Skip to main content

বিশ্বমানবতা বোধ-এর গল্প সংকলন ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’


‘বর্তমান সময়ের এক জঘন্য সমস্যা রাজনৈতিক অস্থিরতা। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছে না। সহনশীলতা কমে গেছে। সমগ্র দেশ জুড়ে নয়, বিশ্বজুড়ে পারিপার্শ্বিক পরিবেশ অসহনীয় হয়ে উঠেছে। পারস্পরিক সম্পর্ক বা সামাজিক সম্বন্ধ সম্পর্কহীন হয়ে চলেছে। এ যেন এক বিপন্ন বিস্ময়। চোখ দিয়ে দেখা ছাড়া গত্যন্তর নেই। এক দুর্বিষহ অবস্থায় শুধু দিন যাপনের এক নিদারুণ কাহিনিমানুষ মানুষের জন্য - এ কথা আজ বড় বেমানান লাগে ……।’
আবার … ‘সামাজিক সম্বন্ধের দিকগুলো যখন ভোঁতা হয়ে আসছে ঠিক তখন বিশ্বমানবতার বোধ আমাদের অন্তর্গত রক্তের মধ্যে খেলা করছে। এটা একটা শুভ বোধ। একটা সুস্থ চেতনা। আমাদের বাস্তব পৃথিবীটাকে সুন্দর করে সাজাতে সাহায্য করে। এই জাগ্রত বোধটাই মানুষকে বাঁচার রসদ জোগায় ……।’
‘পূর্বাভাষ’ শিরোনামে ভূমিকায় এভাবেই বর্তমান সময়কে কাঁটাছেড়া করেছেন গল্পকার পরিতোষ তালুকদার তাঁর ‘দশম’ গল্প সংকলন ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’তে। পরবর্তী পৃষ্ঠায় কিন্তু এর আগে প্রকাশিত আটটি গল্প সংকলনের হদিশ পাওয়া যায়। নবম সংকলনটি সম্ভবত সমসাময়িক কালেই প্রকাশিত হয়েছে। তাই উল্লেখে আসেনি।
মোট দশটি গল্পের সমাহার এই ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’। এবং প্রতিটি গল্পই ‘পূর্বাভাষ’-এ বর্ণিত সামাজিক সম্পর্কহীনতা, সম্পর্কের জটিলতা এবং সার্বিক অবক্ষয়ের এক একটি সুচিন্তিত, সুলিখিত বয়ান। প্রতিটি গল্পের ঘটনাপ্রবাহের খুঁটিনাটি বর্ণনা গল্পগুলোকে জীবন্ত এবং বাস্তব প্রেক্ষাপটে এনে দাঁড় করায়। গল্পের বাঁধন এতটাই মজবুত এবং ধারাবাহিক যে একবার পড়তে শুরু করলে শেষ না করে থাকা যায় না।
প্রথম গল্প ‘অবিচলিত লক্ষ্যের দিকে’। চমৎকার প্লট। সত্যকথার অসাধারণ বিশ্লেষণ। বলা যায় এক উত্তরণের গল্প। ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এক বজ্রনির্ঘোষ, যুক্তিনির্ভর উচ্চারণ। উত্তর পূর্বে দেশভাগের বলি হওয়া বাঙালির উপর তাচ্ছিল্যের, অপমানের, অত্যাচারের কিছু সপাট উচ্চারণ। গল্পের নায়কের ধারালো যুক্তির কাছে ভ্রান্ত ধারণার আত্মসমর্পণের গল্প। নায়কেরই মতো ধাপে ধাপে এগিয়েছে গল্প তার অবিচলিত লক্ষ্যের দিকে।
পরের গল্প ‘মহাপুরুষের চাবুক’। রূপক ও বাস্তবের অনবদ্য সংমিশ্রণ এই গল্প। আদ্যোপান্ত গোছানো এবং অসাধারণ বুনোটে বাঁধা। কিছু বক্তব্য চাবুকের মতোই সপাট। তবে প্রথমে যেখানে আছে - ‘... বাবা নাকি চাবুকটা ব্যবহার করতেন। স্বাতী দেখেনি কোনোদিন। তখন সে নিতান্ত ছোটো। বাবা চলে গেলেন। তারপর থেকে আর কেউ সে চাবুকে হাত দেয়নি।’ - সেখানে ভাই নিখিলের প্রশ্ন - দিদি রথের মেলায় নিয়ে যাবি ? - এর উত্তরে স্বাতী বলছে - বাবার সঙ্গে যাবি। আমার শরীরটা ভালো নেই।
- না বাবার সঙ্গে নয়। বাবা বলেছে তুই নিয়ে যাবি।’ - ঠিক বোঝা গেল না।
তৃতীয় গল্প - ‘কর্মফল’। গল্প জুড়ে উপমারা যেন খেলে বেড়িয়েছে। কঠোর বাস্তবের উপর লিখা একটি বড়গল্প। মানবিক সম্পর্কের নিমগ্ন কাটাছেঁড়া। সাথে ধ্বস্ত মানসিকতার উলঙ্গ স্বরূপ।
