Skip to main content

একালের নিরিখে সেকালের ছড়ার ময়নাতদন্ত


বাংলা সাহিত্যে ছড়ার ইতিহাস সুপ্রাচীন এবং সমৃদ্ধ। মূলত মুখে মুখেই এর সৃষ্টি যদিও সাহিত্যে এই সৃষ্টি কবিতার পাশাপাশি এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে রেখেছে যুগ যুগ ধরে। ছড়ার লিখিত রূপও সুপ্রাচীন। এমনকী বলা হয় চর্যাপদের প্রথম পদটিই ছড়ার মূল ছন্দ স্বরবৃত্তে ও অন্ত্যমিলে রচিত। একই ছন্দযুক্ত ছড়ার অনুরূপ পঙ্ক্তিসমূহের উপস্থিতি লক্ষ করা যায় মধ্যযুগের চণ্ডীমঙ্গল বা অন্নদামঙ্গল কাব্যেও।
সেই থেকে ছড়া পেরিয়ে এসেছে বহু কাল, বহু যুগ। অথচ আজও তার গ্রহণযোগ্যতা, মাধুর্য, রসাস্বাদনে তৃপ্ত হয় শিশুমন। আধুনিক বাংলা সাহিত্যে ছড়ার মূল রূপকার হচ্ছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর ‘সহজ পাঠ’-এর ছড়ার বাইরেও ‘ছড়ার ছবি’ ও ‘খাপছাড়া’ কাব্যগ্রন্থগুলো আধুনিক বাংলা ছড়ার ভিত্তি হিসেবে ধরে নেওয়া যেতেই পারে। পরবর্তীতে সুকুমার রায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, সুকুমার বড়ুয়া, অন্নদাশংকর রায়, বিমল ঘোষ, শ্যামলকান্তি দাশ, ভবানীপ্রসাদ মজুমদার আদি বিশিষ্ট ছড়াকারদের ধারা মেনে এই উত্তরপূর্বেও ছড়া নিয়ে জাদুকরি সৃষ্টিতে আজও নিয়ত মগ্ন রয়েছেন বিমলেন্দ্র চক্রবর্তী, প্রাণকৃষ্ণ কর, অমলকান্তি চন্দের মতো ছড়াকাররা। এই তালিকায় আরেক উল্লেখযোগ্য নাম সজল পাল যাঁর লেখালেখির হাতেখড়িই ছড়া দিয়ে।
সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ছড়া ও ছড়া-বিষয়ক গ্রন্থ ‘ছড়া ছিষ্টিছাড়া’। মোট ১১২ পৃষ্ঠার গ্রন্থটিতে সূচিপত্র অনুযায়ী তিনি চারটি বিভাগে বিন্যস্ত করেছেন ছড়াগুলিকে। প্রথম ভাগ - ‘ছড়ার ‘পরে ছড়ি’তে একাধিক প্রচলিত জনপ্রিয় ছড়ার পুনর্লিখন করেছেন আজকের বাস্তব প্রেক্ষিতের নিরিখে। বলা যায় নতুন করে সাজিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন, করেছেন কাটাছেঁড়া, করে তুলেছেন একাধারে প্রাসঙ্গিক, যুগোপযোগী ও নব আঙ্গিকে, নবরূপে উদ্ভাসিত। প্যারডি মনে হলেও আসলে আজকের ইঁদুর দৌড়ে অসহায় শিশুদের কঠিন জীবনযাপন যে ছড়া থেকে কত যোজন দূরত্বে অবস্থিত তাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন ছড়াসমূহের পুনর্নির্মাণ করে। ‘আত্মকথন’-এ ছড়াকার লিখছেন - আজকের দিনে ‘...ছড়া নিয়ে ময়নাতদন্ত করার প্রবণতারই ফসল এই ছড়াগুলো।’ উদাহরণ দিলেই তা বোঝা যাবে সঠিক।
‘খোকন খোকন করে মায়/ খোকন গেছে কাদের নায় ?/ সাতটা কাকে দাঁড় বায়/ খোকনরে তুই ঘরে আয়।’ - খোকন কোথায় জানে মায়,/ খোকন গেছে কারখানায়/ সাতটা দিনে যত পায়/ তা দিয়ে সে পাট চালায়.../।’
দ্বিতীয় ভাগ ‘অনুপ্রাসে, অনুচ্ছড়া অন্বেষণে’তে অনুপ্রাসযুক্ত একাধিক ছড়া রয়েছে। উদাহরণ - সন্ধেবেলা শালিক সাজে/ সারাদিনের শেষে/ সাত সন্ধ্যায় সন্ধ্যাতারা/ সাজে সন্ধ্যাকাশে। কিংবা - মশলা মেখে ময়লা মুখে/ ময়নামতির মেয়ে/ মাসমজুরির মাইনে মেপে/ মাশুল মেটায় মায়ে।
তৃতীয় ভাগ ‘করোনা কালের কড়চা’তে রয়েছে ছয়টি দীর্ঘ ছড়া যা মূলত ছোট বড়ো সব্বার করোনাকালীন কঠিন দিনযাপনের সরস বর্ণনা।
শেষ ভাগ ‘ছড়া ছিটে ফোঁটা’তে রয়েছে আরও মোট কুড়িটি দীর্ঘ ছড়া যা বিষয়ভিত্তিক নয়, বলা যায় পাঁচমিশেলি। সব মিলিয়ে ১০২টি ছড়ার সম্ভার এই গ্রন্থ যা আজকের শিশুদের জন্য খুবই উপযোগী এবং সুস্বাদু। কাগজ, ছাপার স্পষ্টতা যথাযথ হলেও দুয়েকটি জায়গায় ছাপাবিভ্রাট পরিলক্ষিত হয়েছে। বানানের শুদ্ধতা উল্লেখযোগ্য যদিও কিছু ছড়ায় অন্ত্যমিল অক্ষত থাকলেও স্বরচ্যুতি উপলব্ধি করা যায়। সুপর্ণা পালের প্রচ্ছদ নান্দনিক। গ্রন্থের তাৎপর্যপূর্ণ একটি ভূমিকা লিখেছেন বিশিষ্ট কবি সঞ্জয় চক্রবর্তী এবং শুভেচ্ছা বার্তা লিখেছেন কবি ও বিশিষ্ট বাচিক শিল্পী পারমিতা নাগ দে। ছড়ার এই আকালের দিনে সজল পালের এই গ্রন্থ যে আসলে বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ ধারাকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনবদ্য প্রয়াস তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
প্রকাশক - তুষারকান্তি সাহা
মূল্য - ২০০ টাকা।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত স্মরণ সংখ্যা ‘আলোহাওয়া’

