Skip to main content

সোনা কথা

রিমলির কথা
এক সেই বালিকা বেলা আর এক আজ আকাশ পাতাল ফারাক
মা ডাকতেন - রিমলি মা … , বাবাও
তেমনি একদিন বাবা ডাকলেন - অফিস থেকে এসে। তখন আমি সবে শাড়িটি পরাতে শুরু করেছি টিকলিকে বাবা সদ্য কিনে এনেছেন টিকলিকে কিন্তু টিকলির শাড়িটি আমার একদমই পছন্দ নয় পুতুলওয়ালাদের সত্যি পছন্দ বলতে কিছুই নেই বদলে আনতে বলব বাবাকে ? কিন্তু টিকলির নাক, মুখ আর চোখ দুটি এত সুন্দর যে হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করছে না সুতরাং চুপ মেরে রইলাম কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে বাবা একটু মুষড়ে গেলেন বোধ করি -
- কী রে রিমলি মা, পছন্দ হয়নি ? বদলে আনব ?
এক মুহূর্ত, হয়তো শেষবারের মতো সিদ্ধান্তের পুনর্বিবেচনার জন্য এক পলকের নীরবতা। আর তারপরই - ভিতরে যতটা সম্ভব উচ্ছ্বাস এনে -
- না না, ঠিক আছে। কী সুন্দর ...। বলতে বলতে মুখে চোখে ঠিকরে এল হাসি - স্বাভাবিক ছন্দেই। নিশ্চিন্ত হলেন বাবা। কিন্তু আমার হিসেবি মায়ের সব কথাতে একটা কিছু বলতেই হয় -
- আবার পুতুল এনেছ ? আলমারিতে আর জায়গাই হবে না যে।
শুনে গা জ্বলে যায় আমার। ওরা সবাই আমার কত আপন সে কথাটি মা বুঝতে চায় না কেন ? মা আর আমাকে কতটুকু সঙ্গ দেয় ? বাবা তো সকাল থেকে সন্ধে ঘরেই থাকে না। কার সাথে আমি থাকি ? এই টিকলি, ঝিমলি, মৌ, টুসী এরা - এরাই তো আমার সঙ্গী। আর হয়েছেও এক একটি। রোজ ওদেরও আমার সঙ্গ চাই। আমি আর রোজ রোজ সবাইকে কী করে সঙ্গ দিই ? এত সময় আমারই বা কোথায় ? আজ ক’দিন ধরে ইস্কুলটা বন্ধ বলেই না পারছি ওদের একটু যত্নআত্তি করতে। নাহলে তো আমারও হাতে সময় নেই এতটুকুমা দেখে সব। তবু বুঝতে চায় না কেন জানি না বাপু। আর সব সময় জ্বালাতে থাকে আমাকে। এটা কর, ওটা করবি না। এভাবে কর, ওভাবে করবি না। আমার কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায় সবকিছু। কী করব, কেমন করে করব - ভেবেচিন্তে করতে গিয়েও হামেশা উল্টোটাই করে ফেলি। ব্যস্‌, মায়ের বকুনি আর চোখ রাঙানি। অসহ্যকর। বিরিক্তিকর।
বাবা আবার ঠিক উল্টো। বিন্দাস থাকে। কোনকিছুতেই বাড়াবাড়ি নেই। ফলে বাবার ভাগ্যেও মায়ের কিছু বিষম কথা জোটে।
- আর তুমিও, মেয়েটা গোল্লায় গেলেও তোমার ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি আর পারি না বাপু ঘরদোর সামলে তোমার এই অবুঝ মেয়েটিকে সামলাতে। তোমার লাই পেয়ে পেয়ে মাথায় উঠছে মেয়ে। পরে কিন্তু সামলাতে হিমশিম খেতে হবে এই বলে দিচ্ছি।
