দুই বোন উপন্যাসের সূচনাতেই প্রাণপুরুষ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বলেছেন -
মেয়েরা দুই জাতের - কোনো কোনো পণ্ডিতের কাছে এমন কথা শুনেছি।
এক জাত - প্রধানত মা, আর এক জাত - প্রিয়া।
ঋতুর সঙ্গে তুলনা করা যায় যদি - মা হলেন বর্ষাঋতু। জলদান করেন, ফলদান করেন, নিবারণ করেন তাপ, ঊর্ধ্বলোক থেকে আপনাকে দেন বিগলিত করে, দূর করেন শুষ্কতা, ভরিয়ে দেন অভাব।
এক জাত - প্রধানত মা, আর এক জাত - প্রিয়া।
মেয়েরা দুই জাতের - কোনো কোনো পণ্ডিতের কাছে এমন কথা শুনেছি।
এক জাত - প্রধানত মা, আর এক জাত - প্রিয়া।
ঋতুর সঙ্গে তুলনা করা যায় যদি - মা হলেন বর্ষাঋতু। জলদান করেন, ফলদান করেন, নিবারণ করেন তাপ, ঊর্ধ্বলোক থেকে আপনাকে দেন বিগলিত করে, দূর করেন শুষ্কতা, ভরিয়ে দেন অভাব।
এক জাত - প্রধানত মা, আর এক জাত - প্রিয়া।
ঋতুর সঙ্গে তুলনা করা যায় যদি - মা হলেন বর্ষাঋতু। জলদান করেন, ফলদান করেন, নিবারণ
করেন তাপ, ঊর্ধ্বলোক থেকে আপনাকে দেন বিগলিত করে, দূর করেন শুষ্কতা, ভরিয়ে দেন অভাব।দাবদাহময় গ্রীষ্মের সমাপন আগত। ঋতুচক্রের হিসেবে দিন
কয়েকের মধ্যেই বর্ষার আগমন। এমনিতে ইতিমধ্যেই বর্ষার পদধ্বনি
আমরা শুনতেই পারছি কান পাতলে। আজ বর্ষাকে তাই হৃদয় দিয়ে করি
স্বাগত সম্ভাষণ। বর্ষাকে নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে কত কালজয়ী কবিতা তার লেখাজোখা
নেই। অঞ্চলভেদে বর্ষার কতই না অনন্যসাধারণ রূপ। কবির কলমে ফুটে উঠে তারই
জীবন্ত চিত্র। কিন্তু কেমন আমাদের একান্ত নিজেদের বর্ষা ? এই ভাষা জননীর
বঞ্চিত ভুবনের বর্ষা ? গ্রাম বরাকের বর্ষা ? আমাদের এ অঞ্চলের বর্ষা ? আজ আমি নিয়ে এসেছি বর্ষা
ঋতুর কিছু কবিতা। কিছু কাছের কবিদের কবিতা, কিছু নিজের। কাছের বলতে প্রথমেই তিনি - যাঁর পদাঙ্ক
অনুসরণ করেই এক পা, দু’ পা করে এগিয়ে যাওয়ার সাহস, অনুপ্রেরণা। সেই আমাদের প্রাণের পুরুষ
রবীন্দ্রনাথ। তাঁকেই শ্রীগণেশ করে শুরু করছি আজকের এই বর্ষা সম্ভাষণ। কবিগুরুর বর্ষা ঋতুর
রচনাসম্ভার মনে এলেই যে কবিতাটি আমার সবার প্রথমে মনে পড়ে সেটি হলো সোনার তরী। অবাক হই আমিও এত এত
বর্ষার কবিতা রেখে সোনার তরী কেন ?
কবিতাটি আসলে যদিও এক ফাল্গুনেই
লিখা হয়েছিল তবুও বর্ষার এক স্পষ্ট আভাস যেন ধ্বনিত হয়েছে এই কবিতায়। প্রথম সারিতেই ঘোর বরষার আগাম
বার্তা।
‘সোনার তরী’ কাব্যে কবি নদীমাতৃক বাংলাদেশের
রূপ, পদ্মার প্রবহমানতা, বিচিত্র খণ্ড
খণ্ড রূপকল্প ও চিত্রকল্পের ভিতর দিয়ে, কখনও সাঙ্কেতিক
রহস্যময়তায়, কখনো প্রকৃতির বিষাদ উজ্জ্বলতায় প্রকাশিত
করেছেন বর্ষাকে। ‘সোনার তরী’ কবিতাটি
এক ঘন বর্ষায় আবৃত নদীচরের নিসর্গচিত্র। কবির ভাষায়
পল্লীপ্রকৃতির সঙ্গে তাঁর একটি মানসিক ঘরকন্নার সম্পর্ক, সেটি এ কবিতায়
ফুটে উঠেছে।
(১)
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা - - - - -
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খর-পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
একখানি ছোট ক্ষেত আমি একেলা,
চারিদিকে বাঁকা জল করিছে
খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়া মসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাত বেলা।
এ পারেতে ছোট ক্ষেত আমি একেলা।
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে !
দেখে যেন মনে হয় চিনি
উহারে।
ভরা পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দুধারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি
উহারে !
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে !
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে
এসে !
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে !
যত চাও তত লও তরণী পরে ।
আর আছে ? — আর নাই, দিয়েছি ভরে ।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে
এখন আমারে লহ করুণা করে !
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ! ছোট সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে
ভরি।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি,
যাহা ছিল, নিয়ে গেল -
সোনার তরী।
মনে পড়ে বালক বেলার সেই বর্ষামাখা দিনগুলি। ছাতা মাথায় করে গুটি গুটি পায়ে বাইরে বেরিয়ে বৃষ্টিভেজা ঘাস আর পায়ের পাতা ভেজানো জলে ধানের অকর্ষিত ক্ষেতে নেমে পড়া। আল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলধারার পানে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা। কীসের আকর্ষণে - জানতাম না। শেষ কৈশোরের অনুসন্ধিৎসু মন কিংবা আগত যৌবনের অভাবিত সুন্দরের পিয়াসী মনের সেই তখন থেকেই শুরু বৈচিত্রের অন্বেষণ। আজ পথের ধারের বৃষ্টিমাখা স্বর্ণলতা ঢেউ তোলে যায় মনগগনে - - - । ধরে রাখতে চেষ্টা করেছি আমার একটি কবিতার মাধ্যমে। কবিতার নাম - বৃষ্টিস্নাত।
(২)
নীল সাগরের সাহস দেখেছ, আকাশ জুড়ে ?
কেমন আছো
স্বর্ণলতা ?
ঝরতে দাওনা
অবিশ্রান্ত।
তোমার তো নেই হাসতে মানা।
দিন জোড়া আজ মুহুর্মুহু কতই ঘটা ঘনঘটায়-
মেঘে
মল্লারে মন খারাপের
তুমিই বা কম কীসে যাও
বাজুক তান আজ সুর বাহারের।
আকাশ তলায়, সাগর ঝরে অঝোর ধারায়
পৃথিবী আজ
পালটে গেছে
তোমার স্থিতি পথের ধারে
মুক্তোঝরা অরূপ হাসি একই আছে।
কাজলা কালো হরিণ চোখের ইতিউতি
ওই ধারাতে আনচান মন
চাউনি তোমার চকিত চপল
পরখ তোমায়, রিক্ত আমি অগুণতি ক্ষণ।
ভরাট যত ফুটিফাটা, আঁকাবাঁকা কৃষ্ণবিবর
খেত খামারে
ধারায় ঝরে মুক্তোদানা
সাকিন তোমার নতুন সাজে
সাজবে মুক্তো হার না মানা।
গর্ভধারণ উল্লাসে আজ মত্ত নদীর শান্ত জঠর
জঙ্ঘা বেয়ে নামবে ধীরে পাগল পারা
পারে পারে তোমারও তো অগুণতি সব
নতুন ছবি, চিত্রকরের পট যে ভরা।
ময়না, শালিক, মাছরাঙা আজ মন্দ্রবিভোর
উচ্ছল মীন, চাতক মেটায়
তৃষ্ণা আপন
তোমার
বাহার সামলে রেখো
রঙবাহারের পত্রে আমার দিন যে যাপন।
ঝিরঝির ওই শব্দনিনাদ বাজায় বুকে বিষাদবীণা
ঘোমটা তলে উদাস নয়ন তাকিয়ে থাকে
ফুৎকারে আজ দাও উড়িয়ে
বিলিয়ে দিয়ে রঙমশালের ছন্দটাকে।
সিঞ্চিত ধরিত্রীর একবুক বুভুক্ষা
পিয়াসী পাতায় ছলকে পড়া শান্তিধারা
জীবন ধারণ রসদ তোমার প্রোথিতমূলে
অঙ্গে অঙ্গে তোমার বাহার পাগলপারা।
রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুরবাহারের বিরামহীন কোরাস সুর
তপ্ত ধরার অবগাহন সুখের তান
উন্নত শির, তোমার লক্ষ্য নবীন জনম
তুমিতো গাও
প্রজন্মেরই আগাম গান।
বিরামবিহীন বুকের মোচড় দু’চোখ বেয়ে অবিশ্রান্ত
জীবন যেথায়
অবিন্যস্ত খেই হারিয়ে
তোমার তখন স্বর্ণলতা, জলসা সভায়
দিবস রাত্র গড়ায় সোহাগ
সুতনুকার অঙ্গ বেয়ে।
বর্ষা ও বৃষ্টিকে নিয়ে কল্পনায় মেতে ওঠার যে আমেজ তা বোধ করি আর কোথাও নেই। কবি মনে চিরন্তন সাড়া জাগায় বর্ষার মনমাতানো রূপ। বৃষ্টি ধারার মাঝে লুকিয়ে থাকে কতই না প্রেম, বিরহের গাথা। বুকের ভেতরে খেলে যায় ঢেউ। রূপকথার নদী হয়ে সঘনে আনাগোণা করে কেউ। তাদের নিয়েই কবিতার মালা গেঁথেছেন প্রিয় কবি, শ্রদ্ধার কবি চন্দ্রিমা দত্ত। কবিতা - কুর্চি সুবাসে কে আসে ?
