Skip to main content

নারায়ণ মোদক-এর উপন্যাসোপম সুখপাঠ্য রচনা - ‘সাঁঝবেলা’


হাজারো লাখো মানুষের ভিড়ে টিপু ছুটে চলেছে, এক নির্জন গন্তব্যের দিকে পথ গাড়ি জনতার কোলাহল ছুটোছুটিতে ও কিছুই দেখতে পারছে না অনেক অনেক স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল, ফিরে যাচ্ছে শুধুমাত্র একজনের ভালোবাসার চিহ্ন বুকে নিয়ে আর সব ফাঁকি পড়ে আছে জীবনের অনেকখানি সময় চলে গেছে সাধনার বেড়াজাল অতিক্রম করে সাহিত্যের অঙ্গনে ব্যর্থ প্রেমিকের কান্না বুকে চেপে সব কিছুকে বিদায় জানিয়ে’ ……
কবি, সাহিত্যিক নারায়ণ মোদকের ত্রয়ী উপন্যাস সাঁঝবেলার প্রথম উপন্যাস - ‘সাঁঝবেলা ৫৭ পৃষ্ঠার ব্যাপ্তি পরবর্তী উপস্থাপনা - ‘কমলেশ, ৬৬ পৃষ্ঠার এবং শেষটি - ‘সময় বয়ে যায়, ৪৫ পৃষ্ঠার ব্যাপ্তি বা দৈর্ঘের দিকে তাই এগুলোকে উপন্যাস না বলে উপন্যাসিকা বলাই শ্রেয় লেখক নিজেও তাঁর ভূমিকায় এগুলোকেউপন্যাসবলে অভিহিত করেননি বরংগল্পকিংবালেখাবলে উল্লেখ করেছেন তিনটি উপন্যাসেই বর্ণিত হয়েছে ‘সাঁঝবেলা’র সেই টিপুর মতোই শুধু ছুটে চলার কাহিনি। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কষ্টকর সংগ্রামের চিত্র। ভিন্ন পরিবেশে ও ভিন্ন পটভূমিতে কিছু চরিত্রের অমোঘ জীবন ধারায় প্রবাহিত হওয়ার কাহিনি।
বেঁচে থাকতে এবং বেঁচে থাকার অর্থ বুঝতে বুঝতে কৈশোর পেরিয়ে যৌবন - তারপর সংসারে পত্তন ও টানাপোড়েনের সুসংহত কাহিনি ‘সাঁঝবেলা’। সাঁঝবেলায় বর্ণনা এতই বিস্তৃত, দীর্ঘ যে প্রথম সংলাপ পেতে পেতে পড়ে ফেলতে হয় আঠাশটি পৃষ্ঠা। অথচ একবারের জন্যও মনে হয়নি যে বর্ণনার আধিক্য রসভঙ্গের দায়ে দুষ্টদেশভাগ ও তজ্জনিত কায়ক্লেশের যথাযথ বর্ণনা। এই পর্যায়ের কিছু স্পষ্ট কথা - যা সচরাচর সাহিত্য জগতের কলমচিরা লিখে ওঠার সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারেন না কদাপি, শুধু দেশভাগের যন্ত্রণা নিয়েই কলম তুলে নেন হাতে - তাই নির্দ্বিধায় ব্যক্ত করেছেন লেখক। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে রাখার কুটকৌশল অনুসরণ না করে সরাসরি ব্যক্ত করেছেন সত্য - তা সে যতই অপ্রিয় হোক না কেন। এই একটি গুণে সাঁঝবেলা এবং লেখক নারায়ণ মোদক যথাক্রমে দর্পণের মতো স্বচ্ছ এক ইতিহাসসমৃদ্ধ উপন্যাসিকা এবং একজন সত্যনিষ্ঠ সার্থক কলমবাজ।
মূল চরিত্র আরতিকে কেন্দ্র করে কয়েক দশকের এক বিচিত্র কথাকল্প ‘সাঁঝবেলা’। ধীরে ধীরে সম্পর্ক ও ভূগোলের খোলস ছেড়ে কাহিনি এগিয়েছে চমৎকার বুনোটে। কোথাও হারায়নি খেই। পাঠককে উন্মুখ করে রাখার জন্য যা যথেষ্ট। ঘটনাক্রম বিশাল। একাধিক প্রজন্মের জীবনগাথার এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে সুযোগ ছিল এক পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হয়ে ওঠার। কিন্তু কিছু ঘটনা পরিক্রমার সংক্ষিপ্ত বর্ণনার জন্য মনে হয় যেন স্বল্প কথার মোড়কে সমাপ্তিরেখা টানতে চেয়েছেন লেখক। কাহিনির শেষটাও তেমনি। ছোটগল্পের মতো মূল চরিত্রের সাথে হঠাৎ করেই যেন হারিয়ে গেল সব কিছু - কোনও নির্দিষ্ট সমাপ্তি অবিহনেই। অনেক বিষয় রয়ে গেল অনির্ণীত, অবর্ণিত, অমীমাংসিত। এবং হয়তো এরই জেরে পঠনশেষে রয়ে যায় এক রেশ, এক গভীর ভাবনাসঞ্জাত জিজ্ঞাসা। বোধ হয় এখানেই লেখকের ইচ্ছাপূরণ, রচনার সার্থকতা।