বাবা কিছুক্ষণের জন্য বোবা হয়ে যায়। মা সরে গেলেই আমার দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। আমি বুঝি - বাবার এই চোখ রাঙানি আসলে আগ্নেয়গিরি থেকে হাসির লাভা বিচ্ছুরণের প্রাক্‌মুহূর্ত। কিন্তু মা যে ওই ‘অবুঝ’ কথাটি বলল আমাকে সেই তখন থেকেই মনটা আমার খারাপ হয়ে গেল। মা কী ভাবে ? আমি কি বুঝি না কিছুই ? আমি সব বুঝি। মায়ের সারাদিনের কষ্টটাও আমি বুঝি। কিন্তু আমি কী করব ? এত বড় বড় কাজ মা করে। আমি কি আর তা পারব ? আর আমার তো সময়ই নেই। সারাদিন কত কাজ। ইস্কুল, পড়াশোনা এসব সামলে এর পর ওদের জন্য কত কিছু করতে হয়। সবক’টা ভীষণ দুষ্টু। ভালো করে খেয়াল না করলেই ওরা রাগ করে, কথা বলতে চায় না। কাপড়জামা সব ক’দিন পরপরই ঠিকঠাক করে দিতে হয়। আসলে আমার এসব না করলে নিজেরই ভালো লাগে না। এই যে এত কাজ, মা তো এসব বোঝে না।
কিন্তু মা অনেক কিছুই বোঝে। আমার কখন কী চাই, কী দরকার সব জানে মা। তাই তো এত কথার ফাঁকেও আমার যত্ন নিতে ভুলে না। রাতে মা’কে কাছে না পেলে আমার ঘুম আসে না। মাথায়, চুলে হাত বুলিয়ে মা বলে - ‘সোনা মা আমার, এখন ঘুমোও’। আমার ঘুম এসে যায়। মায়ের মুখে এই ‘সোনা মা’ সম্বোধনটি শুনলেই আমার মন কেমন গলে যায়। এত মিষ্টি, এত আদর।
কিছু করতে গেলে মা যদি বলে - ‘রিমলি, এদিকে আয় তো মা, আমাকে একটু সাহায্য কর‘ - তাহলে আমার ইচ্ছে করে না যেতে। না গেলেই বকুনি। তাও যেতে ইচ্ছে করে না। অথচ সেই মা-ই যখন বলে - ‘সোনা মা আমার, আয় না বলছি’ - আমার ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। কী যে এক আকর্ষণ আমার এই ‘সোনা’ শব্দটিতে তা বিধাতাই জানেন। আর শুধু ‘সোনা’ শব্দেই কেন, সোনার সব কিছুতেই আমার কেমন যেন এক ভালো লাগা। আমিই কি তবে সোহাগা ? মায়ের গলায় সরু সোনার হারটির দিকে আমি তাকিয়ে থাকি অপলক। কী অপরূপা যে লাগে আমার মা’কে। আমার নিজেরও আছে সোনার দু’টি চূড়ি আর কয়েক জোড়া কানের দুল। মা যত্ন করে আলমারিতে গুছিয়ে রেখেছে। কোথাও বাইরে বেরোতে হলে পরিয়ে দেয়। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি আয়নায়। উদগ্রীব হয়ে থাকি ওগুলো পরে বাইরে বেরোতে। মাঝে মাঝে ভাবি - ইস্‌ আমার মৌ, টিকলিদেরও যদি এমন কিছু সোনার গয়না থাকত। তাহলে সাজাতাম খুব করে ওদের। দেখতে কী যে ভালো লাগত। একদিন বাইরে থেকে এসে দরজা ভেজিয়ে বসে টুসির দুই কানের নিচে ধরে রেখেছিলাম আমার কানের দুলজোড়া। দেখে দেখে আর আশ মেটে না। টুসিও ভীষণ খুশি। হাসি যেন উপচে পড়ে মুখ বেয়ে। আমি তাকিয়েই আছি পলকহীন। হঠাৎ মায়ের ডাকে ঘোর ভাঙে। সত্যি কী যে মায়া সোনার। বাবার কাছে নালিশ করলেও বাইরের মানুষের কাছে আমাকে দেখিয়ে মা’কে বলতে শুনেছি - ‘আমার সোনার মেয়ে’। সত্যি আমি সোনার মেয়ে হয়ে সেই বালিকা বেলাতেই থাকতে চেয়েছিলাম আজীবন
