আষাড়ের মাঝামাঝিতেই জলে টইটম্বুর
উপত্যকা। অফুরান বৃষ্টিধারা ঝরেই চলেছে শ্রাবণের ধারার মতো। তিতিবিরক্ত হয়ে ওঠে নাজেহাল পথিক। শহর জুড়ে জলজট। থইথই রাজপথে স্তব্ধ
জীবনযাত্রা। ওদিকে ‘ছাতা কাঁধে, জুতা হাতে ভ্যাবাচ্যাকা মূর্তি’ সব পথচারী
গ্রামবাসী। বাটে ঘাটে, পথে হাটে যেন মাছেদের রাজত্ব। উপচে পড়া জলধারায় নাস্তানাবুদ
জীবন।
শিলচর শহরতলি থেকে মোহনপুরের নিত্যযাত্রী
মন্দিরা। শিক্ষকতার চাকরির হ্যাপা প্রচুর। সরকার বাহাদুরের নিত্য নতুন ফরমানে
ব্যতিব্যস্ত দিনযাপন। সবকিছু সামলেসুমলেও দিনশেষে করিৎকর্মা সরকার আর নিজের
ভাগ্যকেই পুরো কৃতিত্বটা দেয় মন্দিরা। সরকারি চাকরি করে সত্য মিথ্যার মিশেল বানিয়ে
উঠতে বসতে সরকারের মুণ্ডপাত করাদের দলে নেই সে।
‘আইন, আইন দিদিমণি। যাইতামগি’ -
মন্দিরাকে বাসস্ট্যাণ্ডে দেখেই হাঁক পাড়ে মোহনপুরগামী বাসের হ্যাণ্ডিমেন ফকরুল।
অসম্ভব রকমের ছটফটে ধরণের ছেলে এই ফকরুল। সদাহাস্য কিন্তু অশান্ত, চঞ্চল। একদিন তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে
সিগারেট খেতেও দেখেছে মন্দিরা। সে খাক। মন্দিরার তাতে কী ? মন্দিরা এগিয়ে যায়
বাসের দিকে। ভালো করে তাকিয়ে দেখে সাকুল্যে চার থেকে ছ’জন যাত্রী বসে রয়েছেন বাসে।
অর্থাৎ বাস ছাড়তে অন্তত আধঘণ্টা বাকি আছে এখনো। অথচ ফকরুলের ভাবখানা এমন যেন
মন্দিরা যদি এক্ষুণি বাসে উঠে না পড়ে তাহলে তাকে না নিয়েই ছেড়ে চলে যাবে বাস। আর
এর পর আরোও একটি ঘণ্টা তাকে অপেক্ষা করতে হবে এখানেই - এই বাস স্ট্যাণ্ডে। মন্দিরা
এদিক ওদিক তাকিয়ে বাসেই গিয়ে উঠলো। জানালার ধারের অসংখ্য সিট খালি পড়ে আছে। অথচ
এমনটা হয় না সাধারণতঃ। আজ নির্ঘাত বৃষ্টির জন্যই এমনটি হয়েছে। মনে মনে একটু খুশিই হয়
মন্দিরা। একটু আয়েস করে খোলা হাওয়ায় ভাবনায় মেতে থেকে একলা একা সফরের আমেজই আলাদা।
কিন্তু এ কী ? জানালার ধারের প্রায় সবগুলি সিটই তো ভিজে জবজবে হয়ে আছে। বসবে কোথায়
? মুখ বাড়িয়ে ডাকে ফকরুলকে। ফকরুল এক লাফে উঠে আসে বাসের ভেতর - ‘কিতা হইছে
দিদিমণি ?’ ভেজা সিটগুলো দেখিয়ে মন্দিরা বলে - ঠিক মতো কাজ করিস না, না রে ফকরুল ?
জানালাগুলো লাগিয়ে রাখিসনি সময় মতো। এখন ভেজা সিটে বসি কী করে ?
লজ্জা, অনুশোচনায় দাঁতে জিভ কাটে
ফকরুল। ছুটে গিয়ে ড্রাইভারের সিটের পাশের বাক্স থেকে একটা পলিথিনের খালি প্যাকেট এনে পেতে দেয় মন্দিরার
পছন্দের সিটের উপর। গুছিয়ে বসে ফকরুলের দিকে তাকায় মন্দিরা। বলে - কত দেরি হবে আর
?
