‘দণ্ডবৎ মাতা’ - দণ্ডবৎ সঞ্জয়
রাত্রি জ্বলছে, জ্বলুক।
রাত্রির আগুনে পুড়ে যাচ্ছে মুখ, যাক।
মানবপুত্র, মানবীকন্যা আমরা
কোনো করুণা না, সৃষ্টিভিক্ষা না
ধরিত্রীপুত্র, ধরিত্রীকন্যা আমরা
কোথাও যাব না না
অন্ধকারমুখরিত দেশ যদিও
সে আমাদের, আমাদের, আমাদের।
দেশ অন্ধকারমুখরিত, তবু সে আমাদের। আমরাই ধরিত্রীপুত্র, ধরিত্রীকন্যা। স্পষ্ট কথায়, শব্দের পুনঃপুনঃ উচ্চারণে এমন কাব্যিক প্রত্যয় জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা ক’জন কবির আছে ? সঞ্জয়ের আছে। কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী - উত্তর পূর্বের কবিতা বিশ্বের সুপরিচিত মুখ। এবং প্রায় প্রতিটি কবিতায় তাঁর শব্দে, অলঙ্কারে, রূপকে ফুটে ওঠে এই ভূখণ্ডের গর্বিত সত্ত্বার প্রকাশ। অবিভক্ত ভারত, দেশভাগ শেষে, উত্তর পূর্বের মাটি ও মানুষের সাহচর্যে কবির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। অবিভক্ত বাংলার জল মাটি, বরাক - ব্রহ্মপুত্র - পাহাড়ের অনাবিল মোহ তাঁর কবিতার সম্পদ। আলাদা করিয়ে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন মানে থাকতে পারে না।
ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এ প্রকাশিত হয় তাঁর ৬৪ পাতার সপ্তম কাব্যগ্রন্থ - ‘দণ্ডবৎ মাতা’। আছে মোট পাঁচটি কবিতা। ৯ থেকে ১৮ পৃষ্ঠাজোড়া কবিতা। প্রতিটি কবিতার পরতে পরতে আছে বিস্ময়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে - সঘনে। প্রতিটি কবিতা থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতি অনায়াসে তুলে আনা যায়। এমনকি আস্ত কবিতাটিই তুলে ধরার লোভ সামলানো যায় না। যেমন তিনি নিজেও করেছেন। অধিকাংশ কবিতার শুরুতেই নিয়েছেন উদ্ধৃতি। সে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে Pink Floyd, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী কিংবা The Beatles. অনন্য সব উদ্ধৃতি এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে কবিতায়। খেই ধরিয়ে দিয়েছে পঠনের। কবিতার ফর্মাট নিয়ে নিত্য খেলা করেন সঞ্জয়। এই সংকলনেও তার অন্যথা হয়নি। তাই প্রতিটি কবিতাই হয়ে উঠেছে অনন্যসুন্দর। ভাব, বক্তব্য, উচ্চারণের পাশাপাশি কাব্যিক সুষমা যেন পাতার পর পাতা জুড়ে খেলা করে আপন উৎকর্ষতায়।
প্রথম কবিতা ‘আলো পড়ে টাপুর টুপুর’। অসাধারণ ফর্মাট।
সুর ও কথার অপূর্ব ককটেল। আলাদা ভাবে মোট ছয়টি কবিতা এই পর্বে। প্রথমেই ষড়জ (সা)। এই
কবিতায় সঞ্জয় যেমন নিজের জাত চিনিয়েছেন তেমনি নিজের অস্তিত্বকেও লিপিবদ্ধ করে গেছেন
ভবিষ্যতের দলিল হিসেবে। জন্ম থেকে মৃত্যুর এক অগস্ত্যযাত্রার বিবরণ। শুরুটাই চমকপ্রদ
-
সঞ্জয়, পুড়ল, তাহলে, অবশেষে।
সকলে মিলে পোড়ালো।
সকল বলতে ওই, বন্ধু ক’জন।
অশ্রুব্যঞ্জন রাঁধা হলো দু-একদিন, যেমন হয়।
সে তো হওয়ারই ছিল,
ডানা যখন, উড়তেই হবে একদিন।
উপুড় করে ঢেলে রেখে যেতে হবে সব,
মানবজন্ম, তৃষ্ণাযাপন, আদর পরব।
কবিতার প্রথম আট লাইনেই যেন জীবনের সারসত্যটিকে নিজের জীবনের কল্পগাথায় তুলে দিয়েছেন জলের মতো স্বচ্ছ উচ্চারণে। প্রতিটি শব্দে, শব্দবন্ধে কী অসাধারণ ব্যঞ্জনা। এ না হলে সঞ্জয় ?