(৩)
অঝোর বৃষ্টির-ই মতো আজ ঝরছে
মনখারাপ-পালক,
ঝরাপাতার মতো ভালোলাগাও
প্রবল হাওয়ায় ঝরছে ... ...
কখনো বৃষ্টি তো কখনো উত্তর হাওয়া
নদী যদি রূপকথা
হাওয়া আসে চরিত্র অবয়বে,
কিছু ঝাপসা গল্পরা
বৃষ্টির সুরে গান হয়ে ঝরলে
বুঝি বুকের ভেতরে আজও ঢেউ,
আজও কুর্চি-সুবাসে
আনাগোনা করে কেউ ... ...
অরণ্যধারে নদীর-বাগানে, স্রোত-ফুল
একাকী নৌকোয় উঠেছে অজস্র ভুল।
বর্ষা এলে, আষাঢ় শ্রাবণ এলেই আজো মনে পড়ে যায় সেই যে কালজয়ী গান - আষাঢ়-শ্রাবণ, মানে না তো মন। না বলা কথা যেন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে হৃদয় বেয়ে। আকুল আবেদনে কবি শতদল আচার্য আধুনিক কবিতার ধাঁচে লিখছেন, তাঁর মনীষা সিরিজের একগুচ্ছ কবিতা। তারই একটি -
(৪)
আমার আকাশে বৃষ্টি আজ
মেঘ মেঘ মন,
ভাল না লাগার ছলে তোমাকে বলা।
সব কিছু আজ ............।
তোমার ভাল লাগার চোখে মুখে
ফোটে ফুল ........................ ।
আমার জীবনে ............।
নামল বৃষ্টি, তুমি শুষে নিলে
তোমার আঁচলে এখন জলেরই
ছাপ।
মনীষা, জানি একদিন মিশে যাব ,
আর
চিৎকারে বলব তোমার নাম।
তরুণ কবি শৈলেন দাশ আবার মেঘের সাথে উড়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে কল্পনাকে ছড়িয়ে দেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে। বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নেয় কবিতা - তুমি হাত বাড়ালেই।
(৫)
তুমি হাত বাড়ালেই আমি
মেঘের সাথে উড়ে যেতাম আকাশে
সেখান থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তাম
সবুজ সতেজ পৃথিবীর বুকে
আমার ক্লান্তি শ্রান্তি সব দূর হয়ে যেত
আমি শান্ত হতাম নিমেষে।
যত দু:খ গ্লানি ব্যথা মুছে যেত
অভিমানও
আমার ঘুচে যেত
পূরণ হত যত অভিলাষ আমার।
তুমি হাত বাড়ালেই
আমার স্বপ্ন গুলো হত রঙিন
আর এই মন হয়ে উঠত প্রজাপতি
তোমাকে ঘিরে এলোমেলো ভাবনাগুলি
ডানা মেলত বহুদূর চুপিচুপি
আমি ভাবনার দেশে হারিয়ে যেতাম নিমেষে
তুমি হাত বাড়ালেই
আবার যেমন তেমনি বৃষ্টিরাণীকে নিয়ে এক মন না মানা, পড়ে পড়ে আশ না মেটা কবিতা লিখেছেন আমাদের খুব কাছের কবি, ছন্দের কবি দিলীপ দাশ। কবিতার নাম - বৃষ্টিভেজা রাতে।
(৬)
তপ্ত শরীর ভিজিয়ে দিলো বৃষ্টি এসে রাতে,
আলতো করে
হাতটি রাখি বৃষ্টিরাণীর হাতে।
বললো আমায় রাগ করোনা অনেক দিনে দেখা,
তোমার কাছেই
প্রিয় আমার প্রেমের পাঠটি শেখা।
এতো টা দিন ছিলাম আমি মেঘবালিকার সাথে,
প্রেমের
গোলাপ গুঁজে দিলাম প্রিয় তোমার হাতে।
শরৎ আমায় নিয়ে গেলো নীল আকাশের গায়,
সেখানেই
ভেসেছিলাম মেঘেরই ভেলায়।
বর্ষা যখন ছাড়লো চিঠি আমার ঠিকানায়,
বিজলী তখন
গর্জে উঠে ডাকটি শোনা যায়।
ভাবছি বসে এবার আমার ঝরার সময় হলো,
আষাঢ় তুমি
বন্ধ যত দরজাগুলো খোলো।
আমার প্রিয়ার গা ভেজাবো বৃষ্টিভেজা রাতে,
শীতল হবে
তপ্ত শরীর মনের সাথে সাথে।
কিছু দিন ঝরবো আমি আষাঢ় শ্রাবণ জুড়ে,
তোমায় ছেড়ে
যাবো চলে হেমন্তের এক ভোরে।
কোন এক বর্ষা শুরুর বেলায় নিবিড় সান্নিধ্যে প্রিয়াসঙ্গ সুখ কবির মনকে দোলায়িত করে অনন্ত কাল। অপরূপ প্রকৃতির ছায়া সুনিবিড় গহীনে ঝরাবাদরে নিমগ্ন প্রেমিক হৃদয় - উচাটন মন ঘরে রয় না। কবির একান্ত বাসনা - কিছু দিন ঝরবো আমি আষাঢ় শ্রাবণ জুড়ে, এমন দিনটি আসুক ফিরে ফিরে। অন্তরের সেই গভীর ভাবনাটিকে কবিতায় ধরে রাখার প্রয়াসে আমার একটি কবিতা - এমন দিনটি আসুক ফিরে ফিরে।
(৭)
আজ বাঁকা চাঁদের জ্যোৎস্না মেখে
সবাই যখন ভাসছে প্রেমের সুখস্বপনে
আমি তখন মেঘ পাহাড়ে নিঝুম রাতে
স্বপ্নে সাজাই অলীক কল্পনা।
আজ অতল থেকে ঘুমের ঘোরে
গুমরে ওঠে মিলন তান।
এমন দিনটি আসুক ফিরে ফিরে
এমনি করে বর্ষা শুরুর বেলায়
এক দিন তো মিলবো আবার
অন্য কোনো জীবন নদীর তীরে
জুম পাহাড়ি নতুন পথের ধারে।
আবার তবে রইব চেয়ে
গভীর বনানীতে - একই ছাতার তলায়
বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে -
গরম চা-এর চুমুক সাথে চুমুর দূরত্বে
ফারাক বিহীন - অবাক কাছাকাছি।
মন উচাটন এই বর্ষায় একদিকে যেমন ফুটে ওঠে ফারাক বিহীন অবাক বিরহী মনের আকুলতা অন্যদিকে মিলন আশে ভেসে ওঠে প্রিয়ার মুখটি বারবার। মেঘেদের খুনসুটি আর বিগলিত হয়ে ঝরা পড়ার অনাবিল আনন্দ বাকরুদ্ধ করে দেয় কবিকে। তাই তো শিরোনামহীন কবিতার মাধ্যমে বলিষ্ঠ কবি কল্লোল চৌধুরী লিখেন -
(৮)
মেঘেরা করে খুনসুটি
বেলপাহাড়ি রাতে
তোমাকে নিয়ে থাকি আঁধারেতে
মেঘমন্দ্র আকাশে হাজারো তারা
মুখ বুজে হাসে
চাঁদ থাকে তখন অপার বিস্ময়ে
মেঘেরা করে খুনসুটি ।
অফুরান মেঘ
আকাশে ছিল না মেঘের পাঁয়তারা
তবে তোমার বুকে জমা ছিল অফুরান মেঘ
সে মেঘ যখন বৃষ্টি হয়ে নেমেছিল
আমার তখন বলার কিছু ছিল না ।
নিঝুম বরিষণে, প্রিয়া সনে যাপিত সময়ের অনাবিল কত অমর কথার জন্ম হয় কবির কলমে। আমাদের সবার আরেক প্রিয় কবি নিরুপম শর্মা চৌধুরীও তাঁর অনাবিল কল্পকথায় বর্ষার গভীরে করেছেন বিচরণ। তাঁর কথায় - বৃষ্টি তো নয়, যেন এক জীয়নকাঠির ছোঁয়া।
(৯)
বৃষ্টি তো নয়...
যেন এক জিয়ন
কাঠির ছোঁয়া;
ছুঁয়ে যায়
এসে
মেঘ পরী যত, দেহজ সকল জরা !
আজ বাদল
মেঘের পরশ মেখে
জেগে ওঠে দেহ-মন;
কীসের যেন
তাড়না তাড়িত
প্রাণ-মন উচাটন !
আনচান মন ..... আকুল হৃদয়
সে এক ভীষণ
রকম জ্বর;
আজ, কে জানে কেন যে
দেহ কাঁপে থর
থর !
স্পর্শে জাগে
হৃদয়ে পুলক,
দেহে জাগে শিহরণ;
শরীর চাইছে
শরীর সুখে
হোক না সহমরণ !
বর্ষা আগুনে
পুড়ছে শরীর
মনে আজ ফাগুন;
কে জানে, জুড়াবে কী করে...
