Skip to main content

কাব্যধারার বৈচিত্র্যময় সংকলন - ‘পঞ্চনির্যাস’


প্রত্যেক কবির কাব্যসুষমায় - এমনকি - প্রতিটি কবিতারও এক আলাদা নির্যাস থাকে এখানে শৈলীর কথা বলা হচ্ছে না বলা হচ্ছে না কবিতার বিষয়ের কথাও কবিতার অন্দরে থাকে এক গভীর কাব্যময়তা যে কাব্যিকতার অনিঃশেষ ধারা তাই প্রতিটি কবিতার শরীর চুঁইয়ে পড়ে এক স্বতন্ত্র নির্যাস
পঞ্চনির্যাস’ - নামকরণটি তাই আক্ষরিক অর্থে কবিতার ক্ষেত্রে মানানসই না হলেও কবির ক্ষেত্রে একশো ভাগ সফল ভিন্ন ভিন্ন নির্যাসে বিন্যস্ত পাঁচজন কবির কাব্য সংকলন - পঞ্চনির্যাস বাংলার আধুনিকোত্তর কাব্য জগতে পরিচিত নাম পাপিয়া সাধুখাঁ এবং ভাস্বর দে। এই দুই কবির দশটি করে কবিতাগুচ্ছকে প্রথম ও শেষে রেখে মাঝে আরোও তিনজন কবির সমসংখ্যক কবিতার সমাহার এই সংকলন। প্রত্যেকের দশটি করে কবিতা থাকায় পাঠশেষে কবিদের কাব্যশৈলীর সাথে পাঠকের পরিচয় গড়ে ওঠে যথাযথ। শেষ প্রচ্ছদে কবিদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি সূত্রে উঠে আসে এক ব্যতিক্রমী তথ্য। বাংলা বিষয়ে আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও উচ্চশিক্ষিত এই পঞ্চকবি শুধু কবিতাকে ভালোবেসেই কবিতার আঙিনায় বিচরণ করছেন দৃপ্ত পদক্ষেপে। সংকলনটির সম্পাদক পাপিয়া সাধুখাঁ। স্পাইনে এমনটা থাকলেও মলাটে (প্রথম প্রচ্ছদে) ‘সম্পাদিকা’ বলে লিখা আছে। ব্লার্বে কবিদের আকাঙ্ক্ষার শব্দোচ্চারণ - ‘পঞ্চনির্যাস যৌথ কাব্যগ্রন্থটি আমাদের স্বপ্নপ্পূরণের পথ। এখানে আছে আবেগ, অনুভূতি, ইচ্ছের ডানায় ভর করে আগামীকে ছোঁয়ার আশা। প্রেম, বিরহ, পরিণতির মতো সুখানুভূতিগুলির পরিণত পন্থা। পাঠকের মনে ভাবনার তরঙ্গ বেয়ে এ সকল অনুভূতি যাবে বয়ে হৃদয়ের গহিনে।’ কোলকাতা বইমেলা ২০২২-এ প্রকাশিত এ সংকলন গ্রন্থের প্রকাশক সৌরভ বিশাই, নিবেদক শব্দ সাঁকো। ভিতরের বিস্তৃত কাব্যভাবনার প্রেক্ষাপটে প্রতীকী প্রচ্ছদ এঁকেছেন সন্তু কর্মকার।
অন্দরে প্রথম দশটি কবিতা সম্পাদক পাপিয়া সাধুখাঁর। স্মৃতি, অনুভব, নস্টালজিয়ার আবেশে লিখা কবিতাগুলি দাগ কাটে পাঠক মনে। কিছু কবিতায় ছন্দের ব্যবহারও লক্ষ্যণীয় -
বৃষ্টি নামুক বৃষ্টি নামুক
শহর জুড়ে বৃষ্টি নামুক।
অভিমান সব জমা পাথর
এবার তবে একটু ভিজুক। (কবিতা - বৃষ্টি নামুক)।
কিংবা -
কখনো বা আকাশ দেখি, আমার চোখে ফিকে রং...
সেই আকাশেই তোমার ঘুড়ি, সঙ্গী খোঁজে যখন তখন। (কবিতা - ব্যবধান)।
বিশেষ দু’টি কবিতা - অন্তহীনে, ঘুম।
এর পর আছে কবি পিয়ালী রায় কুণ্ডুর দশটি কবিতা। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির রূপ-রস-গন্ধের সাথে আশা-ভালোবাসার পাল্লা ভারী।