দ্বিতীয় কবিতা - রেখাব (রে)। এখানে জীবন যাপন, প্রহসনের নাগরিকত্ব। অপূর্ব শব্দচয়নে ভাস্বর এই পর্ব। সরাসরি কবিতায় চলে যাওয়াই সঙ্গত।
উত্তর-পূর্ব খুলে দিল দ্বার।
সঞ্জয় এল।
অবশেষে।
প্রবেশমুহূর্ত, সে তো আলোসোহাগি বড়
পিতার আনন্দ থেকে মাতার আত্মগত গ্রহণে
খসে পড়ি আমি, এই বিভাহীন আমি।
জড় থেকে চলমান-এ।
মাতৃগর্ভের জলে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তরণে
আমি চৈতন্যমুখী।
মাতৃযোনি ভ্রমণের চাইতে আর কোনো স্বর্গীয় ভ্রমণ
নেই তো, এ-জগতে।
এই একই পর্বে ‘বরাক’ শিরোনামে আছে আরোও একটি কবিতা। কিয়দংশ -
আমার তীর্থক্ষেত্র, আমার ঐশ্বর্য, গর্বের মাটি
কণ্ঠে যে ভাষা পেলাম তার জন্য এগারোটি
চিরনমস্য প্রাণ, কণ্ঠে নিলেন মরণের জয়গান।
তাই তো আমি,
আজকে বাঁচি
বাংলায় বাঁচি।
যে-ভাষায় আমার স্বপ্ন দেখা পোড়া দেশে
যে-ভাষায় আমি তোমায় বলি ভালোবাসি
যে-ভাষায় আমি লৌহ বাঁচি
যে-ভাষায় আমি স্বর্ণ ঘুমোই
যে-ভাষায় আমি শেষ দহনে, পুড়তে রাজি
সেই ভাষারই স্পর্ধা নিয়ে,
উনিশে মে
জননী আমার।
পরবর্তী কবিতা গান্ধার (গা)। মাতা, মাতৃভূমির অমোঘ টান, দেশভাগের নিদারুণ ব্যথা। মধ্যম (মা) কবিতায় পরিযায়ী মন থিতু হয়েছে এই মাটিতে, এই ভূমিতে। জীবনের সরগম এসে মেতেছে তানকর্তবে, ভালোবাসায়, ভালো লাগায় -
আমি যেমন খাই মাটি মাহর ডালি সঙ্গে আলু পিটিকা
বন্ধুটিও আমোদে খায় সিদলমাখা ভাত একথালা।
ভালোবাসার চর্বণের চেয়ে সরস
আর কিছু নেই এই ভূগোলে।
চর্বণ, অসফল, একপাটি দাঁতে।
‘পদ্মার চরের লাইগ্যা’ যার ‘মন কান্দে’
লুইতের চরে সে এখন জীবন বান্ধে।
দেশ হারিয়ে, পুনরায় খুঁজে পায় দেশ।
দিঘলিপুখুরির এক কোণে একান্তে বসে
সজল দু’চোখ মুছেন যে যুবক,
বিদেশি তকমা কপালে সেঁটে,
পরম অভিমানে,
তিনিও বলে ওঠেন, “লুইতের পারে পারে আমাদের রাত
কোজাগর।”
পঞ্চম (পা)। পঞ্চমে এসে কবি আবার বুঝি একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে জীবনের উপলব্ধিকে রোমন্থন করেন আরোও একবার। ধৈবত (ধা) ও নিষাদ (নি) তে এসে কবি জীবন প্রবাহের যাবতীয় দুঃখ, অভিমানকে বিসর্জন দিয়ে পরমজ্ঞানের পথে এগিয়ে যেতে থাকেন -
‘আলো পড়ে টাপুর টুপুর
আলো পড়ে টাপুর টুপুর।’
