Skip to main content

আলোচনাময় এক সংগ্রহযোগ্য ছোট পত্রিকা - গবেষণাধর্মী ‘প্রবাহ’


'মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে গোটা পৃথিবী আবার করোনা অতিমারির কবলে পড়ল। - - - - - ক্ষতির কথা নতুন করে বলার নয়। ক্ষতি হয়নি কোন ক্ষেত্রে ? সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রও বাদ যায়নি। প্রবাহ প্রকাশেও তাই বিস্তর বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। যারা লিটল ম্যাগাজিন করেন তারা এক ঘোরের মধ্যে পড়ে যান। সময় মতো সংখ্যা প্রকাশ করতে না পারলে তাদের উৎকণ্ঠার শেষ থাকে না। সন্তান ভূমিষ্ট না হওয়া পর্যন্ত প্রসূতি মায়ের উৎকণ্ঠা যেমন লেগে থাকে।’
এভাবেই পৃষ্ঠাজোড়া সম্পাদকীয়তে প্রকাশ পেয়েছে পোড় খাওয়া সম্পাদক আশিসরঞ্জন নাথ-এর দায়বদ্ধতা ও গরজ। এহেন সম্পাদকের সম্পাদনায় ইতিমধ্যে বহু মাইলস্টোন পেরিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে গবেষণাধর্মী সাহিত্য পত্রিকা ‘প্রবাহ’-এর ৩৪ বর্ষ, সংখ্যা ১। অক্টোবর ২০২১, আশ্বিন ১৪২৮। এবারের অভিনব বিষয় হলো ‘আলোচনা ও একগুচ্ছ গল্প’। বিষয় বৈচিত্রে, অভিনবত্বে ‘প্রবাহ’ সতত ভাস্বর। এবারেও ব্যতিক্রম হলো না এবং ‘গবেষণাধর্মী’ তকমাটি বজায় রইল পুরো মাত্রায়।
এ সংখ্যায় রয়েছে মোট ১৯টি গ্রন্থ আলোচনা যা পাঠকদের সঙ্গে গড়ে তুলেছে এক অজানা বিশ্বের পরিচিতি। ‘প্রবাহ’ এক্ষেত্রে একটি মোক্ষম সেতুর ভূমিকায় অবতীর্ণ। এই স্বল্প পরিসরে প্রতিটি আলোচনার উপর বিস্তৃত কিছু লিখার উপায় নেই। বস্তুতঃ প্রতিটি আলোচনার বিস্তৃত ব্যাখ্যাতেই একটি পূর্ণাবয়ব গ্রন্থ প্রকাশ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক অতীতে বরাক উপত্যকা থেকে প্রকাশিত একগুচ্ছ উৎকৃষ্ট গ্রন্থের চুলচেরা আলোচনা, পর্যালোচনায় সেজে উঠেছে এই বিভাগ। 
সাহিত্য ও সমাজকর্মী অপর্ণা দেব এর অণুগল্প সম্পর্কে আলোচনা করেছেন বর্ষীয়ান গল্পকার মিথিলেশ ভট্টাচার্য। গল্পের সাথে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছেন আলোচক। তাঁর আন্তরিক আলোচনায় ভবিষ্যৎ গল্প জগৎ নির্দ্বিধায় ঋদ্ধ হবে ‘সৃষ্টিবিব্দু থেকে বলছি’র গল্পকারকে। সীমা ঘোষের ‘রাসসুন্দরী রোকেয়া তসলিমাও অন্যান্য’ প্রবন্ধ সংকলন এর উপর বিস্তৃত আলোচনা করেছেন রূপকথা তরী। আলোচনা পাঠান্তে পাঠক মনে সংকলনটি সংগ্রহের প্রবল ইচ্ছে জাগ্রত হবে নিশ্চিত। প্রদীপ কুমার পালের সম্প্রতি প্রকাশিত উপন্যাস ‘কর্মপুরুষের ব্রত’ বোদ্ধা মহলে সাড়া জাগিয়েছে বেশ। তারই আলোচনায় কলম ধরেছেন পাপড়ি ভট্টাচার্য। বিশিষ্ট লেখক সঞ্জীব দেবলস্করের ‘আলোর মানুষ’ এবং আরেক বিশিষ্ট সাহিত্যিক মনোমোহন মিশ্রের ‘মিঠে রোদ্দুর’ উপন্যাস দু’টির আলোচনা করেছেন লেখক দীপক সেনগুপ্ত। উপন্যাস মানেই যে নিছক একটি কাহিনি নয়, তারও যে অন্দরে লুকিয়ে থাকে কিছু সিদ্ধান্ত, কিছু প্রয়াস সে কথাটিই উচ্চারিত হয়েছে আলোচনায় - যথার্থ প্রেক্ষাপটে। কৃতী গল্পকার মেঘমালা দে মহন্তর সাড়া জাগানো গল্প সংকলন ‘অন্তর্গত রক্তের ভেতর’ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন কাশ্যপজ্যোতি ভট্টাচার্য। গল্পকার আদিমা মজুমদার করেছেন গল্প সংকলন ‘মণিপুরি লোককথা’র আলোচনা। যদিও তিনি একে পাঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবেই চিহ্নিত করেছে। এছাড়াও আলোচনা করেছেন লেখিকা বিজয়া কর সোমের বেশ কিছু গল্পের। কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক কল্লোল চৌধুরীর ছোটগল্প সংকলনের আন্তরিক আলোচনা করেছেন নৃপেন্দ্রলাল দাশ। ‘সুরমা নদীর চোখে জল’ উপন্যাসে দেশভাগ ও সুরমা-বরাক উপত্যকার জনজীবন - এই শিরোনামে বিশিষ্ট লেখক ইমাদ উদ্দিন