‘আব্বাজানের হাড়’
গ্রন্থটি গল্পকার দেবব্রত চৌধুরীর প্রথম গল্পসংকলন। মোট বারোটি গল্পের সমাহার এই সংকলনটি। আলোচ্য গল্প ‘আব্বাজানের হাড়
: একটি প্রামাণ্য দলিল’ এই সংকলনের অন্যতম গল্প। গল্পের বিশদ আলোচনায় যাবার আগে অচ্ছেদ্য
প্রসঙ্গক্রমে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যেতে পারে গ্রন্থের ভূমিকায়, যেখানে ‘আমার
কথা’ শিরোনামে গল্পকার খোলামেলা ভাবে মেলে ধরেছেন নিজেকে। গল্প সৃষ্টির গোঁড়ার কথায় এমন কিছু
তথ্য আমরা দেখতে পাই যেখানে আলোচ্য গল্পটির সৃষ্টি রহস্যও হয়তো খুঁজে পাওয়া যেতে পারে
- ‘বাবা আর মার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলাম হরিহর আর সর্বজয়াকে। চা বাগানের একজন সাধারণ
কর্মচারী আমার বাবার জীবনভর ছিল না কোনও উচ্চাভিলাষ। আটপৌরে জীবনে তাঁর একমাত্র
আড়ম্বর ছিল যাত্রাপালা ও চা বাগানের মঞ্চে নাট্যাভিনয়ের শখ শৌখিনতা। ... এই বাবাকে
নিয়ে একটা গল্প লিখার খুব ইচ্ছে ছিল আমার। কিন্তু কেন জানি, হয়তো এত আপন, এত
প্রত্যক্ষ, এত আত্মার আত্মজন হবার জন্যই কিনা, তিনি আমার ধরার মাঝেই অধরা থেকে
গেলেন। তবুও বলি, মনের খুব অজান্তেই হয়তো, নিজের লেখাগুলোর পুনর্পাঠকালে আবিষ্কার
করি - আমার বাবা মা আমার কোনও কোনও গল্পের আটপৌরে চরিত্রে ছাতা হয়ে মিশে গেছেন।’
পরবর্তীতে ‘আব্বাজানের হাড় ...’ গল্পের সৃষ্টিতে এই মিশে যাওয়া যে কতটা প্রেক্ষিত বয়ে এনেছে তা ক্রমশ অনুধাবনযোগ্য। আলোচনাকালে একটি প্রশ্নের অবতারণা উঠে আসে প্রায়শ। গল্প লিখার কি কোনও ব্যাকরণ আছে ? কিংবা একটি গল্প কি আদৌ ব্যাকরণ মেনে লিখা যেতে পারে ? এর উত্তর অনেকটাই জটিল। এখানে গল্পকার ও পাঠকের মধ্যেকার সম্পর্কের ব্যাপারটা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় যে একজন পাঠক গল্পের ব্যাকরণ বলে কিছু আছে বলে এক চুলও অবগত না হন তবু গল্পের সার্থকতা নিয়ে শেষ কথা তো সেই পাঠকই বলবেন। আলোচক, সমালোচকের দায়িত্বটা আসছে পরবর্তী পর্যায়ে। এবং সেই পর্যায়ে এসে যা দেখা যাচ্ছে সেটা অনেকটা বাক্যের সমাপিকা, অসমাপিকা বিষয়ক ধারণারই সমপর্যায়ের। ব্যাকরণ মেনে এবং না মেনে লিখা দু’টি বাক্যের শ্রবণে বা পাঠশেষে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় শ্রোতা বা পাঠক মনে, গল্পের ক্ষেত্রেও তাই। অর্থাৎ কিনা ব্যাকরণ মেনে লিখা একটি গল্প কিংবা বলা যায় একটি গল্প ব্যাকরণসিদ্ধ হয়ে উঠলে তা পাঠকসমাজে তুলনামূলকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
