Skip to main content

মনোমোহন মিশ্রের ‘কুসুমলতা’ - একটি সুপাঠ্য উপন্যাস


দিনকাল পাল্টেছে অনেকখানি নারী নির্যাতনের ধারাবাহিক আখ্যান - সেই সতীদাহ, সহমরণ, বাল্যবিবাহ, বৈধব্যযন্ত্রণার করাল সব অধ্যায় পেরিয়ে আজকের সমাজ এগিয়ে গেছে বহু দূর বহুলাংশে পেরিয়ে এসেছে অন্ধবিশ্বাস ও কুসংস্কারের অভেদ্য বেড়াজাল পথ হয়তো শেষ হয়নি এখনও তবু পথ চলা চলছে নিরন্তর এই উত্তরণের পথ চলার লক্ষ্য তখনই ভেদ করা সম্ভব যখন অতীতের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করা যায় পীড়া তাই অতীতকে জানতে হয় অতীত অজানা থাকলে ভবিষ্যৎ অধরা থেকে যায়
বাংলা সাহিত্যে বৈধব্যযন্ত্রণা এবং তখনকার দিনে বাঙ্গালার গোঁড়া সমাজ ব্যবস্থার ফলস্বরূপ রিক্ত, নিঃস্ব, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত অকাল বিধবাদের কাশীবাসী হওয়ার করুণ কাহিনি লিপিবদ্ধ হয়েছে এন্তার ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী, ‘পল্লীসমাজ’-এর রমা সেই অসহায়তার শিকার। আরোও আছে অজস্র। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল কার্যকারণ অভিন্ন যদিও প্রেক্ষাপট ছিল বিচিত্র। অসহায়তার কারণ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত। বাংলার গোঁড়া সমাজব্যবস্থার বলি হওয়া অগণিত অকালবিধবাদের একমাত্র ভরসা ছিল কাশী। মানসিক, সামাজিক নির্যাতনের চরমে পৌঁছে তাঁদের মুখে উচ্চারিত হতো সেই অমোঘ বাক্য - ‘আমি কাশী যাব’। কেমন ছিল তাঁদের কাশীবাস ? আলো-আঁধারির কত গাথা যে লুকিয়ে আছে কাশীর ‘বাঙালিটোলা’র অন্দরে।
সেই অতীত ইতিহাসের সূত্র ধরেই সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক মনোমোহন মিশ্রের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কুসুমলতা’। প্রকাশক ‘পান্থজন প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন, শিলচর’। মনোমোহনের প্রথম উপন্যাস ‘মিঠে রোদ্দুর’-এর মতোই ‘কুসুমলতা’র বুনোটও টানটান এবং পাঠককে ধরে রাখে আগাগোড়া। ঘটনাক্রমের বিন্যাসও আকর্ষণীয়। প্রথম পর্বে অকালবিধবা কুসুমলতার কাশী আগমন ও প্রাথমিক স্থিতির এক আভাস দিয়ে দ্বিতীয় পর্ব থেকে শুরু হয়েছে মূল কাহিনী। পটভূমি আজ থেকে সওয়াশো বছর আগেকার অবিভক্ত ভারতের বৃহত্তর বাংলার জনজীবন। অঞ্চল বিয়ানিবাজার। ‘কৃতজ্ঞতা স্বীকার’ অংশে লেখক লিখছেন - ‘... শত-শত নাবালিকা অকাল বৈধব্যের বোঝা সারা জীবন বয়ে বেড়িয়েছেনতেমনই এক দুর্ভাগা গৃহবধূর ‘লক্ষ্মী’ থেকে ‘অলক্ষ্মী’র তকমা পরে যন্ত্রণার দিনলিপি কেমন হতে পারে তা কল্পনায় রেখে এই উপন্যাসটি লেখা...।’ স্থান ও কাল-এর নির্দিষ্ট পরিমাপে গ্রথিত এই উপন্যাসে কাহিনিও এগিয়েছে যথেষ্ট ধারাবাহিকতা বজায় রেখে। কুসুমলতার বালিকাবেলা থেকে শুরু করে পরিণত হওয়ার যাত্রাপথে একদিকে যেমন চিত্রিত হয়েছে ঘটনা-দুর্ঘটনার বিন্যস্ত বর্ণনা, অন্যদিকে পারিপার্শ্বিক সমাজ ব্যবস্থার এক নিটোল চিত্রও ফুটে উঠেছে উপন্যাস জুড়ে। এবং এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে উপন্যাসকারের মুনশিয়ানা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি চরিত্র যেন অতি আবশ্যক। কোথাও বাহুল্য নেই। চরিত্রগুলো মূর্ত হয়ে উঠেছে আপন কার্যকলাপে, প্রত্যাশিত সংলাপে। কাহিনির মূল চরিত্র কুসুমলতা হলেও উপন্যাসজোড়া সব চরিত্রই যেন অপরিহার্য। বিশেষ ভাবে প্রতিটি নারী চরিত্র যেন তৎকালীন সমাজের এক একটি টিপিক্যাল মুখ হিসেবে উঠে এসেছে উপন্যাসে। উপন্যাসটি শুধুমাত্র বিধবাদের নিয়েই নয়, যেন সমকালীন নারীদের নিয়েও লিখা হয়েছে। তখনকার সময়-সমাজে নারীর ভূমিকা, নারীর অবস্থানকেও ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক যথাযথভাবে। চরিত্র চিত্রণে লেখক সর্বাংশেই সফল।
উপন্যাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সামাজিক রীতিনীতির এক অনবদ্য চিত্র সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। বাংলার হারিয়ে যাওয়া গীত-সংগীত, ব্রত-উপচার, যেমন - সই পাতানো, মাঘমণ্ডল ব্রতের বিস্তারিত বর্ণনা, নিমাই সন্যাস পালার অংশবিশেষ ইত্যাদি। সময়-সমাজকে ধরে রাখার প্রয়াসে এসব উল্লেখ নিশ্চিতভাবেই এক অসাধারণ সংযোজন যা উপন্যাসটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে যথার্থ মর্যাদায়।
কুসুমলতা চরিত্রের বিভিন্ন দিক ঔপন্যাসিকের কলমে উদ্ঘাটিত হয়েছে সাবলীল চরিত্রায়নে। স্বামীর অকালমৃত্যুতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া আদুরে বালিকা কুসুম সমাজের, পরিবারের অনাদরে, অবজ্ঞায় দৃঢ়চেতা হয়ে ওঠে একসময়। বিধবা পিসিকে বলে - ‘পিসিমা গো, কপালে কী আছে জানি না। তবে হার মানব না। বাবা এ কথা শিখিয়েছে। ... ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে ভালো লাগে না। ... আমি কাশীতেই যাব পিসিমা। কত পুণ্যস্থান ... আমাদের মতো হতভাগীদের আশ্রয়স্থলও। আমি আর দেশে ফিরব না পিসি - কাশীতেই বিশ্বনাথের পায়ে ঠাঁই নেব। ... সংসারের কোনও সুখ আমার ভাগ্যে লেখা নেই। তাই সংসারের মোহ ত্যাগ করতেই হবে আমাকে। বাবা ফিরিয়ে নিতে এলেও আমি তাই করব। আমি কাশীবাসিনী হব পিসিমা। আমাকে যেতে দিও।’
এর পর দাদা শৈলেনের হাত ধরে কুসুমলতার কাশীযাত্রা এবং সারা উপন্যাস জুড়ে কুসুমলতার জীবনযুদ্ধের কাহিনি। ঘাত-প্রতিঘাত এবং একাধিক সজ্জন চরিত্রের হাত ধরে জীবনযাত্রার এক অভাবনীয় মোড়। কুসুমলতা কি শেষ অবধি কুসুমলতা হয়ে রইল ? এই প্রশ্নের উত্তর বিন্যস্ত উপস্থাপনায় গ্রন্থিত হয়ে রইল উপন্যাসের শেষ পর্বে।
লেখক এই উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘ঠানদিদি স্বর্গীয় অতুল সুন্দরী দেবী-র স্মৃতির উদ্দেশে’। মোট ১১৮ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত এই উপন্যাসের প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ সৌজন্যে অনির্বাণ ভট্টাচার্য। পৃষ্ঠাসংখ্যা আরোও বেশি হতে পারত। বলা ভালো আরোও একটু বিস্তৃত হওয়াটাই বাঞ্ছনীয় ছিল। পুরো উপন্যাসের যে বিস্তৃতি সেই হিসেবে শেষটাও তেমনই হতেই পারত। উপন্যাসের অন্তিম পর্যায়ে কিছু উল্লেখনীয় ঘটনাকে আরোও বিস্তৃত করে উপস্থাপন করলে হয়তো বোদ্ধা পাঠকের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু আজকের দিনে বাংলা গ্রন্থাদি পঠনের যে চালচিত্র সেখানে ১১৮ পৃষ্ঠার বেশি উপন্যাস আঞ্চলিক পাঠকসমাজে কতটুক গ্রহণযোগ্য হবে - সম্ভবত সেই দিকটি মাথায় রেখেই ঔপন্যাসিক উপন্যাসের সমাপ্তিরেখা টেনেছেন বিস্তৃতি নয়, কাহিনিকে গুরুত্ব দিয়ে - যদিও উপন্যাসের সুখপঠনে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি এতটুকুও। এই পাঠকমনষ্কতাও এ সামাজিক উপন্যাসটির এক ব্যতিক্রমী চিন্তার ফসল
স্পষ্ট বাঁধাই, ছাপাই ও যথাযথ অক্ষর, শব্দ এবং বাক্যবিন্যাস পাঠকমনে জাগিয়ে তুলে পঠনস্পৃহা। কিছু বানান/ছাপার ভুল রয়েই গেছে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশকের দৃষ্টি এড়িয়ে। তবে সংখ্যায় তা নগণ্যই বলা যায়।
বাংলা সাহিত্যের এই বিশেষ ভুবনে একটি উপন্যাসের জন্ম এক একটি মাইলফলক হয়ে থেকে যায় নিশ্চিতই। সেই অর্থে ‘কুসুমলতা’ও এক উল্লেখযোগ্য পাঠযোগ্য উপন্যাস। প্রেক্ষাপট, কাহিনি, বিস্তৃতি এবং বিন্যাসে যা অতি অবশ্যই পাঠকসমাজে সমাদৃত হওয়ার দাবি রাখে।

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘কুসুমলতা’
মনোমোহন মিশ্র
মূল্য - ২৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯০৮৫২১৩০৭৫

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...