দেহজ এই আগুন
!
সুখ পাখি
শুধু উড়ে উড়ে যায়...
চিরদিন সে তো
অধরা;
জিয়ন কাঠির
পথ চেয়ে রয়...
পায় না যে
তার সাড়া !
কবির কলম
কম্পমান আজ
কেঁপে যায় অবিরাম;
ছোঁয়ায় কথা
যেন কার হাত...
বলে যত
অভিমান !
দেহের গভীরে
গোপন ঘরে
এক প্রজ্বলিত শিখা;
রোদ বেঁচে রয়... হোক না যতই
মেঘ-চাদরে আকাশ ঢাকা !
একই ছন্দে জীবনের যাবতীয় অপ্রাপ্তিকে নির্মল বারিধারায় ধুয়ে মুছে দেওয়ার কাজটিও বর্ষার হাত ধরেই সেরে নিতে চাইছেন আরেক বলিষ্ঠ কবি যিনি একান্তই তাঁর কল্পগাথার মালিক। কবি রূপরাজ ভট্টাচার্যের অসাধারণ লিখন শৈলীতে বর্ষা এখানে কল্লোলিনী, নির্ঝরিনী, দুঃখহারিণী। কবিতার নাম - বৃষ্টি নামুক।
(১০)
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামুক ,
শস্য ক্ষেতে হলুদ ফুলের
পাপড়ি ঝরুক
বৃষ্টি নামুক ।
অনেক হৃদয় টুকরো করে
প্রেমের খেলায় সময় গেছে ।
অনেক হৃদয় জয় করেও
হেরে গেলাম নিজের কাছে ।
অনেক আশার ইট-পাথরে
মহল গড়ার সাধ মিটেছে,
অনেক আশার রঙিন কাঁচে
চোখ রেখেই তো দিন কেটেছে ।
অনেক দিনের স্বপ্ন দেখার
হাজারটা চোখ অন্ধ হলো,
অনেক দিনের বুকের পাঁজর
দাঁড় টানাতেই দিন ফুরালো ।
তাই এবার শুধু বৃষ্টি নামুক
মাঠ ভাসিয়ে -- ঘর ডুবিয়ে,
সবুজ চোখের বার্তা আনুক,
বান ডাকুক আর বৃষ্টি
নামুক ;
বৃষ্টি নামুক
বৃষ্টি নামুক !
বৃষ্টিধারার অনাবিল মুগ্ধতায় মন নেচে উঠে কবি জয়শ্রী ভট্টাচার্যের। সুন্দরী বর্ষার মিষ্টি বৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে যাবার আনন্দে ময়ূরের মতো নেচে ওঠে তাঁর কাব্য পিয়াসী মন। সেই মনের কথাটি বৃষ্টিরই মতো ঝরে পড়ে কবিতা হয়ে - তাঁর ‘বাদল দিনে’ কবিতার হাত ধরে।
(১১)
বৃষ্টি তুমি মিষ্টি বড়
ঝুমঝুমিয়ে ঝরো,
টাপুর
টুপুর বাজাও নূপুর
প্রাণ খুশিতে ভরো।
আকাশ গাঙে খুশির ঢঙে
বৃষ্টি মেয়েরা
তাথৈ তাথৈ নাচছে যে ওই
মত্ত পাগলপারা ।
শনশনিয়ে বইছে বাতাস
মেঘের গরজন
তটিনী নটিনী আজ
ভাসাবে প্লাবন।
সকাল থেকেই বৃষ্টি বাদল
একনাগাড়ে বাজায় মাদল ,
ঝুমঝুমিয়ে
বৃষ্টি ধারা
ভীষণ চঞ্চল ।
দীঘি ভরা কানায় কানায়
ঢেউ আছড়ে পড়ে,
খবরদার যেয়ো না কেউ
পদ্মদীঘির ধারে ।
অঝোর ধারায় ছন্দ হারায়
স্বাভাবিক জন জীবন,
ময়ূরের মতো নেচে উঠে তবু
কাব্য পিয়াসী কবি মন ।
এমন দিনে ঘরের কোনে
কেন বসে থাকা
প্রাণ ভরে বৃষ্টিতে ভিজি
মাথায় নিয়ে ছাতা।।
কবিগুরুর ভাষায় বর্ষা ঋতু মাতৃসম কারণ এই ঋতু প্রকৃতিকে উর্বরা করে মানব জীবনে প্রাচুর্যের সন্ধান এনে দেয়। জীবন ধারা অবিরত বয়ে চলে সম্পৃক্ত হয়ে। আর প্রকৃতি ও জীবন যেখানে বয়ে যায় নিরন্তর সেখানে জীবন সঙ্গিনী অর্থাৎ প্রিয়তমার আবাহন অনিবার্য। তাই তো বর্ষা মানব মনে নিভৃতে বপন করে দেয় স্বর্গীয় প্রেমের অনুভূতি। প্রেমিকা কিংবা দয়িত নারী সেখানে হয়ে ওঠে মেঘ ও বৃষ্টিরই সমার্থক। তাই তো কবির ভাষায় - তোমার সাড়ায় বৃষ্টি ঝরে। এই নামেই আমার একটি কবিতা -
(১২)
তুমি শুধু মেঘ হয়েই ভাসতে ভালবাসো
আমার বিদ্ধ এক নজরে বৃষ্টি হয়ে এসো।
চোখে তোমার অনাদি আর অনন্ত ধরা
আমার সূক্ষ্ম জগৎ শুধু রুক্ষ খরায় ভরা।
তোমার চোখে ব্রাত্য আমি চিরটি কাল
আমার স্বপ্ন তোমায় নিয়েই টালমাটাল।
নীরব তুমি সঘন মগ্ন তোমায় নিয়ে
নিঃস্ব আমি তোমার মাঝে সব হারিয়ে।
তোমার খেয়াল শুধুই তোমার এক্তিয়ারে
আমার কথায় তোমার সাড়ায় বৃষ্টি ঝরে।
গরজ তোমার আমায় নিয়ে ভাবনা জাগে
হৃদয় আমার দোলেই রাগে অনুরাগে।
তুমি যবে ঝরেই পড়ো আমার মুখোমুখি
তোমার কথার তোড়ে আমি বড্ড যে সুখী।
এমনি করে এসো আমার কল্পনা, বাস্তবে
হবে ধরায় তোমার আমার স্বর্গবাস তবে।
বর্ষা শুধু কল্পনাতেই নয়। বাস্তবেও বর্ষার রূপ অপরূপ। বর্ষার ভোরে বৃষ্টিভেজা পাখির ওড়াওড়ি কিংবা ভিজে একসা হয়েও দ্বৈত আলাপনে কিছুক্ষণ সংলাপ - কিছুই এড়িয়ে যায়না কবির চোখ। পরিবেশ অনুযায়ী পৃথিবীর বুকে বর্ষার নেমে আসাও জন্ম দেয় ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যকল্প। মনে প্রশ্ন জাগে কেমন আমাদের একান্ত কাছের বর্ষা ? গ্রাম বরাকের বর্ষা ? আসুন, হদিশ খুঁজে নেই আমাদের একেবারেই কাছের গুরুজন কবি সুশান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায়। কবিতার নাম - বর্ষার ভোরে।
(১৩)
দূর দিগন্ত জুড়ে ধূ ধূ মাঠ
তারপর ছোট ছোট টিলা-বস্তি-গ্রাম
আকাশ - সো.......জা নেমে গেছে ওই গ্রামে
মধুরা নদী আছে তারই কিনারে।
বরাক বয়ে চলেছে আরেকটু দূরে
বাঁক ঘুরে, আপন ছন্দ তুলে
ভরা বর্ষার ঘোলা জল নিয়ে।
বর্ষার ভোরে বৃষ্টিতে ভিজেও পাখিরা -
ওড়ে চলে যায় দূরে
কিংবা সামনের গাছে এসে বসে -
কোনো দূর গ্রাম থেকে উড়ে এসে।
তারপর কিছুক্ষণ সংলাপ - জোড়ায় জোড়ায় আলাপ
তার পর, আবার দূরে চলে যায়।
গ্রামীণ জীবনের ছবি এভাবেই তৈরি হয়
রাতভর বৃষ্টির পরে কোনো এক বর্ষার ভোরে
এই সবই দেখি আমি আনমনে
বৃষ্টিতে ছাতা হাতে - প্রাতঃভ্রমণে।
কবির মনোজগতে বর্ষার এই যাবতীয় রূপকথা এক সময় জন্ম দেয় বিষাদগ্রস্ত যাপন কথার। হয়তো বা বয়সের তরতর বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই পরিবর্তিত হতে থাকে এই রূপগাথা। কঠিন বাস্তব এসে বর্ষারানির উচ্ছলতার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। অপরূপ রূপমাধুরীর হারিয়ে যাওয়ার কল্পকথায় জন্ম হয় বেদনার। সেই সুর কবিতায় ফুটে উঠে কবির কলমে। শ্রদ্ধার কবি রবিশঙ্কর ভট্টাচার্যের কবিতা ‘শ্রাবণ’ সেই কথাই বলে।
(১৪)
ছাইরঙা আকাশের গায়
বিন্দু বিন্দু জল বুকে মেঘ
গুমোট ভাবনায় সুর ছন্দ এলোমেলো
রবি যেন পথহারা
ম্লান হাসে সাথীহারা চাঁদ
তারই মাঝে
বারিপাতে দেশ মল্লার
কথায় মজেছে সারি সারি পল্লবের ঝোপ
শিস দিয়ে নেচে চলে আনন্দ উল্লাসে
পাড় ছেয়ে ফুঁসে ওঠে
নদ নদী খাল বিল জলাশয় যত
মাছের আঁশটে গন্ধ
গ্রাম মাঠে শোনা যায়না
হুরর হুরর তি তি চা
ভটভটিতে নদী পার