স্বভাবতই আবারও যে প্রশ্ন উঠে আসে তা হল - প্রথমত, গল্প লিখার কি আদৌ কোনও ধরাবাঁধা ব্যাকরণ আছে ? এবং দ্বিতীয়ত, গল্পকার কি আলোচ্য গল্পটি সেই হিসেবেই সাজিয়েছেন ? একটি গল্প লিখতে গিয়ে গল্পের বিষয় অর্থাৎ কাহিনির যে তাড়না গল্পকারের মস্তিষ্কে খেলা করে বেড়ায় সেখানে ব্যাকরণের নিয়ম মানা কিংবা না মানার কি কোনও স্থান আছে ? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় যে একজন সফল গল্পকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাকরণের নিয়মকানুন (যদিও সেরকম ধরাবাঁধা কিছু নেই, তবু নিপাতনে সিদ্ধ গোছের কিছু ছক আবিষ্কার করা গেছে) না মেনেই তা মেনে চলেছেন। এখানেই তাঁর সফলতার চাবিকাঠি।
‘আব্বাজানের হাড়...’ গল্পে গল্পকার দেবব্রত চৌধুরী একসঙ্গে বহু দিক সামলেছেন অসাধারণ মুনশিয়ানায়। দেশভাগজনিত বিড়ম্বনার ফলে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর (গ্রন্থে সংকলিত গল্পসমূহের রচনাকাল) পেরিয়ে গেলেও বিদেশি সন্দেহে নিরীহ মানুষদের উপর সন্দেহযুক্ত নাগরিকত্ব নামক সরকারি অত্যাচারের ঘটনাই গল্পের মূল বিষয় যদিও এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত নিপুণ ছকে পারিপার্শ্বিক চিত্রসমূহকে গল্পকার যেন সেই নিয়ম মেনে চলার মতোই উপস্থাপন করেছেন। মূল বিষয়ের উপর ফোকাস নিবদ্ধ রেখে সাজানো হয়েছে গল্পের প্লট।
প্রথমেই আলোকপাত করা যাক গল্পের ভূমিকাতে। এটা অনস্বীকার্য যে একটা সাসপেন্স কিংবা আরোহন একটি ভূমিকার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছুটা উদ্ধৃতি এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক -
‘রাতশেষের কুমড়ো-ফালি মরা চাঁদটা টুক করে পানসি মেঘের আড়ালে ডুবে গেল। শীতমরা নদী আর তার বিস্তর চর জুড়ে আবছায়া অন্ধকার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ পানসে হয়ে আসছে। ঘণ্টা দুই কাটলেই ভোরের দিকে আলো ফুটবে চরাচরে।
সীমান্ত এলাকা। নদীর ওপারেই বাংলাদেশ। সটান লম্বা কাঁটাতারের বেড়া সীমানা বরাবর। চরের উপর বিশাল অ-ফসলি মাঠটা নাঙা ফকিরের মতো হা হা উদাম। কোনও বড় বা মাঝারি গড়নেরও গাছপালা নেই, শুধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্যাকাস আর শরঘাসের একেকটা বেয়াদপ ঝোপ। আমিরুদ্দি (গল্পের নায়ক) এরকম একটা প্যাকাস ঝোপের অন্ধকারে আব্বাজানের মাসহীন কাঠামোটা পাহারা দিয়ে ঠায় বসেছিল মাঝরাত অবধি।’ - এইটুকু ভূমিকাতেই যে অবধারিত সাসপেন্সের নমুনা দেখিয়েছেন গল্পকার তাতেই এক সম্ভাব্য সংঘাত এর পূর্বাভাস এঁকে দিতে পেরেছেন পাঠক হৃদয়ে। পাশাপাশি গল্পে এসে গেছে কাঙ্ক্ষিত গতিময়তা। এখান থেকে পাঠকের আর সরে যাবার আশঙ্কাও নেই, সেই সুযোগও নেই। এক নিশ্চিত চলমানতার যথার্থ সংকেত ভূমিকাতেই স্পষ্ট করে দিতে পেরেছেন গল্পকার।
