উত্তরপূর্বের সাহিত্য ভুবনের বিষয়ভিত্তিক পত্রিকা প্রকাশে ‘সেবা’ এক নিয়মিত নাম। কর্মকাণ্ডের বিপুলতায় যুগ্ম সংখ্যা হিসেবেই বছরে এখন একটি করে এই পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে ধারাবাহিকতা মেনে। শ্রীভূমি থেকে ‘সেবা - এ হেল্প এজেড গ্রুপ কর্তৃক প্রকাশিত বরিষ্ঠ নাগরিকদের প্রতি নিবেদিত’ ‘সেবা পত্রিকা’ যেখানে, সেখানেই রয়েছে বৃদ্ধাবাস ‘বেলাভূমি’ - যার পরিচালনায় ও দেখভালে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছেন সমাজসেবী ও কবি, লেখক অপর্ণা দেব।
‘সেবা’ পত্রিকাটি বিষয়ভিত্তিক। বরিষ্ঠ নাগরিকদের সুখদু:খ, জীবন যাপন, আশা প্রত্যাশা নিয়েই সব রচনা। পত্রিকার ৩৩/৩৪ যুগ্ম সংখ্যা (আশ্বিন ১৪৩২, অক্টোবর ২০২৫) প্রকাশিত হয়েছে যথাসময়েই। স্বভাবতই বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে ‘সেবা’ এখন আর ছোট্টটি নেই। গত সতেরো বছর ধরে পত্রিকার প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে ওঠার ধারাবাহিকতায় এতে সন্নিবিষ্ট হয়েছে নানা আঙ্গিকের বহু লেখালেখি। সেখান থেকেই ৫০টি ছোটোগল্প বাছাই করে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সংকলন - ‘বেলাশেষের নীলাকাশ’। নিঃসন্দেহে এক অনন্যসাধারণ প্রয়াস ও প্রকাশ।
এই পরিসরে প্রকাশকের তরফে ব্লার্বে সন্নিবিষ্ট হয়েছে প্রেক্ষাপট সহ যে গ্রন্থ পরিচিতি তার কিয়দংশ মোটেও অপ্রাসঙ্গিক হবে না নিশ্চিত - ‘অপর্ণা দেব সম্পাদিত ‘বেলাশেষের নীলাকাশ’ গল্প সংকলনটির মূল ভিত্তিভূমি একটি ছোট পত্রিকা। পত্রিকার নাম ‘সেবা’। ...’সেবা’ বিজ্ঞাপনহীন একটি পত্রিকা। শুধুমাত্র প্রবীণদের নিয়ে সম্পূর্ণ বিষয়ভিত্তিক এই কাজ সাহিত্য অঙ্গনে ইতিমধ্যে নতুন একটি ধারার পরিচয় বহন করছে...। বৃহৎ সংকলনটিতে সতেরো বছরের যাত্রাপথের পরিচয় বহন করছে পঞ্চাশটি ছোটোগল্প। গল্পগুলো মূলত বিধৃত হয়েছে বিষয় এবং অবয়বে। সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, অতিমারি সময়, প্রযুক্তি সবকিছুই কোনো না কোনোভাবে তুলে ধরেছে এই সময়কালের বিবর্তনের চিহ্নকে। মূল বিষয় ধরে রেখে ছোটোগল্পের বিবর্তনের ধারাবাহিকতাকে তুলে ধরা হয়েছে। জীবন বহমান, পরিণত সময়ে অস্তিত্ববোধ ও তার যাপনের কথকতা এবং তার ভিন্ন ভিন্ন রূপ পাঠক আস্বাদন করবেন এই গ্রন্থে...।’
