ছোট পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিনের প্রাথমিক
বৈশিষ্ট্য হচ্ছে উঠতি,
নবীন লেখকের উত্তরণের প্রথম ধাপ। ছোট পত্রিকার এ এক পরিচয় কিংবা প্রাথমিক
শর্তও বলা চলে। ‘নবপর্যায় মাজুলি’র দ্বিতীয় বর্ষ সংখ্যা (প্রকাশকাল - ২০২১) নিঃসন্দেহে লঙ্ঘন
করেছে এই শর্ত।
এবার আয়নার অপর দিকটি উন্মোচিত হোক। সাহিত্য পত্রিকার পাতায় যদি সন্নিবিষ্ট
হয় বিশিষ্ট, পছন্দের, প্রতিষ্ঠিত কবি সাহিত্যিকদের রচনা, পাঠক যদি এখানেই খুঁজে নিতে পারেন তার কাঙ্ক্ষিত রসদ সেক্ষেত্রে সেই ছোট পত্রিকাটি
সাহিত্যের অঙ্গনে ইতিহাস হয়ে থাকে। নবীন থেকে প্রবীণ পাঠকের এই রসাস্বাদনে ভাস্বর হয়ে থাকে পত্রিকাটি।
অতএব সম্পাদকের উপর একটা দায়ভার এসে বর্তায় উভয় দিকটি সামলে চলার যদিও আলোচ্য সংখ্যায় কবি, সম্পাদক দিলীপ দাস দ্বিতীয়োক্ত পথটি অবলম্বন করে পাঠক মহলে উপহার দিয়েছেন একটি অতি মনোরম সাহিত্য সম্ভার। উত্তর পূর্বের সার্বিক বিশিষ্টতাকে চরম উৎকৃষ্টতায় সন্নিবিষ্ট করেছেন এখানে। প্রথম সারির কবি সাহিত্যিকদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে ‘নবপর্যায় মাজুলি - ২’। চমকে ওঠার মতো তালিকা। সম্পাদকীয়তেও উল্লেখ রয়েছে এই দিকটির কথা।
৯৮ পৃষ্ঠার সংখ্যাটির ঠিক অর্ধেক জুড়ে রয়েছে পাঁচটি ছোটগল্প এবং একটি অনুবাদ গল্প।
দেবীপ্রসাদ সিংহ লিখেছেন গল্প ‘মানবজমিন’। এর আলাদা উল্লেখ রয়েছে সম্পাদকীয়তে। স্বভাবসিদ্ধ অসামান্য বয়ানে, বর্ণনায় ফুটিয়ে তুলেছেন আত্মিক সম্পর্কের বহমান ধারাকে। প্রথম পুরুষে, চিঠির ফর্ম্যাটে, শব্দ-ভাষার অনবদ্য ব্যবহারে জীবনের উপলব্ধি, অনুভবকে সামনে ধরেছেন তাঁর নিজস্ব আঙ্গিকে। একটি বাক্যের উদ্ধৃতি গল্পের উৎকৃষ্টতাকে অনেকটাই পরিচিত করিয়ে দেবে পাঠকের সাথে - শুধুই একটি বাক্য ......