ফকরুলের রেডিমেড উত্তর - দশ
মিনিটর মধ্যেই ছাড়ি দিমু দিদিমণি।
মুচকি হাসে মন্দিরা। জানে বাস
ছাড়বে তার নির্ধারিত সময়েই। কিংবা খানিকটা দেরি করেই। বেশি যাত্রীর অপেক্ষায় যাই
যাচ্ছি করেও সহজে ছাড়বে না যতক্ষণ না পরবর্তী বাস এসে তাড়া দেবে পেছনে। জীবনের সহজ
সত্য। সন্ধে এসে তাড়া দেয় বলেই দিনে দিনে ঘর গোছানো। দারিদ্র আর বুভুক্ষা এসে তাড়া
দেয় বলেই জীবনভর কিছু করে খাওয়ার ঝক্কি।
মন্দিরার কথার উত্তর দিয়েই তড়িঘড়ি
নেমে যায় ফকরুল ফাঁকা রাস্তায় যাত্রী ধরার উদ্দেশে। নীরবে বসে তার কাণ্ডকারখানা
দেখে মন্দিরা। ভাবনা এসে পাখা মেলে মনে। ফকরুলের মতো অসংখ্য কম বয়সের ছেলেদের
আজকাল কাতারে কাতারে দেখা যায় বাইরে বেরোলেই। ঘোলাটে চোখ, কথাবার্তায়
বহির্বরাকের আঞ্চলিকতার ছোঁয়া। কম বয়সে দৈহিক কাজের খোঁজে এরা
ঘুরে বেড়ায় এদিক ওদিক। অথচ এই বয়সে এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। শিক্ষাদীক্ষার বয়স।
কিন্তু সে বালাই নেই কারোও। উপচে পড়ছে জনসংখ্যা, পালটে যাচ্ছে জনবিন্যাস। অশিক্ষা,
সদিচ্ছার অভাব, ধর্মীয় কুসংস্কার আর অনুপ্রবেশই যে এর জন্য দায়ী সে তো দিনের আলোর
মতোই পরিষ্কার। কিন্তু এ নিয়ে কিছু বলা যাবে না। বললে চক্ষুশূল হতে হবে অনেকের।
তার চেয়ে সরকারকে দোষারোপ করাটাই সেফ সাইড। ‘ডিসগাস্টিং’ - শব্দটি স্বতঃস্ফুর্ত
ভাবেই বেরিয়ে আসে মন্দিরার ভেতর থেকে।
এরকমই - সাত পাঁচ ভাবতে থাকতে
থাকতেই, হঠাৎ সামান্য ঝাঁকুনি দিয়ে ছাড়লো বাসটা। এতক্ষণে মোটামুটি অর্ধেক বাস
ভর্তি হয়ে গেছে যাত্রীতে। খেয়ালই করেনি মন্দিরা। তার পাশের সিটটি তখনো খালি।
মন্দিরা জানে যতক্ষণ পর্যন্ত একটি সিটও খালি আছে ততক্ষণ কেউ এসে বসবে না এখানে। এর
কারণও অবশ্য আছে। প্রথমতঃ সবাই জানে মন্দিরা মোহনপুর এল পি স্কুলের দিদিমণি। তাই সবাই
একটু সমীহ করে স্বভাবতই। দ্বিতীয়তঃ চেহারা কিংবা গায়ের রঙের দিক থেকে এমন কিছু
আকর্ষণীয় নয় মন্দিরা যে কোনও হ্যাংলা যাত্রী এসে আগ বাড়িয়ে পাশের সিটে বসবে গা
ঘেঁষে। সুতরাং আপাতত এক ঘন্টার নিভৃত যাত্রা শুরু হলো মন্দিরার।
সকাল থেকে চরকির মতো চলতে চলতে এই
সময়ে এসে শারিরীক ভাবে কিছুটা বিধ্বস্ত হয়ে থাকে মন্দিরা। ঘরে নিজেকে নিয়ে মোট
চারটে প্রাণী। সৌভিক প্রাইভেট ফার্মে কাজ করে। ধরাবাঁধা সময়ের চাকুরি। ন’টা থেকে
ছ’টা। এর মধ্যে মৃত্যু হলেও যমরাজকে তার অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে নির্ঘাত।
বিশেষ কারণে হলেও এমনকি মন্দিরার ফোনটিও ধরার সময় থাকে না সৌভিকের হাতে। মন্দিরাও
সেটা জানে বিলক্ষণ। তাই সৌভিকের অফিস টাইমে মন্দিরার একলা জীবন। যমজ ছেলে-মেয়ে
দুটি আপাতত ক্লাস টু’তে। প্রাইভেট স্কুল। এখন ক্লাস টু’তেও টপিক লিখতে দেওয়া হয়।
ফিজিক্স, কেমিষ্ট্রি, বায়োলজি পড়ানো হয়। শিশুরা নাকি হাতির মতো। যত খাওয়াতে চাও
ততই খাবে। সরকারি স্কুলের শিক্ষিকা মন্দিরা এসব কথা শুনে অবাক হয়ে যায়।
ভাবে নিজেও তো সরকারি স্কুলে
মাতৃভাষায় পড়াশোনা করে আজ সরকারি চাকরি করে বলতে গেলে সংসারটাকে টানছে। অথচ
প্রাইভেটে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ে সৌভিক এখন কী করছে ? ন্যূনতম বেতনে সারাটি দিন খেটে
