সম্ভ্রান্ত মজুমদার
বংশের চতুর্থ প্রজন্মের প্রথম পুত্র সন্তানের আজ মুখে ভাত। অন্নপ্রাশন। হইচই, আয়োজন বিয়েবাড়িকেও হার মানায়। কথ্য
অনুযায়ী বারো বছরে যদি এক যুগ হয়ে থাকে তাহলে প্রথম প্রজন্ম গত হয়েছেন দুই যুগ আগে। পায়ের
তলার মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে এদেশে এসে থিতু হতেই কেটে গেছে জীবনকাল। পরবর্তী
প্রজন্মের জন্য রেখে গেছেন শুধু গ্রামের এক বাড়ি আর শিক্ষা ও সংস্কার। সেই
নিয়ে নতুন করে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসে পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পেয়েছে দ্বিতীয় প্রজন্ম ফের
একবার। সুখের সন্ধানে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তৃতীয়
প্রজন্মকে সুরক্ষিত করে রাখতে দিন রাত একাকার করে শেষে তৃতীয় প্রজন্মের হাতে সুখের
চাবিকাঠি সমর্পণ করে গত হয়েছেন দ্বিতীয় প্রজন্মের পুরুষটিও।
ইতিমধ্যে একই ধারায় এক এক করে এ সংসারে প্রবেশ ঘটেছে বাড়ির মা-বউদের। তাঁদের চিন্তাধারা, দেশাচার, লোকাচার এ বাড়িতে এসে মিলেমিশে এক নতুন আচার সংহিতা গড়ে উঠেছে সংসারের অভ্যন্তরে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বউ, তৃতীয় প্রজন্মের মা আজ সংসারের গৃহকর্ত্রী। মাথা তুলে দাঁড়ানোর সংগ্রামের কিছুটা আঁচ তিনিও পেয়েছেন প্রথম প্রথম এ সংসারে এসে। এরপর ক্রমে ক্রমে আর্থিক স্বচ্ছলতার সাক্ষীও তিনি। উন্নয়নের রেখাচিত্র তাঁর সামনেই হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। এর সাথে সঙ্গতি রেখে তাঁর স্বভাব চরিত্র, চাওয়া পাওয়াও বদলেছে বিলক্ষণ। তিনি কোনোদিনই ধূসর অতীতকে মাথায় জায়গা দেননি, দিতে চাননি। তাঁর চাহিদা ছিল নিরন্তর ঊর্ধ্বমুখী। যেমন পিছন ফিরে তাকাতে রাজি ছিলেন না তেমনি শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত পিছনে পড়ে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেও তিনি ছিলেন অনাগ্রহী। ভয় - পাছে অর্থকড়ি কিংবা সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে টান পড়ে। বাইরে যদিও বুঝতে দিতে চাইতেন না তবু তাঁর আচার আচরণে ধরা পড়ে যেত তাঁর এ স্বভাব। তিনি অবশ্য এসব গায়ে মাখতেন না। স্বভাবতই তাঁর সঙ্গে অনেকেই তেমন যোগাযোগ রাখতেন না। তিনিও তা চাইতেন না। তাঁর যোগাযোগ ছিল স্বচ্ছল এবং বিশেষ করে বাপের বাড়ির দিকের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেই। স্বস্তি পেতেন ভেবে যে তাঁর সন্তানকে অর্থাৎ তৃতীয় প্রজন্মকে তিনি নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছেন। সব সময় বলতেন - কখনও নিচের দিকে তাকাবে না, চোখটা রাখবে উপরের দিকে। তেমনই হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের ছেলে অয়ন। কোনও রকম সংস্কার কিংবা পারিবারিক ঐতিহ্যের ধার না ধেরে নিজে দেখেশুনে ভালোবেসে বিয়ে করেছে রোজগেরে মেয়েকে। এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি মীরা দেবী। বরং ছেলের বুদ্ধিমত্তায় আনন্দিত হয়েছেন খুব। বিত্তের প্রাচুর্যে আজ মজুমদার বংশের যাবতীয় ঐতিহ্য ভেঙে তৃতীয় প্রজন্মকে প্রতিষ্ঠিত দেখে উৎফুল্ল হয়েছেন বেজায়।