‘... নিবিড় কুয়াশায় যেমন পাখির পালকের মতো ভারহীন, ভাসমান আর সময়-বিচ্ছিন্ন মনে হয় নিজেকে, সেই কুয়াশা আমি আস্তে আস্তে নিজের ভেতর ঢুকিয়ে নিচ্ছিলাম, আর যেমন কুহেলিকা-ঘন পাহাড়ি পথে হেডলাইটের হলদে স্তিমিত আলোয় চোখের পাতার উপর গাছের একটা ঝুঁকে থাকা ডাল, ভাঙা একটা মাইলপোস্ট চমকে চমকে ওঠে, দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধাই ওয়াসিম কাপুরের ছবির প্রিন্টের উপর লুটিয়ে পড়া লম্বা ডাঁটির বাতিদানের স্বর্গীয় নরম আলো, নিচু টেবিলে রাখা হুইস্কির গ্লাসের উপর ঝুঁকে পড়া অজয়ের পৃথুলা বৌ মহাশ্বেতার বুকের উপচে পড়া মাংস, দূরের বড় রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে যাওয়ার সরসর মিলিয়ে যেতে থাকা শব্দ আড্ডার সেলিব্রেটরি নৈরাজ্য থেকে পরিস্রুত হয়ে এক্সট্রিম ক্লোজ আপে আমার হাতে ধরা গ্লাসের তারল্যের উপর ভেসে ভেসে পার হয়ে যাচ্ছিল।’ বস্তুতঃ এই একটি বাক্যের উপরই একটি আলোচনা লিখা যায় যেখানে, সেখানে গল্পটির বিস্তৃত আলোচনা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
গল্পকার দীপংকর কর। উত্তর পূর্বের
গল্পবিশ্বে তাঁকে আলাদা করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার যুগ শেষ। লিখেছেন - ‘লৌকিক
অলৌকিক’। পরিবেশের নির্মাণ-বিনির্মাণে একটি গল্পের বুনোট কী চরম উৎকর্ষে পৌঁছাতে
পারে তার এক জ্বলন্ত নিদর্শন এই গল্পটি। লৌকিক দিনযাপনে আজকের মানবও যে কী এক
অন্তর্গত নেশায় বুনে চলে অলৌকিক ছায়াজাল তারই এক চমকপ্রদ কাহিনি। আগাগোড়া গল্পের
খেইটি নিপুণ দক্ষতায় নিজের হাতে রেখে দিলেন প্রায় এগারোটি পৃষ্ঠা জুড়ে গল্পময়তার
চমৎকারিত্বে। এক নিঃশ্বাসে শেষ না করে নিস্তার নেই পাঠকের।
সফল গল্পকার মৃদুলকান্তি দে’র গল্প ‘মার্লো আসছে সামালকে’। সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে এক সোচ্চার প্রতিবাদ। যেমন থীম তেমনি গল্পের বুনোট। পরতে পরতে ঘটনার সাযুজ্য রেখে সাহিত্যরসের ধারা -
‘আমি এবার বলব।’ মিঃ বরকটকির ব্যারিটন কণ্ঠ। ‘মিঃ সান্যাল ঠিক কাজ করেছেন। অফিসার অফিসার ইগো লালন পালন করে আমরা নিজেদের মঙ্গল গ্রহের প্রাণী বানিয়ে ফেলেছি। মিঃ সান্যাল এখানে আজ নতুন দৃষ্টান্ত পালন কলেন।’ আগুনে ঘি পড়ল। তুঙ্গে উঠল হট্টগোল। ...... বাগানে অনুব্রত আর নিপীড়িত। বালতির জল লোকটির দুই হাতে আর পায়ে ঢেলে গেল অনুব্রত। চরাচর নীরব। লোকটির পকেটের ছোট ডায়েরির পাতায় সই করে অনুব্রত লিখে দিয়েছে, হি হ্যাজ ডান হিজ জব। ... বাঁশের লম্বা ফিতেওলা মানুষটা রাস্তা ধরে চলে যাচ্ছে দূর দিগন্তের দিকে। বুক পকেটে তার শিরীষ গাছের পাতা ছোঁয়া নরম রোদ।