হালিচারা বিকোয় দ্বিগুন দরে
মাস শ্রাবনে তারকনাথের স্তব
ভক্তের ঢল
মুখে ‘ভোলে ব্যোম তারক ব্যোম’
আনমনে এই একই বর্ষা - তার ঝরোঝরো বৃষ্টি, কবির মনোজগতে জন্ম দেয় এক অনাবিল কল্পনা। গ্রাম শহর ছাড়িয়ে মানুষের অন্তরে অন্তরে ছড়িয়ে যায় এই কল্পনা। সৃষ্টি হয় নতুন কল্পকথা, উছল বৃষ্টিময়তা। প্রতিষ্ঠিত কবি তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থের কল্পনায় সেই কল্পকথারই আভাস। কবিতা - এমন বৃষ্টিতে।
(১৫)
এমন বৃষ্টিতে কথা না রাখলে পাপ হয়,
স্বর্গ থেকে নেমেছে এ বৃষ্টিধারা বহুদিন পর,
মারকুটে মিনিবাস, ছাতাহীন ট্রাফিক পুলিশ
আজ সব ধুলো-ময়লা সাফ-করা
ধারাজলে স্নাত হবে বলে
নতজানু পথের উপর।
অমোঘ বর্ষণ
ধুয়ে দিচ্ছে ইস্তেহার, চুন-প্রতিশ্রুতি,
পোস্টারের ছেঁড়া টুকরো
নুয়ে পড়া পতাকার মতো।
অপুষ্টির মেয়েটি তার নিচু বুকে শুনেছে স্পন্দন,
মন্ত্রধ্বনি, যুবকের রবীন্দ্র-সঙ্গীতে।
বর্ষা কখনো ব্যঞ্জনা হয়ে কবির কলমে ধরা দেয় জীবনকথার মূল্যায়নে। কবি জল হাতে অবলীলায় সইয়ালা করেন বৃষ্টির সাথে, বর্ষার সাথে। ব্যতিক্রমী কবি সঞ্জিতা দাশ ব্যঞ্জনায় বর্ষাকে নামিয়ে এনেছেন জীবনপথে, তাঁর দৈনন্দিন জীবনধারায় - তাঁর শিরোনামহীন কবিতাটির মাধ্যমে।
(১৬)
দক্ষিণের জানালায় রোদ আসেনা
হাওয়াগুলো ঘরে ঢুকেই মরে যায়
বৃষ্টির সংগে তাই গোপন সমঝোতায়
রাত পোহালাম
সইয়ালা হলো - জল হাতে নিয়ে।
একটু বসতে দেবে তোমার মাছরাঙা ঠোঁটে ?
বর্ষা নামবে। কে বলে খরা কাটেনা,
এইতো বেশ বর্ষা নামে আজও
উঠোনও নদীজলে সাঁতরায়।
বর্ষার বিস্তৃত রূপের সাথে পাল্লা দিয়ে অনুভূতিগুলোও যেন ব্যঞ্জনা হয়ে উড়ে বেড়ায় দিগবিদিক। কখনো উছল সুখের ছটায় নেচে ওঠে মন তো কখনো মন খারাপ করা অনুভবে কেটে যায় উদাসী দিনমান। আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি হয়ে থাকে দুঃখু মন। যাপন কথা হয়ে ওঠে মন খারাপ আর উতল ঘনঘটার গুমোট আপন কথা। সেই কথা, সেই ব্যথাকেই গাথায় গাঁথতে চেয়েছি আমার এই কবিতায়। নাম - মেঘলা দিনের কবিতা।
(১৭)
মেঘলা দিনের করুণ যাপন ব্যথা,
শুধু মন খারাপ আর আকাশ পানে
অগুনতি সব আঁধার বেলার কথা।
গুমড়ো মুখের আকাশটাকে দেখে,
গুমরে ওঠে হৃদয় অজানিতে
কোন বারতা ছড়ায় আবির মেখে।
সারাটি দিন কালো মেঘের ত্রাস,
আঁধার ঘনায় উতল ঘনঘটায়
অন্তরে আজ পুঞ্জীভূত মন উদাস।
দুপুর শেষে উদাস বিকেল এলো,
কোথায় তুমি আছ - আমার ঝলমলে সেই
সকাল বেলার আলো ?
বর্ষার হাত ধরে ভেসে আসা প্রতিটি জলকণা মানব হৃদয়ে জাগিয়ে তুলে অনুভূতির পাহাড়। কোথাও ব্যথার প্রলেপ তো কোথাও বক্ষজোড়া শূন্যতায় স্বপ্নমাখা কোমল হাতের স্পর্শ। কবি শিপ্রা দাসের কলমে বাস্তব হয়ে ধরা দেয় এই অমলিন চিত্র। কবিতা - রিমঝিম বরষার ধারা।
(১৮)
রিমঝিম ওড়না পরা বরষা,
মন ময়ূরীর চকিত ভাষা l
নবীন পায়ে হেঁটে চলে..
শাল পিয়ালের বন তলে l
বকুল কেতকী হাসনুহানার
উচ্ছাসে,
বর্ষারানীর স্বপ্নমাখা
কোমল স্পর্শে l
অস্তমিত সূর্যের শেষ আভায়,
মেঘ রোদের লুকোচুরি
খেলায়..
স্বপ্নগুলো নিভৃতে অশ্রু ঝরায়,
হারিয়ে যাওয়া সময়ের শূন্যতায়
l
ধীরে ধীরে রথ এগিয়ে
চলেছে..
কোলাহলহীন অজ্ঞাত পথের বাঁকে..
রাজপথ শূন্য, রথের মৌনমিছিলে,
বৃষ্টিকণায় অনুভূতিকে
সামলে নেয়...
বর্ষা কি শুধুই কল্পনার মৌনমিছিল ? কিংবা কবিমনের ঋতু ? একেবারেই নয়। মাঠে মাঠে যখন বর্ষার বরিষণে প্রোথিত হয় বেঁচে থাকার ফসল তখনই তার বিপরীত মেরুতে উপচে পড়া বেনোজলে গরীব মানুষের জীবনে নেমে আসে - সব হারানোর দুর্যোগ। কবির কলম থেমে থাকে না তখনো। ধরা পড়ে যায় আয়নায়। তাই তো আমাদের এই বরাক বাংলার কবি পম্পা ভট্টাচার্যের কবিতায় ঝরে পড়ে দুঃখ, বিষাদ, শ্লেষ। কবিতার নাম - বর্ষা।
(১৯)
বর্ষা তোমার সজল চোখে
ঝরো ঝরো জলের ধারা,
মেঘমালার ছোটাছুটি
আকাশ যেন আত্মহারা।
এসব দেখতে ভালবাসেন
কাব্যটাব্য লেখেন যারা।
কিন্তু যাদের ফুটো চালে
ভাঙ্গা ঘরে জলের ধারা,
গড়িয়ে পড়ে রাতদুপুরে
ঝড়ো হাওয়ায় দিশেহারা।
হাঁটুডোবা কাঁদায় হেঁটে
ছুটছে, আছে কাজের তাড়া,
বানের জলে ঘর হারিয়ে
সব ভাসিয়ে সর্বহারা,
বর্ষা তোমায় ভয় করে সে
দুঃখসহা মানুষ যারা।
পৃথিবী জুড়ে আছে দুঃখ, শোক। আছে মন খারাপের ক্ষণ, আছে বুকের ব্যথা বৃষ্টি ধারার মতো বর্ষা হয়ে ঝরে পড়া। মানবিক আবেগ আর অনুভূতি বেনোজলেরই মতো অঝোর ধারায় ভাসিয়ে দেয় সারা গা। বৃষ্টি আসে, কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অন্তরের ভাবনা, জাগতিক অনুভূতির বৃত্তান্ত। তেমনি এক অসহনীয় বানভাসি বৃত্তান্ত দুরন্ত এক অধরা ছন্দে এসে ধরা দিল - প্রিয় কবি, বাস্তবতার কবি সুপ্রদীপ দত্তরায়ের কবিতায়। বৃষ্টি এলো বৃষ্টি এলো -
(২০)
আজ বিকেলে হঠাৎ করেই বৃষ্টি এলো
আমি তখন ব্যস্ত ভীষণ - মেয়ের কাছে
মেয়ে আমার বাইরে যাচ্ছে,
প্রথমবারের মতো
একা থাকবে দীর্ঘদিন,
থাকেনি তো -
আমি তাই ভীষণ ব্যস্ত টুকটাক গোছগাছে।
বৃষ্টি এলো নিয়ম মেনেই
ঠিক বিকেলে আমার ঘরে
বৃষ্টি এলো।
বৃষ্টি এলো হঠাৎ করেই আকাশ জুড়ে
দালান বাড়ি, চটের কল শ্মশান ঘুরে
বৃষ্টি এলো।
কালো আকাশ, ঘন কালো
হাওয়ায় হাওয়ায় উড়লো ধুলো
বুক কাঁপিয়ে বাতাস এলো
চপল পায়ে আকাশ গেল ঢেকে।
টুপটাপ থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি
বুক ভাসিয়ে চোখ জুড়িয়ে
মেঘ পরীদের সৃষ্টি
ওই যে এলো বৃষ্টি।
গাছের ডালটি নুইয়ে মাথা
বললে - এবার যাও বাড়ি যাও বৃষ্টি এলো
বৃষ্টি এলো।
বৃষ্টি এলো শুকনো মাঠে, পুকুর ঘাটে
পাহাড় তলে, সদর দোরে, বৃষ্টি এলো,
গঞ্জে যারা গেছিল সব ছাউনি তলে সদল বলে
শাঁওলি মেয়ের গা ভিজিয়ে বৃষ্টি এলো নাভিমূলে
পাখিরা সব আকাশ ছেড়ে গাছের ডালে
রাম পিয়ারীর দুধের গাভী
ছুটছে তখন গোয়াল পানে
বৃষ্টি এলো বৃষ্টি এলো বৃষ্টি এলো ।
বৃষ্টি এলো হঠাৎ করেই
চোখের পাতায়, মনের খাতায়,
গুমড়ে ওঠা বুকের মধ্যে।