‘পাখি মা’ গল্প মানবিক বোধের এক কল্পিত বাস্তব। সন্তানহীন মাতৃহৃদয়ের অন্তর্নিহিত বেদনা এবং বিকল্প পন্থার এক অন্যরকম উপস্থাপনা। সুচিন্তিত প্লট। ব্যতিক্রমী নিঃসন্দেহে।
পঞ্চম গল্প ‘অশৌচ মুক্তি’ - অপরিণত মস্তিষ্কের কিশোর রঘুর কার্যকলাপ এবং তার অবুঝ জিজ্ঞাসা যেন সমাজের নগ্ন রূপ খুলে দিয়ে যায় পাঠকের সামনে। সুস্থ মানসিকতারও এক অনবদ্য চিত্রায়ন। সব মিলিয়ে মানসিকতার এক নিখুঁত ককটেল যা এক শুদ্ধ মননের বার্তা দিয়ে যায়।
রাজনৈতিক দাঙ্গাবাজির পরিচিত নগ্ন স্বরূপ ‘লাল ঝড় আসছে’। ‘সীতা হরণ’ গল্পটি রম্য রচনার ধাঁচে লিখা নারী পুরুষের এক প্রেম ভালোবাসা, ভালো লাগার অপরূপ রসায়নের গল্প।
গল্প ‘স্বপ্নবিলাশ’ - শিরোনামেই বানান ভুল। সূচিপত্রেও এবং গল্পের মধ্যেও একই বানান আছে। রাজনীতি, উগ্রপন্থী, দাঙ্গাবাজ, মাফিয়ারাজের প্রভাবে কীভাবে সাধারণ জীবনে নির্মূল হয়ে যায় উত্তরণের স্বপ্নবিলাস তারই এক বিস্তৃত কথন।
আবারও এক অনবদ্য রূপকের ছোঁয়ায় ব্যক্তিমানসের কেতাবি চরিত্রের ভেতরকার ফাঁপা স্বরূপ উদঘাটন হলো ‘আত্মগ্লানি’ গল্পে। বাইরে ভদ্রতার মুখোশ পরে থাকা ব্যক্তিসত্ত্বার ভিতরের কদর্য, কর্দমাক্ত চেহারার প্রকাশ্য চিত্রণ এই গল্প।
শেষ গল্প ‘রসময়ের ঘর সংসার’। রূপক অঙ্গে আরেকটি রম্য রচনার ধাঁচে লিখা এই গল্পে বিশ্বময় স্বার্থপরতার স্বরূপটিকে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন গল্পকার।
শেষ দু’টি গল্পের প্রথম পরিচ্ছদে চরিত্রসমূহের উল্লেখে ‘সে’ ও ‘তিনি’র মধ্যে কিছু অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে। কিছু বানান ভুল। এর বাইরে উপস্থাপনায়, বুনোটে, বিষয় বৈচিত্র্যে, প্রাসঙ্গিক উপমার যথাযথ উল্লেখে একটি অনবদ্য সংকলন। বিকাশ প্রকাশন, গুয়াহাটি থেকে প্রকাশিত গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে ‘নাট্যকার শ্রী দীপক ভদ্রকে’। রঙিন প্রচ্ছদটি খুবই প্রাসঙ্গিক যদিও প্রচ্ছদ শিল্পীর নাম অনুল্লেখিত। বর্ণ, শব্দ, বাক্য বিন্যাস, মুদ্রণ যথাযথ যদিও অক্ষর আকার (ফন্ট) আরোও এক ধাপ বড় হলে ভালো হতো। পেপারব্যাক বাঁধাই-এ ৯২ পৃষ্ঠার এই গ্রন্থের শেষ প্রচ্ছদে রয়েছে লেখকের সংক্ষিপ্ত জীবমপঞ্জি। এখানেই হদিশ পাওয়া যায় তাঁর উপন্যাসের। এবং তাঁর রং তুলির ভালোবাসার কথা। হয়ত তারই প্রভাব গল্পসমূহের চরিত্র চিত্রণে প্রত্যক্ষ করা যায়। এক একটি চরিত্র যেন নিত্য দিনের চলার পথে মুখোমুখি হওয়া চরিত্র। মুদ্রণে গুয়াহাটির আলপনা গ্রাফিক্স। কৃতজ্ঞতা স্বীকার করা হয়েছে ‘দীপক ভদ্র’-এর প্রতি। তাঁর উল্লেখ রয়েছে ভূমিকাতেও। 
ভূমিকায় উল্লেখ করা মতোই ‘বিশ্বমানবতার বোধ’ এই সংকলনের মূল উপজীব্য বিষয় এতে কোনও সন্দেহ নেই। এই সমস্যাদীর্ণ সময়ের এক দর্পণ হয়ে রইল এই সংকলন। ‘এই জাগ্রত বোধটাই’ যেন গ্রন্থ জুড়ে ফেরি করে চলে - কোনও এক জাদুকর, এক ‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

‘স্বপ্নের ফেরিওয়ালা’
পরিতোষ তালুকদার
মূল্য - ১০০ টাকা
যোগাযোগ - ৯৯৫৪০১১৭৭৬

Comments

  1. পঙ্কজ কান্তি মালাকারAugust 20, 2023 at 9:26 AM

    খুব সুন্দর আলোচনা

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...