আশাহত
মূল অসমিয়া গল্প - আশাহত - রুমী লস্কর
বরা
বাংলা অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
তার বলতে ইচ্ছে হয় - ‘আয় তো রূপসী, আমার কাছে একটুখানি বোস এসে। তুই কাছে থাকলে বড় ভালো লাগে রে।’
গলা পর্যন্ত উজিয়ে আসা কথাটি সেখানেই থেকে যায়। ঠোঁটটিতে লেগে থাকে কেবল বলতে না পারা সেই কথাটির কম্পন। সে বা কী ভাবে ? হঠাৎ যদি হুলুস্থুল লাগিয়ে দেয় ? যদিও তার দেহে যুবা বয়সের আকর্ষণ না থাকা নয়। কিন্তু তার দৈনন্দিন ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য যে জীবন সংগ্রাম, তা তার গ্রামের কে না জানে ? তার তুলনায় কণটিলৌ, মাঘীরামরা পৈতৃক ভিটেমাটি, খেত-কৃষি নিয়ে গ্রামে মাথা উঁচু করে থাকা মানুষ। বন্যায় এক বছর খেতি নষ্ট করলেও চিন্তা থাকে না। দুই বছর চলে যাওয়ার মতো আগারে ধান আছে। বাড়িতে তাম্বুল পান, সবজি আছে। গোয়ালে গোরু আছে। তার কী আছে ? বামুন হয়ে চাঁদ ধরতে গিয়ে কোন লাভ আছে কি ? নিজের ভিটে-মাটি ঘরে কোনও প্রকারে দু’টি পেট চালিয়ে যাওয়া জীবনটিতে কে আর আত্মঘাতী হতে আসবে ? আশায় আবদ্ধ তার মনটি স্বপ্ন রচে - একদিন ভালো দিন আসবে। কিছু একটা করে কৃষিজমি দুই বিঘা মতো নেবে। সে হাল বাইবে। কষ্ট করবে। রূপসীকে মনের কথা বলবে। সে তার জীবনে এলে আরো বেশি উদ্যম নিয়ে কাজ করবে।
- থুঃ। থুঃ শালা জাহান্নামে যাওয়াগুলি। আবার সেই উৎকট গন্ধ। কে কোথায় মেরে রেখেছিস রে ?
বগীরাম বিড়বিড় করে থাকতেই তার পায়ে আঠার মতো কিছু একটা লাগল। সে পায়ের দিকে তাকালো। মাড়ালো নাকি ? আশ্বস্ত হলো। না, না। কেঁচোমাটি।
অসুস্থ মায়ের কথা তার হঠাৎ করে মনে পড়ল। ছিঃ। কেমন পুত্র সে ? মায়ের একটি আশাও পূরণ করতে পারল না। ভালো দিনের স্বপ্ন দেখতে থাকা বগীরামের জীবনে যে কঠিন মুহূর্তগুলোই হাতছানি দিচ্ছে সে কী করে জানবে ? দিন-কাল বদলে গেছে। গ্রামটিতে মাত্র একটি বাস্ চলত তখন। সেটাতেই ঝুলতে ঝুলতে লোকেরা যেত টাউনে। সেও গিয়েছিল মাঘীরামের সঙ্গে একদিন সিনেমা দেখতে। গ্রামে তখন চাকুরি করা লোক নেই বলা যায়। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক রতিকান্ত বরুয়া এবং লীলাধর শইকিয়া ও মহেন মন্ডল। এখন দেখতে দেখতে গ্রামে স্কুল বাড়লো। টাউনে যাওয়া বাসের সংখ্যা বাড়লো। গ্রামের ছেলে-মেয়েরা বাসে কলেজে যেতে শুরু করলো। ঘরে ঘরে চাকুরিয়াল হলো। ঘরে ঘরে মানুষ এক গোয়াল গোরু সামলানোর সময় নেই বলে গোরুগুলি বিক্রি করে দিল প্রায় সবাই। যারা দুধেল গাই বা হালের গোরুজোড়া রাখে তারাও নিজেই বাড়ির পেছন দিকে ছেড়ে দেয়। বগীরামদের মতো গোপালকের এখন কাজ নেই হয়ে আসছে। ক্কচিৎই কোনো ঘরে ডাক পড়ে - আসবি তো বগী, আজ গোরুজোড়া পেছনের পুকুরে নিয়ে গিয়ে ধুইয়ে রাখবি। ভাতও একবেলা এখানেই খাবি। মায়ের জন্যও দিয়ে পাঠাব।
