Skip to main content

আই এম এ প্রফেশনাল কিলার

ছোট থেকেই অর্থাৎ এ বি সি ডি ইংরেজি অক্ষরের সাথে পরিচিত হওয়ার সময় থেকেই আমি একটি বাক্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলাম সেই বয়সে কিজানি বাক্যটির অর্থ ভালো করে বুঝতে পারিনি। তবু কেন যে ভালো লেগেছিল ? আমি কাঠপেন্‌সিল দিয়ে খাতায় লিখে রেখেছিলাম বাক্যটি। হাইস্কুলের শিক্ষয়িত্রী মাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম -‘মা, এই বাক্যটির মানে কী হবে বলো তো ......’
মাত্র এ বি সি ডি শিখেছিলাম তখন। নার্সারি স্কুলের ছাত্র। আমার অনভিজ্ঞ হাতে জড়িয়ে জড়িয়ে লেখা বাক্যটিতে মা চোখ বুলিয়ে দেখলেন। একবার আমার দিকে তাকালেন।
তুমি নিজেই লিখেছো গৌতম ?
হ্যাঁ।
কীভাবে জানলে ? কে শেখালো ?
একটি ইংরেজি সিনেমায়। দাদা দেখতে থাকার সময় আমিও দেখেছিলাম। সিনেমার হিরো হাতে একটি পিস্তল ধরে থাকে। মাথায় কালো টুপি আর কালো লম্বা কোট পরে। চোখদু’টি বড় করে মেলে, পিস্তলটির ট্রিগারে আঙুল রেখে বলেছিল - ‘আই এম এ প্রফেশনাল কিলার।’ আমার ভালো লেগেছিল। আমারও একটি পিস্তল আছে। আমারও একটি কালো কোট আছে। আমিও এই হিরোর মতো বলতে পারব - ‘আই এম এ প্রফেশনাল কিলার।’
তুমি ভালো করে ইংরেজি শেখোইনি। লিখতে পারলে কী করে ?
দাদাকে বলেছিলাম মানে কথাগুলো দাদাকে খাতায় লিখে দিতে বলেছিলাম। দাদা লিখে দিয়েছিল। ইংরেজি এ বি সি ডি জানিই। দিন দুয়েক লিখতেই মনে থেকে গেল।
মা আমার কথা শুনে যতটা অবাক হয়েছিলেন, ততটাই আশঙ্কায় ভুগছিলেন নিশ্চিত - তাঁর স্নেহের কনিষ্ঠ পুত্র কি একটি ভালো বাক্য মনে রাখতে পারল না ? আমাকে আমার সেই বয়সের হিসেবে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলেন -
বাছা সোনা আমার, এই বাক্যটির অর্থ জানো কি ?
জানি।
কী ?
আমি হত্যাকারী।
কে বললো, তোমাকে ?
নিজেই বুঝে নিয়েছি। লম্বা, সুন্দর হিরোটি পিস্তল দিয়ে কাউকে গুলি করে বেরিয়ে আসার পর, পিস্তলটি উপরের দিকে তাক করে মেরে, আবার কায়দা করে হাতে নিয়ে বলেছিল -‘আই এম এ কিলার। প্রফেশনাল কিলার।’
আমি বুঝে গিয়েছিলাম। দাদাকেও অবশ্য জিজ্ঞেস করেছিলাম বাক্যটির অর্থ। কিছু সময় ধরে মায়ের বিবর্ণ হয়ে পড়া মুখের দিকে তাকিয়ে রয়েছিলাম। ব্যাপারটি আমি সহজ ভাবেই নিয়েছিলাম। জটিল করে নেওয়ার বা বোঝার বয়সও ছিল না আমার। বরঞ্চ মায়ের সামনে আমি গর্বিত ভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। কারণ মাত্র ইংরেজি এবিসিডি শিখে ওঠা ছেলেটি ইংরেজি সিনেমা দেখে একটি বাক্য লিখে দেখানো কি কম গৌরবের কথা ? এ তো আমার মায়ের জন্যও আনন্দের কথা হওয়া উচিত। মা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেছিলেন -
হ্যাঁ, সেই সিনেমাটি আমিও দেখেছিলাম। হিরোটি বদমাশ, গুণ্ডাদের মেরেছিল - যারা মানুষের মধ্যে অশান্তি ছড়ায়। শেষে হিরোটি কী করলো জানো ?
