Skip to main content

শব্দকুহকের কাব্যগ্রন্থ - ‘ইউটিউব ও লালটিপ’


কবিতা লিখে এখন কেউ অর্থ বা পুরস্কার প্রাপ্তির কথা ভাবে না কবিতা এখন অধ্যাপকদের দাপটমুক্ত কবি স্থা-শক্তি পালিত নয় কবি অন্ধকারে ঝুল মাপে না তার জার্নি বর্ণব্রহ্মের ভাঁজে ভাঁজে, বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে এইরকম ছুটতরাজ মেধাব্রহ্মের কবি প্রাণজি বসাক যার অত্যন্ত ম্যাসকুলিন ভাষাভাবনা, উত্তম চেতনাবোধআমার যতদূর জানা আছে, প্রাণজি তার নিজের কথা শুধু কবিতাতেই বলেছে তার কোন গ্রন্থে ব্যক্তিগত ভূমিকা নেই কবিতাতেই তার মিথ উৎসব, চিত্তজিজ্ঞাসা, আত্মরতির আলোড়নঅফুরান প্রাণশক্তির অধিকারী সে, শূন্য থেকে মহাবিশ্বের অধিকারী, প্রাণজি - যার কাছে জীবনের জ্বালা জুড়নো মলম মানেই কবিতা
গ্রন্থের শ্রীগণেশেই কবি প্রাণজি বসাকের কবিতা এবং তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থ নিয়ে ছয় পৃষ্ঠা জোড়া আলোচনা করলেন রবীন্দ্র গুহ - যা গ্রন্থটির নির্যাস যেমন ছড়িয়ে দিল পাঠকের মনমানসে তেমনি বাড়িয়ে দিল কবিতার অবয়বে সন্তরণের আকাঙ্ক্ষা
সদ্য কোভিড পরবর্তী সময়ের কাব্যগ্রন্থইউটিউব ও লালটিপপ্রাণজি বসাকের কুড়িতম কাব্যগ্রন্থ কবিতাবিশ্বে প্রাণজির সঘন প্রকাশ্য পদচারণা সহজে অনুমেয়। প্রাণজি ভৌগোলিক দূরত্বে আমাদের কাছের মানুষ। তাঁর এই ৮০ পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থে আছে মোট ৬৬ টি ‘এক পৃষ্ঠার’ কবিতা। আজকের ইউটিউব-এর পরতে পরতে যত কথা যত ভাবনা সবখানে যেন সেই লালটিপ এসে দেয় হানা। এ এক অভাবনীয় যাত্রাকথা, যুগ যুগান্তের এক সন্তরণ কথা -
থরে থরে সাজিয়ে রাখি অমূলক ভাবনাগুলো ...
যত্ন করে সাজিয়ে রাখি কথাগুলো
ফেঁসে আছে অমূলক প্রস্তাবিত প্রস্তাবে
 
আমার পকেটভর্তি রহস্য কথোপকথন
অথৈ জলের সন্তরণ
পদ্ম ফোটে নাভিকুণ্ড
দূরে ভাসে কীর্তনগান ......।
(কবিতা - রেওয়াজ কেন শেষ হয় না)।
এই প্রথম কবিতাটি থেকে শুরু করে শেষ অবধি শব্দবিন্যাস, ভাষা, পঙ্‌ক্তির অনবদ্য সব সজ্জায় সজ্জিত একেকটি কবিতা যেন ‘কাল থেকে আজ’-এর আত্মগাথা। লালটিপ ঘুরেফিরে আসে কবি মননে - যুদ্ধবেলায় -
একটা মায়া মায়া লাগে... একটা লালটিপ
কখনও ললাটে...... কখনও আয়নায়
একটা পুরোনো ওড়নায়
যাবতীয় বোধ সংকলন
রকমফের ছায়া আসে যায়
মৃতছায়াদের বিন্যাসে ঝড়ের অঙ্গীকার ......
আয়নার চিবুকে লালটিপ
পুরোনো ওড়নায় বাঁধা
এক অমোঘ সংসার যাবতীয় বোধে ......
(কবিতা দশ থেকে কুড়ি)।
এর বাইরেও আছে বহু কথা। এসেছে অতিমারী - বহু কবিতায়। সময়কে ধরে রাখার আন্তরিক আয়োজন। মারীবেলার অনর্নিহিত কথা ও ব্যথা -
করোনাকালে সবাই যেন বিধ্বস্ত ক্লান্ত
মানুষ সরিয়ে রাখে নিজেকেই নিজের ভেতর
কেউ আর সহজে খোলে না কপাট
দূরত্ববোধ সহজিয়া অপরাপর উঠোনে
 
