দিনকাল পাল্টেছে অনেকখানি। নারী নির্যাতনের ধারাবাহিক আখ্যান - সেই সতীদাহ,
সহমরণ, বাল্যবিবাহ, বৈধব্যযন্ত্রণার
করাল সব অধ্যায় পেরিয়ে আজকের সমাজ এগিয়ে গেছে বহু দূর। বহুলাংশে পেরিয়ে এসেছে অন্ধবিশ্বাস
ও কুসংস্কারের অভেদ্য বেড়াজাল। পথ হয়তো শেষ হয়নি এখনও তবু পথ চলা চলছে নিরন্তর। এই উত্তরণের পথ চলার লক্ষ্য
তখনই ভেদ করা সম্ভব যখন অতীতের দিকে তাকিয়ে অনুধাবন করা যায় পীড়া। তাই অতীতকে জানতে হয়। অতীত অজানা থাকলে ভবিষ্যৎ অধরা থেকে
যায়।
বাংলা সাহিত্যে বৈধব্যযন্ত্রণা এবং তখনকার দিনে বাঙ্গালার গোঁড়া সমাজ ব্যবস্থার ফলস্বরূপ রিক্ত, নিঃস্ব, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত অকাল বিধবাদের কাশীবাসী হওয়ার করুণ কাহিনি লিপিবদ্ধ হয়েছে এন্তার। ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী, ‘পল্লীসমাজ’-এর রমা সেই অসহায়তার শিকার। আরোও আছে অজস্র। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল কার্যকারণ অভিন্ন যদিও প্রেক্ষাপট ছিল বিচিত্র। অসহায়তার কারণ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত। বাংলার গোঁড়া সমাজব্যবস্থার বলি হওয়া অগণিত অকালবিধবাদের একমাত্র ভরসা ছিল কাশী। মানসিক, সামাজিক নির্যাতনের চরমে পৌঁছে তাঁদের মুখে উচ্চারিত হতো সেই অমোঘ বাক্য - ‘আমি কাশী যাব’। কেমন ছিল তাঁদের কাশীবাস ? আলো-আঁধারির কত গাথা যে লুকিয়ে আছে কাশীর ‘বাঙালিটোলা’র অন্দরে।
সেই অতীত ইতিহাসের সূত্র ধরেই
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক মনোমোহন মিশ্রের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘কুসুমলতা’।
প্রকাশক ‘পান্থজন প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন, শিলচর’। মনোমোহনের প্রথম উপন্যাস
‘মিঠে রোদ্দুর’-এর মতোই ‘কুসুমলতা’র বুনোটও টানটান এবং পাঠককে ধরে রাখে আগাগোড়া।
ঘটনাক্রমের বিন্যাসও আকর্ষণীয়। প্রথম পর্বে অকালবিধবা কুসুমলতার কাশী আগমন ও
প্রাথমিক স্থিতির এক আভাস দিয়ে দ্বিতীয় পর্ব থেকে শুরু হয়েছে মূল কাহিনী। পটভূমি আজ
থেকে সওয়াশো বছর আগেকার অবিভক্ত ভারতের বৃহত্তর বাংলার জনজীবন। অঞ্চল বিয়ানিবাজার।
‘কৃতজ্ঞতা স্বীকার’ অংশে লেখক লিখছেন - ‘... শত-শত নাবালিকা অকাল বৈধব্যের বোঝা
সারা জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন। তেমনই
এক দুর্ভাগা গৃহবধূর ‘লক্ষ্মী’ থেকে ‘অলক্ষ্মী’র তকমা পরে যন্ত্রণার দিনলিপি কেমন হতে পারে
তা কল্পনায় রেখে এই উপন্যাসটি লেখা...।’ স্থান ও কাল-এর নির্দিষ্ট পরিমাপে গ্রথিত
এই উপন্যাসে কাহিনিও এগিয়েছে যথেষ্ট ধারাবাহিকতা বজায় রেখে। কুসুমলতার বালিকাবেলা
থেকে শুরু করে পরিণত হওয়ার যাত্রাপথে একদিকে যেমন চিত্রিত হয়েছে ঘটনা-দুর্ঘটনার
বিন্যস্ত বর্ণনা, অন্যদিকে পারিপার্শ্বিক সমাজ ব্যবস্থার এক নিটোল চিত্রও ফুটে
উঠেছে উপন্যাস জুড়ে। এবং এই বিশেষ ক্ষেত্রটিতে উপন্যাসকারের মুনশিয়ানা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য।
প্রতিটি চরিত্র যেন অতি আবশ্যক। কোথাও বাহুল্য নেই। চরিত্রগুলো মূর্ত হয়ে উঠেছে