###
কিন্তু দিনগুলি কি আর জীবনভর সোনার খাঁচায় থাকে ? আমারও বাড়ল বয়স আর সাথে বয়সের সাথে পাল্লা দিয়ে বড় হয়ে ওঠা। একদিন আমি অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম আমার আর সোনার গয়না পরার ফুরসৎ নেই এখন। জীবন সংগ্রামের ব্যস্তমুখর দিনযাপনে প্রসাধনের সময় বের করাই যেখানে দুষ্কর সেখানে স্বর্ণখচিত হওয়ার কোথায় আর অবসর। ছুটছি আমি। ছুটছি ক্যারিয়ারের নেশায়। ছুটছি আপন সংসার গড়ার অলিখিত নির্দেশে। এতদিনে বুঝতে পেরছি যে, যে সংসারে থেকে মা-বাবার ছত্রছায়ায় শখ আহ্লাদকে সঙ্গে নিয়ে, একরাশ অপরিপক্ক স্বপ্নকে মননে আগলে রেখে বেড়ে উঠেছি খেলার ছলে - এ আমার নিতান্তই এক খেলাঘর। আমার আপন সংসার নয় এ। ভেঙে পড়তে পড়তে মেনে নিয়েছি জীবনের সারসত্য। মা বলেছিল সব। নিজের জীবনের কাহিনি শুনিয়েছিল আমাকে কাছে বসিয়ে। কাহিনি শেষে আঁচলে মুছেছিল চোখ।
একদিন আমাদের অবাক করে দিয়ে বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে - আচমকা, বিনা নোটিশেএমনও হয় ? কত কথা বলতেন বাবা। আমার এত কিছু শোনার সময় কিংবা ধৈর্য হতো না। বাবার মৃত্যুর পর সব - সব মনে পড়ছিল। মনে হলো যেন আমারও তো কত কথা ছিল বাকি - বাবার সাথে। জীবনে ব্যাবহারিক শিক্ষা আমাকে দিতে চেষ্টার কসুর করেননি বাবা। মাও তা-ই করতেন। তবু দু’জনের শিক্ষাদানের মধ্যে ফারাক ছিল। আমার বালিকা বেলা শেষ হতেই বাবার সাথে এক অলিখিত দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিল। মা থাকতেন কাছাকাছি কিন্তু বাবা যেন এই দূরত্বকে মেনে নিতে পারতেন না। তাই সংসারের নিয়ম মেনেই দূর থেকে জীবনবোধের পাঠ পড়াতেন আমায়। তাঁর সেই সব পাঠ যদি আমি লিখে রাখতাম তাহলে এতদিনে এক পুরুষ্টু গ্রন্থের আকারে পৌঁছে যেত। বাবা শেষের দিকে আমার বিয়ের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন যদিও এই কাজটি আর করে যেতে পারলেন না। আমিও বুঝতে শিখেছি আমারও এক নতুন সংসারের প্রয়োজন রয়েছে। এভাবে একা একা কিংবা কারো গলগ্রহ হয়ে জীবন কাটাতে পারব না আমি। আমারও একটি পরিবার চাই, সমাজ চাই। সেই থেকে মায়ের একটাই স্বপ্ন - আমার বিয়ে। একদিন কাছে বসিয়ে মা বললেন - তোর বাবার শেষ ইচ্ছেটাকে মর্যাদা দিয়ে এবার তোর বিয়েটা হয়ে গেলে আমি দায়মুক্ত হই রে মা।
- আমাকে দায় ভাবছ কেন মা ? - আমি মায়ের চোখের দিকে তাকাই
- সে অর্থে নিচ্ছিস কেন ? তুই কেন দায় হতে যাবি ? অভিভাবক হিসেবে তোর যথাযথ ভবিষ্যৎ গড়ে দেওয়ার যে কর্তব্য আছে আমার, সেটাকেই তো দায় বলছি। তা, তোর পছন্দের কেউ আছে কি মা ?
আমি আকাশ থেকে পড়ি। কিছু ভ্রমরের গুঞ্জন শুনতে পেতাম চারপাশে কিন্তু এভাবে তো ভাবিনি কোনোদিনবললাম মা’কে।
- তবে এগোই সোনা মা ?