দ্বিতীয় উপন্যাসিকা ‘কমলেশ’। এই অংশে চমৎকার কিছু উপমা রচনাটিকে সমৃদ্ধ করেছে নিশ্চিত। আগেরই মতো সরস বর্ণনায় সম্পৃক্ত কাহিনি। একাধারে গরিবির প্রচণ্ড জ্বালাকে উপেক্ষা করে সন্তানসুখের আশায় দিনযাপনের বাখান আর অন্যদিকে এক স্বর্গীয় প্রেম ও তার পরিণতির সমান্তরাল উপস্থাপনা - উভয়ের সমন্বয়ে এক জমজমাট কাহিনি। এখানেও পাঠকের কাছে শুধু পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা পড়ে যাওয়ার বাইরে আর কিছু করার নেই। শেষটা এখানেও ব্যতিক্রমী। একেবারেই মেলেনি পাঠকের ভাবনার সাথে। এও এক মুনশিয়ানা লেখকের।
শেষ রচনা ‘সময় বয়ে যায়’ যেন দ্বিতীয়টির এক রেপ্লিকা। কিংবা বলা যায় বর্ধিতকরণ বা প্রসারণ দারিদ্রের পীড়নে পিষ্ট নায়কের প্রেম ভালোবাসার জলাঞ্জলি এবং এক অনভিপ্রেত জীবনযাত্রার করুণ কাহিনি। এখানেও যথারীতি এক ভিন্ন আঙ্গিকের সমাপন।
প্রতিটি রচনাই ভিন্ন ভিন্ন পরিসরে এক একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসে পর্যবসিত হতে পারত কিংবা হতে পারে। তবে এরও এক ব্যখ্যা খুঁজে পাওয়া যায় লেখকের ভাষ্যে - ভূমিকায়। “জীবনের যে অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলাম, তার ফসল হিসেবে গল্পগুলো, কলম থেকে বেরিয়েছে আমার মননের চিন্তায়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে লেখাগুলো যদি পরিবর্তন বা পরিবর্ধন করি, তাহলে আঠারো উনিশ বছর বয়েসের আমার চারপাশের যে পৃথিবীটা আমি দেখেছি, আমার স্মৃতিপটে, হৃদয়ে আঁকা চরিত্রগুলো ঝাপসা হতে বাধ্য।”
কিছু কথ্য শব্দাবলি এবং কথনশৈলী - হয়তো অনবধানতায়, কিংবা নস্টালজিয়ায় - ঢুকে পড়েছে গ্রন্থে। এতে আজকের সাহিত্যকাঠামোয় স্বচ্ছ পঠন কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে এল, এলাম, এলেন - এর জায়গায় আসল, আসলাম, আসলেন জাতীয় শব্দাবলি পরিহার হলেই ভালো হতো।
অন্যদিকে গোটা গ্রন্থ জুড়ে বানান ভুলের সংখ্যা এতই নগণ্য যে এই দিকটা গ্রন্থের এক অমূল্য সম্পদ বলেও বিবেচিত হতে পারে - বিশেষত এ অঞ্চলের গ্রন্থসমূহে, যেখানে বানান ভুলের আধিক্যই অধিকাংশ ক্ষেত্রে চোখে পড়ে। গ্রন্থের আকার, প্রচ্ছদ, ছাপাই, বাঁধাই, অক্ষর, শব্দ ও বাক্য বিন্যাস যথাযথ। লেখক গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর “মা’কে...”প্রকাশক বিপ্লব ভট্টাচার্য, মুদ্রক - স্কলার পাবলিকেশনস্‌, করিমগঞ্জ।
সব মিলিয়ে ‘সাঁঝবেলা’ এক সুখপাঠ্য ত্রয়ী উপন্যাসিকা গ্রন্থ যার হাত ধরে হয়তো পাঠকের হাতে একদিন এসে পৌঁছে যাবে এক পূর্ণাবয়ব উপন্যাস। অন্তত এমন প্রত্যাশা জাগাতে ষোলোআনা সফল ‘সাঁঝবেলা’।  

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘সাঁঝবেলা’
নারায়ণ মোদক
মূল্য - ২০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...