মরছে। এ কেমন শিক্ষা ব্যাবস্থা ? অথচ আজকাল অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রাইভেটে পড়তে যেতে
হয়। না হলে ছেলে মেয়ে দু’টিকে সরকারি স্কুলে পড়ানোরই পক্ষপাতী ছিল মন্দিরা।
যাই হোক। যা হলো না তা নিয়ে তো আর
ভেবে লাভ নেই। এখন চোখের সামনে জমে আছে যে সমস্যার পাহাড় তাকেই সামলানোর ভাবনাটি
বড় মন্দিরার কাছে।
###
বাইরে যতই বৃষ্টি ঝরুক, যতই খেলে
বেড়াক প্রকৃতি - ভেতরে কিন্তু তার আঁচটুকুও পাওয়া যায় না। দিনের পর রাত, রাতের পর
দিন একঘেয়ে এখানকার জীবনযাত্রা। অচেনা প্রতিবেশী, অজানা আশঙ্কাই এখানকার
নিত্যসঙ্গী মনোজবাবুর। শহরের মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত একটি নার্সিং হোমের জেনারেল
ওয়ার্ডে আপাতত শয্যাশায়ী মনোজবাবু সদ্য সফর করে এসেছেন আই সি ইয়ু। ভয়ানক এক স্বপ্ন
থেকে যেন বেরিয়ে এসেছেন সদ্য। চোখের সামনে যেন একের পর এক জীবন্ত লাশ। যেন তার আর
যন্ত্রপাতি জড়ানো এক একটি জড় পদার্থ। এসব দেখে দেখে নিজের অসুখের কথাটি ভুলেই বসে
রয়েছিলেন মনোজবাবু - যদিও আকস্মিক অসুস্থতার থেকে বেরিয়ে আসতে সপ্তাহখানেক থাকতে
হয়েছে হয়তো। দিন ক্ষণের হিসেবে আজকাল গণ্ডগোল হয়ে যায় তাঁর। গণ্ডগোল সবখানেই। চেনা
দেহটি যে এভাবে এত তাড়াতাড়িই বিশ্বাসঘাতকতা করবে তা ভাবতে পারেননি মনোজবাবু।
কিন্তু সব কিছু কি আর ভাবনা মতো হয় ? অবসরের পর দু’টি বছরও ঘুরলো না। তার আগেই হাসপাতালের নিয়মিত যাত্রী হয়ে গেলেন। অথচ আজ থেকে পাঁচ বছর আগে যখন চোখের সামনে পরপারে চলে
গেলেন স্ত্রী মোহনা তখনও তো তিনি যথেষ্ট শক্তসমর্থ।
সেই দিনটির কথা ভাবলে আজও শিউরে
উঠেন মনোজবাবু। এক মেঘলা সকালেই বলেছিল মোহনা - শরীরটা একটুও
ভালো লাগছে না গো।
একাধিক রোগের বাসা মোহনার শরীরে। প্রতি দিন অন্তত পাঁচটি ওষুধ তাঁর বাঁধা। এত সব অসুখ নিয়েই চলছিলেন মোহনা। মাঝে মাঝেই বিগড়ে যেত
নিত্যদিনের রুটিন - মোহনার এহেন শারীরিক সমস্যার জন্য। প্রায় গা সওয়া হয়ে
গিয়েছিল মনোজবাবুর। স্বামী স্ত্রী দু’জনেরই সংসার। একমাত্র মেয়ে মন্দিরার আজ
বছর তিনেক হলো বিয়ে হয়েছে। ইতিমধ্যেই যমজ দু”টি ছেলে-মেয়ে এসেছে কোল আলো করে। মোহনার কথায় সেদিন বেশি গুরুত্ব
দেননি মনোজবাবু। ওষুধগুলো সময়মতো খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন
অফিসের উদ্দেশে। কিন্তু অফিসে গিয়ে পৌঁছানোর আগেই কাজের মাসির ফোন পেয়ে
তড়িঘড়ি ঘরে ফেরেও আর বাঁচাতে পারেননি মোহনাকে। তাঁকে অবাক করে মুহূর্তের
মধ্যেই স্ট্রোক করে চলে গেলেন তাঁর এতদিনের সফরসঙ্গী মোহনা। সেই থেকে আনমনা মনোজবাবু
যেন সংসারের নিয়মমাফিক কাজের জন্যই বেঁচে আছেন কোনওরকমে। মন্দিরা চেয়েছিল বাবাকে
তার কাছে নিয়ে গিয়ে রাখতে। জামাইও এসে দীর্ঘ সময় ধরে এ নিয়ে
তাঁকে বুঝিয়েছে। কিন্তু রাজি হননি মনোজবাবু। বলেছেন - যখন আর পারবো না
চালাতে এ জীবন তখন বলবো বাবা তোমাদের। আপাতত যে ক’টা দিন পারি
এখানেই থাকি তোমার মায়ের স্মৃতিটাকে সঙ্গে করে। এরপর আর আপত্তি করেনি ওরা। মন্দিরা জানে বাবা একবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন তখন
আর কিছুতেই তাঁকে টলানো যাবে না।
এরপর চাকরি থেকে অবসরের পরও একা
একাই নিজের বাড়িতে থাকছিলেন মনোজবাবু। ইতিমধ্যে বাড়িটা তাঁর মেয়ের নামেই