এর পর শুরু হয়েছে গল্পের চলন। গড়ে উঠেছে গল্পের কাঠামো, ছড়িয়েছে ব্যাপ্তি। তবে নিক্তি ধরে। কোথাও কোনো ধোঁয়াশা নেই, পক্ষান্তরে নেই কোনও বাহুল্যও। বয়ানের পরিমিত প্রয়োগের চমৎকার নিদর্শন পরিলক্ষিত হয় গল্পে। গল্পের চলন বজায় রাখতে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই। সেই যে প্যাকাস ঝোপের অন্ধকারে আব্বাজানের মাসহীন কাঠামোটা পাহারা দিয়ে ঠায় বসেছিল আমিরুদ্দি - মাঝরাত অবধি এর পর থেকেই মূল গল্পের শুরু। যদিও এই অংশে অবধারিতভাবেই এসেছে প্রেক্ষাপট, যা কিনা আমিরুদ্দির হাতে পৌঁছানো একটা সরকারি নোটিশ - ‘যদিও ভোটার তালিকায় আপনার / আপনার পরিবারের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তবুও আপনি কিংবা আপনার পরিবার ভারতীয় নাগরিক নন বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। সুতরাং......’। এখান থেকেই চলতে শুরু করে গল্প। এভাবে - ‘এই এতটা অবধি পড়ার পরই তো চোখের উপর জমাট অন্ধকার নেমে এসেছিল আমিরুদ্দির। পায়ের তলার মাটি সরে যেতে যেতে শূন্য গহ্বর সৃষ্টি হচ্ছিল। অতল খাদের চূড়া থেকে ঝটকায় কে যেন তাকে নীচে ঠেলে দিয়েছে। শরীরের রক্ত সব এখন হিম, শূন্য হয়ে যাওয়া এক অসাড় অনুভূতি।’
এরপর এগোয় গল্প, এগোয় অসহায়ের জীবনযুদ্ধ। প্রবেশ ঘটে নতুন চরিত্রের। চরিত্র চিত্রণেও গল্পকার চূড়ান্ত রকমের
সতর্ক। অদরকারি
পার্শ্বচরিত্রের আমদানি করে চরিত্রের ভিড়ে হারিয়ে যেতে দেননি বিষয়কে। আলম সাহেব এবং শামাদ নামের মাত্র দু’টি চরিত্রকে সামনে
এনেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে গেছেন গল্পকার। এখানেই তাঁর চূড়ান্ত দক্ষতার পরিচয়। এই পর্বে কিছু মানবিক অনুভূতি, কিছু সম্পর্কের গভীরতাকে
যথাযোগ্য মর্যাদায় স্থাপন করেছেন গল্পকার। এবং এরই মধ্যে নায়কের মানসিক অবস্থারও
এক যথার্থ বর্ণনা প্রতিস্থাপিত হয়েছে যা গল্পের এই মোড়ে এসে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে
উঠেছে পরবর্তী স্তরে পৌঁছানোর জন্য - ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। নিঃশব্দে মাচায় কাঁথা ছেড়ে উঠে বিড়ি
ধরায় আমিরুদ্দি। দেশলাইকাঠির
আগুনে অন্য মাচায় বউ আর বাচ্চাদের জড়াজড়ি করে ঘুম দেখে। বউয়ের মুখটা ঈষৎ হাঁ করা। ভারি পাছা এগিয়ে আছে মাচার সীমানায়। কষে লাথি ঝেড়ে ঘুম ভাঙানোর ইচ্ছে হয়
অদম্য। ইচ্ছে
হয় শরীরটা ঝাঁকিয়ে বলে,
তুই যে এত নিশ্চিন্তে হাঁ-মুখো হয়ে ঘুমোচ্ছিস,
তুই তো মাগি জানিস না তোর শিয়রে মরণ। তুই কি চোখে দেখিস না - এযাবৎ আমার হাল,
আমার রক্তহীন মুখ, আমার অনিদ্রা, আমার উচাটন, আমার যন্ত্রণা ? হাঁদা