আরেক প্রতিষ্টিত গল্পকার অশোক দেব। তাঁর গল্পের নাম ‘কৃপাদৃষ্টি’। ব্যতিক্রমী ফর্ম্যাট। সংলাপনির্ভর, স্বগতোক্তিনির্ভর। ধীরে ধীরে সংক্ষিপ্ত শব্দ থেকে বাক্যসংলাপের হাত ধরে ফুটে ওঠে বিষয়বস্তু। নান্দনিক থীম। পুরুষের চোখ, নারীর মনস্তত্ত্ব - চাহিদা - প্রেম ভালোবাসার পোস্টমর্টেম - সাহিত্যের মুন্সিয়ানায়। উন্মোচিত হয় বাস্তব - ‘বসালো। কী এক ভঙ্গি ...... ও স্পর্শ করছে। কিন্তু করছে না। একটু তাকায় একটু আঁকে। আমাকে দেখছেই না ... গলে যাচ্ছি ? না ভেঙে যাচ্ছি আমি ? সারা জীবনের একাকীত্ব, আমার জন্মজন্মান্তরের সঞ্চয় এ আমি কার কাছে খুলে ধরেছি ? ও আমাকে নয়, আমার জ্যামিতি আর সুষমা দেখত ওরকম দৃষ্টি দিয়ে ? কেবল ওইটুকু ? আমার গভীরে থাকা আমাকে সে দেখতই না ? মনে মনে ডাকি দাদাকে। দাদা। ইয়েস ম্যাম। আই লস্ট ইট, দাদা, ইট ডাজনট এগজিস্ট।’ উন্মোচিত হয় জীবনের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের ধোঁয়াশা অরূপ রূপকে।
মিথিলেশ ভট্টাচার্য উত্তর পুর্বের কথা সাহিত্যে এক যুগের নাম। আজকাল খুবই কম লিখছেন। রয়েছে তাঁর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর লিখা ‘পূর্ণগ্রাস’ গল্পটি। সংলাপের চমৎকারিত্বের মধ্য দিয়ে নিরলস ছন্দে এগিয়ে যায় গল্পের চলন। করোনার আবহে একটি উপভোগ্য এবং নিঃসন্দেহে এক চিন্তনযোগ্য ছোটগল্প।
এ অঞ্চলে অনুবাদ সাহিত্যে যে ক’জন সাহিত্যিক নিজস্ব এক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে সফল হয়েছেন একশো ভাগ তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম অভিজিৎ লাহিড়ী। তিনি অনুবাদ করেছেন রাস্কিন বন্ডের গল্প ‘যখন আর গাছে চড়ার বয়স নেই’। যেমন গল্প তেমনি তার অনুবাদ। একজন বৃদ্ধ এবং একটি বালিকার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে উপভোগ করা জীবনদর্শনকে গল্পের মোড়কে করা অসাধারণ পরিবেশনাকে ঝরঝরে তর্জমায় সরল প্রয়াসে পৌঁছে দেয়া হয়েছে পাঠকের দরবারে।
কবিতার বিভাগটিও যথারীতি প্রতিষ্ঠিত এবং ডাকসাইটে কবিদের ভিড়ে উজ্জ্বল। গোটা উত্তরপূর্বকে যেন জড়ো করা হয়েছে দুই মলাটের ভেতরে। প্রতিটি কবিতা চূড়ান্ত রকমের উৎকৃষ্টতায় পরিপূর্ণ। আলাদা করে নামোল্লেখের জো নেই। তালিকায় একবার চোখ বুলানো যাক - দেবাশিস তরফদার, অমিতাভ দেব চৌধুরী, সঞ্জয় চক্রবর্তী, স্বর্ণালী বিশ্বাস ভট্টাচার্য, পল্লব ভট্টাচার্য, তপন মহন্ত, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, অভিজিৎ চক্রবর্তী, শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়, তমোজিৎ সাহা, অনিতা দাস ট্যান্ডন, সুব্রত কুমার রায়, তপন রায়, কমলিকা মজুমদার। এ তালিকায় সব বয়সের, সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে যদিও কেউ নবীন নন। প্রথমোক্ত কবির কথা আলাদা ভাবে স্থান পেয়েছে সম্পাদকীয়তেও। শুধু কবিতা বিভাগ নিয়েই একটি আস্ত আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু পরিসর সে অনুমতি দেয় না।
