‘হাজারো লাখো মানুষের
ভিড়ে টিপু ছুটে চলেছে, এক নির্জন গন্তব্যের দিকে। পথ গাড়ি জনতার কোলাহল ছুটোছুটিতে ও
কিছুই দেখতে পারছে না। অনেক
অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল,
ফিরে যাচ্ছে শুধুমাত্র একজনের ভালোবাসার চিহ্ন বুকে নিয়ে। আর সব ফাঁকি পড়ে আছে। জীবনের অনেকখানি সময় চলে গেছে সাধনার
বেড়াজাল অতিক্রম করে সাহিত্যের অঙ্গনে ব্যর্থ প্রেমিকের কান্না বুকে চেপে সব কিছুকে
বিদায় জানিয়ে।’ ……
বেঁচে থাকতে এবং বেঁচে থাকার অর্থ বুঝতে বুঝতে কৈশোর পেরিয়ে যৌবন - তারপর সংসারে পত্তন ও টানাপোড়েনের সুসংহত কাহিনি ‘সাঁঝবেলা’। সাঁঝবেলায় বর্ণনা এতই বিস্তৃত, দীর্ঘ যে প্রথম সংলাপ পেতে পেতে পড়ে ফেলতে হয় আঠাশটি পৃষ্ঠা। অথচ একবারের জন্যও মনে হয়নি যে বর্ণনার আধিক্য রসভঙ্গের দায়ে দুষ্ট। দেশভাগ ও তজ্জনিত কায়ক্লেশের যথাযথ বর্ণনা। এই পর্যায়ের কিছু স্পষ্ট কথা - যা সচরাচর সাহিত্য জগতের কলমচিরা লিখে ওঠার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেন না কদাপি, শুধু দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়েই কলম তুলে নেন হাতে - তাই নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন লেখক। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে রাখার কুটকৌশল অনুসরণ না করে সরাসরি ব্যক্ত করেছেন সত্য - তা সে যতই অপ্রিয় হোক না কেন। এই একটি গুণে সাঁঝবেলা এবং লেখক নারায়ণ মোদক যথাক্রমে দর্পণের মতো স্বচ্ছ এক ইতিহাসসমৃদ্ধ উপন্যাসিকা এবং একজন সত্যনিষ্ঠ সার্থক কলমবাজ।
মূল চরিত্র আরতিকে কেন্দ্র করে কয়েক দশকের এক বিচিত্র কথাকল্প ‘সাঁঝবেলা’। ধীরে ধীরে সম্পর্ক ও ভূগোলের খোলস ছেড়ে কাহিনি এগিয়েছে চমৎকার বুনোটে। কোথাও হারায়নি খেই। পাঠককে উন্মুখ করে রাখার জন্য যা যথেষ্ট। ঘটনাক্রম বিশাল। একাধিক প্রজন্মের জীবনগাথার এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সুযোগ ছিল এক পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হয়ে ওঠার। কিন্তু কিছু ঘটনা পরিক্রমার সংক্ষিপ্ত বর্ণনার জন্য মনে হয় যেন স্বল্প কথার মোড়কে সমাপ্তিরেখা টানতে চেয়েছেন লেখক। কাহিনির শেষটাও তেমনি। ছোটগল্পের মতো মূল চরিত্রের সাথে হঠাৎ করেই যেন হারিয়ে গেল সব কিছু - কোনও নির্দিষ্ট সমাপ্তি অবিহনেই। অনেক বিষয় রয়ে গেল অনির্ণীত, অবর্ণিত, অমীমাংসিত। এবং হয়তো এরই জেরে পঠনশেষে রয়ে যায় এক রেশ, এক গভীর ভাবনাসঞ্জাত জিজ্ঞাসা। বোধ হয় এখানেই লেখকের ইচ্ছাপূরণ, রচনার সার্থকতা।
