সচরাচর এমনটিই হয়। দীর্ঘদিনের পুঞ্জিত অনুভব যেন বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে আসে হড়পা বানের মতো। কবিতায় যিনি আত্মমগ্ন, কবিতায় কবিতায় তিনি ধরে রাখেন সমকাল, সমকালিক সুখদু:খ। এরপর যখন অগ্রন্থিত কবিতাকে গোটানোর পালা আসে তখন এক এক করে খনি থেকে তুলে আনা রত্নকে বাছাই করে গ্রন্থিত করার যে প্রক্রিয়া তা শুধু তিনিই জানেন - কবি যিনি, গ্রন্থকার যিনি।
অনুভব কখনও একমুখী হয় না। মানুষের জীবন বহুমুখী অনুভব, বিস্তৃত অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রথম কাব্যগ্রন্থ তাই সচরাচর বিষয়ভিত্তিক হয়ে ওঠে না। বরাকের কবি প্রণব কান্তি দাস ব্যতিক্রম নন। স্বভাবকবি তিনি, তাঁর নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডে সাহিত্য জুড়ে রয়েছে বহুমাত্রিক হয়ে। পত্রিকা সম্পাদনা, সাংবাদিকতা, ভ্রমণ - প্রকৃতি আর মানুষের সঙ্গলাভের উদ্দেশে তিনি ছুটে বেড়ান এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আহরণ করেন জাগতিক অনুভব আর মানসিক পরিপূর্ণতা। আর এসব নিয়েই রচিত হয় কবিতা - যা নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত হল কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ। স্বভাবতই বিষয়ভিত্তিক নয়, আহৃত অনুভবের বহুমাত্রিক প্রকাশ।
বরাক নদী জন্মস্থানসূত্রে কবি-মানুষের চিরসঙ্গী। এ নদী বরাকপারের মানব জীবনে গভীর প্রভাবশালী। এর পারে দুদণ্ড দাঁড়ালে অশান্ত মন ভরে ওঠে স্নিগ্ধতায়, যাবতীত শোকদুঃখের জ্বালা মেটায় এ নদী তার আপন বৈভবে। ব্যতিক্রম নন কবিও। কিন্তু কোথাও এক ভাঙনের ধ্বনি যখন বেজে ওঠে কবির হৃদয়ে তখনই পঙ্ক্তি ঝরে পড়ে কবিতার আদলে -
হাজারো কান্না, দুচোখে ভরা
দুই পারে অশ্রুনদীর ধারা...
দুই তীরে তার কান্না ঝরে
শুকিয়ে যায় বালুচরে
ঘামে রক্তে মিশে প্রাণ
অনেক ভালোবাসা,
নিঝুম রাতে জল ছলাচ্ছল
ওগো বরাক নদী
হাত দুটিতে শেকল কেন
কানে তালা নিরবধি ?