সংকলনে সন্নিবিষ্ট এক একটি গল্প যেন জীবনের এক একটি বিচিত্র ও বিষণ্ণ অধ্যায়কে জীবন্ত করে তুলেছে। নানা প্রেক্ষাপটে, নানা আঙ্গিকে লেখা গল্পগুলি শুধু গল্প নয়, জীবনের সারসত্যকেই যেন উদ্ঘাটিত করেছে। ‘বয়স শুধুই একটি সংখ্যা’ বলে বিষয়কে ইচ্ছে করেই লঘু করে দেখানোর প্রয়াসের মধ্যেই নিহিত আছে বয়স যে কী বালাই। অন্তত এই সংকলনের গল্পসমূহের পরতে পরতে সেসব কথা, সেইসব ইতিহাসই যেন জীবন্ত হয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সবগুলো গল্প নিয়ে কিংবা সুচিন্তিত কতিপয় গল্প নিয়েও আলোচনার পরিসর নেই যেহেতু শুধু এটুকুই বলা যায় যে এই অভিনব প্রয়াসের পিছনে যাঁরা রয়েছেন তাঁদের এই কর্মকাণ্ডকে প্রবহমান বাংলা সাহিত্যধারার সঙ্গে জড়িত প্রত্যেকের সাধুবাদ জানাতেই হবে একদিন।
সম্পাদক আপর্ণা দেব তাঁর নিত্যদিনের কর্মকাণ্ডে বরিষ্ঠ নাগরিকদের সেবায় সাহচর্যে অতিবাহিত করেন অধিকাংশ সময়। অন্যদিকে ‘সেবা’ পত্রিকারও তিনিই সম্পাদক। সুতরাং দুয়ে দুয়ে চার হয়ে সংকলনটির গভীরে যে লেখা রইবে এক নিগূঢ় জীবনকথা তাতে তো অন্যথা হবার জো নেই। যে ৪০জন গল্পকারের লেখা মোট ৫০টি গল্প এখানে সংকলিত হয়েছে তাঁরা হলেন - সৌমিত্র বৈশ্য, হেলালুজ জামান, শুভঙ্কর চন্দ, খেলু মজুমদার, জন্মজিৎ রায়, মানবরতন মুখোপাধ্যায়, বিজয়া দেব, রণবীর পুরকায়স্থ, তুষারকান্তি সাহা, অঞ্জলি সেনগুপ্ত, মাধুরী সেনগুপ্ত, ময়কান্তি দে, তনুশ্রী ঘোষ, মৃদুলকান্তি দে, বিনয়ভূষণ কর, সুশান্ত চক্রবর্তী, কুমার অজিত দত্ত, মিথিলেশ ভট্টাচার্য, অপর্ণা দেব, পরিতোষ তালুকদার, সজল পাল, মেঘমালা দে মহন্ত, মৃন্ময় রায়, ভাস্বতী দাশগুপ্ত, সৌমিত্র বৈশ্য, শ্যামল বৈদ্য, জয়তী রায়, অর্ঘ্য দত্ত, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, বিল্লাল হোসেন, প্রাণকৃষ্ণ কর, শিবানী শর্মা, বিমলেন্দু চক্রবর্তী, প্রতিভা সরকার, সঞ্জয় গুপ্ত, দীপেন্দু দাস, বিকাশ সরকার, গৌর বৈরাগী, স্বপ্না ভট্টাচার্য ও সৌম্যদীপ দেব। ১০ জন গল্পকারের দুটি করে গল্প নেওয়া হয়েছে সংকলনে।
সম্পাদকীয় কর্মকাণ্ডের বাইরেও এমন একটি সংকলন প্রকাশের প্রস্তুতি, কার্য সম্পাদনা ও সমাপন পর্বে একাধিক ব্যক্তির অংশগ্রহণ অপরিহার্য। গভীর নিষ্ঠা, নিবেদন ও গরজের অকুণ্ঠ যোগদানেই এই বৃহৎ কার্যটি সুসংগঠিত হতে পারে। এই পর্বে শহরের অন্যতম নিষ্ঠাবান কবি, লেখক মৃন্ময় রায় অন্যতম। গ্রন্থের শেষ প্রচ্ছদে তাঁর কিছু বয়ান এখানে তুলে ধরা উচিত বলেই মনে হয়। এই অমূল্য সংকলনটির বিষয়ে তিনি লিখছেন - ‘একটি সাময়িকীর একটি বিষয়ভিত্তিক কোনও সংখ্যা এবং একটিই বিষয়ভিত্তিক কোনও সাময়িকীর প্রতিটি সংখ্যা যে অভিন্ন নয়, সে কথা না বললেও চলে। তবে দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বাংলা সাময়িকীর ধারায় ‘সেবা’ সম্ভবত একটি বিরল সংযোজন। বিরল - কারণ এই ধারায় প্রবীণত্বকে বিশেষ করে নিতে এর আগে আমরা দেখেছি কি না মনে করতে পারি না।