দ্বিতীয় উপন্যাসিকা ‘কমলেশ’। এই অংশে চমৎকার কিছু উপমা রচনাটিকে সমৃদ্ধ করেছে নিশ্চিত। আগেরই মতো সরস বর্ণনায় সম্পৃক্ত কাহিনি। একাধারে গরিবির প্রচণ্ড জ্বালাকে উপেক্ষা করে সন্তানসুখের আশায় দিনযাপনের বাখান আর অন্যদিকে এক স্বর্গীয় প্রেম ও তার পরিণতির সমান্তরাল উপস্থাপনা - উভয়ের সমন্বয়ে এক জমজমাট কাহিনি। এখানেও পাঠকের কাছে শুধু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়ে যাওয়ার বাইরে আর কিছু করার নেই। শেষটা এখানেও ব্যতিক্রমী। একেবারেই মেলেনি পাঠকের ভাবনার সাথে। এও এক মুনশিয়ানা লেখকের।
শেষ রচনা ‘সময় বয়ে যায়’ যেন দ্বিতীয়টির এক রেপ্লিকা। কিংবা বলা যায় বর্ধিতকরণ বা প্রসারণ। দারিদ্রের পীড়নে পিষ্ট নায়কের প্রেম ভালোবাসার জলাঞ্জলি এবং এক অনভিপ্রেত জীবনযাত্রার করুণ কাহিনি। এখানেও যথারীতি এক ভিন্ন আঙ্গিকের সমাপন।
প্রতিটি রচনাই ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে এক একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে পর্যবসিত হতে পারত কিংবা হতে পারে। তবে এরও এক ব্যখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় লেখকের ভাষ্যে - ভূমিকায়। “জীবনের যে অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলাম, তার ফসল হিসেবে গল্পগুলো, কলম থেকে বেরিয়েছে আমার মননের চিন্তায়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখাগুলো যদি পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করি, তাহলে আঠারো উনিশ বছর বয়েসের আমার চারপাশের যে পৃথিবীটা আমি দেখেছি, আমার স্মৃতিপটে, হৃদয়ে আঁকা চরিত্রগুলো ঝাপসা হতে বাধ্য।”
কিছু কথ্য শব্দাবলি এবং কথনশৈলী - হয়তো অনবধানতায়, কিংবা নস্টালজিয়ায় - ঢুকে পড়েছে গ্রন্থে। এতে আজকের সাহিত্যকাঠামোয় স্বচ্ছ পঠন কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে এল, এলাম, এলেন - এর জায়গায় আসল, আসলাম, আসলেন জাতীয় শব্দাবলি পরিহার হলেই ভালো হতো।
অন্যদিকে গোটা গ্রন্থ জুড়ে বানান ভুলের সংখ্যা এতই নগণ্য যে এই দিকটা গ্রন্থের এক অমূল্য সম্পদ বলেও বিবেচিত হতে পারে - বিশেষত এ অঞ্চলের গ্রন্থসমূহে, যেখানে বানান ভুলের আধিক্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রে চোখে পড়ে। গ্রন্থের আকার, প্রচ্ছদ, ছাপাই, বাঁধাই, অক্ষর, শব্দ ও বাক্য বিন্যাস যথাযথ। লেখক গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর “মা’কে...”। প্রকাশক বিপ্লব ভট্টাচার্য, মুদ্রক - স্কলার পাবলিকেশনস্, করিমগঞ্জ।
সব মিলিয়ে ‘সাঁঝবেলা’ এক সুখপাঠ্য ত্রয়ী উপন্যাসিকা গ্রন্থ যার হাত ধরে হয়তো পাঠকের হাতে একদিন এসে পৌঁছে যাবে এক পূর্ণাবয়ব উপন্যাস। অন্তত এমন প্রত্যাশা জাগাতে ষোলোআনা সফল ‘সাঁঝবেলা’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘সাঁঝবেলা’
নারায়ণ মোদক
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯
নারায়ণ মোদক
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯

Comments
Post a Comment