উইল করে রেখেছেন। কিন্তু হঠাৎ করে যে এভাবে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালের আই সি
ইয়ুতে ভর্তি হতে হবে তা আগেভাগে একটুও টের পাননি। কিন্তু যা হবার তা তো
হবেই। মারাত্মক কিছু একটা যে হয়েছে সে আঁচটি করতে পারছেন এখন
মেয়ে, জামাই আর ডাক্তারবাবুর ফিসফিস কথাবার্তার মাধ্যমে - যদিও জিজ্ঞেস করলে
তেমন আশঙ্কার কথা হেসেই উড়িয়ে দিচ্ছে সবাই। তবুও তাদের চোখের
ভাষাটুকু বুঝতে তেমন কোনও অসুবিধে হচ্ছে না মনোজবাবুর। এবার তবে সত্যি সত্যি
তাঁকে সন্তানের মুখাপেক্ষী হতেই হচ্ছে। একটু অস্বস্তি হয় ভেতরে। বিশেষ করে মন্দিরা তাঁর মেয়ে বলে। ছেলে সন্তান হলে হয়তো
এতটা বাধো ঠেকতো না। মন্দিরাকে কখনো মেয়ে বলে ভাবেননি মনোজবাবু। সন্তান বলেই ভেবেছেন। কিন্তু জগতের একটা অলিখিত
নিয়ম আছে। তাকে তো আর অস্বীকার করা যায় না। মন্দিরারও তো একটি আলাদা
সংসার আছে। তাই মনোজবাবুর ভেতরে একটা দোটানা, নিজেরই সাথে একটা
দ্বিধা-দ্বন্দ। এদিকে মন্দিরা ও সৌভিক দিন রাত
একাকার করে দিচ্ছে ঘরে,
হাসপাতালে আর কর্মক্ষেত্রে।
সেদিন বাচ্চা দু’টোকে স্কুলে
পাঠিয়ে একসাথে বেরিয়ে পড়ে মন্দিরা ও সৌভিক। সোজা হাসপাতালে পৌঁছেই
কেবিনে গিয়ে খবর নেয় মনোজবাবুর। এক রাত জেনারেল ওয়ার্ডে থেকে
কেবিনে স্থানান্তরিত হয়েছেন। আজ যেন আবার খানিকটা বিধ্বস্ত লাগছে তাঁকে। মুখটা ভালো করে ধুইয়ে দিয়ে তাঁর জন্য চা-বিস্কুটের অর্ডার
করে ডাক্তারের সঙ্গে দেখা করতে বেরিয়ে যায় দু’টিতে। ডাক্তার নিয়মমাফিক টহলে আসবেন বৈকি কেবিনে। কিন্তু তার দেরি আছে এখনো। অতটুকু সময় নেই মন্দিরা
বা সৌভিকের হাতে। তাই ডাক্তারের নির্দিষ্ট কোঠায় গিয়েই দেখা করতে বেরিয়ে যায়। প্রায় আধঘন্টা বাদে ফিরে আসে। ইতিমধ্যে চা বিস্কুট খেয়ে
সামান্য চনমনে অনুভব করছিলেন মনোজবাবু। কেবিনের চেয়ারে বসে রয়েছিল সৌভিক। ভেতরে ভেতরে একটা অস্বস্তি তার। চোখ এড়ায়নি মনোজবাবুর। জিজ্ঞেস করেন - কী হয়েছে সৌভিক। তোমাকে অমন উদভান্তের মতো লাগছে কেন ? থতমত খেয়ে
চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে নিজেকে সামলে নেয় সৌভিক। বলে - না বাবা,
তেমন কিছু নয়, ওই অফিসে যাওয়ার সময় হয়ে যাচ্ছে
তো তাই। বুঝে নেন মনোজবাবু - যা বোঝার। মন্দিরা এসে খাটের উপর
মনোজ বাবুর পাশে বসে তাঁর পা দু’টিতে আস্তে আস্তে টিপতে থাকে। মনোজবাবু জিজ্ঞেস করেন - কী রে মা, আজ
স্কুলে যাবি না ? আমার দাদুভাই আর দিদিমণিকে স্কুলে পাঠিয়ে
এসেছিস তো ?
- হ্যাঁ বাবা,
ওরা স্কুলেই আছে। আমিও বেরোব এখন। বলছিলাম কি বাবা, এখান থেকে ছাড়া পেলে সোজা এবার আমাদের ঘরে
নিয়ে যাবই তোমাকে। সৌভিক তোমার জন্য আলাদা খাটের কথা বলে রেখেছে। তোমার কোনও অসুবিধে হবে না বাবা। কথায় মাথা নেড়ে সায় দেয়
সৌভিকও।
মেয়ের কথা শুনে ভাবনায় পড়ে যান
মনোজবাবু। মন যে একেবারেই চায় না তাঁর মেয়ের সংসারে তাদের উপর
নির্ভরশীল হয়ে পড়ে থাকতে। এদিকে একা থাকাও যে আর কতটুকু সম্ভব সেটিও বুঝে উঠতে
পারছেন না। তাছাড়া ওখানে থাকলে মেয়ে জামাই-এর পক্ষে তাঁকে
দেখাশোনা করার কষ্টটি অন্তত কিছুটা কম হবে তো বটেই। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন - হ্যাঁ রে মা,
আমার কী অসুখটা হয়েছে - সেটা বললো ?
