Skip to main content

মিলন তরী ২

অকৃত্রিম বন্ধুত্বের বাঁধনে বাঁধা প্রতিটি বন্ধুর মানসিকতার সুরে সুর মিলিয়েছে প্রকৃতি। তিন দিন আগে মিলন মেলার আশে সবার চনমনে হৃদয়ের সাথে খেলে বেড়াচ্ছিল ঝলমলে রোদ।

আর আজ বিদায় বেলায় ভাঙা হাট থেকে ফেরার পথে সবার হৃদয়ের জমাট ব্যথার সাথে  ব্যথিত সুরে আবার কেমন গুমড়ো মুখে সুর মিলিয়েছে প্রকৃতি।

দুটো দিন সত্যিই বড্ড কম পড়ে গেল। অনেক কিছুই রয়ে গেল অধরা। আসলে এমন সংসর্গ সব সময় অপূর্ণই থাকে। আশ মেটে না। এত কথা, এত সাহচর্য তবুও মনে হয় আরোও কতই যে রয়ে গেল বাকি। বড়দিনের মতো শুভ দিনে এক এক করে যখন সবাই এসে পৌঁছাতে শুরু হলো আগরতলা শহরের নির্ধারিত গন্তব্য 'হোটেল মার্শ'- সেদিনই বেজে উঠলো মিলন মেলার চূড়ান্ত নহবত। অতিথিবৎসল তিন বন্ধু চরকির মতো শুধু ছুটছিল যেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পরে অনেকের সাথে অনেকের দেখা হতেই শুরু হলো বুকে জড়িয়ে ধরে এক সুরে দুটো অভুক্ত  হৃদয়তন্ত্রীর সুর ফের মেলানোর পালা।

প্রথম দিনে সমবেত প্রাতঃভ্রমণ শেষে বন্ধু দেবজিৎ - এর ঘরে ফুলকো লুচির দমদার প্রাতঃরাশ দিয়ে বেজে উঠলো মিলন তরীর দামামা। এরপর গ্রহণ লাগা সূর্য দেবতার রাহুমুক্তি হতেই নাওয়া খাওয়া শেষে সবাই মিলে ফিরে দেখলাম প্রথম মিলন তরীর স্মৃতি সম্বলিত ডিজিটাল এলবাম। সৌজন্যে নাসিকবাসী সহপাঠী বন্ধু প্রশান্ত বিকেল হতেই পড়িমরি দে ছুট বাংলাদেশ সীমান্তের পেরেড দেখার অছিলায়। এরপর ঐতিহ্যবাহী আগরতলা রাজবাড়ি।

সেখান থেকে ফিরেই সটান শুধুমাত্র নিজেদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে অনুষ্ঠিত বিচিত্রানুষ্ঠানে। একের পর এক সুন্দর থেকে সুন্দরতর সব নন্দনকলার প্রদর্শন। দূরে বসবাসরত বন্ধু, স্থানীয় বন্ধু, বান্ধবী, বন্ধুপত্নী, বান্ধবীপতি আর আমাদের চির কচিকাচা সন্তানদের দ্বারা পরিবেশিত হলো এক দীর্ঘ জমজমাট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সাথে উন্মোচিত হলো মিলন মেলা 2 এর স্মরণিকা

এবং পালন করা হলে এক মিনিটের নীরবতা - পরলোকগত সহপাঠী বন্ধুদের স্মৃতির উদ্দেশে। গান কবিতা নাচ বাদ্য এবং দেহরক্ষা শিল্পের চূড়ান্ত প্রদর্শন। শেষে চিরাচরিত ধামাইল গানের সঙ্গে পা দুলিয়ে তুমুল নাচ। দারুণ অভাব অনুভূত হলো গায়ক বন্ধু সঞ্জীব দেবজিতের সুকণ্ঠী কন্যা মিলির অভাব। রাতে বৃষ্টিধারায় ঝরে পড়লো হৃদয়ের স্বপ্নময় উল্লাস।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে ছিল ঘুরে বেড়ানোর পালা। উদয়পুর ভুবনেশ্বরী মন্দির মাতাবাড়ি, মেলাঘর নীরমহলে সারাটি দিন কাটিয়ে হৈ হুল্লোড়ের মাঝেই উপভোগ করলাম বন্ধু বিকাশ তার সহধর্মিণীর আতিথ্য। রাতে আরেক বন্ধু টিটুর দরিয়াদিল আত্মীয়ের ঝাঁ চকচকে রেস্তরাঁয় সমবেত রাত্রিভোজ সেরে রাত এগারোটায় হলো হোটেলে ফেরা।

গভীর রাতে প্রশান্ত-এর বহুরূপী প্রদর্শন হাসির বন্যা বইয়ে দিল গোটা হোটেলে।

তৃতীয় তথা শেষদিনে ভোর থেকেই শুরু হয়ে গেল ঘরে ফেরার পালা। একে একে বিদায় হলো সবার - দু'দিনের মিলন মেলার অফুরন্ত স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে। বিমান বন্দর, রেল স্টেশন পর্যন্ত অতিথিদের অকৃপণ ভালোবাসার কদরে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব যথাযথ পালন করে গেল তিন স্থানীয় মহারথী দেবজিত, বিকাশ বিশ্বজিৎ।

এবারের মিলন মেলার অফুরান প্রাপ্তি।

আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম - আমাদের সন্তানদের পারস্পরিক সখ্য এবার এক অসীম উচ্চতা ছুঁয়েছে যার থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না। বন্ধুপত্নীদের একাত্মতার ছবি ছিল হৃদয়ে সযতনে সাজিয়ে রাখার মতো। এই সাহচর্য একদিন আমাদেরও না ছাড়িয়ে যায়। বান্ধবীপতি দেবাশিস-দার সরব উপস্থিতি অনুষ্ঠানের মর্যাদা বাড়িয়ে দিল বহুগুণ। আমরা আপ্লুত। সপরিবারে যোগদানের মাধ্যমে এই যে বর্ধিত নৈকট্যের ধারা - এই ধারা প্রবহমান কাল ধরে চলতে থাকুক অবিশ্রান্ত। সবার মননে বাজতে থাকুক মিলনের ঐকতান।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...