কী ?
- হিরোটির মানুষ মেরে মেরে খারাপ লাগল। এতদিনে অবশ্য তার বয়স হয়ে এসেছিলসে গির্জায় যেতে শুরু করল। মাঝেমাঝে সে দুঃখ করতে শুরু কর
মায়ের কথার মধ্যে আমি প্রশ্ন করেছিলাম -
খারাপ মানুষ মেরে আবার দুঃখ করার কী আছে ?
মা কিছু সময় মৌন হয়ে রয়েছিলেন। হয়তো ভাবছিলেন। কথাগুলো মনের মধ্যে গুছিয়ে নিচ্ছিলেনকীভাবে বললে তাঁর এই অবোধ পুত্রকে পিস্তল, কিলার এই ধরণের শব্দের প্রেম থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারবেন। অবশেষে মা গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে বলেছিলেন -
কত মানুষ সে মারল - তবুও তো খারাপ, বদমাশ মানুষ শেষ হল না। একজনকে মারলে আরেকজন বেরিয়ে আসে। সে যার জন্য, যে ভালো মানুষের ভালো হোক ভেবে বহু খারাপ মানুষ হত্যা করল তা সফল হল না। অথচ তাকে ভগবানের কাছে হত্যাকারী রূপে দাঁড়াতে হল।
সে গির্জায় একাকী গিয়ে গিয়ে চোখের জল ফেলতে লাগল। অবশেষে সে একটি কাজ করলএকটি আশ্রম খুলল। যেসব লোক অভাবে পড়ে পাপ করে, সেই মানুষদের সব সময় ভালোভাবে  অনুশীলন করাবে বলে। শ্রম করতে শেখাবে। আমাদের যেমন ভাগবত আছে, সেরকম খ্রিস্টানের বাইবেল আছে। যেখানে ভালো ভালো উপদেশ, প্রেম, শান্তি, পরোপকারের কথা লেখা আছে। সেই বাইবেলের জিশুর বাণী ভালো করে বোঝাবে। সেইমতো মানুষের মধ্যে কাজ করতে মনোবল জোগাবে। মানুষের মঙ্গল সেভাবেও হবে।
মা একনাগাড়ে কথাগুলো বলে ক্ষণিক থমকে রয়েছিলেন। আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমার গালে-মুখে চুমু খেয়েছিলেন। তখন বিশেষ ভাবিনি যদিও এখন ব্যাপারপ্টা ভালো করে জানলাম। আসলে মা সিনেমাটি দেখেননি। আমাকে সৎ উপদেশ দিতে একটি কাহিনি সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছিলেন। মায়ের দৃষ্টিতে বোধহয় সন্তান অবোধ শিশুর মতোমা কাহিনিটি বলে আমার গালে মুখে চুমু খেয়ে যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন -
বুঝেছো সোনা ? সেইজন্য পিস্তল, কিলার এগুলো ভালো মানুষের কথা নয়। তুমিও বলবে না আজ থেকে। কেমন ?