বরিষ্ঠ নাগরিকদের জন্য নিবেদিত, শুরু থেকেই সেবা-র প্রতিটি প্রচ্ছদে মুদ্রিত এই ঘোষণার ধারাবাহিক অনুসরণ রয়েছে প্রতিটি সম্পাদকীয় এবং রচনায় এবং এ পর্যন্ত গড়ে ওঠা তাদের পরিমাণ সহজেই দাবি করতে পারে একটি সংরক্ষণ-কামী সংকলনের।
সর্বধরণের লেখাই যদিও গুরুত্বপূর্ণ এবং স্বকীয় আবেদনেই তারা সমাদৃত, তবু আয়তন, অর্থ এবং আরও কিছু প্রাসঙ্গিক দিককে বিবেচনায় রেখেই হয়তো আপাতত শুধু পঞ্চাশটি নির্বাচিত গল্পেরই এই সংকলন।
গল্পের প্রতি আমাদের আকর্ষণ চিরন্তন হলেও এখানে কেবলই প্রবীণ ও প্রবীণত্ব বিষয়ক গল্পের সমাহার কি এক সময় ক্লান্তিকর বলে মনে হতে পারে ? সুখের কথা, তেমন সম্ভাবনা নেই কারণ বিষয়ের ঐক্যকে আলো দিয়েছে প্লট, পরিবেশ, দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপনার বৈচিত্র। এ ছাড়াও, বাড়তি স্বাদ জুগিয়েছে কয়েকটি অনুবাদ গল্প...।’ মৃন্ময় এখানে সংকলনটির একগুচ্ছ ভিতরকথা, আশা ও আশঙ্কার কথা উদ্ধৃত করে মান বাড়িয়েছেন সংকলনটির। সত্যিই তো প্রতিটি জীবনই তো আলাদা। তাই একটি নির্দিষ্ট জীবনসীমার কথাতেও তো লিপিবদ্ধ হতে পারে একের পর এক বিচিত্র উপকথা আর অনুষঙ্গ।
২৮০ পৃষ্ঠার সংকলনটি এমনই। মানস ভট্টাচার্যের নান্দনিক প্রচ্ছদ গ্রন্থটিকে এক ভিন্নতর মর্যাদা এনে দিয়েছে। ছাপার স্পষ্টতা, বাঁধাই, অক্ষর বিন্যাস, বানানের শুদ্ধতা সবেতেই অনন্য এক সংকলন। ছাপার ক্ষেত্রে শুধু শেষ গল্পটির লাইন স্পেসিং আর কিছু গল্পের ফন্ট সাইজ ভিন্ন হয়ে গেছে। সম্পাদকীয় ভূমিকাবিহীন গ্রন্থটির শেষে লেখক পরিচিতি প্রাসঙ্গিক হয়েছে। বস্তুত সংকলনটি উৎসর্গই করা হয়েছে - ‘যাঁদের সংবেদী সাহচর্যে এই সাহিত্যপত্রের পথ চলা, যাঁদের কলম নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখিয়েছে সেইসব লেখক ও পাঠকদের উদ্দেশে...।’ সব মিলিয়ে এক সংগহযোগ্য সংকলন যা সাহিত্যপথের সকল যাত্রীকে আকৃষ্ট করবে নিশ্চিতভাবেই।
বিদ্যুৎ চক্রবর্তী
‘বেলাশেষের নীলাকাশ’সম্পাদক - অপর্ণা দেব
প্রকাশক - ‘সেবা’ পত্রিকামণ্ডলী
মূল্য - ৪০০ টাকা
.jpg)
অতি মূল্যবান একটি সংকলন।
ReplyDelete