হলেও তো তুই আমার বউ, অংশীদার। আমার সঙ্গে তোর আর এই ছানাদু’টোরও যে অসহায় জীবন।’ পরক্ষণেই মনে হয়,
কীই বা হবে এসব বলে ? মেয়েমানুষটা যদি মূর্খও হতো
তবু বোঝানো যেত - এটা হল নোটিশ, এর মর্ম
এই, আমার সঙ্গে ছানাপোনা নিয়ে এবার তোরও ভাসার জীবন, ওঠ রে মাগি, তৈরি হ - ভাসবি বলে
চল।
স্বগতোক্তি করে আমিরুদ্দি - ভালো রে বউ, একটা পশুর মতো জীবনের যে এরকম সময়টাতে বড় প্রয়োজন… দুয়ার খুলে বেরিয়ে আসে আমিরুদ্দি। … আচ্ছা, এই হাঁদা বউ, হাভাতে ছানাপোনা, ছেঁড়া কাঁথা-বালিশ কি প্রমাণ হতে পারে না এই দেশের নাগরিকত্বের ? নিদেন কোনও দলিলই তো নেই ঘরে। ……
এই অসহায় অবস্থা থেকে পরিত্রাণের যুদ্ধে
এগোয় গল্প। আর
এখানেই দীর্ঘ কাল শেষে আবার ফিরে আসেন গল্পকারের সেই ইচ্ছে হয়ে থাকা মুশকিল আসান বাবা। বিদেশি কলঙ্ক থেকে মুক্তির জন্য দরকারি
টাকা পেতে মধ্যভোগী,
দালাল শামাদের পরামর্শে - ‘মধ্যরাতে তাই আব্বাজান
বদ্দিরুদ্দিকে গোর থেকে টেনে তুলল আমিরুদ্দি। এক পলাতক আসামিকে প্রেপ্তার করার মতো। মাটির তলায় সাত বছর ফেরারি জীবন কাটিয়ে
আব্বাজান এখন শুধু হাড়ের কাঠামো।’
একটা সময় আমিরুদ্দির মনে হল আব্বাজান
যেন আবার জীবন্ত। এখানেই
গল্পের ক্লাইম্যাক্স। এর পর এগিয়ে আসে গল্পের পরিণতি, সংঘাত থেকে মুক্তি। তবে সে মুক্তি কি গল্পের নায়কের অসহায়ত্ব
থেকে নাকি গল্পের সংঘাত থেকে, গল্পকারের বাবা কি আটপৌরে চরিত্রে ছাতা হয়ে মিশে রইলেন
গল্পে - তা জানার,
অনুধাবন করার দায়ভার নাহয় তোলা থাকুক পাঠকের জন্য। গল্পের শেষটাও একেবারেই যেন সেই ব্যাকরণ
মেনে - শেষ হয়নি…… কিংবা হয়েছে। সত্যিকার অর্থে একটি আদর্শ গল্প হিসেবেই
সমাপ্তিরেখা টেনেছেন গল্পকার। ভাষার যথাযথ প্রয়োগে, শব্দের
যথার্থ স্থাপনায় গল্পের প্রতিটি বাক্যে তুলে ধরা হয়েছে পরিমিতিবোধের পরিচয়।
গল্পের খাতিরে যা যা দরকার তা যথাযথ পরিমাণেই সন্নিবিষ্ট করা
হয়েছে। কোথাও
কোনো খামতি নেই, নেই অযথা শব্দের বাহুল্য। দু’একটি জায়গায় ‘কি’
এবং ‘কী’ এর স্থানচ্যুতির
বাইরে কোথাও বিন্দুমাত্র ব্যাহত হয়নি একাগ্র পাঠ।
এক কথায় একটি সর্বাঙ্গীন উৎকর্ষমণ্ডিত ছোটগল্প- ‘আব্বাজানের হাড় : একটি প্রামাণ্য দলিল’।
পরবর্তীতে ‘আব্বাজানের হাড় ...’ গল্পের সৃষ্টিতে এই মিশে যাওয়া যে কতটা প্রেক্ষিত বয়ে এনেছে তা ক্রমশ অনুধাবনযোগ্য। আলোচনাকালে একটি প্রশ্নের অবতারণা উঠে আসে প্রায়শ। গল্প লিখার কি কোনও ব্যাকরণ আছে ? কিংবা একটি গল্প কি আদৌ ব্যাকরণ মেনে লিখা যেতে পারে ? এর উত্তর অনেকটাই জটিল। এখানে গল্পকার ও পাঠকের মধ্যেকার সম্পর্কের ব্যাপারটা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়। তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় যে