আমি একান্ত বাধ্য ছেলের মতো হ্যাঁ-সূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়িয়েছিলাম। মা সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। সস্নেহে বলেছিলেন -
এসো; এখন আমার ভালো ছেলেটি এক গ্লাস দুধ খেয়ে একটু পড়াশোনা করবে।
সেই কথাও আমি বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছিলাম।
ব্যতিক্রমী চিন্তা, খেয়ালি কাজকর্মে আমি অবর্ণনীয় তৃপ্তি পেতাম। মনে আসা খেয়ালটি কার্যত শেষ না করা অবধি শান্তি পাই না। সেই সিসেবে ছোট থাকতে স্কুলে সমবয়সীদের উত্যক্ত করে রঙ্গ দেখতাম। কেউ আমার দুষ্টুমি ধরতে পারে না - এটাই এমন কাজে আমাকে বেশি করে অণুপ্রেরণা জুগিয়েছিল হয়তো। দেখতে আমি শান্তশিষ্টের মতো ছিলাম। আমার সামনে বসে থাকা ডরোথি। দুটি করে বেণী গেঁথে আসে চুলে। আমার ভেতরটা লপলপ করে। এই দু’টির একটি কেটে দিলে কেমন হয় ? বেশি দিন অপেক্ষা করতে হল না। ভাবনাটি মনে আসার দিন থেকেই একটি কাঁচি ব্যাগে ভরে নিয়েছিলাম। একদিন সুযোগ বোঝে তার একটি বেণী কেটে আমার কাছে বসা কৌশিকের ব্যাগে ভরিয়ে রাখলাম। কাঁচিটি ব্যাগে থাকলে ধরা পড়ব ভেবে স্কুলের ড্রেনে ফেলে দিলাম। পরে ডরোথির কান্না। টিচার বিচার চালালেন। আশা করা মতেই কৌশিক দোষী সাব্যস্ত হল। কৌশিক করুণ দু’চোখে স্কুলের বারান্দায় হাঁটু মুড়ে কানে ধরে থাকল গোটা পিরিয়ড। খারাপ লাগছিল যদিও, এত নিখুঁত ভাবে কাজ করে বেঁচে যেতে পারায় আমার পরিতৃপ্তি ছিল।
একবার মায়ের সঙ্গে আমাদের একজন প্রতিবেশীর ঘরে ঘুরতে গেলাম বাইরে আচারের বোতল রোদে রাখা ছিল ঘরে মা কথাবার্তায় ব্যস্ত আমি কাছেই বসে থাকা মায়ের শান্ত ছেলেটি কেন জানি মনে হল - বাইরে দেখে আসা আচারের বোতলগুলিতে অল্প ধুলো ফেলতে পারলে গৃহকর্ত্রী আমার গালে মুখে হাত বুলিয়ে আদর করে বললেন - ‘আহা রে আমার আদরের ছেলেটিআমার মনের মধ্যে আচারের বোতলটি দুলছে মাকে হিসি করতে যাবলে বাইরে বেরিয়ে এলাম এদিক ওদিক দেখে নিশ্চিন্ত হলাম কেউ নেই কাছেই থাকা ফুলের টবটি থেকে অল্প মাটি নিয়ে এসে আচারের বোতলটিতে ভরে রাখলাম আবার এসে মায়ের কাছে বসে পড়লাম
অনেক দিন পর জানতে পারলাম আমার সেই কাজের শাস্তি অন্য কেউ ভোগ করেছে আচারের বোতল ভিতরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসে খুড়ি দেখলেন তাঁর মেয়ে বোতলটি নাড়াচাড়া করছে পরে বোতলের ভিতরে তাকিয়ে খুড়ির মন মেজাজ কাজ করছিল না - ‘কী কুলক্ষণীয়া যে এই মেয়েটিসময় নষ্ট না করে পেটালেন একচোট
‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ কথাটি মনে পড়ে গেল আমার ব্যতিক্রমী কাজে আমি এক অবর্ণনীয় তৃপ্তি পেতাম মধ্যে মধ্যে মনে হতো ইংলিশ ফিল্মে দেখা হিরোর মুখের সেই কথাটি - ‘আই এম এ প্রফেশনাল কিলার