দ্বিতীয় প্রজন্মের
সেই একমাত্র জীবিত প্রতিভূ মীরা দেবী স্বভাবতই আজ গৃহকর্ত্রী হিসেবে সাংঘাতিক রকমের
ব্যস্ত। অন্নপ্রাশন অনুষ্ঠানের জাঁকজমকের দিকেই
তাঁর বেশি নজর। দিনে নিজেদের ঘরেই বিধি অনুযায়ী অনুষ্ঠিত
হবে সব পর্ব। রাতে বিবাহ ভবন ভাড়া করে সাজিয়ে তোলা
হয়েছে মনের মতো করে। হাজারখানেক নিমন্ত্রিত
রয়েছেন। রাতের গোটা পর্বের ভার দেওয়া হয়েছে ইভেন্ট
ম্যানেজমেন্ট গ্রুপকে। গোটা তিরিশেক
পদ রাখা হয়েছে খাদ্যতালিকায়। আপ্যায়ন
ও প্রাচুর্যের প্রদর্শনে যেন কোনোরকম ত্রুটি না থাকে তার দিকে সবার প্রখর নজরদারি।
দুপুরেও প্রায় পঞ্চাশ জনের মতো নিমন্ত্রিত রয়েছেন। বেশির ভাগই অয়নের মামা মাসির দিকের। আয়োজন এখানেও সমানুপাতিক। নয়-দশটি পদ। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব চারদিকে। পুরোহিত মশাই যথাসময়ে এসে শুরু করে দিয়েছেন পূজা-আচার। নিজের এবং পুত্রবধূর শাড়ি নিজেই কিনেছেন মীরা দেবী। রাতের জন্য পাঁচ অঙ্কের দামি শাড়ি। দুপুরেও যতটা সম্ভব ঠাট বজায় রাখা মতো। আত্মীয় স্বজন যাঁরা এসেছেন সবার জন্যই কাপড়চোপড় কেনা হয়েছে। খুব বুদ্ধি খাটিয়ে বেশি দামের ট্যাগ লাগানো কম দামের কাপড়। গিফটের জন্য বেশি খরচ করতে কোনোদিনই আগ্রহী নন মীরা দেবী। ছ’মাস বয়সের চতুর্থ প্রজন্মের শিশুপুত্রের এসব দিকে আর কী নজর থাকবে। সে জানে না তার কাপড়টির দাম কত। বরং এসব নতুন কাপড়ের বিটকেলে গন্ধ আর খসখসে স্পর্শে তার কিছু অস্বস্তিই হচ্ছে।
পুজোআচ্চা শেষে পুরোহিত বললেন - এবার শিশুকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করুন। তিথি শেষের দিকে।
সব তৈরিই আছে। পঁচিশটি পদের বাটি সাজানো হল শিশুর সামনে। ধূপ, ধুনো, ভাতের থালা, জলের গ্লাসও এসে গেল। ঘর ভর্তি লোকজন। ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার ক্যামেরা তাক করে তৈরি। এবার শিশুর মামাকে ডাকা হল। তিনি এসে বসলেন সাজানো পিড়িতে। অন্ন ছোঁয়ানো হল শিশুপুত্রের মুখে। উলুধ্বনি আর হইচই শুনে শিশুটি চারপাশটা দেখে নিল সপ্রশ্ন চাউনিতে।
এবার পুরোহিত মশাই বললেন - অন্নপ্রাশনের ডালাটি এবার নিয়ে আসুন।
প্রথম থেকেই সবার আগে মীরা দেবী। সবকিছু সুচারু নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তাঁর হাতে। কেউ একজন নিয়ে এলেন ডালাটি। পুরোহিত মশাই একবার দেখে নিলেন - ধান, বই, খই, দড়ি, সোনা, কলম, মাটি, কিছু নতুন চকচকে খুচরো পয়সা, কড়ি ইত্যাদি। সব ঠিক আছে। ফটোগ্রাফার অ্যাকশন মুডে তৈরি হয়েই আছে। মামা সামগ্রীর ডালাটি তুলে ধরলেন ভাগ্নের সামনে। সবাই উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে কীসের উপর শিশুর হাতটি পড়ে। যেন এ তার সারা জীবনের পথ চলার ইঙ্গিত। অবশ্য এমনটাই অনুমান করা হয়। এ এক চিরন্তন রেওয়াজ। যদিও এ নিতান্তই এক লোকাচার তবু সবাই চাইছেন মজুমদার বংশের শিশু যেন তার উপযুক্ততার প্রমাণ রাখে।