যদি এমনটি হতো...
প্রথম থেকে শুরু করি জীবন...
নতুন করে সাজাই জীবনের পাতা। (কবিতা - ইচ্ছেডানা)।
সারাটি দিনের মাঝে সোনালি ওই ক্ষণটুকু,
ফাগুন জাগায় মনে প্রাণে, লিখে যাব পূর্ণতার এক গল্প ... (কবিতা - পূর্ণতা পেতে চাই)।
বিশেষোল্লেখে থাকছে - অনুপম জোছনা, পশ্চিমী বারান্দা।
তৃতীয় পর্বের কবি আইভি ধর। আইভির কবিতায় অনুভব আর অনুভূতির প্রকাশ প্রোজ্জ্বল। কবিতায় শব্দের জাগলারি লক্ষ করার মতো। প্রথম দু’টি কবিতায় ‘নক্ষত্র’ শব্দের বহুল ব্যবহার কবি জীবনানন্দকে স্মরণ করায়।
একটা শব্দ রাখো,
জল ফড়িং-এর পিঠের উপর...
একটা স্বপ্ন আঁকো। (কবিতা - বুকের কাছে জ্বালিয়ে রাখো)
কথা রাখার কোনো ছিল না কথা...
জানতাম, কথারা থাকে না কোথাও। (কবিতা - হারিয়ে যায় কথা)।
বিশেষ লাগা দু’টি কবিতা - হঠাৎ এলে, আমাকে পেলাম।
পরবর্তী কবি সঙ্গীতা ব্যানার্জী। তাঁর কবিতায় ভিন ভাষার শব্দসমূহের বহুল ব্যবহার লক্ষ করা যায়। কাব্যময়তাকে ছাড়িয়ে গেছে সপাট শব্দের প্রক্ষেপণ। ছন্দ এসে ধরা দিয়েও যেন হারিয়ে যায়। বাস্তব শব্দেরা জেগে থাকে অতন্দ্র প্রহরীর মতো।
ভালোবাসার গন্ধতে শর্তের অসুখ ধরেছে !
রোজ ধোঁয়া ওঠা চায়ের চুমুক ডিপ্রেশন নামাচ্ছে,
রোজ খুন হচ্ছে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা। (কবিতা - বেকার জীবনী)।
মৃত্যু থেকে বিচরণ... 
তার আঙ্গিকে আঙ্গিকে ভাষা,
আশ্রয় থেকে প্রতিবাদ;
প্রেম থেকে হিংস্রতা। (কবিতা - ভাষার কুর্নিশ)।
উল্লেখনীয় কবিতার মধ্যে আছে - অন্য প্রেম, শীতল পরাগ।
শেষ পর্বের কবি ভাস্বর দে। প্রকৃতি আর স্বপ্নময়তা ফুটে উঠেছে তাঁর অধিকাংশ কবিতায়। ‘মোর’, ‘মোরা’, ‘ছিলেম’, ‘ফুরায়ে’ জাতীয় আধুনিক কবিতায় সচরাচর অব্যবহৃত কিছু কাব্যিক শব্দ বহুল ব্যবহৃত হয়েছে তাঁর কবিতাগুলিতে। ছন্দে, শব্দে কিছু ঘোর লাগা কবিতা কবির সম্পদ।
সাদা মেঘে ভেসে কোন বলাকায়
কীসের খবর ছড়ায় নীলে
আবছায়া মন খুশির ফাগুন
আবেশ ছড়ায় পলাশ ফুলে ...... (কবিতা - মন)।
পথে পথে যেতে কোন সংকেতে
ডাকে দিগন্তের নীলাকাশ ...
... কত ভুল ভাঙলে হয় রাগিনী ?
সেই ভেবে ভেবে আমি হয়েছি উদাস।। (কবিতা - নাগপাশ)।
বিশেষ দু’টি কবিতা - ফুলবামা, স্বপ্ন।
নিখুঁত অক্ষর, শব্দ ও পঙ্‌ক্তি বিন্যাস। বানান ভুলের আধিক্য পরিলক্ষিত হলেও সব মিলিয়ে এক বৈচিত্র্যময় সংকলন। ঘন ঘন রূপান্তরিত নির্যাসে পঠনসুখের সংকলন - ‘পঞ্চনির্যাস’।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।

‘পঞ্চনির্যাস’  
সম্পাদক - পাপিয়া সাধুখাঁ
মূল্য - ১২০ টাকা
যোগাযোগ - ৯০৯১৪৯৮৭২৪

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...