ছয়ভাগে বিভক্ত এই কবিতাটির পরে দ্বিতীয় কবিতা - ‘পুড়তে আমার আর ভালো লাগে না’। এই কবিতায় আছে মোট পাঁচটি পর্ব। ‘আমারও মাতৃদুগ্ধ - বাংলাভাষা’, ‘অন্ধকারে কবর খুঁড়ে তুলে আনি সময়ের কঙ্কাল’, ‘দেখেছি, মা ভিজছেন, অবিশ্রাম, অসহায়তার অবিশ্রান্ত ধারায়’, ‘আগামীকাল পাখিদের গানে গানে সুপ্রভাত’ এবং ‘উড়ুক ছাই, ভয়-পোড়া ছাই, শূন্য শবদেহের দেশ’। কবিতাগুলির শিরোনামেরই মতো অজস্র আনকোরা শব্দবন্ধে প্রতিটি কবিতা হয়ে উঠেছে দেশ ও কালের অ-সুখের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার ব্যঙ্গ। প্রথম দু’লাইনেই ঝরে পড়ে শ্লেষ -
‘গাঙ্গেয় যুবক, আমি বাংলায় কথা বলি
জগন্নাথ হলের যুবতী, আমি বাংলায় কথা বলি ...।’
অসীম বেদনার গাথা এই পর্বে অসাধারণ কিছু পংক্তির মধ্য দিয়ে ভেসে উঠেছে কবিতার শরীরে -
মধ্যরাতের স্বাধীনতা,
তোমার কান্না, রক্ত এবং শবদেহের
বিউগল বাজার পূর্বে,
সে ছিল
শ্রাবণের অবিশ্রাম বরষামঙ্গল।
কুড়ালের ঘা পড়ল কুঁড়েঘর-এ
দ্বিখণ্ডিত হইল রাধারমণ
দ্বিখণ্ডিত হইল শ্রীভূমি
দ্বিখণ্ডিত হইল চৈতন্যচরণ
দ্বিখণ্ডিত যদি সুনামগঞ্জ
দ্বিখণ্ডিত শ্রীমঙ্গল
মানুষের চোখের জলে
কাউয়াদিঘি হাওর
ফুলে ফেঁপে ওঠে নিঃসীম বেদনায়
জানে, সব জানে ভৈরবের পুল।
আজকের কুটিল সময়ের কুচক্রের বিরুদ্ধে শাণিত হয় কবির কলম। বিদ্রুপে, শ্লেষে সৃষ্টি হয় কিছু অমোঘ, তীর্যক পংক্তি -
শিকড় খুঁজি, খুঁজি বসবাস
মধ্যরাতের স্বাধীনতা, তোমার ক্লান্ত, ভগ্ন হাত
আজ ঘরের সিন্দুক হাতড়ে খুঁজে,
রয়েছে কি চিহ্ন কোনো, খেরোখাতা ?
প্রপিতামহের ইতিহাস।
প্রপিতামহীকে লিখা প্রেমপত্রও তো
হতে পারে
দাঁড়াবার সম্ভ্রান্ত দলিল।
শব্দে, চরণে ঝরে পড়ে একাধারে ক্ষোভ, দ্রোহসুর, তীর্যক শ্লেষ আর অন্যদিকে ঘৃণা, ব্যথা, ক্লান্তি -
‘দেশ
আমাকে আর সন্দেহ করো না।
পুড়তে আমার আর ভালো লাগে না।’
‘দণ্ডবৎ মাতা’ কবিতায় তেরোটি শিরোনামবিহীন বিভাগ। অনন্য এই কবিতায় মা মাটি মানুষের ইতিহাস অসাধারণ দক্ষতায় সাজিয়েছেন কবি। এক চূড়ান্ত উৎকর্ষতার দলিল হয়ে থাকবে এই দীর্ঘ কবিতাটি - নিশ্চিত। কিছু অংশ -
গ্যারি কুপার মারা যাচ্ছেন, এসে গেছেন জর্জ ক্লুনি
বব ডিলান গান গাইছেন নিউইয়র্কে
ফিদেল কাস্ত্রো ঘোষণা করছেন তিনি কমিউনিস্ট
রবার্ট ফ্রস্ট কবিতা পড়ছেন কেনেডির সামনে
পাবলো পিকাসো বিয়ে করছেন তার মডেলকে
অ্যান্ড নাও ইয়ু মে কিস্ দ্য ব্রাইড
বার্লিন ওয়াল গড়ে তোলা হচ্ছে
বিটলস্ এই প্রথম গান গাইছে জনসমক্ষে
একশোতম জন্মবর্ষ পালন হচ্ছে মহামানবের
হাংরিরা ইস্তেহার লিখছেন
কাঁচা রক্তে ভেসে যাচ্ছে শিলচর রেল স্টেশন
বাংলা মায়ের কোলে ঢলে পড়ছে এগারোটি টগবগে প্রাণ
য়ুরি গ্যাগারিন, ঘুরে ফেলেছেন এই অদ্ভুত গ্রহ,
সে কি বিষের মতোই তীব্র নীল ?