একজন পাঠক গল্পের ব্যাকরণ বলে কিছু আছে বলে এক চুলও অবগত না হন তবু গল্পের সার্থকতা নিয়ে শেষ কথা তো সেই পাঠকই বলবেন। আলোচক, সমালোচকের দায়িত্বটা আসছে পরবর্তী পর্যায়ে। এবং সেই পর্যায়ে এসে যা দেখা যাচ্ছে সেটা অনেকটা বাক্যের সমাপিকা, অসমাপিকা বিষয়ক ধারণারই সমপর্যায়ের। ব্যাকরণ মেনে এবং না মেনে লিখা দু’টি বাক্যের শ্রবণে বা পাঠশেষে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয় শ্রোতা বা পাঠক মনে, গল্পের ক্ষেত্রেও তাই। অর্থাৎ কিনা ব্যাকরণ মেনে লিখা একটি গল্প কিংবা বলা যায় একটি গল্প ব্যাকরণসিদ্ধ হয়ে উঠলে তা পাঠকসমাজে তুলনামূলকভাবে অধিক গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।
স্বভাবতই আবারও যে প্রশ্ন উঠে আসে তা হল - প্রথমত, গল্প লিখার কি আদৌ কোনও ধরাবাঁধা ব্যাকরণ আছে ? এবং দ্বিতীয়ত, গল্পকার কি আলোচ্য গল্পটি সেই হিসেবেই সাজিয়েছেন ? একটি গল্প লিখতে গিয়ে গল্পের বিষয় অর্থাৎ কাহিনির যে তাড়না গল্পকারের মস্তিষ্কে খেলা করে বেড়ায় সেখানে ব্যাকরণের নিয়ম মানা কিংবা না মানার কি কোনও স্থান আছে ? এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় যে একজন সফল গল্পকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যাকরণের নিয়মকানুন (যদিও সেরকম ধরাবাঁধা কিছু নেই, তবু নিপাতনে সিদ্ধ গোছের কিছু ছক আবিষ্কার করা গেছে) না মেনেই তা মেনে চলেছেন। এখানেই তাঁর সফলতার চাবিকাঠি।
‘আব্বাজানের হাড়...’ গল্পে গল্পকার দেবব্রত চৌধুরী একসঙ্গে বহু দিক সামলেছেন অসাধারণ মুনশিয়ানায়। দেশভাগজনিত বিড়ম্বনার ফলে স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর (গ্রন্থে সংকলিত গল্পসমূহের রচনাকাল) পেরিয়ে গেলেও বিদেশি সন্দেহে নিরীহ মানুষদের উপর সন্দেহযুক্ত নাগরিকত্ব নামক সরকারি অত্যাচারের ঘটনাই গল্পের মূল বিষয় যদিও এই প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত নিপুণ ছকে পারিপার্শ্বিক চিত্রসমূহকে গল্পকার যেন সেই নিয়ম মেনে চলার মতোই উপস্থাপন করেছেন। মূল বিষয়ের উপর ফোকাস নিবদ্ধ রেখে সাজানো হয়েছে গল্পের প্লট।
প্রথমেই আলোকপাত করা যাক গল্পের ভূমিকাতে। এটা অনস্বীকার্য যে একটা সাসপেন্স কিংবা আরোহন একটি ভূমিকার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিছুটা উদ্ধৃতি এখানে খুবই প্রাসঙ্গিক -
‘রাতশেষের কুমড়ো-ফালি মরা চাঁদটা টুক করে পানসি মেঘের আড়ালে ডুবে গেল। শীতমরা নদী আর তার বিস্তর চর জুড়ে আবছায়া অন্ধকার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ পানসে হয়ে আসছে। ঘণ্টা দুই কাটলেই ভোরের দিকে আলো ফুটবে চরাচরে।