- লিভারের কিছু
সমস্যা আছে বাবা। বলেছে এখন থেকে খুব নিয়মের মধ্যে চলতে হবে তোমাকে। আর ঘনঘন হাসপাতালে এসে চেক আপ করিয়ে যেতে হবে।
- ক্যান্সার
? নাকি সিরোসিস ?
- না না, সেরকম কিছু তো বললো না। তবে অন্য কী একটা বলেছে। সে যাই হোক ও নিয়ে এত ভেবে তো লাভ নেই। তাই বলছিলাম কি এবার থেকে তুমি আমাদের সঙ্গেই থাকবে। কেমন ? - হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে উঠে পড়ে দু’জনেই। বলে - আজ বেরোই বাবা। দেরি হচ্ছে। সম্ভবত কাল তোমার রিলিজ হয়ে যাবে।
কথাগুলো বলেই উদাস মনোজবাবুর দিকে
তাকিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায় কেবিনের বাইরে। বাইরে বেরিয়েই দুহাতে মুখটাকে
ঢেকে চোখের জলের ধারাকে রুখতে চেষ্টা করে মন্দিরা। বুকের ভেতরটা যেন অব্যক্ত
কষ্টে অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
সৌভিক মন্দিরার ঘাঁড়ে হাতটি রেখে
এগিয়ে নিয়ে যায় তাকে। ধীরে ধীরে বাইরে পা বাড়ায় দু’জন। এগিয়ে যায় যে যার গন্তব্যের দিকে।
কেবিনের ভেতরে এবার যেন কালো
মেঘের আঁচটি এসে পড়েছে। জীবনভর বেপরোয়া মনোজবাবু এবার ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছেন
অসহায় আত্মসমর্পণের পথে। জীবন নদীর মোহনা বেলায় এসে মনটি বারবার ফিরে যায় ফেলে আসে
পথের দিকে। দিকভ্রান্ত মননে দীর্ঘ চলার পথের সব টুকরো স্মৃতি কোলাজ
হয়ে ভাসতে থাকে চোখের সামনে। সেই উৎসবেলার দিনগুলি, সেই যাপিত সময়ের স্মৃতিমেদুর গ্রামটি
এসে ধরা দেয় কল্পনায়। দিনভর ছুটে বেড়ানো - মাঠের পথে, কুলুকুলু গাঙের
পার ধরে এবড়ো খেবড়ো রাস্তাটি ধরে অজানার উদ্দেশে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসা
শিমূলের বৃন্তচ্যুত তুলোকে আকাশেই ধরে ফেলার অদম্য উৎসাহ নিয়ে দে দৌড় দিগ্বিদিক। চোখের সামনেই ভেসে ওঠে সেই দিগন্ত বিস্তৃত ধানের খেত - কখনো সবুজে সবুজ
তো কখনো সোনালিমায় উদ্ভাসিত। গাঙের পাড় ধরে উচ্ছ্বসিত
সর্ষেফুলের তীব্র হলুদাভায় চোখ জুড়ানো খুশি। দিনভর বর্ষাধারায় আলপথ বেয়ে
মাছেদের উজান যাত্রা। অগভীর বনানীর ফাঁকে লুকিয়ে থাকা পাখিদের সন্ধানে এলোমেলো
ছুটে চলা। আজও সকাল থেকেই কালো মেঘের সঙ্গী হয়ে মাঝে মাঝেই ঝরে পড়ছে পশলা পশলা
বৃষ্টি। কেবিনের কাঁচের জানালা দিয়ে দেখা যায় দূরের পাহাড় চূড়ার
অস্পষ্ট ছবি। পাশাপাশি মন জানালায় ভেসে ওঠে হারিয়ে যাওয়া মোহনার অস্পষ্ট
অবয়ব। পাহাড় থেকে নদী - জীবনের চড়াই-উৎরাই ঘিরে নানা প্রশ্ন
জাগে ভেতরে। কতই বা বয়স হয়েছিল মোহনার ? এত তাড়াতাড়ি না গেলেই কি চলছিল না
তার ? পঞ্চাশ পেরিয়েছিল সবে। হিসেব করেন মনোজ বাবু। তিনি নিজেও তো সবে ষাট পেরিয়েছেন। এক হিসেবে চিন্তা করলে
মনে হয় এ তো কিছুই নয়। অন্তত আরোও বছর দশেক তো অনায়াসে হেসে খেলে কাটিয়ে যেতে
পারতেন। কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল। আবার কখনো মনে হয় দীর্ঘ
ষাটটি বছরও তো বড় কম কথা নয়। শরীরের অভ্যন্তরে থাকা অঙ্গ
প্রত্যঙ্গগুলো তো এতদিন ধরে কাজ করে চলেছে নিরলস। তাদেরও তো বিশ্রাম দরকার। আর তাদের বিশ্রাম মানেই তো জীবনের শেষ মুহূর্ত। তবে কি এবার সেই ব্রাহ্ম মুহূর্তটিই সমাগত ? কী জানি