বন্যা এসে কপোল ভাসায়
ঘরের কোণে, মনের কোণে
বৃষ্টি এলো।
আর দুটো দিন -
মেয়েটি আমার -
বাইরে যাবে, অনেক দুরে।
বৃষ্টি যেথায় দৃষ্টি হারায়, তেমনি দুরে।
বৃষ্টি এলো, বৃষ্টি এলো, বৃষ্টি এলো।
এই দুঃখ আর তারই সাথে অনন্ত সব ভালো খারাপের চিন্তা এসে আচ্ছন্ন করে দেয় উতলা মন। বর্ষা এসে উথলে দেয় বোধ আবার ধুয়ে মুছে ভাসিয়েও নিয়ে যায় নিমেষেই। তবু বোধ করি - এই নয় শেষ কথা। এরও একটা পর আছে। সেই অনন্ত কথারই সূত্র ধরে উপত্যকার আরেক দিকপাল কবি আশুতোষ দাস এর লেখনী থেকে বাদল ধারারই মতো ঝরে পড়ে কবিতার ফল্গুধারা - চকখড়ি
(২১)
অশ্রু জলে ভালোবাসার চকখড়িতে
হৃদআকাশে আঁকছি ।
তোমায় আমি তৃষ্ণা নিয়ে সারাবেলা
চাতক হয়ে ডাকছি।
ঋতুর পরই ঋতু আসে তবু তোমার
মুরলি বাঁশী থামলো না।
পাথর চাপা বুকে কেন বৃষ্টিধারা
প্রেমের ছোঁয়ায় নামলো না।
খরার ফাটল জুড়ে কেবল ধুলো বালি
কুসুম কলি ফুটলো না।
ভালোবাসার আকাশ ছুঁতে পাখি ঝাঁকে
নীলাকাশে ছুটলো না।
তবু আমি ময়ুরপঙ্ক্ষী ডিঙি হলাম
সমুদ্দুরে ভেসে,
তোমার গাঙে সারাবেলা
ডুবছি ভাসছি
ঝড়োজলে হেসে।
বর্ষা এভাবেই মেঘ ও বৃষ্টি হয়ে বসুন্ধরায় আপন খেয়ালে বিরাজমান যুগ যুগ ধরে। কবির মানসসঞ্জাত পংক্তি ধরে কালিদাস, রবীন্দ্রনাথের মতো মহামানবের পিছু পিছু আমরাও যে যার মতো করে গাই বর্ষার গান। একদিন সৃষ্টিরই নিয়মে নতুনও হয়ে যাই পুরাতন। স্বপ্ন দেখি বর্ষারই হাত ধরে মহাপ্রস্থানে পথের শেষ যাত্রায় বৃষ্টিবিধৌত পূর্ণাহুতির ছবি। আঁকি - শেষের স্বপ্ন।
(২২)
হে নুতন -
আমার - ‘কেবলই ছবি, শুধু পটে লিখা’
আজ তুমিও তো পুরাতন।
মনে আছে কি আর ? সেদিন নতুন আবেশে
পাশেই আমি - দিবস দুই।
আকালের সন্ধানে থাকা
এতগুলো বছরে - সেদিনই তো
বৃষ্টি নেমেছিল অঝোর ধারায়।
বৃষ্টিভেজা শীত দুপুরে উত্তাপ শুধু উত্তাপ -
সেই পথ যদি শেষ না হতো
তবে কেমন হতো ?
এর পরেই তো প্রতি রাতে
মৃগয়ার শেষে কিংবা সারা অবেলায়
স্বপ্ন দেখার শুরু - একদিন প্রতিদিন।
আবার একদিন এমনি করেই - সমাপনে
দূর বহুদূরে,
দৃষ্টি অগোচরে
অঙ্গ শোভায় মানস যাপনে - তোমার অবস্থান।
সুখে থেকো হে ক্ষণিকের প্রতিবিম্ব।
- - - - পুনঃশ্চ, আবার হবেই দেখা
অন্যখানে, দিবাবসানে।
বর্ষাশেষের বিদায় ক্ষণে কিংবা আরেক
নতুন সূর্যোদয়ে, নববরষায়, নবীন হর্ষে -
কে জানে
কোন নতুন সুখের স্পর্শে।
(১)
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা - - - - -
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
খর-পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
একখানি ছোট ক্ষেত আমি একেলা,
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়া মসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাত বেলা।
এ পারেতে ছোট ক্ষেত আমি একেলা।
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে !
ভরা পালে চলে যায়,
ভাঙে দুধারে,
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে !
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে !
যত চাও তত লও তরণী পরে ।
আর আছে ? — আর নাই, দিয়েছি ভরে ।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে
এখন আমারে লহ করুণা করে !
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই ! ছোট সে তরী
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
রহিনু পড়ি,
মনে পড়ে বালক বেলার সেই বর্ষামাখা দিনগুলি। ছাতা মাথায় করে গুটি গুটি পায়ে বাইরে বেরিয়ে বৃষ্টিভেজা ঘাস আর পায়ের পাতা ভেজানো জলে ধানের অকর্ষিত ক্ষেতে নেমে পড়া। আল বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলধারার পানে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকা। কীসের আকর্ষণে - জানতাম না। শেষ কৈশোরের অনুসন্ধিৎসু মন কিংবা আগত যৌবনের অভাবিত সুন্দরের পিয়াসী মনের সেই তখন থেকেই শুরু বৈচিত্রের অন্বেষণ। আজ পথের ধারের বৃষ্টিমাখা স্বর্ণলতা ঢেউ তোলে যায় মনগগনে - - - । ধরে রাখতে চেষ্টা করেছি আমার একটি কবিতার মাধ্যমে। কবিতার নাম - বৃষ্টিস্নাত।
(২)
নীল সাগরের সাহস দেখেছ, আকাশ জুড়ে ?
তোমার তো নেই হাসতে মানা।
দিন জোড়া আজ মুহুর্মুহু কতই ঘটা ঘনঘটায়-
তুমিই বা কম কীসে যাও
বাজুক তান আজ সুর বাহারের।
আকাশ তলায়, সাগর ঝরে অঝোর ধারায়
তোমার স্থিতি পথের ধারে
মুক্তোঝরা অরূপ হাসি একই আছে।
কাজলা কালো হরিণ চোখের ইতিউতি
ওই ধারাতে আনচান মন
চাউনি তোমার চকিত চপল
পরখ তোমায়, রিক্ত আমি অগুণতি ক্ষণ।
ভরাট যত ফুটিফাটা, আঁকাবাঁকা কৃষ্ণবিবর
সাকিন তোমার নতুন সাজে
সাজবে মুক্তো হার না মানা।
গর্ভধারণ উল্লাসে আজ মত্ত নদীর শান্ত জঠর
জঙ্ঘা বেয়ে নামবে ধীরে পাগল পারা
পারে পারে তোমারও তো অগুণতি সব
নতুন ছবি, চিত্রকরের পট যে ভরা।
ময়না, শালিক, মাছরাঙা আজ মন্দ্রবিভোর
রঙবাহারের পত্রে আমার দিন যে যাপন।
ঝিরঝির ওই শব্দনিনাদ বাজায় বুকে বিষাদবীণা
ঘোমটা তলে উদাস নয়ন তাকিয়ে থাকে
ফুৎকারে আজ দাও উড়িয়ে
বিলিয়ে দিয়ে রঙমশালের ছন্দটাকে।
সিঞ্চিত ধরিত্রীর একবুক বুভুক্ষা
পিয়াসী পাতায় ছলকে পড়া শান্তিধারা
জীবন ধারণ রসদ তোমার প্রোথিতমূলে
অঙ্গে অঙ্গে তোমার বাহার পাগলপারা।
রন্ধ্রে রন্ধ্রে সুরবাহারের বিরামহীন কোরাস সুর
তপ্ত ধরার অবগাহন সুখের তান
উন্নত শির, তোমার লক্ষ্য নবীন জনম
বিরামবিহীন বুকের মোচড় দু’চোখ বেয়ে অবিশ্রান্ত
তোমার তখন স্বর্ণলতা, জলসা সভায়
বর্ষা ও বৃষ্টিকে নিয়ে কল্পনায় মেতে ওঠার যে আমেজ তা বোধ করি আর কোথাও নেই। কবি মনে চিরন্তন সাড়া জাগায় বর্ষার মনমাতানো রূপ। বৃষ্টি ধারার মাঝে লুকিয়ে থাকে কতই না প্রেম, বিরহের গাথা। বুকের ভেতরে খেলে যায় ঢেউ। রূপকথার নদী হয়ে সঘনে আনাগোণা করে কেউ। তাদের নিয়েই কবিতার মালা গেঁথেছেন প্রিয় কবি, শ্রদ্ধার কবি চন্দ্রিমা দত্ত। কবিতা - কুর্চি সুবাসে কে আসে ?