ভালোবাসা ছড়ানো নেই ইতস্তত ?
এসে গেছি আমি খরবায়ু
এসে গেছি ঢাকাদক্ষিণ
এসে গেছি হাওরের জল
এসে গেছি ভাতে সিদল
নিমাই হে, এসে গেছি আমি
ক্ষীণজন্ম, শূন্যজন্ম, ক্ষণজন্ম
এসে গেছি পদ্মপুরাণ
লাচাড়ি, ত্রিপদে
রেখো মা বিষহরি
সন্তানেরে অমৃতকুশলে।
গ্যারি কুপার থেকে নিমাই-এর এই অনন্ত যাত্রার অম্লান ছবিটি চিরতরের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে রইল বাংলা ভাষার ইতিহাসে - সৌজন্যে আমাদের একান্ত কাছের এক উদাস কবি - ‘সঞ্জয় উদাস’।
‘শব্দের যথেচ্ছাচার’ কবিতায় কবি একেবারে মাটির মানুষ হয়ে মিশে গেছেন সাধারণ্যে। খেয়ালখুশির শব্দ সাজিয়ে সোজাসাপটা ভাষায় তুলে ধরেছেন আত্মপরিচয় -
গুহা থেকে বেরোলেন পিতা আমার
গুহা থেকে বেরোলেন মাতা আমার
মাটি খুঁড়ে বের করলেন আমায়
তুলে ধরলেন ঊর্ধ্বাকাশে ......
মুখে ভাষা দিলেন
যাপনে ধর্ম,
জাতের উল্কাবারি,
পরিচয়ের স্তম্ভ।
সেই সকাল থেকে আমি সিলেটি বাঙালি
সেই সকাল থেকে আমি হিন্দু
সেই ঝুরো মাটি ঝেড়ে আমি ব্রাহ্মণ উচ্চবর্ণীয়
সেই মাটি ঝেড়ে মানব সিন্ধু ……
সিলেটি বাঙালি হওয়া বড় কষ্টের
বন্ধু বলেছিল পরের জন্মে
সে নাকি বাঙালিই হবে না,
আমরা তো বৃহৎ বঙ্গই ছিলাম
কে কেটে জুড়ে দিল অন্য শরীরে।
পুরো কবিতাটিই যেন এক মানব জীবনের জীবন্ত দলিল - শব্দের যথেচ্ছাচারে।
শেষ কবিতা - ‘উদ্বাস্তুচরণ’। এক উদ্বাস্তুর জীবন পরিক্রমা। কাছে থেকে দেখা জটিল সমীকরণের সহজ বিশ্লেষণ -
কই যাও, চরণ ?
যাও কই, একলা একলা ?