পত্রিকার সম্পদ হিসেবে পরিশেষে রয়েছে তিনটি বই-এর আলোচনা। স্বর্ণালী বিশ্বাস ভট্টাচার্যের কবিতার বই ‘হাসপাতালের দিনগুলি’র আলোচনা (চিরকুট, বালিশের তলায়) করেছেন দেবাশিস তরফদার। দেবীপ্রসাদ সিংহের বিভিন্ন গল্পের চরিত্র অনন্ত কীভাবে গল্পকারের কলমে এক ঘোর বাস্তবের জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠে এসেছে সাধু ছন্দে তারই এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং সাথে গল্পসমূহের বিস্তৃত সারগর্ভ বিশ্লেষণ - তাপস পাল-এর ‘অয়দিপাউস গুঢ়ৈষার আলোকে দেবীপ্রসাদের অনন্ত’। বাসব রায় আলোচনা করেছেন গল্পকার দীপংকর কর-এর গল্প ‘হুমকির পর যা ঘটে’ গল্পের। আলোচনার অন্তর্গত চাকিচিক্য কী পর্যায় পেতে পারে তার একটি নিদর্শন নিম্নোক্ত গদ্যাংশটুকু -
…… হুমকির পর যা গটে
গল্পটিও শুরু হচ্ছে সংলাপ দিয়ে - ‘দেখ তো কে দিয়েছে’। গোটা বাক্যটা পড়ি - “দেখ তো কে দিয়েছে,
অভ্রের হাতে চিঠি দিয়ে সুজাতা বলল, ‘টাইটেলটা ভুল
করেছে’; একটু থেমে যোগ করে, ‘অবশ্য সনাতন
ঠিক পৌঁছে দিয়ে গেছে।” পাঠক, আপনাকে এই বাক্যের
যতিচহ্নের ব্যবহার দেখতে অনুরোধ করছি। প্রথম বাক্যে তিনটি নাম পাওয়া যাচ্ছে - অভ্র, সুজাতা ও সনাতন। বোঝা যায় অভ্রের বউ সুজাতা আর সনাতন পিয়োন। তবে এটা নয়, বাক্যের গভীরতা অন্যত্র,
তা হল, একটি বাক্যে তিনটি সংলাপ, একজনই - সুজাতা - বলছে,
রয়েছে একটি সেমিকোলনও, পাতি রাইটাররা সেমিকোলন
ব্যবহারই করতে জানে না, যদিও এই বাক্যে সেটি অমোঘ।
এমন চুলচেরা আলোচনার জন্যই বলা হয়েছে এই বিভাগটি এই পত্রিকার একটি সম্পদ বলে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। দীপংকর করের ভাবনায় প্রচ্ছদ অঙ্কনে খিল বাহাদুর ছেত্রি। ঝরঝরে ছাপাই এবং ‘প্রায়’ নির্ভুল বানানও পত্রিকাটির সৌষ্ঠব বাড়িয়েছে বহুগুণ কিন্তু প্রচ্ছদের বর্ষসংখ্যার ভুল ছাপা পাঠককে ধন্দে ফেলে দেয় প্রচ্ছদ ওল্টালেই। ‘দ্বিতীয়’ বর্ষের জায়গায় প্রচ্ছদে ভুলবশতঃ লিখা হয়েছে ‘তৃতীয়’ বর্ষ। এর বাইরে সুখপাঠ্য এবং অবশ্যপাঠ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায় সংখ্যাটিকে। পরবর্তীতে নবীন কবি সাহিত্যিকের উপস্থিতিতে ‘নবপর্যায় মাজুলি’ ধারে ও ভারে আরো বেশি সজ্জিত হওয়ার আশা জাগিয়ে রাখে নিশ্চিত।