মীরা দেবী উত্তেজনায় বলতে গেলে চোখ প্রায় বুজেই ফেলেছেন। আজ তাঁর এতদিনের সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা। মনে মনে আওড়াচ্ছেন - ‘আজ আমার পরীক্ষা ভগবান’। শিশুটি নিশ্চিত তাঁর মুখ রক্ষা করবে। আভিজাত্য আর অহংকারকে মাটিতে মিশে যেতে দেবে না সে। মনে পড়ে যায় আজ বহু বছর আগে অয়নের অন্নপ্রাশনের কথা। তখন সরাসরি প্রথম বারেই সে সোনার অলংকার ধরে হাতের মুঠোয় নিয়েছিল। খুশিতে আত্মহারা হয়েছিলেন মীরা দেবী। কিন্তু এতটা আহ্লাদিত হননি তাঁর স্বামী। মাটিতেই ছিল তাঁর শেকড়। তাঁর শেকড়চ্যুত বাবাকে তিনি দেখেছেন পায়ের তলার মাটিটাকেই শক্তপোক্ত করতে কতটা ঘাম ঝরাতে হয়। তাই তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পুত্র মাটিকেই আঁকড়ে ধরুক। এ টালমাটালের দিনে শেকড়টাই পোক্ত হোক। রাতে এ নিয়ে মৃদু কথা কাটাকাটিও হয়েছিল সেদিন দুজনের মধ্যে। আজ বন্ধ চোখের সামনে যেন সেই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন মীরা দেবী।
এমন সময় হইহই শব্দে ঘোর ভাঙে তাঁর। শিশু নাতিটি তার হাতটা রেখেছে ধানের উপর। সবাই জোরে জোরে কথা বলছে, হাসছে। হাততালি দিচ্ছে কেউ। মীরা দেবী যেন দুঃস্বপ্ন দেখছেন। এভাবে তাঁর সাধ আহ্লাদ মাটিতে মিশিয়ে যেতে দেখে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লেন ভিতরে ভিতরে। পরিস্থিতি সামলাতে বুদ্ধি করে স্বর পঞ্চমে নিয়ে বললেন - ও হাত লেগে গেছে শুধু, ধরেনি তো। থালাটাকে আবার রাখো ওর সামনে।
ইশারায় কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা বোনকে বললেন থালাটা ঘুরিয়ে সোনার দিকটা শিশুর কাছে রাখতে। ইঙ্গিত পলকে ধরে নিয়ে তেমনই করা হল। আবার সবাই উন্মুখ হয়ে রইলেন। মীরা দেবী এবার নিশ্চিত - নাতি তাঁর সোনাই ধরবে। কিন্তু এ কী ? এবার মামার কোলে বসেই অনেকটা সামনের দিকে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে সে মুঠো ভরে নিয়ে এল এক ডেলা মাটি। এক মৃদু নীরবতায় ছেয়ে গেল চরাচর। লজ্জায় মুখ ঢাকলেন মীরা দেবী। আর কিছুই করার রইল না তাঁর।
ফিসফিস গুঞ্জনের মধ্যেই নিয়ম অনুযায়ী অন্নপ্রাশন পর্ব সমাধা হল শিশুর। উলুধ্বনি হল ফের, ছবিওয়ালা বিভিন্ন কোণ থেকে শ'খানেক ছবি তুলল। ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে গেলেন মীরা দেবী। ঘুরে গেছে মাথা, খালি হয়ে গেছে অন্তর। এসব আড়ম্বর যেন তাঁর কাছে ফিকে হয়ে গেল নিমেষেই।