কই যাও,
থাকো।
তুই জীবন ছাড়িয়া গেইলে
আদর করিবে কায়
চরণ রে …
রক্তভেজা উদ্বাস্তুচরণ
তার সমস্ত গল্প নিয়ে
খুঁজে পেল শেষে,
সেই দেশ, চিরকাঙ্খিত।
কাঠের শয্যা, আগুনের চামর
চন্দনের পথ, ঘৃতকামড়
সাক্ষ্যপ্রমাণ সব, আগ্নেয় স্বাহাঃ …
এভাবেই মা ও মাটিকে দণ্ডবৎ জানিয়েছেন কবি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কাব্য সুষমায়। প্রতি পৃষ্ঠায়, চরণে, শব্দে চিনিয়ে দিয়েছেন নিজের জাত। গুয়াহাটির উঁই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত দুই মলাটের এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘গৌতম ভট্টাচার্য’কে। শব্দ, পংক্তি বিন্যাস নিখুঁত। বানান/ছাপার ভুল একেবারেই নগণ্য।
পরিশেষে আমরাও বলতে চাই - হে গাঙ্গেয় যুবক, হে জগন্নাথ হলের যুবতি, আমরাও পারি বাংলায় যাপন করতে আমাদের প্রান্তিক জীবন - আমাদেরও আছেন এক সঞ্জয়, ‘দূরদ্রষ্টা সঞ্জয়’।
রাত্রির আগুনে পুড়ে যাচ্ছে মুখ, যাক।
মানবপুত্র, মানবীকন্যা আমরা
কোনো করুণা না, সৃষ্টিভিক্ষা না
ধরিত্রীপুত্র, ধরিত্রীকন্যা আমরা
কোথাও যাব না না
অন্ধকারমুখরিত দেশ যদিও
সে আমাদের, আমাদের, আমাদের।
দেশ অন্ধকারমুখরিত, তবু সে আমাদের। আমরাই ধরিত্রীপুত্র, ধরিত্রীকন্যা। স্পষ্ট কথায়, শব্দের পুনঃপুনঃ উচ্চারণে এমন কাব্যিক প্রত্যয় জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা ক’জন কবির আছে ? সঞ্জয়ের আছে। কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী - উত্তর পূর্বের কবিতা বিশ্বের সুপরিচিত মুখ। এবং প্রায় প্রতিটি কবিতায় তাঁর শব্দে, অলঙ্কারে, রূপকে ফুটে ওঠে এই ভূখণ্ডের গর্বিত সত্ত্বার প্রকাশ। অবিভক্ত ভারত, দেশভাগ শেষে, উত্তর পূর্বের মাটি ও মানুষের সাহচর্যে কবির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। অবিভক্ত বাংলার জল মাটি, বরাক - ব্রহ্মপুত্র - পাহাড়ের অনাবিল মোহ তাঁর কবিতার সম্পদ। আলাদা করিয়ে তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কোন মানে থাকতে পারে না।
ফেব্রুয়ারি ২০১৯ এ প্রকাশিত হয় তাঁর ৬৪ পাতার সপ্তম কাব্যগ্রন্থ - ‘দণ্ডবৎ মাতা’। আছে মোট পাঁচটি কবিতা। ৯ থেকে ১৮ পৃষ্ঠাজোড়া কবিতা। প্রতিটি কবিতার পরতে পরতে আছে বিস্ময়, ছড়িয়ে ছিটিয়ে - সঘনে। প্রতিটি কবিতা থেকে অসংখ্য উদ্ধৃতি অনায়াসে তুলে আনা যায়। এমনকি আস্ত কবিতাটিই তুলে ধরার লোভ সামলানো যায় না। যেমন তিনি নিজেও করেছেন। অধিকাংশ কবিতার শুরুতেই নিয়েছেন উদ্ধৃতি। সে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে Pink Floyd, শক্তিপদ ব্রহ্মচারী কিংবা The Beatles. অনন্য সব উদ্ধৃতি এক অন্য মাত্রা এনে দিয়েছে কবিতায়। খেই ধরিয়ে দিয়েছে পঠনের। কবিতার ফর্মাট নিয়ে নিত্য খেলা করেন সঞ্জয়। এই সংকলনেও তার অন্যথা হয়নি। তাই প্রতিটি কবিতাই হয়ে উঠেছে অনন্যসুন্দর। ভাব, বক্তব্য, উচ্চারণের পাশাপাশি কাব্যিক সুষমা যেন পাতার পর পাতা জুড়ে খেলা করে আপন উৎকর্ষতায়।
সকলে মিলে পোড়ালো।
সকল বলতে ওই, বন্ধু ক’জন।
অশ্রুব্যঞ্জন রাঁধা হলো দু-একদিন, যেমন হয়।
সে তো হওয়ারই ছিল,
ডানা যখন, উড়তেই হবে একদিন।
উপুড় করে ঢেলে রেখে যেতে হবে সব,
মানবজন্ম, তৃষ্ণাযাপন, আদর পরব।
কবিতার প্রথম আট লাইনেই যেন জীবনের সারসত্যটিকে নিজের জীবনের কল্পগাথায় তুলে দিয়েছেন জলের মতো স্বচ্ছ উচ্চারণে। প্রতিটি শব্দে, শব্দবন্ধে কী অসাধারণ ব্যঞ্জনা। এ না হলে সঞ্জয় ?