(৩)
অঝোর বৃষ্টির-ই মতো আজ ঝরছে
মনখারাপ-পালক,
প্রবল হাওয়ায় ঝরছে ... ...
নদী যদি রূপকথা
হাওয়া আসে চরিত্র অবয়বে,
বৃষ্টির সুরে গান হয়ে ঝরলে
বুঝি বুকের ভেতরে আজও ঢেউ,
আনাগোনা করে কেউ ... ...
একাকী নৌকোয় উঠেছে অজস্র ভুল।
বর্ষা এলে, আষাঢ় শ্রাবণ এলেই আজো মনে পড়ে যায় সেই যে কালজয়ী গান - আষাঢ়-শ্রাবণ, মানে না তো মন। না বলা কথা যেন বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে হৃদয় বেয়ে। আকুল আবেদনে কবি শতদল আচার্য আধুনিক কবিতার ধাঁচে লিখছেন, তাঁর মনীষা সিরিজের একগুচ্ছ কবিতা। তারই একটি -
(৪)
আমার আকাশে বৃষ্টি আজ
মেঘ মেঘ মন,
সব কিছু আজ ............।
তোমার ভাল লাগার চোখে মুখে
ফোটে ফুল ........................ ।
আমার জীবনে ............।
নামল বৃষ্টি, তুমি শুষে নিলে
মনীষা, জানি একদিন মিশে যাব ,
চিৎকারে বলব তোমার নাম।
তরুণ কবি শৈলেন দাশ আবার মেঘের সাথে উড়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে কল্পনাকে ছড়িয়ে দেন তাঁর কবিতার মাধ্যমে। বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় জন্ম নেয় কবিতা - তুমি হাত বাড়ালেই।
(৫)
তুমি হাত বাড়ালেই আমি
মেঘের সাথে উড়ে যেতাম আকাশে
সেখান থেকে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়তাম
সবুজ সতেজ পৃথিবীর বুকে
আমার ক্লান্তি শ্রান্তি সব দূর হয়ে যেত
আমি শান্ত হতাম নিমেষে।
যত দু:খ গ্লানি ব্যথা মুছে যেত
পূরণ হত যত অভিলাষ আমার।
তুমি হাত বাড়ালেই
আমার স্বপ্ন গুলো হত রঙিন
আর এই মন হয়ে উঠত প্রজাপতি
তোমাকে ঘিরে এলোমেলো ভাবনাগুলি
ডানা মেলত বহুদূর চুপিচুপি
আমি ভাবনার দেশে হারিয়ে যেতাম নিমেষে
তুমি হাত বাড়ালেই
আবার যেমন তেমনি বৃষ্টিরাণীকে নিয়ে এক মন না মানা, পড়ে পড়ে আশ না মেটা কবিতা লিখেছেন আমাদের খুব কাছের কবি, ছন্দের কবি দিলীপ দাশ। কবিতার নাম - বৃষ্টিভেজা রাতে।
(৬)
তপ্ত শরীর ভিজিয়ে দিলো বৃষ্টি এসে রাতে,
বললো আমায় রাগ করোনা অনেক দিনে দেখা,
এতো টা দিন ছিলাম আমি মেঘবালিকার সাথে,
শরৎ আমায় নিয়ে গেলো নীল আকাশের গায়,
বর্ষা যখন ছাড়লো চিঠি আমার ঠিকানায়,
ভাবছি বসে এবার আমার ঝরার সময় হলো,
আমার প্রিয়ার গা ভেজাবো বৃষ্টিভেজা রাতে,
কিছু দিন ঝরবো আমি আষাঢ় শ্রাবণ জুড়ে,
কোন এক বর্ষা শুরুর বেলায় নিবিড় সান্নিধ্যে প্রিয়াসঙ্গ সুখ কবির মনকে দোলায়িত করে অনন্ত কাল। অপরূপ প্রকৃতির ছায়া সুনিবিড় গহীনে ঝরাবাদরে নিমগ্ন প্রেমিক হৃদয় - উচাটন মন ঘরে রয় না। কবির একান্ত বাসনা - কিছু দিন ঝরবো আমি আষাঢ় শ্রাবণ জুড়ে, এমন দিনটি আসুক ফিরে ফিরে। অন্তরের সেই গভীর ভাবনাটিকে কবিতায় ধরে রাখার প্রয়াসে আমার একটি কবিতা - এমন দিনটি আসুক ফিরে ফিরে।
(৭)
সবাই যখন ভাসছে প্রেমের সুখস্বপনে
আমি তখন মেঘ পাহাড়ে নিঝুম রাতে
স্বপ্নে সাজাই অলীক কল্পনা।
আজ অতল থেকে ঘুমের ঘোরে
গুমরে ওঠে মিলন তান।
এমন দিনটি আসুক ফিরে ফিরে
এমনি করে বর্ষা শুরুর বেলায়
এক দিন তো মিলবো আবার
অন্য কোনো জীবন নদীর তীরে
জুম পাহাড়ি নতুন পথের ধারে।
আবার তবে রইব চেয়ে
গভীর বনানীতে - একই ছাতার তলায়
বৃষ্টিভেজা এক দুপুরে -
গরম চা-এর চুমুক সাথে চুমুর দূরত্বে
ফারাক বিহীন - অবাক কাছাকাছি।
মন উচাটন এই বর্ষায় একদিকে যেমন ফুটে ওঠে ফারাক বিহীন অবাক বিরহী মনের আকুলতা অন্যদিকে মিলন আশে ভেসে ওঠে প্রিয়ার মুখটি বারবার। মেঘেদের খুনসুটি আর বিগলিত হয়ে ঝরা পড়ার অনাবিল আনন্দ বাকরুদ্ধ করে দেয় কবিকে। তাই তো শিরোনামহীন কবিতার মাধ্যমে বলিষ্ঠ কবি কল্লোল চৌধুরী লিখেন -
(৮)
মেঘেরা করে খুনসুটি
বেলপাহাড়ি রাতে
তোমাকে নিয়ে থাকি আঁধারেতে
মেঘমন্দ্র আকাশে হাজারো তারা
মুখ বুজে হাসে
চাঁদ থাকে তখন অপার বিস্ময়ে
মেঘেরা করে খুনসুটি ।
অফুরান মেঘ
আকাশে ছিল না মেঘের পাঁয়তারা
তবে তোমার বুকে জমা ছিল অফুরান মেঘ
সে মেঘ যখন বৃষ্টি হয়ে নেমেছিল
আমার তখন বলার কিছু ছিল না ।
নিঝুম বরিষণে, প্রিয়া সনে যাপিত সময়ের অনাবিল কত অমর কথার জন্ম হয় কবির কলমে। আমাদের সবার আরেক প্রিয় কবি নিরুপম শর্মা চৌধুরীও তাঁর অনাবিল কল্পকথায় বর্ষার গভীরে করেছেন বিচরণ। তাঁর কথায় - বৃষ্টি তো নয়, যেন এক জীয়নকাঠির ছোঁয়া।
(৯)
বৃষ্টি তো নয়...
মেঘ পরী যত, দেহজ সকল জরা !
জেগে ওঠে দেহ-মন;
প্রাণ-মন উচাটন !
হোক না সহমরণ !
মনে আজ ফাগুন;
কেঁপে যায় অবিরাম;
এক প্রজ্বলিত শিখা;
একই ছন্দে জীবনের যাবতীয় অপ্রাপ্তিকে নির্মল বারিধারায় ধুয়ে মুছে দেওয়ার কাজটিও বর্ষার হাত ধরেই সেরে নিতে চাইছেন আরেক বলিষ্ঠ কবি যিনি একান্তই তাঁর কল্পগাথার মালিক। কবি রূপরাজ ভট্টাচার্যের অসাধারণ লিখন শৈলীতে বর্ষা এখানে কল্লোলিনী, নির্ঝরিনী, দুঃখহারিণী। কবিতার নাম - বৃষ্টি নামুক।
(১০)
আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামুক ,
পাপড়ি ঝরুক
বৃষ্টি নামুক ।
অনেক হৃদয় টুকরো করে
প্রেমের খেলায় সময় গেছে ।
অনেক হৃদয় জয় করেও
হেরে গেলাম নিজের কাছে ।
অনেক আশার ইট-পাথরে
মহল গড়ার সাধ মিটেছে,
চোখ রেখেই তো দিন কেটেছে ।
অনেক দিনের স্বপ্ন দেখার
হাজারটা চোখ অন্ধ হলো,
দাঁড় টানাতেই দিন ফুরালো ।
তাই এবার শুধু বৃষ্টি নামুক
মাঠ ভাসিয়ে -- ঘর ডুবিয়ে,
বৃষ্টি নামুক
বৃষ্টি নামুক !