একদিন ক্লাস ফাইভে পড়া একটি মেয়ের খাতায় লিখে দিলাম - ‘আমি তোমাকে ভালোবাসিএকটি বাক্যকেতিনবার লিখেছিলাম ওর দিকে তাকিয়েছিলাম ও আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল ও কী বুঝেছিল আমি জানি না এক অবুঝ শিহরণ আমার শরীরে অনুভব করছিলাম মার প্যান্ট দিয়ে ঢেকে ধরে রাখা কোমরের নীচের সামনের দিকের অংশে অনুভব করেছিলাম এক অদ্ভুত পরিবর্তন অজান্তেই আমার হাতটি সংগোপনে সেই স্থানটি বার বার স্পর্শ করছিল আমি পেয়েছিলাম বিরল পরিতৃপ্তি আমার সমবয়সিরা কি এমন কাজ সেই বয়সে করেছিল ? কে কী করেছে কেনই বা ভাবি ? ভাবি সেই বয়সে আমি যে কী ধরনের কাজ করার সাহস পেয়েছিলাম আর কী করে সেসব জেনেছিলাম
ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছিল তাকে সে আমার শৈশবের খেলার সাথি অপরিণত বয়স বলে ভেবেই কিজানি আমার মা-বাবা তার সঙ্গে একা খেলতে দিয়ে নিশ্চিন্ত ছিলেন নীহারিকা প্রায়ই আমাদের ঘরে আসত আমার সঙ্গে লুডো খেলবে দাবা খেলবে আমরা বার্ষিক পরীক্ষা সবে শেষ হয়েছে ফাল্গুন মাস ছিল মা-বাবা, দাদা কেউ ছিল না ঘরে এর আগেও মা ওঁরা আমাকে নীহারিকার সঙ্গে খেলার কথা বলে কাছের বাজার-হাটে যেতেন কখনো অন্য কারো ঘরেও যেতে নীহারিকাদের ঘর আমাদের ঘরের একেবারেই কাছে মা অবশ্য নীহারিকার মাকে বলে যান -‘ওকে একলা রেখে গেছি, নীহারিকার সাথে থাকবে মাঝে মাঝে চোখ রাখবেন দিদি
খেলছিলাম ফাগুনের ধুলো ওড়া বাতাস শুকনো পাতা খেলার মধ্যেই হঠাৎ আমি মন্দার ফুলের লাল একটি পাপড়ি এনে নীহারিকার সিঁথিতে রাখলাম বললাম - ‘তোকে বিয়ে করলামসে হাসল বললাম - ‘চল, বিছানায় যাই বর কনে একসাথে শোয় না বিয়ের পর ?’ সে বিনা বাক্যব্যয়ে সম্মতি দিল আমি যেন বিন বাজানো সাপুড়ে আর সে বিনের সুরে নাচতে থাকা মন্ত্রমুগ্ধ নাগিনী
কেউ তো এসব শেখায়নি আমি ওর বুকটিতে হাত বোলাতে লাগলাম বিষফোঁড়ার মতো হয়ে থাকা তার বুকে হাত বোলাতে সেও চোখদুটি বুজে দিয়েছিল আমি কিছু সময় ওর শরীরের উপর উঠে থাকলাম সে কোন প্রতিবাদই করেনি
ইংলিশ ফিল্মটির সংলাপ - ‘আই এম এ প্রফেশনাল কিলারস্কুলে সময়ে সময়ে বাজানো ঘণ্টার মতো বুকে বাজতে থাকল আথচ মানুষকে আমি কি আর হত্যা করতে পারব ? তেমন কোন পরিস্থিতির উদ্রেক হওয়ার মতো আমি গুণ্ডা প্রকৃতিরও নই আমি মনে হয় সেই হিরোর প্রেমে পড়েছিলাম র মুখে কথাটি এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস, সাহস, নির্ভীকতা ফুটিয়ে তুলেছিল
