিলনীর সমকালীন ঘটনাবলির
এক সুস্পষ্ট ইতিহাস। বৃহৎ এই পত্রিকাটির যাবতীয় নির্যাস যেন এই একটি রচনাতেই চূড়ান্ত
মুন্সিয়ানায় হৃদয় নিংড়ে লিপিবদ্ধ করেছেন লেখক।
হাতে গোণা কয়েকটি বানান ভুলের বাইরে
বিশালাকার এই পত্রিকায় কোথাও কোন ছন্দপতনের চিহ্ন নেই। সম্পাদনা মণ্ডলীর এও এক দারুণ কৃতিত্ব।
সম্মিলনীর ‘১২৫ বছরের স্মারক’
সংখ্যার মধ্য দিয়ে উৎকর্ষের চরম নিদর্শন হয়ে রইল অনুরণন। একাধিক নামজাদা কবি সাহিত্যিকের উৎকৃষ্ট
রচনার পরিপুষ্ট সম্ভারে প্রকৃতপক্ষে অনুরণন নিজেই হয়ে উঠলো এক সম্মিলনী।
সম্পাদক - শংকর দাস
যোগাযোগ - ৯১০১৮২৯০৩০
Comments
Post a Comment