আপন কার্যকলাপে, প্রত্যাশিত সংলাপে। কাহিনির মূল চরিত্র কুসুমলতা হলেও
উপন্যাসজোড়া সব চরিত্রই যেন অপরিহার্য। বিশেষ ভাবে প্রতিটি নারী চরিত্র যেন
তৎকালীন সমাজের এক একটি টিপিক্যাল মুখ হিসেবে উঠে এসেছে উপন্যাসে। উপন্যাসটি
শুধুমাত্র বিধবাদের নিয়েই নয়, যেন সমকালীন নারীদের নিয়েও লিখা হয়েছে। তখনকার
সময়-সমাজে নারীর ভূমিকা, নারীর অবস্থানকেও ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক যথাযথভাবে। চরিত্র
চিত্রণে লেখক সর্বাংশেই সফল।
উপন্যাসের বিভিন্ন পর্যায়ে সামাজিক
রীতিনীতির এক অনবদ্য চিত্র সন্নিবিষ্ট করা হয়েছে। বাংলার হারিয়ে যাওয়া গীত-সংগীত,
ব্রত-উপচার, যেমন - সই পাতানো, মাঘমণ্ডল ব্রতের বিস্তারিত বর্ণনা, নিমাই সন্যাস
পালার অংশবিশেষ ইত্যাদি। সময়-সমাজকে ধরে রাখার প্রয়াসে এসব উল্লেখ নিশ্চিতভাবেই এক
অসাধারণ সংযোজন যা উপন্যাসটিকে প্রতিষ্ঠিত করেছে যথার্থ মর্যাদায়।
কুসুমলতা চরিত্রের বিভিন্ন দিক ঔপন্যাসিকের কলমে উদ্ঘাটিত হয়েছে সাবলীল চরিত্রায়নে। স্বামীর অকালমৃত্যুতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া আদুরে বালিকা কুসুম সমাজের, পরিবারের অনাদরে, অবজ্ঞায় দৃঢ়চেতা হয়ে ওঠে একসময়। বিধবা পিসিকে বলে - ‘পিসিমা গো, কপালে কী আছে জানি না। তবে হার মানব না। বাবা এ কথা শিখিয়েছে। ... ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে ভালো লাগে না। ... আমি কাশীতেই যাব পিসিমা। কত পুণ্যস্থান ... আমাদের মতো হতভাগীদের আশ্রয়স্থলও। আমি আর দেশে ফিরব না পিসি - কাশীতেই বিশ্বনাথের পায়ে ঠাঁই নেব। ... সংসারের কোনও সুখ আমার ভাগ্যে লেখা নেই। তাই সংসারের মোহ ত্যাগ করতেই হবে আমাকে। বাবা ফিরিয়ে নিতে এলেও আমি তাই করব। আমি কাশীবাসিনী হব পিসিমা। আমাকে যেতে দিও।’
এর পর দাদা শৈলেনের হাত ধরে কুসুমলতার কাশীযাত্রা
এবং সারা উপন্যাস জুড়ে কুসুমলতার জীবনযুদ্ধের কাহিনি। ঘাত-প্রতিঘাত
এবং একাধিক সজ্জন চরিত্রের হাত ধরে জীবনযাত্রার এক অভাবনীয় মোড়। কুসুমলতা কি শেষ
অবধি কুসুমলতা হয়ে রইল ? এই প্রশ্নের উত্তর বিন্যস্ত উপস্থাপনায় গ্রন্থিত হয়ে রইল
উপন্যাসের শেষ পর্বে।
লেখক এই উপন্যাসটি উৎসর্গ করেছেন
তাঁর ‘ঠানদিদি স্বর্গীয় অতুল সুন্দরী দেবী-র স্মৃতির উদ্দেশে’। মোট ১১৮ পৃষ্ঠায়
সমাপ্ত এই উপন্যাসের প্রাসঙ্গিক প্রচ্ছদ সৌজন্যে অনির্বাণ ভট্টাচার্য।
পৃষ্ঠাসংখ্যা আরোও বেশি হতে পারত। বলা ভালো আরোও একটু বিস্তৃত হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়
ছিল। পুরো উপন্যাসের যে বিস্তৃতি সেই হিসেবে শেষটাও তেমনই হতেই পারত। উপন্যাসের অন্তিম পর্যায়ে কিছু উল্লেখনীয় ঘটনাকে আরোও বিস্তৃত করে উপস্থাপন
করলে হয়তো বোদ্ধা পাঠকের কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য হতো। কিন্তু আজকের দিনে
বাংলা গ্রন্থাদি পঠনের যে চালচিত্র সেখানে ১১৮ পৃষ্ঠার বেশি উপন্যাস
আঞ্চলিক পাঠকসমাজে কতটুক গ্রহণযোগ্য হবে - সম্ভবত সেই দিকটি মাথায় রেখেই ঔপন্যাসিক