একটি লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটপত্রিকা হচ্ছে সমাজের সাহিত্যদর্পণ । শুধুই সমকালিক নয়। যুগান্তরের ভাষাসাহিত্য ও তার যুগন্ধর স্রষ্টাদের সঙ্গে সমকালকে পরিচিত করে দেওয়ার এক প্রতিষ্ঠিত মাধ্যম। আর একের পর এক এই লক্ষ্যেই উৎকৃষ্টতা ও দায়বদ্ধতা নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেছে বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি শহর থেকে প্রকাশিত ‘ সাহিত্য শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক ’ পত্রিকা ‘ আলোহাওয়া ’ । রজতজয়ন্তী বর্ষে প্রকাশিত হয়েছে এই পত্রিকার ১৯তম সংখ্যা - ২৫তম বর্ষ , পৌষ ১৪৩২ - ডিসেম্বর ২০২৫ সংখ্যা । কবি জিতেন্দ্র নাথ সম্পাদিত এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হয়েছে সাহিত্যিক ‘ তুষারকান্তি নাথ স্মরণ সংখ্যা ’ হিসেবে । তুষারকান্তি নাথ এমন একজন সাহিত্যিক যাঁকে আখ্যায়িত করা যায় একজন সার্বিক সাহিত্যিক হিসেবে। ধারে ও ভারে তাঁর সৃষ্টি শুধু বরাক উপত্যকাতেই নয় এর বাইরেও সমাদৃত। তাঁর লেখনী রত্নপ্রসবা। পক্ষান্তরে এটাও বলা যায় যে ঘরে বাইরে কিছু স্বীকৃতি , কিছু প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকলেও তাঁর লেখালেখি ও নানাবিধ সৃষ্টিকর্মের গভীরতার মূল্যায়ন যতটা হওয়ার প্রয়োজন ছিল ততটা কিন্তু হয়নি। আসলে প্রান্তিকতা সততই লেখক, কবি, সাহিত্যিকদের পরিচিতির পথে এক বৃহৎ অন্তরা...

প্রখর গরজ ও শ্রদ্ধায় নিবেদিত একটি ‘সুকান্ত সংখ্যা’ - শতদল

হাতে নিলে আর পাঁচটা নিয়মিত সংখ্যা পত্রিকার মতো মনে হলেও উত্তর ত্রিপুরার চুড়াইবাড়ী থেকে কবি, লেখক রতন চন্দ সম্পাদিত সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক ‘শতদল’ পত্রিকার সম্প্রতি প্রকাশিত ২৯তম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১৪৩৩, মে-২০২৬ (কবি সুকান্ত জন্মশতবর্ষ সংখ্যা) সত্যিকার অর্থেই ব্যতিক্রমী। সেই মাত্র ৪২ পৃষ্ঠার পেপারব্যাক সংস্করণ হলেও প্রচ্ছদ থেকে শেষ পৃষ্ঠা অবধি যতন, গরজ ও উৎকর্ষের এক সম্ভার বললেও বাড়িয়ে বলা হয় না মোটেও। বাংলা ভাষার কবিদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র স্থান ধরে আছেন অকালপ্রয়াত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর সময়কাল থেকে আজ অবধি এবং আগত-অনাগত চিরকালীন এক বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী এই কবি মূলত একজন প্রতিবাদী কবি হিসেবেই সাহিত্যবিশ্বে পরিচিত হলেও তাঁর কবিতায় এর বাইরেও যে রয়ে গেছে বহুমাত্রিক এক বোধ, ভাষ্য - বোধ করি তার সঠিক মূল্যায়ন হয়নি আজও। তবে যতই তাঁকে নিয়ে চর্চা হবে ততই এক এক করে খুলবে বিস্ময়ের ঝাঁপি এ কথা অনস্বীকার্য। এবং তারই এক নির্মোহ প্রয়াস ও প্রকাশ আলোচ্য সংখ্যাটি। সুসজ্জিত কবি-প্রতিকৃতিযুক্ত একটি নান্দনিক প্রচ্ছদ - সজ্জায়, বর্ণ সংস্থাপনে প্রথমেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বাধ্য পাঠকের। সৌজন্যে মুদ...