আবার সোনা মা। আমি গলে যাই আবার। মাথা নাড়ি - উপর থেকে নিচে। মা আমার মুখটা টিপে দিয়ে নেমে পড়লেন কাজে। এরপর রাজুপুত্তুরদের আনাগোনার শেষে অতনু এল সামনে। দেখে, কথা বলে ভরসা পেলাম মনে।    
আমার বালিকা-কিশোরী-যুবতি বেলার সোনার স্বপ্ন যখন প্রায় হারিয়ে যাওয়ার পথে ঠিক তখনই আবার এল ফিরে সে স্বপ্ন এক নতুন আঙ্গিকে। অতনুর সাথে বিয়ে ঠিক হওয়ার পর থেকেই সোনাদানার কথাবার্তা আবার ধ্বনিত হতে শুরু হলো চরাচরে। আমার মনের গহীনে আবার স্বর্ণময় টুংটাং অনুরণন। বিয়ের রাতে সোনায় সেজে ওঠা আমি নিজেকেই চিনতে পারছিলাম না। আমার হবু বর, হবু সংসার, আমার ভবিষ্যৎ জীবনের সব চিন্তা ছেড়ে শুধু নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত হয়ে রইলাম। সেই এক স্বর্ণিম দিন। বি-বাহিত হয়ে সোনার সংসারের লক্ষ্যে মা’কে সাময়িক একা রেখেই পা বাড়ালাম এক নতুন জীবন দর্শনের অনন্ত পথে, নতুনের পথে - যে পথ ধরে মা-ও একদিন বাবার হাতটি ধরে শুরু করেছিলেন এক নতুন দিন, নতুন সংসার। কালের যাত্রাপথ।     
 
অতনুর কথা
রিমলি যে কী ধাতুতে গড়া তা বোধ করি ঈশ্বরেরও অজানা। এত কাছে থেকেও মাঝ মাঝেই বড্ড অবুঝ কেন হয়ে যায় বুঝি না। মায়ের মৃত্যুর পর যেন আরোও উদাস, আরোও অবুঝ হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। বিয়ের আগের স্বল্প পরিচয়ে যতটা সম্ভব মেলে ধরেছিলাম নিজেকে। রিমলিও মানিয়ে নিয়েছিল ষোলোআনা। যথেষ্ট বিচার বিবেচনা ধরে রিমলি। সেদিক থেকে আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত।
ছিন্নমূল একটি পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা আসতে কখনো চলে যায় প্রজন্ম কারো ভাগ্যদেবী সুপ্রসন্ন হলে একটি জীবনই যথেষ্ট অন্যথা তৃতীয় প্রজন্মকেও মাথার ঘাম পায়ে ফেলে চলতে হয় স্বচ্ছলতার লক্ষ্যে আমার হাঁড়ির খবর বিয়ের আগেই জানিয়ে দিয়েছি রিমলিকে মধ্যবিত্তের ঘেরাটোপ থেকে যে বেরিয়ে আসতে পারিনি এখনো সেই বৃত্তান্ত তো অজানা নয় রিমলির। তবু বোঝাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে মাথায় আমার বাজ পড়ে মাঝে মাঝেই। অম্লমধুর দিন যাপনে মানিয়ে নিয়েছি দু’জনেই। প্রায় পঁচিশটি বছর ধরে এগোচ্ছে যৌথ জীবনধারা। সঙ্গে সবেধন নীলমণি আমাদের ছেলে দীপ।
এত গোছালো, এত পরিপক্ক রিমলি একটি বিষয়ে যে কী করে এত অবুঝ হতে পারে, সে আমার বোধের বাইরে। কতবার বলেছি -
- দ্যাখো, আমার আটপৌরে সংসার। ছিন্নমূলের দ্বিতীয় প্রজন্ম। উচ্চাশা পোষে রাখা ভালো কিন্তু সময়ের আগে উঁচু পথে পা ফেলতে হয় না। খেই হারানোর শঙ্কা থেকে যায়। কোটের মাপ অনুযায়ীই কাপড়টি কাটতে হয়। নাহলে বিড়ম্বনার বাইরে আর কোন প্রাপ্তি নেই।
সব বুঝে রিমলি। কিন্তু এক জায়গায় অনড়। এ নিয়ে প্রায়শঃ আমি চিন্তায় পড়ে যাই। আমার কিছু সিদ্ধান্ত মুখ থুবড়ে পড়ে। তিতিবিরক্ত হয়ে উঠি।