বৃষ্টিধারার অনাবিল মুগ্ধতায় মন নেচে উঠে কবি জয়শ্রী ভট্টাচার্যের। সুন্দরী বর্ষার মিষ্টি বৃষ্টিতে ভিজে একসা হয়ে যাবার আনন্দে ময়ূরের মতো নেচে ওঠে তাঁর কাব্য পিয়াসী মন। সেই মনের কথাটি বৃষ্টিরই মতো ঝরে পড়ে কবিতা হয়ে - তাঁর ‘বাদল দিনে’ কবিতার হাত ধরে।
(১১)
বৃষ্টি তুমি মিষ্টি বড়
ঝুমঝুমিয়ে ঝরো,
প্রাণ খুশিতে ভরো।
আকাশ গাঙে খুশির ঢঙে
বৃষ্টি মেয়েরা
তাথৈ তাথৈ নাচছে যে ওই
মত্ত পাগলপারা ।
শনশনিয়ে বইছে বাতাস
মেঘের গরজন
তটিনী নটিনী আজ
ভাসাবে প্লাবন।
সকাল থেকেই বৃষ্টি বাদল
একনাগাড়ে বাজায় মাদল ,
ভীষণ চঞ্চল ।
দীঘি ভরা কানায় কানায়
ঢেউ আছড়ে পড়ে,
খবরদার যেয়ো না কেউ
পদ্মদীঘির ধারে ।
অঝোর ধারায় ছন্দ হারায়
স্বাভাবিক জন জীবন,
ময়ূরের মতো নেচে উঠে তবু
কাব্য পিয়াসী কবি মন ।
এমন দিনে ঘরের কোনে
কেন বসে থাকা
প্রাণ ভরে বৃষ্টিতে ভিজি
মাথায় নিয়ে ছাতা।।
কবিগুরুর ভাষায় বর্ষা ঋতু মাতৃসম কারণ এই ঋতু প্রকৃতিকে উর্বরা করে মানব জীবনে প্রাচুর্যের সন্ধান এনে দেয়। জীবন ধারা অবিরত বয়ে চলে সম্পৃক্ত হয়ে। আর প্রকৃতি ও জীবন যেখানে বয়ে যায় নিরন্তর সেখানে জীবন সঙ্গিনী অর্থাৎ প্রিয়তমার আবাহন অনিবার্য। তাই তো বর্ষা মানব মনে নিভৃতে বপন করে দেয় স্বর্গীয় প্রেমের অনুভূতি। প্রেমিকা কিংবা দয়িত নারী সেখানে হয়ে ওঠে মেঘ ও বৃষ্টিরই সমার্থক। তাই তো কবির ভাষায় - তোমার সাড়ায় বৃষ্টি ঝরে। এই নামেই আমার একটি কবিতা -
(১২)
তুমি শুধু মেঘ হয়েই ভাসতে ভালবাসো
আমার বিদ্ধ এক নজরে বৃষ্টি হয়ে এসো।
চোখে তোমার অনাদি আর অনন্ত ধরা
আমার সূক্ষ্ম জগৎ শুধু রুক্ষ খরায় ভরা।
তোমার চোখে ব্রাত্য আমি চিরটি কাল
আমার স্বপ্ন তোমায় নিয়েই টালমাটাল।
নীরব তুমি সঘন মগ্ন তোমায় নিয়ে
নিঃস্ব আমি তোমার মাঝে সব হারিয়ে।
তোমার খেয়াল শুধুই তোমার এক্তিয়ারে
আমার কথায় তোমার সাড়ায় বৃষ্টি ঝরে।
গরজ তোমার আমায় নিয়ে ভাবনা জাগে
হৃদয় আমার দোলেই রাগে অনুরাগে।
তুমি যবে ঝরেই পড়ো আমার মুখোমুখি
তোমার কথার তোড়ে আমি বড্ড যে সুখী।
এমনি করে এসো আমার কল্পনা, বাস্তবে
হবে ধরায় তোমার আমার স্বর্গবাস তবে।
বর্ষা শুধু কল্পনাতেই নয়। বাস্তবেও বর্ষার রূপ অপরূপ। বর্ষার ভোরে বৃষ্টিভেজা পাখির ওড়াওড়ি কিংবা ভিজে একসা হয়েও দ্বৈত আলাপনে কিছুক্ষণ সংলাপ - কিছুই এড়িয়ে যায়না কবির চোখ। পরিবেশ অনুযায়ী পৃথিবীর বুকে বর্ষার নেমে আসাও জন্ম দেয় ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যকল্প। মনে প্রশ্ন জাগে কেমন আমাদের একান্ত কাছের বর্ষা ? গ্রাম বরাকের বর্ষা ? আসুন, হদিশ খুঁজে নেই আমাদের একেবারেই কাছের গুরুজন কবি সুশান্ত ভট্টাচার্যের কবিতায়। কবিতার নাম - বর্ষার ভোরে।
(১৩)
দূর দিগন্ত জুড়ে ধূ ধূ মাঠ
তারপর ছোট ছোট টিলা-বস্তি-গ্রাম
আকাশ - সো.......জা নেমে গেছে ওই গ্রামে
মধুরা নদী আছে তারই কিনারে।
বরাক বয়ে চলেছে আরেকটু দূরে
বাঁক ঘুরে, আপন ছন্দ তুলে
ভরা বর্ষার ঘোলা জল নিয়ে।
বর্ষার ভোরে বৃষ্টিতে ভিজেও পাখিরা -
ওড়ে চলে যায় দূরে
কিংবা সামনের গাছে এসে বসে -
কোনো দূর গ্রাম থেকে উড়ে এসে।
তারপর কিছুক্ষণ সংলাপ - জোড়ায় জোড়ায় আলাপ
তার পর, আবার দূরে চলে যায়।
গ্রামীণ জীবনের ছবি এভাবেই তৈরি হয়
রাতভর বৃষ্টির পরে কোনো এক বর্ষার ভোরে
এই সবই দেখি আমি আনমনে
বৃষ্টিতে ছাতা হাতে - প্রাতঃভ্রমণে।
কবির মনোজগতে বর্ষার এই যাবতীয় রূপকথা এক সময় জন্ম দেয় বিষাদগ্রস্ত যাপন কথার। হয়তো বা বয়সের তরতর বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়েই পরিবর্তিত হতে থাকে এই রূপগাথা। কঠিন বাস্তব এসে বর্ষারানির উচ্ছলতার পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। অপরূপ রূপমাধুরীর হারিয়ে যাওয়ার কল্পকথায় জন্ম হয় বেদনার। সেই সুর কবিতায় ফুটে উঠে কবির কলমে। শ্রদ্ধার কবি রবিশঙ্কর ভট্টাচার্যের কবিতা ‘শ্রাবণ’ সেই কথাই বলে।
(১৪)
ছাইরঙা আকাশের গায়
বিন্দু বিন্দু জল বুকে মেঘ
গুমোট ভাবনায় সুর ছন্দ এলোমেলো
রবি যেন পথহারা
ম্লান হাসে সাথীহারা চাঁদ
তারই মাঝে
বারিপাতে দেশ মল্লার
কথায় মজেছে সারি সারি পল্লবের ঝোপ
শিস দিয়ে নেচে চলে আনন্দ উল্লাসে
পাড় ছেয়ে ফুঁসে ওঠে
নদ নদী খাল বিল জলাশয় যত
মাছের আঁশটে গন্ধ
গ্রাম মাঠে শোনা যায়না
হুরর হুরর তি তি চা
ভটভটিতে নদী পার
হালিচারা বিকোয় দ্বিগুন দরে
মাস শ্রাবনে তারকনাথের স্তব
ভক্তের ঢল
মুখে ‘ভোলে ব্যোম তারক ব্যোম’
আনমনে এই একই বর্ষা - তার ঝরোঝরো বৃষ্টি, কবির মনোজগতে জন্ম দেয় এক অনাবিল কল্পনা। গ্রাম শহর ছাড়িয়ে মানুষের অন্তরে অন্তরে ছড়িয়ে যায় এই কল্পনা। সৃষ্টি হয় নতুন কল্পকথা, উছল বৃষ্টিময়তা। প্রতিষ্ঠিত কবি তীর্থঙ্কর দাশ পুরকায়স্থের কল্পনায় সেই কল্পকথারই আভাস। কবিতা - এমন বৃষ্টিতে।
(১৫)
এমন বৃষ্টিতে কথা না রাখলে পাপ হয়,
আজ সব ধুলো-ময়লা সাফ-করা
ধারাজলে স্নাত হবে বলে
নতজানু পথের উপর।
অমোঘ বর্ষণ
ধুয়ে দিচ্ছে ইস্তেহার, চুন-প্রতিশ্রুতি,
নুয়ে পড়া পতাকার মতো।
অপুষ্টির মেয়েটি তার নিচু বুকে শুনেছে স্পন্দন,
বর্ষা কখনো ব্যঞ্জনা হয়ে কবির কলমে ধরা দেয় জীবনকথার মূল্যায়নে। কবি জল হাতে অবলীলায় সইয়ালা করেন বৃষ্টির সাথে, বর্ষার সাথে। ব্যতিক্রমী কবি সঞ্জিতা দাশ ব্যঞ্জনায় বর্ষাকে নামিয়ে এনেছেন জীবনপথে, তাঁর দৈনন্দিন জীবনধারায় - তাঁর শিরোনামহীন কবিতাটির মাধ্যমে।
(১৬)
দক্ষিণের জানালায় রোদ আসেনা
হাওয়াগুলো ঘরে ঢুকেই মরে যায়
বৃষ্টির সংগে তাই গোপন সমঝোতায়
রাত পোহালাম
সইয়ালা হলো - জল হাতে নিয়ে।
একটু বসতে দেবে তোমার মাছরাঙা ঠোঁটে ?