বুলবুলের অনবদ্য উপন্যাস ‘সুরমা নদীর চোখে জল’ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন মোহাম্মদ বিলাল উদ্দিন। পাঠান্তে উপন্যাসটির প্রতি পাঠকের তুমুল আগ্রহ গড়ে উঠতে বাধ্য। ‘গণেশ দে গল্প সমগ্র’ নিয়ে আলোচনা করেছেন শান্তশ্রী সোম। প্রতিটি গল্পের নির্যাসকে স্বল্প কথায় তুলে ধরেছেন আপন ছন্দে। শিরোনাম ‘নারীমুক্তির ইতিবৃত্ত’, আলোচিত হয়েছে জয়িতা দাস-এর তত্ত্ব ও তথ্যের নিরিখে রচিত বিশাল মাপের গ্রন্থ ‘বাঙালি নারীর আড়াল ও অন্তরাল’। আলোচক সবুজ কলি সেন। নবগোপাল রায় আলোচনা করেছেন আশুতোষ দাস-এর গল্প সংকলন ‘যখন ধানের গন্ধ’-এর। সুলেখিকা ঝুমুর পাণ্ডের উপন্যাস ‘আলেকজাণ্ডারপুরের কথকতা’র সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছেন ডঃ অনুশীলা দাশগুপ্ত। আলোচনায় উদয়ন ঘোষের উপন্যাস ‘হরিশচন্দ্র’কে সময়ের দলিল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আলোচক সুব্রত পুরকায়স্থ। খ্যাতনামা গল্পকার আদিমা মজুমদারের দু’টি গল্পগ্রন্থ ‘সুইসাইড নোট ও অন্যান্য গল্প’ এবং ‘আমি সেই মেয়ে এবং অন্যান্য গল্প’ নিয়ে আলোচনা করেছেন তানিয়া লস্কর। আলোচনার শেষে আলোচক আলোচ্য লেখিকাকে বরাকের কিছু প্রতিষ্ঠিত গল্পকারের যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার দাবিদার বলে উল্লেখ করেছেন যদিও আদিমা ইতিমধ্যেই সেই দাবিকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন বলেই মনে হয়। আরেক বিশিষ্ট গল্পকার মঞ্জরী রায়ের গল্পগ্রন্থ ‘হালিচারা’র গল্প অনুযায়ী আলোচনা করেছেন বিদ্যুৎ চক্রবর্তী। শর্মিলী দেব কানুনগোর সদ্য প্রকাশিত অণুগল্প সংকলন ‘ঘাসফুল কথা’র পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন কবি, সাহিত্যিক সুশান্ত মোহন চট্টোপাধ্যায়। অনিতা দাস ট্যান্ডন আলোচনা করেছেন দেবাশিষ তরফদারের উপন্যাস ‘শরাইঘাট-এক প্রেম কাহিনী’র। আলোচনার প্রথমার্ধে এটি একটি গল্পগ্রন্থের আলোচনা বলে ধন্দে পড়তে হয়। 
আলোচনার এই বৃহৎ পর্ব শেষে সন্নিবিষ্ট হয়েছে ভিন্ন স্বাদের ৬টি চমৎকার গল্প। ইন্দ্রনীল বক্সীর ‘ডিস্পেনসারি’, রেখা নাথ-এর ‘রবীন্দ্রনাথ ও সুজাতা’, সুখেন্দু দাস-এর ‘ট্রমা’, নন্দিতা মিশ্র চক্রবর্তীর ‘মায়ের মুখ’, নিবেদিতা বিশ্বাস-এর ‘বিজয়িনী’ এবং আশিসরঞ্জন নাথ-এর ‘টান’। প্রতিটি গল্পেই অভাবনীয় মুন্সিয়ানায় চিহ্নিত হয়েছে একাধিক মানবিক চরিত্র। 
বিশেষ নিবন্ধ ‘নীলাচলের বাংলা ও বাঙালি’ লিখেছেন বিশিষ্ট লেখক কুমার অজিত দত্ত। তথ্যসমৃদ্ধ এই নিবন্ধে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালিদের সম্যক ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে নিপুণ লিখনশৈলীতে। এ সংখ্যার শেষ নিবেদন সাদাত হসান মান্টোর গল্পের বংলা অনুবাদ ‘খুলে দাও’। অনুবাদ করেছেন বিশিষ্ট অনুবাদক অভিজিৎ লাহিড়ী। মূল গল্পের নামটি জানা গেল না। 
পরিসরের স্বল্পতায় প্রতিটি রচনার ভেতরের চমৎকারিত্বটুকু পাঠকের দরবারে তুলে ধরা গেল না। তবু এই সংখ্যার বিশালত্ব এবং গুরুত্ব অপরিসীম। ভবিষ্যতের জন্য এক অনবদ্য দলিল। বানান প্রায় নির্ভুল। ছাপায় মাঝে মাঝে অস্পষ্টতা লক্ষ করা গেলেও সব মিলিয়ে সংখ্যাটি পাঠককে দান করেছে অনাবিল পঠনসুখ। সম্পাদককে এ জন্য আলাদা ভাবে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। চমৎকার মানানসই প্রচ্ছদ এঁকেছেন তেরো বছরের হিয়া বকসী। ১৩৯ পৃষ্ঠার এক সংগ্রহযোগ্য সংখ্যা এবারের ‘প্রবাহ’। 
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘প্রবাহ’
মূল্য - ১৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৮৮১১০১০৫৪০

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...