দুপুরের পর রাতের আপ্যায়ন পর্ব সমাধা হল যথানিয়মে। মীরা দেবী অনেকটাই সময় নিলেন স্বাভাবিক হতে। তাঁর এতদিনের অধ্যবসায় যে এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে তাঁরই নাতি এটা হজম করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি পুরোপুরি। সব কিছু সেরে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে রাতে ঘরে ফিরে বিছানায় গেলেন তিনি। ঘুম আসছিল না। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই খানিকটা চোখ খুলে তাকালেন দেয়ালে টাঙানো মৃত স্বামীর ছবির দিকে। মনে হল যেন ওখান থেকেই তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। পিত্তি জ্বলে উঠল মীরা দেবীর। সব রাগ গিয়ে পড়ল তাঁরই উপর - জিতে গেলে আজ, না ? হাসি আর ধরে না দেখছি।
কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলল - মাটির মানুষ মাটি ধরেছে। এই তো চাই। বেঁচে থাক আমাদের ধরিত্রীপুত্র।
ইতিমধ্যে একই ধারায় এক এক করে এ সংসারে প্রবেশ ঘটেছে বাড়ির মা-বউদের। তাঁদের চিন্তাধারা, দেশাচার, লোকাচার এ বাড়িতে এসে মিলেমিশে এক নতুন আচার সংহিতা গড়ে উঠেছে সংসারের অভ্যন্তরে। দ্বিতীয় প্রজন্মের বউ, তৃতীয় প্রজন্মের মা আজ সংসারের গৃহকর্ত্রী। মাথা তুলে দাঁড়ানোর সংগ্রামের কিছুটা আঁচ তিনিও পেয়েছেন প্রথম প্রথম এ সংসারে এসে। এরপর ক্রমে ক্রমে আর্থিক স্বচ্ছলতার সাক্ষীও তিনি। উন্নয়নের রেখাচিত্র তাঁর সামনেই হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী। এর সাথে সঙ্গতি রেখে তাঁর স্বভাব চরিত্র, চাওয়া পাওয়াও বদলেছে বিলক্ষণ। তিনি কোনোদিনই ধূসর অতীতকে মাথায় জায়গা দেননি, দিতে চাননি। তাঁর চাহিদা ছিল নিরন্তর ঊর্ধ্বমুখী। যেমন পিছন ফিরে তাকাতে রাজি ছিলেন না তেমনি শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কিত পিছনে পড়ে থাকা আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেও তিনি ছিলেন অনাগ্রহী। ভয় - পাছে অর্থকড়ি কিংবা সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে টান পড়ে। বাইরে যদিও বুঝতে দিতে চাইতেন না তবু তাঁর আচার আচরণে ধরা পড়ে যেত তাঁর এ স্বভাব। তিনি অবশ্য এসব গায়ে মাখতেন না। স্বভাবতই তাঁর সঙ্গে অনেকেই তেমন যোগাযোগ রাখতেন না। তিনিও তা চাইতেন না। তাঁর যোগাযোগ ছিল স্বচ্ছল এবং বিশেষ করে বাপের বাড়ির দিকের আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গেই। স্বস্তি পেতেন ভেবে যে তাঁর সন্তানকে অর্থাৎ তৃতীয় প্রজন্মকে তিনি নিজের মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছেন। সব সময় বলতেন - কখনও নিচের দিকে তাকাবে না, চোখটা রাখবে উপরের দিকে। তেমনই হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের ছেলে অয়ন। কোনও রকম সংস্কার কিংবা পারিবারিক ঐতিহ্যের ধার না ধেরে নিজে দেখেশুনে ভালোবেসে বিয়ে করেছে রোজগেরে মেয়েকে। এতে বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি মীরা দেবী। বরং ছেলের বুদ্ধিমত্তায় আনন্দিত হয়েছেন খুব। বিত্তের প্রাচুর্যে আজ মজুমদার বংশের যাবতীয় ঐতিহ্য ভেঙে তৃতীয় প্রজন্মকে প্রতিষ্ঠিত দেখে উৎফুল্ল হয়েছেন বেজায়।