নীহারিকা প্রায়ই আসে সে আমাকে সেদিন আমার দ্বারা করা আচমকা আচরণগুলো আবার করতে প্রলোভিত করে আমি সরে থাকতে লাগলাম আমি তো তাই চাইছিলাম কারো সাথে একটি সম্পর্ককে আমি দীর্ঘস্থায়ী করতে চাই না সেই প্রবণতা ছোট থেকেই কী করে যে এল ? গভীরভাবে হয়তো ভেবে দেখিনি
ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছিলাম নতুন নতুন যুবতিকে আমার প্রেমের জালে আবদ্ধ করে পুনঃ নিজের খুশিমতো ছেড়ে দেওয়াতেই আছে আমার অনির্বচনীয় তৃপ্তি মাছ না খাওয়া কোন ব্যক্তির যেমন মাছ মারা একটা নেশা হতে পারে ঠিক সেভাবেই আমারও একটা নেশা গড়ে উঠেছিল যেসব মেয়েরা প্রথমে আমার প্রেমকে প্রত্যখ্যান করে তেমন মেয়েকে আমার আয়ত্তে আনাতেই ছিল - বিশেষ আমেজ আমার বন্ধুবর্গের তুলনায় এমন কাজে আমি প্রতিবারই সফল হয়েছিলাম
পড়াশোনায়ও আমি খারাপ নই আকর্ষণীয় চেহারা একটি আছে বলে প্রথম দেখায় কেউই বলে না আমার কথাবার্তা, আদব-কায়দা, বুদ্ধিদীপ্ত দুই চোখ মানুষকে আমার দিকে আকর্ষিত করে আমার এমন গুণের তুলনায় সুদর্শন বন্ধুবর্গের ব্যক্তিত্বও হার মেনে যায় ছোটকাল থেকেই মেয়ের বা নারীর মনোজগপর্যবেক্ষণ করার একটি প্রবল বাসনা নারীদেহের ভূগোলের গভীরে না গেলেও বিহঙ্গ-বিচরণ করার এক দুর্নিবার তাড়না ছিল ফলে যাকেইটারগেটকরে নিয়েছি সফল হয়েছি আমার এমন শখ, বাসনা আর তাড়নার বলি হওয়া বহু মেয়ের হৃদয় অজান্তেই ভেঙেছিলাম কী করব ? আমিও নিরুপায় মেয়েগুলোই বা কী ? প্রথমে কেউই গুরুত্ব দেয় না কত চেষ্টা করতে হয় যতই গুরুত্ব দেয় না আমাকে, আমার ভেতরে ভেতরে জেদ বেড়ে যায় গভীর জলের মাছ ধরতে পারাটাই পারদর্শী ধীবরের পরিচয় ধৈর্য হারাই না অবশেষে
আমার মন্ত্রপূতঃ জালে না পড়ে থাকে কী করে ? দুর্বার প্রেম চলে সিনেমা হল, রেস্টুরেন্ট, পার্ক, পথে-ঘাটে সবখানে প্রথমে আমার ফোন ঘন ঘন পরে সেই অহংকারী প্রেমিকার ফোন সঘনে আমাকে আমি জেনে যাই এটাই সময় এই সময়ে তাকে প্রত্যাখ্যান করায় আছে আমার পরমতৃপ্তি সে খাদে পড়া মাছের মতো এখন ছটফট করবে, আমার প্রেমের পুকুরে জলকেলি করতে পল পল উন্মাদ হবে
আমি আনন্দিত গভীর জলের মাছ ধরে পাড়ে ছেড়ে দিয়ে তার ছটফট ধড়ফড় দৃশ্য উপভোগ করার কী আনন্দ তা সবাই বুঝবে না মেয়েটি ভগ্নহৃদয়ের যন্ত্রণায় দগ্ধ বিশ্বাসঘাতকতার অসহনীয় বেদনায় মর্মাহত সেসময় আমি অন্য একটি মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি আমার বন্ধুমহলে এই কথা বিদিত ওরা বিফল হওয়া মেয়েকে কখনো আমার কাছে ছেড়ে দেয় বাজি লাগায় - ওই মেয়েটিকে যদি প্রেমের জালে ফেলতে পারিস তাহলে ……
তাহলে টাকা দিতে হবে
