Skip to main content

কথা ও কবিতায় একটি সকাল



‘গেছে যে দিন, একেবারেই কি গেছে ? কিছুই কি নেই বাকি ?’
ঘন ঘন এই প্রশ্নটিই ফিরে আসছিল মনের মধ্যে, কথা ও দেখার ফাঁকে ফাঁকে। আস্ত একটি সকাল - দেখে আর শোনেও কি সবটুকু দেখা গেল, শোনা গেল ? উত্তর এক কথায় - না। কিছুই দেখা হয়নি, শোনা হয়নি। একটি সকাল কেন অজস্র সকাল একাকার করে দিলেও বোধ করি তাঁর, তাঁদের সৃষ্টিকে জানার, পড়ার অন্ত হবে না।
বলছিলাম সাহিত্যিক দম্পতি নিশুতি মজুমদার ও তাঁর আক্ষরিক সহধর্মিণী সুস্মিতা মজুমদারের কথা। গুয়াহাটির রুকমিণী নগরের নিজস্ব বাংলোসম বাড়ির বৈঠকখানায় বসে কথা হচ্ছিল। এর আগে চারতলার নিভৃত কক্ষে তাঁর পুস্তকাগারটি দেখে এলাম। শব্দেরা এখানে সাজানো আছে থরে থরে, সাথে নিয়ে কয়েক যুগের লিপিবদ্ধ ইতিহাসএমন একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার খুম কমই দেখা যায় সাধারণত। স্বর্গীয় নিবারণ চন্দ্র মজুমদার ও সুভাষিনী মজুমদারের স্মৃতিতে নিবেদিত এই গ্রন্থাগার উন্মোচন করেছিলেন অসম সাহিত্য সভার প্রাক্তন সভাপতি তথা অসমিয়া ভাষার বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রয়াত লক্ষ্মীনন্দন বরা। এই মজুমদার ভবনে শুধুমাত্র এই প্রখ্যাত সাহিত্যিকই নন, এখানে আগমন ঘটেছে একাধিক উল্লেখযোগ্য কবি সাহিত্যিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনদের। উল্লেখযোগ্য কিছু নাম - প্রখ্যাত লেখক শঙ্কু মহারাজ, উষারঞ্জন ভট্টাচার্য, প্রশান্ত চক্রবর্তী, প্রয়াত জ্যোতিষকুমার দেব, তুষার কান্তি সাহা, সঞ্জয় চক্রবর্তী, কাবেরী রায়চৌধুরী প্রমুখ। বস্তুতঃ এক সময় নিয়মিত সাহিত্য আসর বসতো তাঁর ‘প্রাসাদ’-এসেই হারানো দিনের পুনরাবৃত্তির এক ঝলক হয়ে সেদিন কয়েকটি ঘন্টা কেটে গেল অনাবিল এক প্রাপ্তিসুখের আবহে। সুসজ্জিত গ্রন্থাগারের এদিকে ওদিকে চোখ রাখলেই ধরা পড়ে তাঁদের অগণিত সাহিত্য সম্ভার। একই সাথে থরে থরে সাজানো আছে এ অঞ্চলের অন্যান্য দিকপাল সাহিত্যিকদেরও সাহিত্য কর্মের নিদর্শন। দেখে শেষ হয় না এত অল্প সময়ে।
এই দম্পতির সৃষ্ট সাহিত্যকর্মের দীর্ঘ ফিরিস্তি। লেখালেখির ক্ষেত্রে ‘এ বলে আমায় দেখ তো ও বলে আমায় দেখ’  ধরণের যেন এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। আশি নব্বই-এর দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি সৃষ্টি হয়েই চলেছে তাঁদের কাজ। থেমে নেই একটুকুওএক সময় উভয়েই ছিলেন ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার সবচাইতে অগ্রণী লেখক। এমন কোনও সাময়িকী কিংবা সংবাদপত্র নেই যেখানে তাঁদের লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতো না। বিশেষ করে তখনকার ‘দৈনিক যুগশঙ্খ’, ব্যতিক্রম ইত্যাদি। পাশাপাশি বাংলা ও অসমিয়া উভয় ভাষায় একের পর এক গ্রন্থ দেখেছে প্রকাশের আলো। নিশুতি মজুমদারের এযাবৎ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একুশেরও বেশি। পাশাপাশি সুস্মিতা মজুমদারও লিখেছেন প্রায় সমসংখ্যক গ্রন্থ - যার অধিকাংশই বাংলা থেকে অসমিয়াতে অনুবাদ। অগণিত সাহিত্য পত্রিকা ও সংকলনে স্থান পেয়েছে তাঁদের সৃষ্টিকর্ম। অনুদিত হয়েছে তাঁদের গ্রন্থ এবং বিভিন্ন রচনাও। গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ সাহিত্য - সাহিত্যের সব আঙ্গিনায় তাঁদের সহজ ও নিরলস আনাগোনা। নিশুতি মজুমদারের উল্লেখযোগ্য কিছু গ্রন্থ - চিরন্তন দামী গল্প, বরাক উপত্যকার লোকসংস্কৃতি ও অন্যান্য, রবীন্দ্রনাথ ও ত্রিপুরা, কেন এমন হয় ? তাঁর লিখা ভূতের গল্প সমূহ আজোও মনে রেখেছেন নিমগ্ন পাঠককূল বস্তুতঃ এই গল্পসমূহের প্রকাশের দিকে চেয়ে থাকতেন অসংখ্য গুণমুগ্ধ পাঠকবৃন্দ সুস্মিতা মজুমদারের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ - কাশবনের স্মৃতি, মন নিয়ে, অন্তরের অন্তরালে, অমরাবতী অসম - শঙ্কু মহারাজ (অনুবাদ গ্রন্থ) ইত্যাদি। উভয়েই যুক্ত থেকেছেন অসংখ্য সাহিত্য তথা সামাজিক সংস্থার সঙ্গে।
ব্যক্তিগত জীবনেও সাফল্য এসে ধরা দিয়েছে যথাযথ পথে। ‘সাহেব সাহিত্যিক’ নিশুতি মজুমদার জন্মসূত্রে বরাকের বাসিন্দা। লালা হায়ার সেকেণ্ডারি অ্যান্ড মাল্টিপারপাস স্কুল থেকে হায়ার সেকেণ্ডারি পাশ করেছেন। ১৯৬০ সনে কিশোর বেলাতেই সামলেছেন স্কুল ম্যাগাজিনের দায়িত্ব এরপর যোরহাট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে বিই করেন। পেশায় ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। আসাম সরকারের পূর্ত বিভাগের চীফ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে অবসর নিয়েছেন ২০০৩ ইংরেজিতে। সুযোগ্য সহধর্মিণী সুস্মিতাও সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিরলস সাহিত্যকর্মে নিজেকে জড়িত রেখেছেন আজ অবধি। একাধিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত ররেছেন তিনিও। দেশ বিদেশের অসংখ্য জায়গায় ভ্রমণ করেছেন এবং অগণিত সাহিত্যিকের সংস্পর্শে এসেছেন। পেরিয়ে এসেছেন সাহিত্যজগতের দীর্ঘ পথ অনুভবে অনুভবে ঋদ্ধ হয়েছে কলম ঋদ্ধ করেছেন অগণিত পাঠক পাঠিকাকে স্বল্প পরিসরে জীবনজোড়া এই বিশাল কর্মকাণ্ডের সবটুকু তুলে ধরা নিতান্তই অসম্ভব।
এই আজীবন সাহিত্যকৃতির স্বীকৃতি স্বরূপ আজ পর্যন্ত কী পেয়েছেন এই সাহিত্যিক দম্পতি ? প্রশ্নটি এসে যায় অবধারিত ভাবে। উত্তরে এইটুকু বলা যায় যে পেয়েছেন একাধিক সংগঠনের তরফ থেকে অগণিত সম্বর্ধনা। আর অগণিত মানুষের, পাঠকের, সমসাময়িক সাহিত্য পথের যাত্রীদের তরফ থেকে পেয়েছেন সম্মান ও ভালোবাসা। সাহিত্য পত্রিকা ‘লেখাকর্মী’র তরফ থেকে নিশুতি মজুমদারকে নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল একটি সম্মাননাসংখ্যা ২০১৭ সালের মার্চে। কিন্তু সরকারি তরফ থেকে আজ অবধি কোনও পুরস্কার জুটেনি ভাগ্যে। এ এক নিছক বিড়ম্বনার বাইরে আর কিছুই নয়। এত এত বিশাল কর্মরাজির পরেও যদি সরকারি স্বীকৃতিটুকু না আসে তবে এর চাইতে দুঃখজনক আর কিছুই হতে পারে না। তবে এ নিয়ে তাঁদের মুখে কোনও অতৃপ্তির আভাস ফুটে উঠেনি যদিও এ দায় মাথা পেতে নিতে হবে সমাজকেই।
একদিন যাঁরা এই দম্পতির লেখালেখির উপর অনেকটাই নির্ভর করেছিলেন তাঁদের কাছে আজ তাঁরাও মুখ ফিরিয়েছেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বাংলা ভাষা বিষয়ক যেটুকু সামান্য সাহিত্যমূলক কাজকর্ম হয় সেখানে আজ আর তাঁদের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় না। বস্তুতঃ আমন্ত্রণ জানানো হয়না তাঁদের। এ এক নিদারুণ প্রহসন।    
তবু থেমে থাকেনি তাঁদের কলম। অগুণতি সাহিত্য কর্ম রচনা করে চলেছেন আপন সৃষ্টির আনন্দে সৃষ্টিশীলতার চলমান পথ বোধ করি থেমে থাকে না কখনো
তাই এই সৃষ্টি আজও চলছে সমানে। ‘রাতের সব তারাই আছে দিনের আলোর গভীরে’  
- - - - - - - - - -
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...