? খাঁচার ভিতর বদ্ধ পাখিটিকে কেমন অচিন লাকে তাঁর। দু’চোখ জুড়ে তন্দ্রা
এসে হানা দেয়। ঘুমিয়ে পড়ার মুহূর্তে দূর পাহাড় চূড়ায় মোহনার আবছা মুখটি
খুঁজে পান মনোজবাবু।
###
গত একটি বছরে অন্তত পাঁচ বার
হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে মনোজবাবুকে। এক বছরেই ফুরিয়ে গেছে সব জীবনী
শক্তি। শুকিয়ে কাঠ দেহ। জীবনের শেষ যুদ্ধ প্রাণপনে লড়ে
চলেছেন তিনি। এদিকে মন্দিরা আর সৌভিকও যেন লড়ে যাচ্ছে পাল্লা দিয়ে। দু-দুটি দামাল শিশুকে সামলে, কর্মক্ষেত্রটি সামলে মনোজ
বাবুকে যতটুকু সময় দেওয়া দরকার তা পারছে না। অথচ চোখের সামনে তাঁর এমন
করুণ অবস্থাও আর সহ্য করা যাচ্ছে না। দিশেহারা হয়ে ক্রমে ভেঙে পড়ার মতো
উপক্রম দু’জনের। ছুটিছাটার সাথে সাথে টাকাপয়সারও এবার বাড়ন্ত রূপ।
সেদিন স্কুল ছুটির পর সোজা
হাসপাতালে ছুটে আসে মন্দিরা। তার আগে সৌভিকই ফোন করে খবরটা
দিয়েছিল। হাসপাতাল থেকে ফোন করেছিল। মনোজ বাবুর অবস্থা
সুবিধের নয়। কেবিনের বাইরে বসার জায়গাটিতে দুরুদুরু বুকে প্রবেশ করেই
সৌভিককে দেখতে পায় মন্দিরা। দেখেই তীব্র বেগে তার দিকে ছুটে
যেতে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে পড়েই যাচ্ছিল। উঠে হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে
সৌভিক। মন্দিরার ফ্যাকাসে চোখদু’টোর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যায়। এ কী অবস্থা হয়েছে মন্দিরার ? এত দিনে তার মুখের দিকে ভালো করে
তাকানোরও সময় পায়নি সৌভিক। একটি চেয়ারে নিয়ে বসায় মন্দিরাকে। নাহ। একবার ভালো করে ডাক্তার দেখাতে
হবে মন্দিরাকে। তবে আপাতত তা সম্ভব নয়। এখন সামনে ঝুলতে থাকা
বিপদকে কাটিয়ে ওঠার সময়। হয়তো মাথাটা ঘুরেই পড়তে যাচ্ছিল মন্দিরা। এত ধকলের পর এটাই স্বাভাবিক। ভেতরে ভেতরে অনেকটাই
দুর্বলতা অনুভব করছে এই মুহূর্তে। তবুও যথা সম্ভব শক্তি সঞ্চয় করে
জিজ্ঞেস করে - ‘বাবা কেমন, সৌভিক ?’
- এক রকমই আছেন
বললো। তুমি আসবে বলে আমি আর ভেতরে ঢুকিনি। আমিও এইমাত্রই এসেছি। চলো কেবিনে যাই।
দরজা ঠেলে কেবিনে ঢুকতেই ওদের
দেখতে পেয়ে হাতের ঈশারায় কাছে ডাকেন মনোজ বাবু। বেডের পাশে এসে দাঁড়াতেই
কিছু একটা বলতে চাইলেন যেন। আজ মনোজবাবুকে কেমন অন্য রকম
লাগছে দেখতে। মুখমণ্ডলে কেমন যেন একটা ফর্সা দ্যুতি দেখতে পেল মন্দিরা। এ কি তবে সুস্থতার লক্ষণ ? না কি ? চোখ
বুজে ফেলে মন্দিরা। বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না
মনোজবাবু। মন্দিরা তাঁর মাথায় বিলি কেটে যায় ধীরে ধীরে। পরম নিশ্চিন্তে চোখ বুজে পাশ ফিরে শুয়ে রইলেন মনোজ বাবু। খানিক বাদে ঘুমিয়ে পড়েছেন ভেবে বাইরে বেরিয়ে এলো মন্দিরা ও
সৌভিক।
রাস্তায় টুকিটাকি বাজার সেরে ঘরে
ফিরতে ফিরতে অনেকটাই রাত হয়ে গেল। কিছুই যেন আর ভালো লাগছে না
মন্দিরার। বাবার এভাবে মরে মরে বেঁচে থাকাটা সব দিক দিয়ে একটা গভীর
সমস্যার সৃষ্টি করেছে এখন। তাঁর এত অভাবনীয় শারীরিক কষ্ট
চোখে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না। বাবাদের সঙ্গে মেয়েদের ঘনিষ্টতা