দ্বিতীয় কবিতা - রেখাব (রে)। এখানে জীবন যাপন, প্রহসনের নাগরিকত্ব। অপূর্ব শব্দচয়নে ভাস্বর এই পর্ব। সরাসরি কবিতায় চলে যাওয়াই সঙ্গত।
উত্তর-পূর্ব খুলে দিল দ্বার।
সঞ্জয় এল।
অবশেষে।
প্রবেশমুহূর্ত, সে তো আলোসোহাগি বড়
পিতার আনন্দ থেকে মাতার আত্মগত গ্রহণে
খসে পড়ি আমি, এই বিভাহীন আমি।
জড় থেকে চলমান-এ।
মাতৃগর্ভের জলে, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সন্তরণে
আমি চৈতন্যমুখী।
মাতৃযোনি ভ্রমণের চাইতে আর কোনো স্বর্গীয় ভ্রমণ
নেই তো, এ-জগতে।
এই একই পর্বে ‘বরাক’ শিরোনামে আছে আরোও একটি কবিতা। কিয়দংশ -
আমার তীর্থক্ষেত্র, আমার ঐশ্বর্য, গর্বের মাটি
কণ্ঠে যে ভাষা পেলাম তার জন্য এগারোটি
চিরনমস্য প্রাণ, কণ্ঠে নিলেন মরণের জয়গান।
তাই তো আমি,
আজকে বাঁচি
বাংলায় বাঁচি।
যে-ভাষায় আমার স্বপ্ন দেখা পোড়া দেশে
যে-ভাষায় আমি তোমায় বলি ভালোবাসি
যে-ভাষায় আমি লৌহ বাঁচি
যে-ভাষায় আমি স্বর্ণ ঘুমোই
যে-ভাষায় আমি শেষ দহনে, পুড়তে রাজি
সেই ভাষারই স্পর্ধা নিয়ে,
উনিশে মে
জননী আমার।
পরবর্তী কবিতা গান্ধার (গা)। মাতা, মাতৃভূমির অমোঘ টান, দেশভাগের নিদারুণ ব্যথা। মধ্যম (মা) কবিতায় পরিযায়ী মন থিতু হয়েছে এই মাটিতে, এই ভূমিতে। জীবনের সরগম এসে মেতেছে তানকর্তবে, ভালোবাসায়, ভালো লাগায় -
আমি যেমন খাই মাটি মাহর ডালি সঙ্গে আলু পিটিকা
বন্ধুটিও আমোদে খায় সিদলমাখা ভাত একথালা।
ভালোবাসার চর্বণের চেয়ে সরস
আর কিছু নেই এই ভূগোলে।
চর্বণ, অসফল, একপাটি দাঁতে।
‘পদ্মার চরের লাইগ্যা’ যার ‘মন কান্দে’
লুইতের চরে সে এখন জীবন বান্ধে।
দেশ হারিয়ে, পুনরায় খুঁজে পায় দেশ।
দিঘলিপুখুরির এক কোণে একান্তে বসে
সজল দু’চোখ মুছেন যে যুবক,
বিদেশি তকমা কপালে সেঁটে,
পরম অভিমানে,
তিনিও বলে ওঠেন, “লুইতের পারে পারে আমাদের রাত
কোজাগর।”
পঞ্চম (পা)। পঞ্চমে এসে কবি আবার বুঝি একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে জীবনের উপলব্ধিকে রোমন্থন করেন আরোও একবার। ধৈবত (ধা) ও নিষাদ (নি) তে এসে কবি জীবন প্রবাহের যাবতীয় দুঃখ, অভিমানকে বিসর্জন দিয়ে পরমজ্ঞানের পথে এগিয়ে যেতে থাকেন -
‘আলো পড়ে টাপুর টুপুর
আলো পড়ে টাপুর টুপুর।’