অতএব সম্পাদকের উপর একটা দায়ভার এসে বর্তায় উভয় দিকটি সামলে চলার যদিও আলোচ্য সংখ্যায় কবি, সম্পাদক দিলীপ দাস দ্বিতীয়োক্ত পথটি অবলম্বন করে পাঠক মহলে উপহার দিয়েছেন একটি অতি মনোরম সাহিত্য সম্ভার। উত্তর পূর্বের সার্বিক বিশিষ্টতাকে চরম উৎকৃষ্টতায় সন্নিবিষ্ট করেছেন এখানে। প্রথম সারির কবি সাহিত্যিকদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়েছে ‘নবপর্যায় মাজুলি - ২’। চমকে ওঠার মতো তালিকা। সম্পাদকীয়তেও উল্লেখ রয়েছে এই দিকটির কথা।
৯৮ পৃষ্ঠার সংখ্যাটির ঠিক অর্ধেক জুড়ে রয়েছে পাঁচটি ছোটগল্প এবং একটি অনুবাদ গল্প।
দেবীপ্রসাদ সিংহ লিখেছেন গল্প ‘মানবজমিন’। এর আলাদা উল্লেখ রয়েছে সম্পাদকীয়তে। স্বভাবসিদ্ধ অসামান্য বয়ানে, বর্ণনায় ফুটিয়ে তুলেছেন আত্মিক সম্পর্কের বহমান ধারাকে। প্রথম পুরুষে, চিঠির ফর্ম্যাটে, শব্দ-ভাষার অনবদ্য ব্যবহারে জীবনের উপলব্ধি, অনুভবকে সামনে ধরেছেন তাঁর নিজস্ব আঙ্গিকে। একটি বাক্যের উদ্ধৃতি গল্পের উৎকৃষ্টতাকে অনেকটাই পরিচিত করিয়ে দেবে পাঠকের সাথে - শুধুই একটি বাক্য ......
‘... নিবিড় কুয়াশায় যেমন পাখির পালকের মতো ভারহীন, ভাসমান আর সময়-বিচ্ছিন্ন মনে হয় নিজেকে, সেই কুয়াশা আমি আস্তে আস্তে নিজের ভেতর ঢুকিয়ে নিচ্ছিলাম, আর যেমন কুহেলিকা-ঘন পাহাড়ি পথে হেডলাইটের হলদে স্তিমিত আলোয় চোখের পাতার উপর গাছের একটা ঝুঁকে থাকা ডাল, ভাঙা একটা মাইলপোস্ট চমকে চমকে ওঠে, দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধাই ওয়াসিম কাপুরের ছবির প্রিন্টের উপর লুটিয়ে পড়া লম্বা ডাঁটির বাতিদানের স্বর্গীয় নরম আলো, নিচু টেবিলে রাখা হুইস্কির গ্লাসের উপর ঝুঁকে পড়া অজয়ের পৃথুলা বৌ মহাশ্বেতার বুকের উপচে পড়া মাংস, দূরের বড় রাস্তা দিয়ে গাড়ি চলে যাওয়ার সরসর মিলিয়ে যেতে থাকা শব্দ আড্ডার সেলিব্রেটরি নৈরাজ্য থেকে পরিস্রুত হয়ে এক্সট্রিম ক্লোজ আপে আমার হাতে ধরা গ্লাসের তারল্যের উপর ভেসে ভেসে পার হয়ে যাচ্ছিল।’ বস্তুতঃ এই একটি বাক্যের উপরই একটি আলোচনা লিখা যায় যেখানে, সেখানে গল্পটির বিস্তৃত আলোচনা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়।
সফল গল্পকার মৃদুলকান্তি দে’র গল্প ‘মার্লো আসছে সামালকে’। সামাজিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে এক সোচ্চার প্রতিবাদ। যেমন থীম তেমনি গল্পের বুনোট। পরতে পরতে ঘটনার সাযুজ্য রেখে সাহিত্যরসের ধারা -