নাকি চিরন্তন। তাই হয়তো বা বাবার এই কষ্টটা চোখ মেলে দেখা ভীষণ দায় হয়ে
পড়েছে মন্দিরার। মায়ের মৃত্যুর বেদনা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই বাবার এই করাল
অসুস্থতা পীড়া দেয় অনবরত। এদিকে সংসারের হাল দিন দিন বেহাল হওয়ার পথে। ছেলে-মেয়ে দু’টোর প্রতি ঠিকঠাক যত্নও
নেওয়া যাচ্ছে না। এক আকাশ হতাশা যেন ছেয়ে থাকে মন্দিরার মন প্রাণ জুড়ে।
এই মুহূর্তে রাতের খাবার খেয়ে
বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে সৌভিক আর মন্দিরা। ছেলে-মেয়ে দু’টি ইতিমধ্যেই পৌঁছে গেছে ঘুমের দেশে। মন্দিরার দুই চোখে ঘুম
নেই যেন। সৌভিক বুঝতে পেরে মন্দিরার চোখের উপর হাত রাখে। ভিজে আছে দু’পাশ। পরম যত্নে মুছিয়ে দেয়
সৌভিক। হঠাত যেন চমকে উঠে মন্দিরা। নিঃশব্দ আদরে সৌভিকের
হাতটি ক্রমশঃ নিচের দিকে নামতে থাকে। মন্দিরার মন মন্দিরে তখন জীবন
কথার তোলপাড়। এত কিছু অসহনীয় বিড়ম্বনার মধ্যে পড়ে সে তো সৌভিকের কথাটি
ভুলেই গিয়েছিল। বঞ্চিত হয়ে আছে বেচারা। এবার পাশ ফিরে শোয়
সৌভিকের দিকে। বলে - ‘খুব কষ্ট হচ্ছে না গো তোমার - সবদিক সামালাতে গিয়ে
?’
- এমন কেন বলছো ? তোমার চাইতে
বেশি তো নয়।
- আমি আর পারছি না সৌভিক।
বিধ্বস্ত হয়ে গেছি আমি। বাবাই আমাকে জীবনের পাঠটি শিখিয়েছিলেন - জানো ? কীভাবে
সামলাতে হয় জীবনের ঝড়ঝাপটা সব - সব কিছু আমাকে পই পই করে বলতেন বাবা। বলতে গেলে
আমি বাবারই একটা অংশমাত্র সৌভিক, বাবাই আমার সবটুকু ছিলেন এতকাল - কান্নায় ভেঙে
পড়ে মন্দিরা। তার মুখটাকে নিজের বুকের মধ্যে সযতনে তুলে আনে সৌভিক।
বৃষ্টিধারার মতো কান্না যেন জল
হয়ে ঝরে পড়ে একটানা। মন্দিরা কিছু সময় পর চোখদু’টো মুছে বলে - বাবার এত কষ্ট আমি
আর সহ্য করতে পারছি না সৌভিক। ভালো করে আমি কাঁদতেও পারিনা তাঁর সামনে। জানো, বাবা
একদিন বলেছিলেন মা’কে - মেয়ের চোখে যেদিন জল দেখবো মোহনা, সেদিন আর আমি বাঁচবো না।
কিন্তু আজ আমার মনে হচ্ছে সৌভিক, এত কষ্ট করার চাইতে বাবার এবার মায়ের কাছে চলে
যাওয়াটাই ঠিক হবে - বলেই চমকে উঠলো যেন। এ কী কথা বেরিয়ে এলো তার মুখ থেকে নিজেরই
অজান্তে ? এবার চোখের অবাধ জলধারা এসে রোধ করে দিল মন্দিরার কণ্ঠস্বর। হাত দু’টো
অলক্ষ্যে কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলে - বাবাকে সুস্থ করে দাও হে সর্বশক্তিমান।
সারা রাত ছন্ন ছাড়া ঘুমেই কেটে
গেল যাপন বেলা। অব্যক্ত কথার বেদনায় ঘরে ও হাসপাতালে বিছানায় দু’চোখ বুজে শুয়ে রইল
একটি বাবা ও একটি মেয়ে। ভোরের দিকে মনোজবাবু পৌঁছে গেলেন মোহনায় আর মন্দিরার ফোনটি
উঠলো বেজে।
হাসপাতাল থেকে ফোন এসেছে -
মনোজবাবু সিরিয়াস। তাড়াতাড়ি চলে আসুন। ধড়ফড়িয়ে
উঠে সৌভিককে জাগিয়ে তড়িঘড়ি তৈরি হয়ে নেয় মন্দিরা। পাশের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা
কাজের মাসির হাতে আবারো আজকের দিনটির জন্য সমঝে দেয় ছেলে-মেয়ে দু’টিকে।
বাইরে বেরোতে গিয়েই টের পেল
রাস্তা ঘাট সব রাতভর বৃষ্টিতে মুখ থুবড়ে পড়েছে জলোচ্ছ্বাসে। আকাশ যেন এবার ভেঙেই
পড়বে মাথার উপর। মন্দিরা জানে না তার আকাশটি ইতিমধ্যেই ভেঙে পড়েছে চিরতরে। অনেকক্ষণ