দুপুরেও প্রায় পঞ্চাশ জনের মতো নিমন্ত্রিত রয়েছেন। বেশির ভাগই অয়নের মামা মাসির দিকের। আয়োজন এখানেও সমানুপাতিক। নয়-দশটি পদ। সকাল থেকেই সাজো সাজো রব চারদিকে। পুরোহিত মশাই যথাসময়ে এসে শুরু করে দিয়েছেন পূজা-আচার। নিজের এবং পুত্রবধূর শাড়ি নিজেই কিনেছেন মীরা দেবী। রাতের জন্য পাঁচ অঙ্কের দামি শাড়ি। দুপুরেও যতটা সম্ভব ঠাট বজায় রাখা মতো। আত্মীয় স্বজন যাঁরা এসেছেন সবার জন্যই কাপড়চোপড় কেনা হয়েছে। খুব বুদ্ধি খাটিয়ে বেশি দামের ট্যাগ লাগানো কম দামের কাপড়। গিফটের জন্য বেশি খরচ করতে কোনোদিনই আগ্রহী নন মীরা দেবী। ছ’মাস বয়সের চতুর্থ প্রজন্মের শিশুপুত্রের এসব দিকে আর কী নজর থাকবে। সে জানে না তার কাপড়টির দাম কত। বরং এসব নতুন কাপড়ের বিটকেলে গন্ধ আর খসখসে স্পর্শে তার কিছু অস্বস্তিই হচ্ছে।
পুজোআচ্চা শেষে পুরোহিত বললেন - এবার শিশুকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করুন। তিথি শেষের দিকে।
সব তৈরিই আছে। পঁচিশটি পদের বাটি সাজানো হল শিশুর সামনে। ধূপ, ধুনো, ভাতের থালা, জলের গ্লাসও এসে গেল। ঘর ভর্তি লোকজন। ফটোগ্রাফার, ভিডিওগ্রাফার ক্যামেরা তাক করে তৈরি। এবার শিশুর মামাকে ডাকা হল। তিনি এসে বসলেন সাজানো পিড়িতে। অন্ন ছোঁয়ানো হল শিশুপুত্রের মুখে। উলুধ্বনি আর হইচই শুনে শিশুটি চারপাশটা দেখে নিল সপ্রশ্ন চাউনিতে।
এবার পুরোহিত মশাই বললেন - অন্নপ্রাশনের ডালাটি এবার নিয়ে আসুন।
প্রথম থেকেই সবার আগে মীরা দেবী। সবকিছু সুচারু নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি তাঁর হাতে। কেউ একজন নিয়ে এলেন ডালাটি। পুরোহিত মশাই একবার দেখে নিলেন - ধান, বই, খই, দড়ি, সোনা, কলম, মাটি, কিছু নতুন চকচকে খুচরো পয়সা, কড়ি ইত্যাদি। সব ঠিক আছে। ফটোগ্রাফার অ্যাকশন মুডে তৈরি হয়েই আছে। মামা সামগ্রীর ডালাটি তুলে ধরলেন ভাগ্নের সামনে। সবাই উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে রয়েছে কীসের উপর শিশুর হাতটি পড়ে। যেন এ তার সারা জীবনের পথ চলার ইঙ্গিত। অবশ্য এমনটাই অনুমান করা হয়। এ এক চিরন্তন রেওয়াজ। যদিও এ নিতান্তই এক লোকাচার তবু সবাই চাইছেন মজুমদার বংশের শিশু যেন তার উপযুক্ততার প্রমাণ রাখে।