কখনও সে মাঘীরামকে খেতির কাজে সাহায্য করে দেয়। কখনো কণটিলৌদের মাঠে হালচাষ করে দেয়। মহেন মন্ডল আবার বাড়িটির বেড়া দিতে বগীরামকে ডাকেন। বড় কষ্ট। তথাপিও কি আর চুলোয় সব সময় আগুন জ্বলে ? এদিকে রুগ্ন মায়ের আজ যান কাল যান অবস্থা। এমন অবস্থায় মাকে সে উন্নত ঔষধপথ্য এনে দেওয়া তো দূর, মায়ের খেতে ইচ্ছে করা বোয়াল মাছের টুকরো একটিও খেতে দিতে পারে না। তার মতো অধম পুত্র বেঁচে আছে কেন ? ‘হু শালা, থুঃ।’ কথাগুলো ভেবে ভেবে আসতে গিয়ে তার নিজের উপরে ধিক্কার জন্মালো। তারই পরিণামে তার অজান্তেই শব্দগুলো বেরিয়ে এল।
মুমূর্ষু মুখটি আবার ছাত্ করে মনে পড়ে গেল। আজ বেশ ক’দিনই হলো - মা কুঁকিয়ে কুঁকিয়ে বলছিলেন - বাবা রে, বোয়াল মাছের পেটি দিয়ে একটু তরকারি খেতে ইচ্ছে করছে। পক্ষাঘাত রোগগ্রস্ত মায়ের একদিকে বেঁকে যাওয়া মুখ দিয়ে লালা বেরিয়ে আসছিল। গ্রামের মাধন খুড়ি, কাতিরাম খুড়ারাও খবর নিতে এসে তাকে বারে বারে বলে যায় - বগীরাম, যেভাবেই হোক কোথায় কীভাবে পাস একটুকরো বোয়াল মাছের পেটি এনে খাওয়া মা’কে। দেখে মনে হচ্ছে, সেই আশাতেই জীবনটি টিপ টিপ করে এখনও বর্তে আছে। বড় কষ্ট পাচ্ছেন রে মা। কথাটি বগীরামকে উদ্দেশ্য করে কাতিরাম খুড়া বললেন যদিও কাছেই থাকা বালিগাঁও-এর খুড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন - না কী বলেন বালিগাঁও-এর বড়বৌ ?
বগীরাম বিলে গিয়ে না পৌঁছাতেই লোকেরা জলে নেমে জল ঘোলা করলই। আরে, কে কার জন্য রয়ে থাকে ? উরুকার দিন। কাল বিহু বলে অলেখ কাজ। আবার মায়ের মুখটি তার মানসপটে ভেসে থাকল। বুকটি ধকধক করার শব্দ শুনতে পেল। আজ তার ভাগ্য পরীক্ষা। কোনোদিনই মাছ মারতে এসে তার এমন অবস্থা হয়নি। সে পলোটি খামচে ধরল। প্রথমে প্রভু ভগবন্তের নাম নিয়ে তার পর জলকুমারী মা’কে প্রণাম করল - হে মা জলকুমারী। এবার দুর্ভাগার দিকে কৃপাদৃষ্টি দাও।
বগীরামকে দেখে গ্রামের ডম্বরু বলল - বলি, আজই দেখি তোর বেলা হলো। বলি, কথাটি কী ? বগীরাম ডম্বরুর কথার উত্তর না দিয়ে মুচকি হাসল। আবার মনে মনে জলকুমারীকে দর্শন করে প্রণাম জানাল - ‘হে মাতা, আমার রুগ্ন মায়ের জন্যই এই প্রার্থনা। কৃপা করো।’
###
সবাই একসাথে লেগে বিলে লেগে থাকা পুকুরের মুখটি বন্ধ করেছে। যাতে মন্ডল এসে বলেন না - বিলে লেগে থাকা পুকুরের মুখ বন্ধ না করে মাছ মারলি, এগুলো সব দেখি আমার পুকুরের মাছ।’ মন্ডল নিজের পুকুর সিঁচতে কাউকে বলেননি তখনও। এক উত্তেজনাময়, উদ্বিগ্ন পরিবেশ। কেউ চিৎকার করছে - ধরেছি ধরেছি রে মস্ত শোল। পরে বাপু পলোর মাঝখান থেকে হাতটি বের করে এনে, তাকিয়ে দেখে মুখটি বাঁকা করে বলছে - ধুর। শালা গড়ৈ হে। শোল, ঘনিয়া, গড়ৈ, কই, পুঁটি মাছে কারো কোমরের খালুই ভরছে। কারো আধাতেই আছে।