দাঁড়িয়ে থাকার পর একটি সিটিবাস পাওয়া গেল। সিটগুলো সব ভিজে আছে বাসের। তাই বাসে
উঠে দাঁড়িয়েই রইল দু’টিতে। বাস যেন এগোচ্ছেই না। মন্দিরার সমগ্র সত্ত্বা জুড়ে
একরাশ ব্যাথার তোলপাড়। অথৈ জল ভেঙে এগিয়ে চলার কসরত থেকে মুক্তি পেতে আজ
ফ্লাইওভারের উপর দিয়েই ছুটে চলে সিটিবাস। অন্য দিন হলে তলা দিয়েই যায়। ফ্লাইওভার
পেরিয়ে পরের স্টপেজেই নামতে হবে মন্দিরাদের। এরপর জল ভেঙে রাস্তা পেরিয়ে হাসপাতাল।
ঠিক ফ্লাইওভারের মাঝামাঝি আসতেই আবার বেজে ওঠে মন্দিরার ফোন। ত্রস্ত মন্দিরা ফোন
হাতে নিয়েই দেখতে পেল হাসপাতালের নাম্বার। হাত, পা যেন কাঁপত থাকে এক অজানা
আশঙ্কায়। কোনও রকমে ফোনটা কানে লাগিয়ে হ্যালো বলে মন্দিরা।
এর পর যে কথাটি ভেসে এলো মোবাইলের
মাধ্যমে সেই শেষ কথাটির আর কোনও উত্তর হয় না। অসাড় মন্দিরা প্রাণপনে সামলানোর
চেষ্টা করতে থাক নিজেকে। সৌভিকের হাত ধরে কোনওক্রমে নেমে আসে বাস থেকে। রাস্তা
এপার ওপার হতে গিয়ে মনে হচ্ছিল যেন কোন মহাকালের অনন্ত যাত্রাপথ ধরে হেঁটেই চলেছে
যুগ যুগান্তর ধরে।
###
জীবনের চলার পথে এবার সত্যিকার
অর্থেই যেন একা হয়ে গেল মন্দিরা। এতদিন এত সমস্যার মধ্যে থেকেও এই বোধটি আসে নি
তার। বোধ বুদ্ধি হওয়ার থেকে যে ছত্রছায়ায় বেড়ে উঠেছিল - হঠাৎ করে যেন কোন দামাল
ঝড়ের সামনে তা উড়ে গেছে চিরতরে। একটা আমূল পরিবর্তন ঘটে গেল তার জীবনে। এক অসীম
শূন্যতায় ভরে গেছে তার চলার পথ। বদলে গেছে পৃথিবী।
আজও উঠে বসেছে মোহনপুরগামী বাসে।
ছোট্টটি যখন ছিল তখন এই মোহনপুরেই কিছুদিন চাকরি করেছিলেন বাবা। ঘরে ফিরে বলতেন
সেসব কথা। সারা দিনের মফঃস্বল বার্তা। ‘মোহনপুরি বাস’ কথাটি তখন থেকেই জানা। বাবা
নিয়মিত এই বাসেই যাতায়াত করতেন। ছোট্ট মন্দিরা কল্পনায় সাজিয়ে নিত ‘মোহনপুরি বাস’-এর অপরূপ চিত্রকল্প। মনে মনে স্বপ্ন দেখতো বাবার সাথে কল্পনা-সফরের। বাবা
কি জানতেন একদিন তাঁর মানসকন্যাও উঠে বসবে এই মোহনপুরি বাসে ?
তবে এখন পাল্টে গেছে মোহনপুরি
বাসের সেই চিত্রকল্প। আজ সেই আমেজ আর নেই। বাস্তবের পরাকাষ্ঠায় উন্নতির
ছোঁয়া লেগেছে সবখানে। বাসের পাশাপাশি এখন অসংখ্য ছোট বা মাঝারি গাড়ি ছুটে চলে
মোহনপুরের মসৃণ রাস্তায়। এল পি থেকে মিডিলে উন্নীত হয়েছে মন্দিরার স্কুল। হারিয়ে গেছে সেই হারানো দিন। মাঝে মাঝে
মনে হয়
কী দরকার
এত উন্নয়ণের,
এত পরিবর্তনের
? এর চাইতে
এমন কী
মন্দ হতো
যদি সেই
পুরোনোটুকুই ধরা
রইত হাতের
মুঠোয় ? কিন্তু
না। এমন হয়
না। কালের ধারায়
পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। সময়ের
সাথে সাথে
স্মৃতি হয়ে
যায় সব
কিছু, অতীত
হয়ে যায়
কালকের বর্তমান। তেমনি
হারিয়ে গেছে
মন্দিরার নিত্যদিন। হারিয়ে গেছে ছটফটে ফকরুল। ড্রাগস নেওয়ার অপরাধে
পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে সেই শ্রাবণের ধারার সেই
মাদকতা।
হারিয়ে গেছে মায়ের গরজ, বাবার ভরসার
হাত। তবু আজো মোহনপুরি বাসেই উঠে বসে মন্দিরা প্রতিদিন নিয়ম করে
- জানালার পাশে বসে চোখ বুজে বাবার সাথে একটি ঘন্টা কাটাবে বলে।
- - - - - - - - - - - -

Comments
Post a Comment