মীরা দেবী উত্তেজনায় বলতে গেলে চোখ প্রায় বুজেই ফেলেছেন। আজ তাঁর এতদিনের সংস্কারের অগ্নিপরীক্ষা। মনে মনে আওড়াচ্ছেন - ‘আজ আমার পরীক্ষা ভগবান’। শিশুটি নিশ্চিত তাঁর মুখ রক্ষা করবে। আভিজাত্য আর অহংকারকে মাটিতে মিশে যেতে দেবে না সে। মনে পড়ে যায় আজ বহু বছর আগে অয়নের অন্নপ্রাশনের কথা। তখন সরাসরি প্রথম বারেই সে সোনার অলংকার ধরে হাতের মুঠোয় নিয়েছিল। খুশিতে আত্মহারা হয়েছিলেন মীরা দেবী। কিন্তু এতটা আহ্লাদিত হননি তাঁর স্বামী। মাটিতেই ছিল তাঁর শেকড়। তাঁর শেকড়চ্যুত বাবাকে তিনি দেখেছেন পায়ের তলার মাটিটাকেই শক্তপোক্ত করতে কতটা ঘাম ঝরাতে হয়। তাই তিনি চেয়েছিলেন তাঁর পুত্র মাটিকেই আঁকড়ে ধরুক। এ টালমাটালের দিনে শেকড়টাই পোক্ত হোক। রাতে এ নিয়ে মৃদু কথা কাটাকাটিও হয়েছিল সেদিন দুজনের মধ্যে। আজ বন্ধ চোখের সামনে যেন সেই দৃশ্য দেখতে পাচ্ছেন মীরা দেবী।
এমন সময় হইহই শব্দে ঘোর ভাঙে তাঁর। শিশু নাতিটি তার হাতটা রেখেছে ধানের উপর। সবাই জোরে জোরে কথা বলছে, হাসছে। হাততালি দিচ্ছে কেউ। মীরা দেবী যেন দুঃস্বপ্ন দেখছেন। এভাবে তাঁর সাধ আহ্লাদ মাটিতে মিশিয়ে যেতে দেখে বিধ্বস্ত হয়ে পড়লেন ভিতরে ভিতরে। পরিস্থিতি সামলাতে বুদ্ধি করে স্বর পঞ্চমে নিয়ে বললেন - ও হাত লেগে গেছে শুধু, ধরেনি তো। থালাটাকে আবার রাখো ওর সামনে।
ইশারায় কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা বোনকে বললেন থালাটা ঘুরিয়ে সোনার দিকটা শিশুর কাছে রাখতে। ইঙ্গিত পলকে ধরে নিয়ে তেমনই করা হল। আবার সবাই উন্মুখ হয়ে রইলেন। মীরা দেবী এবার নিশ্চিত - নাতি তাঁর সোনাই ধরবে। কিন্তু এ কী ? এবার মামার কোলে বসেই অনেকটা সামনের দিকে ঝুঁকে হাত বাড়িয়ে সে মুঠো ভরে নিয়ে এল এক ডেলা মাটি। এক মৃদু নীরবতায় ছেয়ে গেল চরাচর। লজ্জায় মুখ ঢাকলেন মীরা দেবী। আর কিছুই করার রইল না তাঁর।
ফিসফিস গুঞ্জনের মধ্যেই নিয়ম অনুযায়ী অন্নপ্রাশন পর্ব সমাধা হল শিশুর। উলুধ্বনি হল ফের, ছবিওয়ালা বিভিন্ন কোণ থেকে শ'খানেক ছবি তুলল। ঠায় দাঁড়িয়ে দেখে গেলেন মীরা দেবী। ঘুরে গেছে মাথা, খালি হয়ে গেছে অন্তর। এসব আড়ম্বর যেন তাঁর কাছে ফিকে হয়ে গেল নিমেষেই।
দুপুরের পর রাতের আপ্যায়ন পর্ব সমাধা হল যথানিয়মে। মীরা দেবী অনেকটাই সময় নিলেন স্বাভাবিক হতে। তাঁর এতদিনের অধ্যবসায় যে এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে তাঁরই নাতি এটা হজম করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি পুরোপুরি। সব কিছু সেরে শারীরিক ও মানসিক ভাবে বিধ্বস্ত হয়ে রাতে ঘরে ফিরে বিছানায় গেলেন তিনি। ঘুম আসছিল না। তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থাতেই খানিকটা চোখ খুলে তাকালেন দেয়ালে টাঙানো মৃত স্বামীর ছবির দিকে। মনে হল যেন ওখান থেকেই তাঁর দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন। পিত্তি জ্বলে উঠল মীরা দেবীর। সব রাগ গিয়ে পড়ল তাঁরই উপর - জিতে গেলে আজ, না ? হাসি আর ধরে না দেখছি।
কানের কাছে কে যেন ফিসফিস করে বলল - মাটির মানুষ মাটি ধরেছে। এই তো চাই। বেঁচে থাক আমাদের ধরিত্রীপুত্র।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
Comments
Post a Comment