হঠাৎ একটা উত্তেজনা। হুলুস্থুল লাগল। সবার দৃষ্টি গেল বগীরামের দিকে। বগীরামকে সাহায্য করল কণটিলৌ, ডম্বরু। বগীরামের ভাগ্যের প্রশংসা করল একমুখে - ‘হবে তার, মায়ের প্রাণটি পরিতৃপ্ত হবে। কিন্তু এই বগী, এত বড় বোয়াল মাছ। তোরা তো মাত্র দু’জন। একা খেয়ে শেষ করতে পারবি কি ? এরকম কর, বুঝেছিস ? পিঠের ও লেজের দিকেরটুকু দিবি আমাদের। পোক্ত বোয়াল দিয়ে উরুকার দিনে স্বাদ নেব।
বগীরাম ধন্যবাদ জানালো -
- হবে হবে। তোরা লেগে পড়ে দিয়েছিস যখন ...... আমি আর একা কী করে খাব ? বোয়ালটির মাঝখানের অংশটুকু দিয়েই আমরা মা-ছেলে তিন বেলা খেতে পারব। মা’কে মনের মতো করে খাওয়াব।
হঠাৎ হুলুস্থুল কথাবার্তায় মহাজনের ভঙ্গিতে বেরিয়ে এলেন মহেন মন্ডল। মহেন মন্ডলের ঘরে গতবার বিয়ে দেওয়া মেয়ে-জামাই এসেছে। মহানগরে থাকে। মেয়ে নাকি জামাইকে বলেছিল -
- কী আর মহানগরে উরুকার ভাত খাবে ? আমাদের ঘরে যাই চলো। বাবার পুকুর আছে। পুকুরের মাছ, বাড়ির শাকসবজির স্বাদই আলাদা।
মহেন মন্ডল কথাগুলো বলে হি হি করে হাসলেন। হেসে হেসেই সবার দিকে তাকিয়ে বললেন -
- এখন আমি যদি উরুকার দিনে শোল, পুঁটি খেতে দিই নতুন জামাইকে, আমার নাক কান কাটা যাবে না নাকি ? মহেন মন্ডলের কন্যা বলে আমার মেয়েটাই কি লজ্জায় পড়বে না ? তুইই বল তো ডম্বরু।
মহেন মন্ডল ডম্বরুকে উদ্দেশ্য করে বললেন যদিও শিকারি বেড়ালের মতো সবার খালুইগুলিতে একবার দৃষ্টি দিয়ে আবার খিকখিক করে হাসলেন। বললেন -
- আমার পুকুরের মাছ খা তোরা, বিহু বলে কথা। আমি মহেন মন্ডল এত নিষ্ঠুর নই, এই কণটিলৌ, নিয়ে আয়। নিয়ে আয় বড় ভালো শোল মাছ ধরলি। যদিও শোল মাছ খাওয়াতে লাজই লাগছে। কিন্তু ... কথা বলতে বলতেই ডম্বরু ও বগীরামের দিকে দৃষ্টি পড়ল। ডম্বরু অনেক চেষ্টা করেছিল বগীরাম যাতে মহেন মন্ডলের দৃষ্টি থেকে দূরে থাকে। কার্যতঃ তা হলো না। ডম্বরু মনে মনে বিড়বিড় করতে থাকল -
সে বগীরামের দিকে তাকালো। শিকারি বাঘের সামনে পড়া হরিণটির মতোই তার অবস্থা। মুখটিতে কারুণ্য। মহেন মন্ডল নিজে এসে তার হাত থেকে বোয়ালটি তুলে নিলেন -
- হেঃ হেঃ হেঃ। সাবাস বগীরাম। তুইই আমার মান বাঁচালি। আমি জানি। আমি জানি। আমার পুকুরে শুধু শোল, গড়ইই থাকে না। এই বিলে এ আমার পুকুরের বোয়াল।
মাছটি চোখের সামনে উঁচিয়ে ধরে মহেন মন্ডল হাসলেন। তাঁর হাসিটি দৈত্যের হাসির মতো প্রতিধ্বনিত হতে থাকল। মন্ডল ডম্বরুর দিকে তাকিয়ে বললেন -
- বুঝেছিস ডম্বরু। আজ বগী আমার মান বাঁচালো। দে, দে বেচারাকে তুই ধরা শোলটি দিয়ে দে। বিহু বলে ভালো করে এক বেলা খাক গিয়ে। এমনিতেই বেচারা কোথায় পায় ? খুব খারাপ লাগে রে তার জন্য। দে দে। গ্রামটিতে দেখছি সে-ই লায়েক মাছশিকারি।