স্বাধীনতায় স্বচ্ছ তোমার জলের রেণু ঝরে
ভেঙেও আজ ভাঙে না কঠিন কারা
দুই পারে তার অশ্রুনদীর ধারা। (কবিতা - বরাক পারের কান্না)
এই কবিতাকেই গ্রন্থের নির্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করা যায় যদিও সামগ্রিক হিসেবে বরাক প্রসঙ্গ উঠে এসেছে আরও একাধিক ভাবুকপ্রাণা কবিতায়। যেমন - ‘মৌন ছবি’, ‘বড়াইল পুড়ে ছাই’, ‘কালো পাহাড়’, ‘পথিনী’, ‘আজও থাকবে’, ‘মা হয়ে থাকবে’ ইত্যাদি। এর বাইরে প্রেম ভালোবাসার অনুষঙ্গই মুখ্য হয়ে উঠেছে গ্রন্থে। বস্তুত প্রথম এবং শেষ দুটি কবিতার প্রেমবন্ধনেই বাঁধা আছে আস্ত গ্রন্থটি। কোনও এক বা অধিক ‘তুমি’কে উদ্দেশ করে কবি ছড়িয়ে দিয়েছেন তাঁর আত্মোৎসারিত প্রেমের বার্তা - নিজেই নিজেকে, পাঠককে। অধিকাংশ কবিতাতেই এই অনুষঙ্গ প্রস্ফুটিত হয়েছে নানা আঙ্গিকে, কোথাও দু:খব্যথার তো কোথাও সুখানুভূতির আবহে। উল্লেখযোগ্য ‘তুমি’, ‘মোহনায়’, ‘সুখস্মৃতি’, ‘বৃষ্টি শেষে’, ‘এসো ভিজি দুজনে’ ইত্যাদি। কবির ভাষায় - ‘আমার কবিতায় তুমি পাল ছাড়া বুনোহাঁস...।’ বিষয়ভিত্তিক কিছু কবিতা গ্রন্থটিকে প্রদান করেছে এক অনন্য মর্যাদা। যেমন ঋতু বিষয়ক, স্থান বিষয়ক, দেশভাগের যন্ত্রণা (উল্লেখযোগ্য ‘দু:খিনী মায়ের কথা’ কবিতাটি), ভবিষ্যতের স্বপ্ন, চরগোলা এক্সোডাস, শহিদের আত্মত্যাগ, পহেলগামের ঘটনা ইত্যাদি অনুভবসঞ্জাত বিষয়। আসলেই এক দুরন্ত অনুভূতিশীল কবিমনের পরিচায়ক এসব কবিতা। এক নির্ঝঞ্ঝাট বাংলার স্বপ্ন দেখেন কবি। উনিশ-একুশ কবির প্রাণ। তাই কবি লিখেন - ‘...বাংলা আমার আত্মপরিচয়, আমার দৃপ্ত স্লোগান।’ একদিকে কবি যেমন অস্তিত্বের সংকটে দেখেন দুই বাংলার সমন্বয়ে এক বাংলার স্বপ্ন অন্যদিকে আবার ওপার বাংলার অনিয়মের বিরুদ্ধেও লিখেন - ‘...শেয়ালেরা নাছোড়বান্দা সীমানা ছাড়িয়ে/... তাড়িয়ে দিল - বিভাজনে অস্তিত্বের সংকটে/ কেড়ে নিল মনুষ্যত্বের অধিকার...।’
প্রথম কাব্যগ্রন্থে কাব্যময়তার উপস্থিতি সচরাচর বিরল। তবে এখানে কবি অনেকটাই পরিপক্কতার পরিচয় দিতে সচেষ্ট থেকেছেন। তবু বলা যায় উত্তরণের পথে কয়েক ধাপ এগিয়ে রয়েছেন নিশ্চিত। কিছু যতিচিহ্নের ব্যবহারজনিত বিভ্রাট, কিছু পঙ্ক্তি ও বানানবিভ্রাট উপেক্ষা করা যায় না। গ্রন্থের ছাপা বাঁধাই, পরিপূর্ণ ব্লার্ব সবই যথাযথ। গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় কবি ও তাঁর কবিতার বিষয়ে লিখেছেন বিশিষ্ট গল্পকার ঝুমুর পান্ডে। কবি গ্রন্থটি উৎসর্গ করেছেন তাঁর ‘মা, বাবা ও বড়দা’কে। সব মিলিয়ে ৬৪ পৃষ্ঠার পাকা বাঁধাই গ্রন্থের ৫৬টি কবিতার অধিকাংশই নিবিড় পাঠের উপযুক্ত। নিশ্চিত দোলা দেয়, ভাবনার উদ্রেক ঘটায় পাঠকের অন্তরে।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘বরাকপারের কান্না’প্রণব কান্তি দাস
প্রকাশক - একুশ শতক, কলকাতা
মূল্য - ২০০ টাকা।

Comments
Post a Comment