না রিমলির সারা অঙ্গে সোনার গয়না পরে ঘুরে বেড়ানোর কোনও শখ নেই। সোনার অলঙ্কার কিছু থাকলেও সচরাচর পরেই না ওসব। ব্যাঙ্কের লকারেই গচ্ছিত আছে সব। বিয়েশাদিতে কখনোসখনো পরে বেরোয়। আমার অতৃপ্তির জায়গাটি অন্যখানে। সেদিনও একপ্রস্থ মন কষাকষি এ নিয়ে। এর আগেও হয়েছে বহু বার। কত ভাবে বুঝিয়েছি। সব বিফল।
কতবার বলেছি সোনা নিছকই এক অর্থনাশক ধাতু প্রয়োজনীয় টাকাগুলোকে সোনা কেনার নাম করে নিছক জলে ফেলে দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয় প্রতিবাদ করে রিমলি -
- সোনা বিপদের বন্ধু
- এসব আগেকার দিনের কথা গরিব মানুষরা বলত তেমন দিনটি পেরিয়ে এসেছি বহু আগে। এখন কি আর সোনা বিক্রি করে কিংবা বন্ধক দিয়ে সংসার চালাতে হবে ? শেষ কবে দেখেছ বলো তো এসব ? আমার কাছে সোনা আর মাটির ড্যালার মধ্যে কোনও পার্থক্য নেই। শুধু শুধু টাকার অপচয়।
না বিশেষ কিছু লাভ হয়নি এতে। রিমলি যেখানে ছিল, সেখানেই আছে।
রিমলির খুড়তুতো দাদার ছেলের পুত্রসন্তান হয়েছে। মনে খুশির লহর সুসংবাদ শুনে আমিও স্বভাবতই খুশি। মাস ফুরোলে ব্রত অনুষ্ঠান। রিমলিকে অন্তত যেতে হবে। এদিকে আমারও ভাগ্নের কন্যাসন্তানের অন্নপ্রাশন এবং মেজদাদার ছেলের বিয়ে। সামনে এতগুলো শুভানুষ্ঠান। রিমলি টগবগ করে ফুটছে। আমার মতো সাংসারিক ব্যাপারস্যাপারে উদাসীন মানুষটির নিষ্ক্রিয়তার জন্য দায় দায়িত্ব সব তো তাকেই নিতে হয়।   
পাশাপাশি আমি ফুটছি অন্যভাবে। এক অনাকাঙ্ক্ষিত শঙ্কায় ভুগছি ভেতরে ভেতরে সকালে ছেলেকে স্কুলে দিয়ে এসে রিমলিকে ডেকে বললাম -
- দাদার ছেলেকে দেখতে যাবে না ?
রিমলির চোখে মুখে খুশির ঝিলিক আবার নিমিষে উধাও। বলে - যেতে তো ইচ্ছে করছে কিন্তু ভাবছি, গেলেই তো ……
- কী ? দেখতে হলে সোনা দিয়ে দেখতে হবে ?
- হ্যাঁ, সেটাই তো নিয়ম
- দেখতেও সোনা ? আবার অন্নপ্রাশনেও ?
আমতা আমতা করে রিমলি আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করি - কত লাগবে ?
- একেবারে কম করে হলেও পাঁচ হাজার তো লাগবেই এক আনার কম সোনা দিয়ে কী হবে ?
আমি চমকে উঠি
- মানে সোনা কি এখন আশি হাজার টাকা তোলা ?
- সেরকমই তো
আমি আর ধৈর্য ধরতে পারি না এবং প্রতিবারই এমন হয় আবার একই কথার পুনরাবৃত্তি -
- তোমাকে কত বলি এই সোনা থেকে বেরিয়ে আসতে আমার যা কিছু আছে তা কি আত্মীয়স্বজনদের সোনা দিতে দিতেই ফুরিয়ে যাক - তুমি চাও ? আচ্ছা সোনা না দিলে কী হয় বলো তো ? এই যে এত এত গরিব লোকেরা আছে ওরা কি এভাবে সোনা বিলিয়ে থাকে ? ওরা কি তাহলে সমাজ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে গেছে ? আচ্ছা রিমলি, তুমি কি চাও সোনা বিলিয়ে নিঃস্ব হয়ে সন্তানের সুশিক্ষার পথটি আমাদের বন্ধ হয়ে যাক ? ভবিষ্যতের চিন্তা না করে এভাবে মিথ্যে রীতি-নিয়মের ঘেরাবন্দিতে পা ফেলে নিজেদের নিঃশেষ করে দেব ? আজ আমরা যদি উচ্চ কিংবা উচ্চবিত্তদের সৃষ্ট এসব এই টানাপোড়েনের নিয়ম-কানুনের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে পারি তাহলে