Skip to main content

অনুভবী যাপনের সার্বিক প্রকাশ ‘সিথান’


গল্প, কবিতা, উপন্যাস - সব মিলিয়ে বেশ কটি গ্রন্থ ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি হাতে এল তাঁর কাব্যগ্রন্থসিথানশিথানশব্দের বানানভেদ ক্লান্ত দিনের শেষে রাতের ঘুমন্ত মস্তিষ্কের নিশ্চিন্ত আয়োজন প্রয়োজনও বটে
নারায়ণ মোদক যতটা না কবি কিংবা লেখক তার চাইতে বেশি তাঁর সম্পাদক পরিচয়। বছরে তিন তিনটি নিয়মিত সাময়িকীর সম্পাদক। এর পরেও তিনিই কবি কিংবা লেখক হতে পারেন যাঁর মজ্জায় রয়েছে সৃষ্টিসুখের উল্লাস। এমনই সৃষ্টিময়তার এক বিচিত্র বাখান ‘সিথান’। বিচিত্র অর্থে এখানে কবিতার পঙ্‌ক্তিবিন্যাসের কথাই মূলত বলা হচ্ছে। আপাতপঠনে মনে হতে পারে গদ্য ভেঙে সৃষ্ট একেকটি কবিতা। বাক্যশেষের যতিচিহ্ন তাই অগোছালো মনে হতেই পারে। কিন্তু পাঠশেষে কাব্যসুষমা ষোলোআনা খেলা করে পাঠকহৃদয়ে। কবিতা পাঠের অনুভূতিই জুড়ে বসে অন্তরে। এও এক বিচিত্র কাব্যরূপ বটে। ৬০ পৃষ্ঠার কাব্যগ্রন্থে রয়েছে ৫১ টি কবিতা। বলতে গেলে একটি জীবনকেই যেন কবিতায় অঙ্কিত করে রাখা হয়েছে এখানে। যাপন পথের যাবতীয় সুখ দুঃখকে এক মলাটে পঙ্‌ক্তিবদ্ধ করার এ প্রয়াস নিঃসন্দেহে বিশিষ্টতার এক প্রতীক। এমনকি পূর্বজদের পথ চলা থেকে শুরু করে শেষের কবিতায় ‘আজি হতে শতবর্ষ পরে’র ভাবনাকেও -
প্রায়ই দেশবাড়ির কথা বলে
বাবা ফেলতেন দীর্ঘস্বাস। যখন উনুনে
হাঁড়ি চড়াতে টান পড়ত ভাঁড়ারের
নির্জলা একাদশী থাকত
ছোট বড় সবার মুখ ছবি। ঠাম্মি কলমি শাক
তুলে আনতে ছুটতেন পুকুরপাড়ে...
বাস্তুদেবতা শ্রীকৃষ্ণের থানে জল তুলসী নিবেদনে
চোখের জলে ভাসত বুক নৈবেদ্যির অবর্তমানে...
আজ উঠোন ফাঁকা, ঠাকুর ঘর, উলুধ্বনি,
কাঁসর ঘণ্টা ছন্নছাড়া... অমসৃণ পথে পাথরে
হোঁচট খাই বারবার, মা বহু দূরে
আত্ম-পরিচয়হীন অজানার পথে। (কবিতা - সাদা কালো ছবি, অথ হারানো দিন)।
অধিকাংশ কবিতাই পৃষ্ঠাজোড়া। তবে কিছু স্বল্পাবয়বের কবিতার শরীরেও কবি এঁকে দিতে পেরেছেন বয়ানের রং, ভাবনার পারিপাট্য। যাপনবেলার দীর্ঘ পথ চলার সূত্রে কবির হৃদয় উদ্‌বেলিত হয়েছে নানা ঘাত প্রতিঘাতে। ঘটনা, দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কবি দেখেছেন ধর্ম, ভাষার অহৈতুকী হানাহানি ও কূটকচাল। পাথর হয়েছে হৃদয়। প্রতিবাদী হয়েছে কলম - দ্বিধাহীন, সোচ্চার শব্দচয়নে -
পড়ন্ত বিকেলে সামান্য বৃষ্টি হয়েছিল
আকাশ মেঘে ঢাকা পড়েছিল, মর্গে দুটো লাশ
সারা হাসপাতাল হাহাকারে ভরে উঠেছিল
আকাশে রামধনু দেখার লোক ছিল না সারা শহরে...
শুধুমাত্র মাতৃভাষা বলার অপরাধে।
গল্পচ্ছলে আজও ঝোলা কাঁধে গর্ব করে সেদিনের
পালিয়ে যাওয়ার গল্প বলে কেউ কেউ
পুলিশের ভয়ে ......
সেদিনের রক্তাক্ত বরাক তুমি আজ
বাংলাভাষীর এনআরসি
লক্ষ মুখোশের আড়ালে কেউটেরা কখন ফণা তোলে
শহিদের রক্তে রাঙানো বরাকে। (কবিতা - সেদিন এবং আগামী দিনের কথকতা)।
কিছু কবিতা গভীর ভাবনার জন্ম দেয় পাঠক হৃদয়ে। যেমন - উপযুক্ত সময়, অনুভব, দিন যাপন, ঠিকানাহীন মানুষ, উত্তরে হাওয়া বয়, আগ্রাসন, বংশ লতিকা, একলা চলো রে, আমার দেশ, খোলস, নটরাজ ইত্যাদি। সব কবিতায় শব্দেরা হয়েছে বাঙ্ময়, জীবন্ত।
কিছু বানান ভুলের বাইরে আদ্যোপান্ত এক তীর্যক প্রতিবাদ আর যাপন ব্যথার সুসজ্জিত উপস্থাপন ‘সিথান’। ছিমছাম প্রচ্ছদে পেপারব্যাক এই গ্রন্থটি উৎসর্গ করা হয়েছে কোভিড যোদ্ধাদের প্রতি। প্রকাশক নীলকমল মোদক, পরিপাটি মুদ্রণে স্কলার পাবলিকেশন, করিমগঞ্জ।

বিদ্যুৎ চক্রবর্তী

মূল্য - ১০০ টাকা।
যোগাযোগ - ৯৪৩৫০৭৬০৬৯ 

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...