ছয়ভাগে বিভক্ত এই কবিতাটির পরে দ্বিতীয় কবিতা - ‘পুড়তে আমার আর ভালো লাগে না’। এই কবিতায় আছে মোট পাঁচটি পর্ব। ‘আমারও মাতৃদুগ্ধ - বাংলাভাষা’, ‘অন্ধকারে কবর খুঁড়ে তুলে আনি সময়ের কঙ্কাল’, ‘দেখেছি, মা ভিজছেন, অবিশ্রাম, অসহায়তার অবিশ্রান্ত ধারায়’, ‘আগামীকাল পাখিদের গানে গানে সুপ্রভাত’ এবং ‘উড়ুক ছাই, ভয়-পোড়া ছাই, শূন্য শবদেহের দেশ’। কবিতাগুলির শিরোনামেরই মতো অজস্র আনকোরা শব্দবন্ধে প্রতিটি কবিতা হয়ে উঠেছে দেশ ও কালের অ-সুখের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার ব্যঙ্গ। প্রথম দু’লাইনেই ঝরে পড়ে শ্লেষ -
‘গাঙ্গেয় যুবক, আমি বাংলায় কথা বলি
জগন্নাথ হলের যুবতী, আমি বাংলায় কথা বলি ...।’
অসীম বেদনার গাথা এই পর্বে অসাধারণ কিছু পংক্তির মধ্য দিয়ে ভেসে উঠেছে কবিতার শরীরে -
মধ্যরাতের স্বাধীনতা,
তোমার কান্না, রক্ত এবং শবদেহের
বিউগল বাজার পূর্বে,
সে ছিল
শ্রাবণের অবিশ্রাম বরষামঙ্গল।
কুড়ালের ঘা পড়ল কুঁড়েঘর-এ
দ্বিখণ্ডিত হইল রাধারমণ
দ্বিখণ্ডিত হইল শ্রীভূমি
দ্বিখণ্ডিত হইল চৈতন্যচরণ
দ্বিখণ্ডিত যদি সুনামগঞ্জ
দ্বিখণ্ডিত শ্রীমঙ্গল
মানুষের চোখের জলে
কাউয়াদিঘি হাওর
ফুলে ফেঁপে ওঠে নিঃসীম বেদনায়
জানে, সব জানে ভৈরবের পুল।
আজকের কুটিল সময়ের কুচক্রের বিরুদ্ধে শাণিত হয় কবির কলম। বিদ্রুপে, শ্লেষে সৃষ্টি হয় কিছু অমোঘ, তীর্যক পংক্তি -
শিকড় খুঁজি, খুঁজি বসবাস
মধ্যরাতের স্বাধীনতা, তোমার ক্লান্ত, ভগ্ন হাত
আজ ঘরের সিন্দুক হাতড়ে খুঁজে,
রয়েছে কি চিহ্ন কোনো, খেরোখাতা ?
প্রপিতামহের ইতিহাস।
প্রপিতামহীকে লিখা প্রেমপত্রও তো
হতে পারে
দাঁড়াবার সম্ভ্রান্ত দলিল।
শব্দে, চরণে ঝরে পড়ে একাধারে ক্ষোভ, দ্রোহসুর, তীর্যক শ্লেষ আর অন্যদিকে ঘৃণা, ব্যথা, ক্লান্তি -
‘দেশ
আমাকে আর সন্দেহ করো না।
পুড়তে আমার আর ভালো লাগে না।’
‘দণ্ডবৎ মাতা’ কবিতায় তেরোটি শিরোনামবিহীন বিভাগ। অনন্য এই কবিতায় মা মাটি মানুষের ইতিহাস অসাধারণ দক্ষতায় সাজিয়েছেন কবি। এক চূড়ান্ত উৎকর্ষতার দলিল হয়ে থাকবে এই দীর্ঘ কবিতাটি - নিশ্চিত। কিছু অংশ -
গ্যারি কুপার মারা যাচ্ছেন, এসে গেছেন জর্জ ক্লুনি
বব ডিলান গান গাইছেন নিউইয়র্কে
ফিদেল কাস্ত্রো ঘোষণা করছেন তিনি কমিউনিস্ট
রবার্ট ফ্রস্ট কবিতা পড়ছেন কেনেডির সামনে
পাবলো পিকাসো বিয়ে করছেন তার মডেলকে
অ্যান্ড নাও ইয়ু মে কিস্ দ্য ব্রাইড
বার্লিন ওয়াল গড়ে তোলা হচ্ছে
বিটলস্ এই প্রথম গান গাইছে জনসমক্ষে
একশোতম জন্মবর্ষ পালন হচ্ছে মহামানবের
হাংরিরা ইস্তেহার লিখছেন
কাঁচা রক্তে ভেসে যাচ্ছে শিলচর রেল স্টেশন
বাংলা মায়ের কোলে ঢলে পড়ছে এগারোটি টগবগে প্রাণ
য়ুরি গ্যাগারিন, ঘুরে ফেলেছেন এই অদ্ভুত গ্রহ,
সে কি বিষের মতোই তীব্র নীল ?