আমাদের দেখাদেখি অন্য যারা আছে নিম্ন কিংবা নিম্ন বধ্যবিত্ত তারাও মুক্তির পথ খুঁজে পাবে। দৃষ্টান্তটি তো আমরাই বপন করতে পারি। থাক না ওগুলো যাদের অঢেল আছে তাদেরই জন্য। কাল আমাদের যখন অর্থনৈতিক সমস্যা দেখা দেবে তখন কি আমরা যাদের সোনা দিয়েছি তারা এসে দাঁড়াবে পাশে ? কেউ দাঁড়াবে না রিমলি। মনে রেখো কথাটি। তাই নিজেদের চিন্তাটি নিজেরাই করতে হবে। এভাবে ক’দিন পর পরই ‘শিউলি’র নামে কাড়ি কাড়ি টাকা অপচয় করে সোনা বিলিয়ে রীতি মেনে চলতে হবে এমন দিব্যি কি কেউ দিয়েছে মাথায় ? তার বদলে অপেক্ষাকৃত কম খরচে ব্যবহারযোগ্য কিছু জিনিস দাও না উপহার। এতে তো সাপও মরবে আর লাঠিও ভাঙবে না।  
বরাবরের মতোই ঘোর অমানিশার অন্ধকার রিমলির মুখমণ্ডল জুড়ে সরে যায় আমার কাছ থেকে, দূরে আমি জানি, এত কিছু বলেও কোন লাভ নেই সোনা আমাকে দিতেই হবে আমার সিদ্ধান্তের মূল্য দিয়ে সোনার পথ ছেড়ে আসতে কোনদিনই পারেনি রিমলি পারবেও না কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের ছোটখাটো অলঙ্কারগুলোকে ভাঙিয়ে হলেও দানের ধারা বজায় রেখেছে যথারীতি
এবার আবারও আমাকে তৈরি হতে হবে বিত্তনাশা সোনার ফাঁদে পা ফেলার জন্য।
মাথাটা খুব ধরেছে। ক’দিন থেকেই এমন হচ্ছে। আর চোখের সামনে কষ্টার্জিত ধনের অপচয় দেখলে, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চিন্তায় কপাল হয় কুঞ্চিত, অন্তর শঙ্কিত। মাথাটা তখন টনটনিয়ে ওঠে। এসব বলে রিমলিকে আর চিন্তায় ফেলতে মন চায় না।
 
রিমলির কথা
কী করে বোঝাই অতনুকে ? আমার কি আর নিজের জন্য সোনা চাই ? আমার তো সোনার শখ সেই কবেই শেষ হয়ে গেছে যেদিন থেকে মায়ের, বাবার সেই সোনামাখা ‘সোনা মা’ ডাকটি আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছে। অতনুর সম্মানকে বাঁচিয়ে রাখতেই তো পারি না সমাজের নিয়ম কানুনকে দূরে সরিয়ে রাখতে। এই তো সেদিন বড় দাদার ছেলের বিয়েতে মেজদারা কত বড় গলার হার দিল। এবার আমরা যদি কিছুই না দিই তবে অতনুর মান সম্মান যে কোন তলানিতে গিয়ে পৌঁছাবে তা কি আর বলার মতো ? কী করে এতটা নীচে নামা যায় ? অথচ অতনু তো এসব বুঝতেই চায় না।
তাছাড়া সোনার দাম যেভাবে বাড়ছে তাতে মাঝে মাঝে কষ্ট করে হলেও সোনা কিনে রাখতে পারলে তো আখেরে লাভই। এটাও অতনু বুঝতে রাজি নয়। শুধু শুধু অশান্তি। পাশের বাড়ির কমলি সেদিন বলছিল ওর বর নাকি সোনা কেনায় ওস্তাদ। সুযোগ পেলেই সোনা কিনে রাখে।
মেজদিদেরও দেখি প্রায়শঃ জুয়েলারি দোকানে যেতে। অতনু সেই যে দু’বার দু’টি হার কিনে দিয়েছিল আর তো ওমুখো হতেই রাজি নয়। সে না হয় না-ই হলো। আমার আর সোনা দিয়ে কী হবে ? কিন্তু এ যাত্রায় কী হবে ? কিছু একটা আমাকেই করতে হবে। লকারে যেতে হবে একদিন। কিছু ছোটখাটো গয়না এনে ঘরে রাখতে হবে।
ঘরে সোনাদানা রাখলে নাকি লক্ষ্মী আসে - যদিও এসব নিছকই - ‘শোনা কথা’।

 

- বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...