‘আমি এবার বলব।’ মিঃ বরকটকির ব্যারিটন কণ্ঠ। ‘মিঃ সান্যাল ঠিক কাজ করেছেন। অফিসার অফিসার ইগো লালন পালন করে আমরা নিজেদের মঙ্গল গ্রহের প্রাণী বানিয়ে ফেলেছি। মিঃ সান্যাল এখানে আজ নতুন দৃষ্টান্ত পালন কলেন।’ আগুনে ঘি পড়ল। তুঙ্গে উঠল হট্টগোল। ...... বাগানে অনুব্রত আর নিপীড়িত। বালতির জল লোকটির দুই হাতে আর পায়ে ঢেলে গেল অনুব্রত। চরাচর নীরব। লোকটির পকেটের ছোট ডায়েরির পাতায় সই করে অনুব্রত লিখে দিয়েছে, হি হ্যাজ ডান হিজ জব। ... বাঁশের লম্বা ফিতেওলা মানুষটা রাস্তা ধরে চলে যাচ্ছে দূর দিগন্তের দিকে। বুক পকেটে তার শিরীষ গাছের পাতা ছোঁয়া নরম রোদ।
আরেক প্রতিষ্টিত গল্পকার অশোক দেব। তাঁর গল্পের নাম ‘কৃপাদৃষ্টি’। ব্যতিক্রমী ফর্ম্যাট। সংলাপনির্ভর, স্বগতোক্তিনির্ভর। ধীরে ধীরে সংক্ষিপ্ত শব্দ থেকে বাক্যসংলাপের হাত ধরে ফুটে ওঠে বিষয়বস্তু। নান্দনিক থীম। পুরুষের চোখ, নারীর মনস্তত্ত্ব - চাহিদা - প্রেম ভালোবাসার পোস্টমর্টেম - সাহিত্যের মুন্সিয়ানায়। উন্মোচিত হয় বাস্তব - ‘বসালো। কী এক ভঙ্গি ...... ও স্পর্শ করছে। কিন্তু করছে না। একটু তাকায় একটু আঁকে। আমাকে দেখছেই না ... গলে যাচ্ছি ? না ভেঙে যাচ্ছি আমি ? সারা জীবনের একাকীত্ব, আমার জন্মজন্মান্তরের সঞ্চয় এ আমি কার কাছে খুলে ধরেছি ? ও আমাকে নয়, আমার জ্যামিতি আর সুষমা দেখত ওরকম দৃষ্টি দিয়ে ? কেবল ওইটুকু ? আমার গভীরে থাকা আমাকে সে দেখতই না ? মনে মনে ডাকি দাদাকে। দাদা। ইয়েস ম্যাম। আই লস্ট ইট, দাদা, ইট ডাজনট এগজিস্ট।’ উন্মোচিত হয় জীবনের অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের ধোঁয়াশা অরূপ রূপকে।
মিথিলেশ ভট্টাচার্য উত্তর পুর্বের কথা সাহিত্যে এক যুগের নাম। আজকাল খুবই কম লিখছেন। রয়েছে তাঁর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উপর লিখা ‘পূর্ণগ্রাস’ গল্পটি। সংলাপের চমৎকারিত্বের মধ্য দিয়ে নিরলস ছন্দে এগিয়ে যায় গল্পের চলন। করোনার আবহে একটি উপভোগ্য এবং নিঃসন্দেহে এক চিন্তনযোগ্য ছোটগল্প।
এ অঞ্চলে অনুবাদ সাহিত্যে যে ক’জন সাহিত্যিক নিজস্ব এক পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে সফল হয়েছেন একশো ভাগ তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নাম অভিজিৎ লাহিড়ী। তিনি অনুবাদ করেছেন রাস্কিন বন্ডের গল্প ‘যখন আর গাছে চড়ার বয়স নেই’। যেমন গল্প তেমনি তার অনুবাদ। একজন বৃদ্ধ এবং একটি বালিকার কথোপকথনের মধ্য দিয়ে উপভোগ করা জীবনদর্শনকে গল্পের মোড়কে করা অসাধারণ পরিবেশনাকে ঝরঝরে তর্জমায় সরল প্রয়াসে পৌঁছে দেয়া হয়েছে পাঠকের দরবারে।