ভালোবাসা ছড়ানো নেই ইতস্তত ?
এসে গেছি আমি খরবায়ু
এসে গেছি ঢাকাদক্ষিণ
এসে গেছি হাওরের জল
এসে গেছি ভাতে সিদল
নিমাই হে, এসে গেছি আমি
ক্ষীণজন্ম, শূন্যজন্ম, ক্ষণজন্ম
এসে গেছি পদ্মপুরাণ
লাচাড়ি, ত্রিপদে
রেখো মা বিষহরি
সন্তানেরে অমৃতকুশলে।
গ্যারি কুপার থেকে নিমাই-এর এই অনন্ত যাত্রার অম্লান ছবিটি চিরতরের জন্য লিপিবদ্ধ হয়ে রইল বাংলা ভাষার ইতিহাসে - সৌজন্যে আমাদের একান্ত কাছের এক উদাস কবি - ‘সঞ্জয় উদাস’।
‘শব্দের যথেচ্ছাচার’ কবিতায় কবি একেবারে মাটির মানুষ হয়ে মিশে গেছেন সাধারণ্যে। খেয়ালখুশির শব্দ সাজিয়ে সোজাসাপটা ভাষায় তুলে ধরেছেন আত্মপরিচয় -
গুহা থেকে বেরোলেন পিতা আমার
গুহা থেকে বেরোলেন মাতা আমার
মাটি খুঁড়ে বের করলেন আমায়
তুলে ধরলেন ঊর্ধ্বাকাশে ......
মুখে ভাষা দিলেন
যাপনে ধর্ম,
জাতের উল্কাবারি,
পরিচয়ের স্তম্ভ।
সেই সকাল থেকে আমি হিন্দু
সেই ঝুরো মাটি ঝেড়ে আমি ব্রাহ্মণ উচ্চবর্ণীয়
সেই মাটি ঝেড়ে মানব সিন্ধু ……
বন্ধু বলেছিল পরের জন্মে
সে নাকি বাঙালিই হবে না,
আমরা তো বৃহৎ বঙ্গই ছিলাম
কে কেটে জুড়ে দিল অন্য শরীরে।
পুরো কবিতাটিই যেন এক মানব জীবনের জীবন্ত দলিল - শব্দের যথেচ্ছাচারে।
শেষ কবিতা - ‘উদ্বাস্তুচরণ’। এক উদ্বাস্তুর জীবন পরিক্রমা। কাছে থেকে দেখা জটিল সমীকরণের সহজ বিশ্লেষণ -
কই যাও, চরণ ?
যাও কই, একলা একলা ?
কই যাও,
থাকো।
তুই জীবন ছাড়িয়া গেইলে
আদর করিবে কায়
চরণ রে …
রক্তভেজা উদ্বাস্তুচরণ
তার সমস্ত গল্প নিয়ে
খুঁজে পেল শেষে,
সেই দেশ, চিরকাঙ্খিত।
কাঠের শয্যা, আগুনের চামর
চন্দনের পথ, ঘৃতকামড়
সাক্ষ্যপ্রমাণ সব, আগ্নেয় স্বাহাঃ …
এভাবেই মা ও মাটিকে দণ্ডবৎ জানিয়েছেন কবি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ কাব্য সুষমায়। প্রতি পৃষ্ঠায়, চরণে, শব্দে চিনিয়ে দিয়েছেন নিজের জাত। গুয়াহাটির উঁই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত দুই মলাটের এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘গৌতম ভট্টাচার্য’কে। শব্দ, পংক্তি বিন্যাস নিখুঁত। বানান/ছাপার ভুল একেবারেই নগণ্য।
পরিশেষে আমরাও বলতে চাই - হে গাঙ্গেয় যুবক, হে জগন্নাথ হলের যুবতি, আমরাও পারি বাংলায় যাপন করতে আমাদের প্রান্তিক জীবন - আমাদেরও আছেন এক সঞ্জয়, ‘দূরদ্রষ্টা সঞ্জয়’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘দণ্ডবৎ মাতা’
সঞ্জয় চক্রবর্তী
মূল্য - ৭০ টাকা।
যোগাযোগ - ৬০০১২০৫২২৩
সঞ্জয় চক্রবর্তী
মূল্য - ৭০ টাকা।
যোগাযোগ - ৬০০১২০৫২২৩

Comments
Post a Comment