ওদের মুখের উপরে বলে দিই ওরা হয়তো ভাবে - সব সময় আমি কৃতকার্য নাও হতে পারি আমার বন্ধু দুটি সুদর্শন, ধনবান যা সতত আজকের মেয়েরা চায় সুতরাং তাদের বিশ্বাস - যে দুটি বস্তু আজকের মেয়েদের আকর্ষিত করে, সেই দুটি বস্তু থাকা সত্ত্বেও ওরা যে কটি মেয়েকে প্রেমের আয়ত্তে আনতে পারেনি; সেখানে আমার আর কী করার থাকতে পারে ? ওরা একবাক্যে সম্মতি জানাত - হ্যাঁ ওরা আমাকে টাকা দেবে যদি ওরা আয়ত্তে আনতে না পারা মেয়েকে আমি প্রেমের ফাঁদে ফেলতে পারি
কথামতোই কাজ এমন কাজে টাকা ? আমি লেগে যাই আমার অভিযানে মেয়েদের মন ভালো করে বুঝতে পারি বলে আমার অহংকার আছে অধিকাং মেয়েরাই সতত আবেগপ্রবণ পুরুষ বিষাদগাথা শোনালে, সাংঘাতিক ভালোবাসে বলে দুএকটি বাক্যে প্রত্যয়িত করতে পারলে প্রথম পর্যায়ের আবেগ উথলে ওঠে আমি জানি বাঘ যেমন জানে হরিণ শিকারের কৌশল
নিত্যনতুন মেয়ের প্রেমে পড়তে তেমনশব্দের টোপ ছিটাই দ্বিতীয় পর্যায়ে কোনভাবে আমার জীবনে তখনো না ঘটা কল্পিত বিষাদের কাহিনি শোনাই আমি জানি নারীর অন্তঃকক্ষে যাওয়ার দ্বিতীয় দুয়ারটি এমন কথায় খুলতে শুরু হয় তৃতীয় পর্যায়ে সে যেখানেই যায়, দুদিন মতো আমিও সেখানে যাই তার সামনে দেখা দিয়ে জানাই - ‘একেবারে শান্তিতে থাকতে পারিনি কী যে করলে আমাকে বিষ যদি আছে খাইয়ে দাও মরে যাই যদি প্রেম দিতে না পারো
ধীরে ধীরে মেয়েটি কাছে আসে আমি জানি প্রথমে পুরুষের প্রেমকে গুরুত্ব না দেওয়া মেয়ে বা নারী যখন প্রেমে পড়ে তখন শয়নে স্বপনে, প্রতি পলে পলে সেই পুরুষেরই হয়ে থাকতে চায়
এই কথাটিও জেনেছিলাম যে প্রথমে ছেলের দিক থেকে যাওয়া প্রেমের প্রস্তাবকে মেয়েরা প্রত্যাখ্যান করেই এমনকি সংগোপনে সেই ছেলেকে ভালোযদি বাসেও কথাগুলো জানি বলেই, একবার প্রস্তাব দেওয়ার পর আমি দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রস্তাব দিতে তৈরি হয়ে থাকি। তেমন যুবতির দিক থেকে আসা দুই তিনবারের প্রত্যাখ্যানকে আমি নির্লিপ্তভাবে নিয়ে থাকি
তেমন যুবতিও পরে খাঁচায় বন্দি পাখির মতো হয়ে পড়ে। খাঁচার দুয়ার খুলে উড়িয়ে দিলেও উড়ে চলে যায় না। আবার এসে খাঁচায় ঢুকতে চায়।
বড় কৌশলে এমন যুবতি থেকে সরে যাই। কখনও বলি - ‘মায়ের পছন্দ মতো বিয়ে করব বলে কথা দিয়েছিলাম। হার্টের রোগী মা’কে আমার সুখের জন্যই কী করে দুঃখ দিই বলো।‘
কখনো আবার যুবতির চরিত্রের বিভিন্ন দিশায় মিথ্যে ত্রুটিবিচ্যুতি দেখিয়ে রাগ করেই বেরিয়ে আসি। আবার বন্ধুর সঙ্গে বাজি লাগাই। অন্য এক যুবতিকে প্রেমের ফাঁদে ফেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ি।
বন্য তৃপ্তি লাভ করিএকদিকে যুবতির হৃদয় যন্ত্রণায় রক্তাক্ত আর অন্যদিকে আমি চূড়ান্তভাবে পরিতৃপ্ত।