ফেস্‌কভারে অন্তরিন মুখোশ বড়োই অসহায়
তোমাকে দেখেও দেখি না অন্ধ হয়ে থাকা
মুখে কথা নেই গান নেই - নেই বাংলা কবিতা ...
(কবিতা - আজকাল সাময়িকী)।
যুগন্ধর কবি আয়নায় দেখতে পান অবিরত বিমূঢ় নৈর্ব্যক্তিক যাত্রা। সময়ের কষ্টিপাথরে স্তরে স্তরে জমে ওঠে অন্ধকারের জনযাত্রার গাথা, স্মৃতিকথা। বিষয় বৈচিত্র্যে প্রসবিত হয় ভাবনার মোহজাল, কবিতার কথামালা -
এভাবে হাঁটতে হাঁটতে একদিন
প্রতিধ্বনিত হয় আপামর জনতার সংগ্রাম
 
তাহলে কোথায় তবে ধ্বনির উৎসমুখ
খুঁজতে খুঁজতে কতই না নতুন ঠিকানা
প্রতিরাতে খুলে যায়
বন্ধ খিড়কি তাবৎ মহল্লায়
 
ফিসফিস বার্তালাপ মহাজনের জীর্তন
হোমথিয়েটারে বেসুরো মহিমা কীর্তন ...
 
কোথাও কেউ নদী হয়
কোথাও আবার চর জেগে ওঠে
ধ্বনি প্রতিধ্বনি যৌথ উল্লাসে।
(কবিতা - উপনিবেশ)
কবির প্রয়াস - ‘অতীত নেই ভবিষ্যৎ নেই শুধু বর্তমান খেলা - তবু কখনো ডায়েরির পাতায় দু’চার বর্ণমালা’। ডায়েরির পাতার এই দু’চার বর্ণমালাই বলে দেয় জীবনের সারসত্য। যে সত্যের সন্ধানে কবির অবিরত যাত্রা - লালটিপ থেকে ইউটিউবের পথে কালান্তরের যাত্রা - সাথে ‘তোমার’ ও ‘আমাদের’ অনিঃশেষ পথ চলা।
আমাদের মধ্যেকার যে ভাষা
দৈনন্দিন ব্যবহারে একই
তাতে কোন সমস্যা নাই
 
আয়নার নিজস্ব অহংকার
নিজস্ব তার নিঃশব্দ ভাষা
উচ্চারণহীন সত্য ভাষণে
পা বাড়িয়ে কখনও জড়ায় না ...
 
যদি কেউ মন্থনপর্বে পুবে যায়
পশ্চিম তার কাছে বহুত দূর ...
 
পারিবারিক আয়নায় ভেসে ওঠে
প্রজন্মের ইউটিউব আর তোমার লালটিপ।
(কবিতা - ইউটিউব ও লালটিপ)।
ব্লার্বে আছে কবির কবিতার সংক্ষিপ্ত পরিচয়। শব্দ ও রূপের সিদ্ধিবিষয়ক বর্ণনা। গ্রন্থের প্রচ্ছদ নিঃসন্দেহে এক সম্পদ। শ্যামল জানা-র প্রচ্ছদ নামকরণের সঙ্গে যথার্থ সাযুজ্য বহন করে। ঝকঝকে প্রায়নির্ভুল ছাপাই, পঙ্‌ক্তিবিন্যাস গ্রন্থটিকে দিয়েছে এক অনবদ্য মর্যাদা। ব্লার্বে যদিও আছে - ‘রস সাহিত্যে বিষয়টা উপাদান, তার রূপটাই চরম’, তবু একটি গ্রন্থের - বিশেষ করে কাব্যগ্রন্থের ক্ষেত্রে বিষয়ানুগ বিন্যাসটিও যাথার্থ্যের আবেদন রাখে। এখানেও তাই কবিতার বিষয় অনুযায়ী বিন্যাসের ক্ষেত্রটিতে আরোও খানিকটা যত্নবান হওয়ার প্রয়োজনীয়তা ছিল বলে অনুভূত হয়।
কবি তাঁর এই মোহিনী মায়ার চাদরে বিন্যস্ত শবদকুহকের মায়াজালমণ্ডিত কাব্যগ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন - ‘কবি ও সাহিত্যিক শ্রী নির্মল ব্রহ্মচারী এবং শ্রীমতী কল্পনা ব্রহ্মচারী ওসলো, নরওয়ে’কে। প্রকাশক - লিপি প্রকাশন - পূর্ব মেদিনীপুর।
পাঠশেষে ব্যঞ্জনাময় শব্দমালারা অনুরণিত হয় ভাবকবির অপরূপ ভাষাবিন্যাসে -
ভাষার প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠে কবিতার শরীর
সারাদিন শব্দমালা ঘোরে অবাধ আনন্দে ……
আমি কুড়িয়ে তুলি অনন্ত স্পর্শ পঙ্‌ক্তি ভরে
আমাদের এই কালবেলিয়া জিপসীদের মতন
যাযাবর যাপনে অথবা নদীর কুলকুল স্রোতে
(কবিতা - ভাষার স্রোতে)।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘ইউটিউব ও লালটিপ’
প্রাণজি বসাক
মূল্য - ১২০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৩১০৭৩৬৪৮৪

Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...