উপন্যাসের সমাপ্তিরেখা টেনেছেন বিস্তৃতি নয়, কাহিনিকে গুরুত্ব দিয়ে - যদিও
উপন্যাসের সুখপঠনে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়নি এতটুকুও। এই পাঠকমনষ্কতাও এই সামাজিক উপন্যাসটির এক ব্যতিক্রমী চিন্তার ফসল।
স্পষ্ট বাঁধাই, ছাপাই ও যথাযথ
অক্ষর, শব্দ এবং বাক্যবিন্যাস পাঠকমনে জাগিয়ে তুলে পঠনস্পৃহা। কিছু বানান/ছাপার
ভুল রয়েই গেছে অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশকের দৃষ্টি এড়িয়ে। তবে সংখ্যায় তা নগণ্যই বলা
যায়।
বাংলা সাহিত্যের এই বিশেষ ভুবনে একটি উপন্যাসের জন্ম এক একটি মাইলফলক হয়ে থেকে যায় নিশ্চিতই। সেই অর্থে ‘কুসুমলতা’ও এক উল্লেখযোগ্য পাঠযোগ্য উপন্যাস। প্রেক্ষাপট, কাহিনি, বিস্তৃতি এবং বিন্যাসে যা অতি অবশ্যই পাঠকসমাজে সমাদৃত হওয়ার দাবি রাখে।
বাংলা সাহিত্যে বৈধব্যযন্ত্রণা এবং তখনকার দিনে বাঙ্গালার গোঁড়া সমাজ ব্যবস্থার ফলস্বরূপ রিক্ত, নিঃস্ব, মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত অকাল বিধবাদের কাশীবাসী হওয়ার করুণ কাহিনি লিপিবদ্ধ হয়েছে এন্তার। ‘চোখের বালি’র বিনোদিনী, ‘পল্লীসমাজ’-এর রমা সেই অসহায়তার শিকার। আরোও আছে অজস্র। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল কার্যকারণ অভিন্ন যদিও প্রেক্ষাপট ছিল বিচিত্র। অসহায়তার কারণ ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে রচিত। বাংলার গোঁড়া সমাজব্যবস্থার বলি হওয়া অগণিত অকালবিধবাদের একমাত্র ভরসা ছিল কাশী। মানসিক, সামাজিক নির্যাতনের চরমে পৌঁছে তাঁদের মুখে উচ্চারিত হতো সেই অমোঘ বাক্য - ‘আমি কাশী যাব’। কেমন ছিল তাঁদের কাশীবাস ? আলো-আঁধারির কত গাথা যে লুকিয়ে আছে কাশীর ‘বাঙালিটোলা’র অন্দরে।
কুসুমলতা চরিত্রের বিভিন্ন দিক ঔপন্যাসিকের কলমে উদ্ঘাটিত হয়েছে সাবলীল চরিত্রায়নে। স্বামীর অকালমৃত্যুতে দোষী সাব্যস্ত হওয়া আদুরে বালিকা কুসুম সমাজের, পরিবারের অনাদরে, অবজ্ঞায় দৃঢ়চেতা হয়ে ওঠে একসময়। বিধবা পিসিকে বলে - ‘পিসিমা গো, কপালে কী আছে জানি না। তবে হার মানব না। বাবা এ কথা শিখিয়েছে। ... ভবিষ্যতের কথাও ভাবতে ভালো লাগে না। ... আমি কাশীতেই যাব পিসিমা। কত পুণ্যস্থান ... আমাদের মতো হতভাগীদের আশ্রয়স্থলও। আমি আর দেশে ফিরব না পিসি - কাশীতেই বিশ্বনাথের পায়ে ঠাঁই নেব। ... সংসারের কোনও সুখ আমার ভাগ্যে লেখা নেই। তাই সংসারের মোহ ত্যাগ করতেই হবে আমাকে। বাবা ফিরিয়ে নিতে এলেও আমি তাই করব। আমি কাশীবাসিনী হব পিসিমা। আমাকে যেতে দিও।’
বাংলা সাহিত্যের এই বিশেষ ভুবনে একটি উপন্যাসের জন্ম এক একটি মাইলফলক হয়ে থেকে যায় নিশ্চিতই। সেই অর্থে ‘কুসুমলতা’ও এক উল্লেখযোগ্য পাঠযোগ্য উপন্যাস। প্রেক্ষাপট, কাহিনি, বিস্তৃতি এবং বিন্যাসে যা অতি অবশ্যই পাঠকসমাজে সমাদৃত হওয়ার দাবি রাখে।
- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী।
‘কুসুমলতা’
মনোমোহন মিশ্র
মূল্য - ২৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯০৮৫২১৩০৭৫
মনোমোহন মিশ্র
মূল্য - ২৫০ টাকা
যোগাযোগ - ৯০৮৫২১৩০৭৫

Comments
Post a Comment