বর্ষা নামবে। কে বলে খরা কাটেনা,
উঠোনও নদীজলে সাঁতরায়।
বর্ষার বিস্তৃত রূপের সাথে পাল্লা দিয়ে অনুভূতিগুলোও যেন ব্যঞ্জনা হয়ে উড়ে বেড়ায় দিগবিদিক। কখনো উছল সুখের ছটায় নেচে ওঠে মন তো কখনো মন খারাপ করা অনুভবে কেটে যায় উদাসী দিনমান। আষ্টেপৃষ্ঠে বন্দি হয়ে থাকে দুঃখু মন। যাপন কথা হয়ে ওঠে মন খারাপ আর উতল ঘনঘটার গুমোট আপন কথা। সেই কথা, সেই ব্যথাকেই গাথায় গাঁথতে চেয়েছি আমার এই কবিতায়। নাম - মেঘলা দিনের কবিতা।
(১৭)
মেঘলা দিনের করুণ যাপন ব্যথা,
অগুনতি সব আঁধার বেলার কথা।
গুমড়ো মুখের আকাশটাকে দেখে,
কোন বারতা ছড়ায় আবির মেখে।
সারাটি দিন কালো মেঘের ত্রাস,
অন্তরে আজ পুঞ্জীভূত মন উদাস।
দুপুর শেষে উদাস বিকেল এলো,
সকাল বেলার আলো ?
বর্ষার হাত ধরে ভেসে আসা প্রতিটি জলকণা মানব হৃদয়ে জাগিয়ে তুলে অনুভূতির পাহাড়। কোথাও ব্যথার প্রলেপ তো কোথাও বক্ষজোড়া শূন্যতায় স্বপ্নমাখা কোমল হাতের স্পর্শ। কবি শিপ্রা দাসের কলমে বাস্তব হয়ে ধরা দেয় এই অমলিন চিত্র। কবিতা - রিমঝিম বরষার ধারা।
(১৮)
রিমঝিম ওড়না পরা বরষা,
শাল পিয়ালের বন তলে l
স্বপ্নগুলো নিভৃতে অশ্রু ঝরায়,
কোলাহলহীন অজ্ঞাত পথের বাঁকে..
রাজপথ শূন্য, রথের মৌনমিছিলে,
বর্ষা কি শুধুই কল্পনার মৌনমিছিল ? কিংবা কবিমনের ঋতু ? একেবারেই নয়। মাঠে মাঠে যখন বর্ষার বরিষণে প্রোথিত হয় বেঁচে থাকার ফসল তখনই তার বিপরীত মেরুতে উপচে পড়া বেনোজলে গরীব মানুষের জীবনে নেমে আসে - সব হারানোর দুর্যোগ। কবির কলম থেমে থাকে না তখনো। ধরা পড়ে যায় আয়নায়। তাই তো আমাদের এই বরাক বাংলার কবি পম্পা ভট্টাচার্যের কবিতায় ঝরে পড়ে দুঃখ, বিষাদ, শ্লেষ। কবিতার নাম - বর্ষা।
(১৯)
বর্ষা তোমার সজল চোখে
ঝরো ঝরো জলের ধারা,
মেঘমালার ছোটাছুটি
আকাশ যেন আত্মহারা।
এসব দেখতে ভালবাসেন
কাব্যটাব্য লেখেন যারা।
কিন্তু যাদের ফুটো চালে
ভাঙ্গা ঘরে জলের ধারা,
গড়িয়ে পড়ে রাতদুপুরে
ঝড়ো হাওয়ায় দিশেহারা।
হাঁটুডোবা কাঁদায় হেঁটে
ছুটছে, আছে কাজের তাড়া,
বানের জলে ঘর হারিয়ে
সব ভাসিয়ে সর্বহারা,
বর্ষা তোমায় ভয় করে সে
দুঃখসহা মানুষ যারা।
পৃথিবী জুড়ে আছে দুঃখ, শোক। আছে মন খারাপের ক্ষণ, আছে বুকের ব্যথা বৃষ্টি ধারার মতো বর্ষা হয়ে ঝরে পড়া। মানবিক আবেগ আর অনুভূতি বেনোজলেরই মতো অঝোর ধারায় ভাসিয়ে দেয় সারা গা। বৃষ্টি আসে, কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অন্তরের ভাবনা, জাগতিক অনুভূতির বৃত্তান্ত। তেমনি এক অসহনীয় বানভাসি বৃত্তান্ত দুরন্ত এক অধরা ছন্দে এসে ধরা দিল - প্রিয় কবি, বাস্তবতার কবি সুপ্রদীপ দত্তরায়ের কবিতায়। বৃষ্টি এলো বৃষ্টি এলো -
(২০)
আজ বিকেলে হঠাৎ করেই বৃষ্টি এলো
আমি তখন ব্যস্ত ভীষণ - মেয়ের কাছে
মেয়ে আমার বাইরে যাচ্ছে,
প্রথমবারের মতো
একা থাকবে দীর্ঘদিন,
থাকেনি তো -
ঠিক বিকেলে আমার ঘরে
বৃষ্টি এলো।
বৃষ্টি এলো হঠাৎ করেই আকাশ জুড়ে
দালান বাড়ি, চটের কল শ্মশান ঘুরে
বৃষ্টি এলো।
কালো আকাশ, ঘন কালো
হাওয়ায় হাওয়ায় উড়লো ধুলো
বুক কাঁপিয়ে বাতাস এলো
চপল পায়ে আকাশ গেল ঢেকে।
টুপটাপ থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি
বুক ভাসিয়ে চোখ জুড়িয়ে
মেঘ পরীদের সৃষ্টি
ওই যে এলো বৃষ্টি।
গাছের ডালটি নুইয়ে মাথা
বললে - এবার যাও বাড়ি যাও বৃষ্টি এলো
বৃষ্টি এলো।
বৃষ্টি এলো শুকনো মাঠে, পুকুর ঘাটে
পাহাড় তলে, সদর দোরে, বৃষ্টি এলো,
শাঁওলি মেয়ের গা ভিজিয়ে বৃষ্টি এলো নাভিমূলে
পাখিরা সব আকাশ ছেড়ে গাছের ডালে
রাম পিয়ারীর দুধের গাভী
ছুটছে তখন গোয়াল পানে
বৃষ্টি এলো বৃষ্টি এলো বৃষ্টি এলো ।
বৃষ্টি এলো হঠাৎ করেই
চোখের পাতায়, মনের খাতায়,
গুমড়ে ওঠা বুকের মধ্যে।
বন্যা এসে কপোল ভাসায়
ঘরের কোণে, মনের কোণে
বৃষ্টি এলো।
আর দুটো দিন -
মেয়েটি আমার -
বৃষ্টি যেথায় দৃষ্টি হারায়, তেমনি দুরে।
এই দুঃখ আর তারই সাথে অনন্ত সব ভালো খারাপের চিন্তা এসে আচ্ছন্ন করে দেয় উতলা মন। বর্ষা এসে উথলে দেয় বোধ আবার ধুয়ে মুছে ভাসিয়েও নিয়ে যায় নিমেষেই। তবু বোধ করি - এই নয় শেষ কথা। এরও একটা পর আছে। সেই অনন্ত কথারই সূত্র ধরে উপত্যকার আরেক দিকপাল কবি আশুতোষ দাস এর লেখনী থেকে বাদল ধারারই মতো ঝরে পড়ে কবিতার ফল্গুধারা - চকখড়ি
(২১)
অশ্রু জলে ভালোবাসার চকখড়িতে
হৃদআকাশে আঁকছি ।
তোমায় আমি তৃষ্ণা নিয়ে সারাবেলা
চাতক হয়ে ডাকছি।
ঋতুর পরই ঋতু আসে তবু তোমার
মুরলি বাঁশী থামলো না।
পাথর চাপা বুকে কেন বৃষ্টিধারা
প্রেমের ছোঁয়ায় নামলো না।
খরার ফাটল জুড়ে কেবল ধুলো বালি
কুসুম কলি ফুটলো না।
ভালোবাসার আকাশ ছুঁতে পাখি ঝাঁকে
নীলাকাশে ছুটলো না।
তবু আমি ময়ুরপঙ্ক্ষী ডিঙি হলাম
সমুদ্দুরে ভেসে,
ঝড়োজলে হেসে।
বর্ষা এভাবেই মেঘ ও বৃষ্টি হয়ে বসুন্ধরায় আপন খেয়ালে বিরাজমান যুগ যুগ ধরে। কবির মানসসঞ্জাত পংক্তি ধরে কালিদাস, রবীন্দ্রনাথের মতো মহামানবের পিছু পিছু আমরাও যে যার মতো করে গাই বর্ষার গান। একদিন সৃষ্টিরই নিয়মে নতুনও হয়ে যাই পুরাতন। স্বপ্ন দেখি বর্ষারই হাত ধরে মহাপ্রস্থানে পথের শেষ যাত্রায় বৃষ্টিবিধৌত পূর্ণাহুতির ছবি। আঁকি - শেষের স্বপ্ন।
(২২)
হে নুতন -
মনে আছে কি আর ? সেদিন নতুন আবেশে
আকালের সন্ধানে থাকা
এতগুলো বছরে - সেদিনই তো
বৃষ্টি নেমেছিল অঝোর ধারায়।
বৃষ্টিভেজা শীত দুপুরে উত্তাপ শুধু উত্তাপ -
তবে কেমন হতো ?
এর পরেই তো প্রতি রাতে
মৃগয়ার শেষে কিংবা সারা অবেলায়
স্বপ্ন দেখার শুরু - একদিন প্রতিদিন।
আবার একদিন এমনি করেই - সমাপনে
সুখে থেকো হে ক্ষণিকের প্রতিবিম্ব।
- - - - পুনঃশ্চ, আবার হবেই দেখা
অন্যখানে, দিবাবসানে।
নতুন সূর্যোদয়ে, নববরষায়, নবীন হর্ষে -
বিদ্যুৎ
চক্রবর্তী


Comments
Post a Comment