কবিতার বিভাগটিও যথারীতি প্রতিষ্ঠিত এবং ডাকসাইটে কবিদের ভিড়ে উজ্জ্বল। গোটা উত্তরপূর্বকে যেন জড়ো করা হয়েছে দুই মলাটের ভেতরে। প্রতিটি কবিতা চূড়ান্ত রকমের উৎকৃষ্টতায় পরিপূর্ণ। আলাদা করে নামোল্লেখের জো নেই। তালিকায় একবার চোখ বুলানো যাক - দেবাশিস তরফদার, অমিতাভ দেব চৌধুরী, সঞ্জয় চক্রবর্তী, স্বর্ণালী বিশ্বাস ভট্টাচার্য, পল্লব ভট্টাচার্য, তপন মহন্ত, প্রবুদ্ধসুন্দর কর, অভিজিৎ চক্রবর্তী, শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়, তমোজিৎ সাহা, অনিতা দাস ট্যান্ডন, সুব্রত কুমার রায়, তপন রায়, কমলিকা মজুমদার। এ তালিকায় সব বয়সের, সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব রয়েছে যদিও কেউ নবীন নন। প্রথমোক্ত কবির কথা আলাদা ভাবে স্থান পেয়েছে সম্পাদকীয়তেও। শুধু কবিতা বিভাগ নিয়েই একটি আস্ত আলোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু পরিসর সে অনুমতি দেয় না।
পত্রিকার সম্পদ হিসেবে পরিশেষে রয়েছে তিনটি বই-এর আলোচনা। স্বর্ণালী বিশ্বাস ভট্টাচার্যের কবিতার বই ‘হাসপাতালের দিনগুলি’র আলোচনা (চিরকুট, বালিশের তলায়) করেছেন দেবাশিস তরফদার। দেবীপ্রসাদ সিংহের বিভিন্ন গল্পের চরিত্র অনন্ত কীভাবে গল্পকারের কলমে এক ঘোর বাস্তবের জীবন্ত চরিত্র হয়ে উঠে এসেছে সাধু ছন্দে তারই এক পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং সাথে গল্পসমূহের বিস্তৃত সারগর্ভ বিশ্লেষণ - তাপস পাল-এর ‘অয়দিপাউস গুঢ়ৈষার আলোকে দেবীপ্রসাদের অনন্ত’। বাসব রায় আলোচনা করেছেন গল্পকার দীপংকর কর-এর গল্প ‘হুমকির পর যা ঘটে’ গল্পের। আলোচনার অন্তর্গত চাকিচিক্য কী পর্যায় পেতে পারে তার একটি নিদর্শন নিম্নোক্ত গদ্যাংশটুকু -
এমন চুলচেরা আলোচনার জন্যই বলা হয়েছে এই বিভাগটি এই পত্রিকার একটি সম্পদ বলে বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। দীপংকর করের ভাবনায় প্রচ্ছদ অঙ্কনে খিল বাহাদুর ছেত্রি। ঝরঝরে ছাপাই এবং ‘প্রায়’ নির্ভুল বানানও পত্রিকাটির সৌষ্ঠব বাড়িয়েছে বহুগুণ কিন্তু প্রচ্ছদের বর্ষসংখ্যার ভুল ছাপা পাঠককে ধন্দে ফেলে দেয় প্রচ্ছদ ওল্টালেই। ‘দ্বিতীয়’ বর্ষের জায়গায় প্রচ্ছদে ভুলবশতঃ লিখা হয়েছে ‘তৃতীয়’ বর্ষ। এর বাইরে সুখপাঠ্য এবং অবশ্যপাঠ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায় সংখ্যাটিকে। পরবর্তীতে নবীন কবি সাহিত্যিকের উপস্থিতিতে ‘নবপর্যায় মাজুলি’ ধারে ও ভারে আরো বেশি সজ্জিত হওয়ার আশা জাগিয়ে রাখে নিশ্চিত।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘নবপর্যায় মাজুলি’
দ্বিতীয় বর্ষ সংখ্যা
সম্পাদক - দিলীপ দাস
মূল্য - ৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৪০৮৭০
দ্বিতীয় বর্ষ সংখ্যা
সম্পাদক - দিলীপ দাস

Comments
Post a Comment