চিলের মতো থাবা মেরে বোয়ালটি নিয়ে যাওয়া মহেন মন্ডলের দিকে কিছুক্ষণ বগীরাম তাকিয়ে থাকল। হঠাৎ সে দাঁড়াল। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে এল। কণ্ঠনালী ফুলে উঠল। শরীরের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে সে যেন জমা হয়ে থাকা ঘৃণাকে উগরে দিতে চেষ্টা করল -
- থুঃ।
কিছুক্ষণ সে মৌন। দুই চোখে বইছে ধারাসার জল। এক সময় মহেন মন্ডলের খেলা দেখতে থাকা গ্রামবাসীরা বগীরামের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মহেন মন্ডলকে অপ্রকাশ্যে নিন্দা জানিয়ে ঘরমুখী হলো। মহেন মন্ডলের মতো গ্রামের প্রতিপত্তিশালী মানুষকে ভেতরে ভেতরে ঘৃণা করলেও মুখ ফুটে কেউই কিছু বলতে সাহস করে না। কারো জন্য মহেন মন্ডলের সঙ্গে শত্রুতা বাড়ালে নিজেরই বিপদ। অনেক লম্বা হাতের মানুষ। ক্ষোভে ফেটে পড়া বগীরাম বিলের পারেই বসে পড়ল। তার কাছে থাকল ডম্বরু। হাতে শোল মাছটি। ডম্বরু দ্বিধাজড়িত স্বরে নিথর হয়ে বসে থাকা বগীরামকে বলল -
- এই বগী, এভাবে বসে থাকলে কী পাবি ? আমাদের মতো মানুষের ভাগ্যই খারাপ। কী করবি ? একটি কথা বলি, তুই যা ভালো বুঝিস। এই শোল মাছটিরই একটি তরকারি রাঁধতে দিই আমার ঘরে।
বগীরাম নিথর। চোখের জলকে সে বয়ে যেতে দিচ্ছে। বগীরাম কোনো সাড়া না দিলেও ডম্বরু বুঝল। সে তার কথাটি ঠিকই শুনেছে। সে আবার বলল -
- মায়ের এখন শরীরের এক দিকে কোনো সাড়া নেই। কী বোয়াল আর কী শোল, বুঝতেই পারবেন না দেখবি। তুই খাইয়ে দিবি, শোলকে বোয়াল বলে বলবি। মায়ের হয়তো বড় মাছ খাওয়ারই শখ। তুই কী ভাবিস ?
বগীরামের গায়ে যেন সাড়াশব্দ নেই। ডম্বরু এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বগীরামের পিঠে একটি হাত রেখে আবার বলল -
- কী ভেবেছিস বগী ?
বগীরাম ডম্বরুর দিকে তাকালো। ডম্বরু উৎসাহিত হয়ে বলল -
- বলেছি না আমি, মা বুঝতেই পারবেন না দেখবি।
ডম্বরুর উৎসাহে ঠাণ্ডা জল ঢেলে সে শুধু বলল -
- মাছটি নিয়ে তুই ঘরে যা। পারিস যদি মা’কে একবার দেখে আসবি। আমাকে খানিক একা, নিরালায় থাকতে দে।
ডম্বরু কিছু সময় মৌন হয়ে রইল। সে মাছটি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বগীরামকে আবার বলল -
- যা হয়েছে, হয়েছে। ঘরে যা। এভাবে ভেজা গায়ে বেশিক্ষণ থেকে অসুস্থ হলে রুগ্ন মা’কে দেখবে কে ?
কথাগুলি বলে ডম্বরু চলে গেল।
বগীরাম বসা জায়গাতেই রইল। সে ঘোলা বিলের দিকে তাকিয়ে থাকল। ঘোলা জলের মধ্যে মায়ের ধূসর দুই চোখ, মুখটি যেন সে দেখতে পাচ্ছে। চোখ দু’টি তাকে প্রশ্ন করছে।
কানের কাছে মায়ের সেই আশা করা একটি কথা বাজতে থাকল -
- বাবা রে, বোয়াল মাছের পেটি দিয়ে একটু তরকারি খেতে ইচ্ছে করছে।

Nice
ReplyDelete