সীমান্ত এলাকা। নদীর ওপারেই বাংলাদেশ। সটান লম্বা কাঁটাতারের বেড়া সীমানা বরাবর। চরের উপর বিশাল অ-ফসলি মাঠটা নাঙা ফকিরের মতো হা হা উদাম। কোনও বড় বা মাঝারি গড়নেরও গাছপালা নেই, শুধু ছড়িয়ে ছিটিয়ে প্যাকাস আর শরঘাসের একেকটা বেয়াদপ ঝোপ। আমিরুদ্দি (গল্পের নায়ক) এরকম একটা প্যাকাস ঝোপের অন্ধকারে আব্বাজানের মাসহীন কাঠামোটা পাহারা দিয়ে ঠায় বসেছিল মাঝরাত অবধি।’ - এইটুকু ভূমিকাতেই যে অবধারিত সাসপেন্সের নমুনা দেখিয়েছেন গল্পকার তাতেই এক সম্ভাব্য সংঘাত এর পূর্বাভাস এঁকে দিতে পেরেছেন পাঠক হৃদয়ে। পাশাপাশি গল্পে এসে গেছে কাঙ্ক্ষিত গতিময়তা। এখান থেকে পাঠকের আর সরে যাবার আশঙ্কাও নেই, সেই সুযোগও নেই। এক নিশ্চিত চলমানতার যথার্থ সংকেত ভূমিকাতেই স্পষ্ট করে দিতে পেরেছেন গল্পকার।
এর পর শুরু হয়েছে গল্পের চলন। গড়ে উঠেছে গল্পের কাঠামো, ছড়িয়েছে ব্যাপ্তি। তবে নিক্তি ধরে। কোথাও কোনো ধোঁয়াশা নেই, পক্ষান্তরে নেই কোনও বাহুল্যও। বয়ানের পরিমিত প্রয়োগের চমৎকার নিদর্শন পরিলক্ষিত হয় গল্পে। গল্পের চলন বজায় রাখতে যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই। সেই যে প্যাকাস ঝোপের অন্ধকারে আব্বাজানের মাসহীন কাঠামোটা পাহারা দিয়ে ঠায় বসেছিল আমিরুদ্দি - মাঝরাত অবধি এর পর থেকেই মূল গল্পের শুরু। যদিও এই অংশে অবধারিতভাবেই এসেছে প্রেক্ষাপট, যা কিনা আমিরুদ্দির হাতে পৌঁছানো একটা সরকারি নোটিশ - ‘যদিও ভোটার তালিকায় আপনার / আপনার পরিবারের নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তবুও আপনি কিংবা আপনার পরিবার ভারতীয় নাগরিক নন বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। সুতরাং......’। এখান থেকেই চলতে শুরু করে গল্প। এভাবে - ‘এই এতটা অবধি পড়ার পরই তো চোখের উপর জমাট অন্ধকার নেমে এসেছিল আমিরুদ্দির। পায়ের তলার মাটি সরে যেতে যেতে শূন্য গহ্বর সৃষ্টি হচ্ছিল। অতল খাদের চূড়া থেকে ঝটকায় কে যেন তাকে নীচে ঠেলে দিয়েছে। শরীরের রক্ত সব এখন হিম, শূন্য হয়ে যাওয়া এক অসাড় অনুভূতি।’
স্বগতোক্তি করে আমিরুদ্দি - ভালো রে বউ, একটা পশুর মতো জীবনের যে এরকম সময়টাতে বড় প্রয়োজন… দুয়ার খুলে বেরিয়ে আসে আমিরুদ্দি। … আচ্ছা, এই হাঁদা বউ, হাভাতে ছানাপোনা, ছেঁড়া কাঁথা-বালিশ কি প্রমাণ হতে পারে না এই দেশের নাগরিকত্বের ? নিদেন কোনও দলিলই তো নেই ঘরে। ……
এক কথায় একটি সর্বাঙ্গীন উৎকর্ষমণ্ডিত ছোটগল্প- ‘আব্বাজানের হাড় : একটি প্রামাণ্য দলিল’।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
Comments
Post a Comment