ডায়ারিতে মাঝে মাঝে লিপিবদ্ধ করি - ‘আই এম এ প্রফেশনাল কিলার’। কিন্তু আমি আজ পর্যন্ত একটি ইঁদুরও মারিনি।
###
আজ এক সপ্তাহ ধরে আমার বুকে যন্ত্রণা। মা-বাবা কবেই ইহসংসার ত্যাগ করে চলে গেছেন। দাদা দিল্লিতে। আমার কোম্পানীর চাকরি। যুবতির হৃদয়ের সাথে খেলা করে থাকা আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমার বয়স যে পঁয়ত্রিশের ঘর পার হয়ে গেছে। সঙ্গীরা বিয়ে করেছে। নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আর আমি ? একটি যুবতিযাকে আমি ঘর সংসার করার স্বার্থে একেবারে নিজের করতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিলাম; নিষ্ঠুরভাবে সে আমার সেই প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে গেছে।
না না। আমার সহ্য হয়নি। এবার সত্যি আমি খেলা করিনি। বন্ধুর সঙ্গে আমি বাজি লাগাইনি। কিন্তু আমাকেও আপন বলার মতো কারো সঙ্গ তো লাগে। এই যে যুবতিটি। প্রিয়া। প্রিয়া আমার বুকে এভাবে কুঠারাঘাত করতে পারে না।
আজ যেতে হবে। প্রিয়ার ঘরে অফিস ছুটির পর যেতে হবে। ভাবা মতোই কাজ। চলে গেলাম। সন্ধ্যার মহানগরী। মায়ানগরী। প্রিয়ার কোঠার বাইরে দাঁড়ালাম। কলিং বেল বাজালাম। কিছু সময় অপেক্ষা। দরজা খুলল। উৎফুল্লিত আমি প্রিয়ার দিকে তাকালাম। তার মানে ...... তার মানে প্রিয়া নেশায় আসক্ত। দরজার ফ্রেমে ধরে প্রিয়া দাঁড়াল। অসংযত মাথাটি পেছনের দিকে হেলে যেতেই দেখা গেল প্রিয়ার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক।
আমি কথা খুলে বলার সুবিধাই পেলাম না। প্রিয়া জড়ানো কণ্ঠে বলল - এসব প্রেমটেমে আমি সিরিয়াস নই। অকে ? জাস্ট ফর এনজয়। নাও ... ইউ মে গো।
নেশাসক্ত মানুষের মতো টলটলায়মান হয়ে চলে এসেছিলাম। নিজের উপরেও ধিক্কার জন্মেছিল। মাকে খুব মনে পড়ছিল। মায়ের কোলে মাথা রেখে বহু কথা বলার ইচ্ছা করছিল। ডায়ারিটি মেলে ধরলাম - আজকের দিনটির জন্য উল্লেখনীয় কী আছে ?
ডায়ারির পৃষ্ঠা উল্টে যেতে যেতে চোখে পড়ল প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখা আছে সেই একটি বাক্য - ‘আই এম এ প্রফেশনাল কিলার’। বিশেষ কিছু ভাবলাম না। বাক্যটি দেখে প্রথমবারের জন্য ঘৃণার সৃষ্টি হল। পুরো ডায়ারিটিকে নোংরা আবর্জনা যেন লাগছিল।
জ্বালিয়ে দিলাম। এতে খানিক শান্ত হল মন। আজ আবার ‘জ্বালিয়ে দিয়েছি এই বাক্যটির প্রেমে পড়ে আক্রোশ-পরিতৃপ্তি লাভ করা এই গৌতম নামের ছেলেটিমনে আরো একটি বাক্য দোলা দিতে থাকল - আই এম নট এ প্রফেশনাল কিলার। বাট ইয়েস্‌, আই ওয়াজ হান্টার।

মূল অসমিয়া গল্প - রুমী লস্কর বরা
অনুবাদ - বিদ্যুৎ চক্রবর্তী


Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...