অজাযুদ্ধ
আজ রোববার। দু’পাশে সবুজের বিস্তৃত সম্ভার নিয়ে সরলরৈখিক
গতিপথ ধরে যা রাস্তাটি শহরতলি ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে সেই রাস্তার
লাগোয়া ছবির মতো পরিপাটি করে সজ্জিত মন্দিরে আজ সকাল থেকেই পুণ্যার্থীদের ভিড়। জাগ্রত
মায়ের মন্দিরে দুঃখ শোকের উপশমের আর্জি নিয়ে ঢল নামে মানুষের। প্রচণ্ড ব্যস্ত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত
অবণী ঘোষাল – তল্লাটে যিনি অবণী পণ্ডিত নামেই পরিচিত। পরিচিত শুধু নয়, জনপ্রিয়ও বটে। এই
জনপ্রিয়তার পেছনে আসলে তাঁর পূজা অর্চনায় অগাধ পাণ্ডিত্যের গুণটিই মূল কারণ। তখনকার
দিনে টোলে পড়া সুদর্শন অবণী ঘোষালের শুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণে উদ্বেলিত হয় ভক্ত হৃদয়।
রোববার হলেই ব্যস্ততার বহর কয়েকগুণ
বেড়ে যায় অবণী পণ্ডিত ও তাঁর সাগরেদ হারাণের। এই দু’জনকেই সামাল দিতে হয়
মন্দিরে সমাগত পুণ্যাতুর জনতার ভিড়। খুব কষ্ট হয় এতে। আগে
লোকজন কম ছিল কিন্তু এখন দিন দিন ভিড় বেড়েই যাচ্ছে। এতদিনে বেশ কিছু ছোট ছোট দোকান খুলেছে
মন্দিরের সামনে। পূজা
সামগ্রীর দোকানই বেশি। এর বাইরেও আছে নিত্য ব্যাবহার্য সামগ্রীর দু’একটি দোকান। আর
এই সব সারি সারি দোকানগুলো যেখানে গিয়ে শেষ হয়েছে সেখানে আছে কাশেম-এর কসাইয়ের দোকান। বস্তুতঃ
কাশেম-এর দোকানটিই এই লাইনের সব থেকে পুরোনো দোকান। তখন এত ভিড় হতো না মন্দিরে। এত
লোকজনও ছিল না এ অঞ্চলে। সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে লোকজন। বেড়েছে জাগতিক দুঃখ দুর্দশা। লোকমুখে
ছড়িয়েছে মন্দিরের কথা। এখন দূর দূরান্ত থেকেও ছুটে আসে অগণিত ভক্ত। দুঃখ
লাঘবের আর্জি নিয়ে দলে দলে ভক্তের সমাগম হয় জাগ্রত মন্দিরে। রোববার ছুটির দিন বলে ভিড় বাশি। এদিন
কিন্তু বন্ধ থাকে কাশেম-এর দোকান। এর পেছনে আছে এক অন্য কাহিনি।
“কই রে হারাণ’’
– পুজো শেষে হাঁক পাড়েন পণ্ডিত মশাই।
আওয়াজ শুনে তড়িঘড়ি ছুটে আসে এতক্ষণ
থেকে তৈরি হয়ে থাকা হারাণ-
“হ্যাঁ বলুন কাকু’’। অবণী পণ্ডিত দূর সম্পর্কে হারাণের
কাকুই হন বটে।
“নে, এবার শুরু কর”।
মায়ের বিগ্রহের সামনে সাষ্টাঙ্গে প্রণাম
করে উঠে দাঁড়ায় হারাণ। চোখে মুখে একরাশ প্রত্যয়। এবার কঠিন কাজে হাত লাগাতে হবে। যদিও
এ তার এক হিসেবে নিত্যকর্মই বলা চলে এবং এই কাজে সেই হলো সব চাইতে সিদ্ধহস্ত ও ভরসার
পাত্র। তবুও
এই সময়টাতে কেমন যেন এক অন্য জগতের বাসিন্দা হয়ে যায় হারাণ। চিত্ত একাগ্র, দৃষ্টি নিবদ্ধ শুধুমাত্র
চোখের সামনে প্রতীয়মান লক্ষ্যে।
মদির চত্বর জুড়ে এক উৎসবের আমেজ। একদিকে
মায়ের মন্দির আর তার ঠিক উলটো দিকেই বাঁধানো সিঁড়ির ঘাটযুক্ত পুকুর। খুব
একটা বড় নয়। বড়জোর
তিরিশ বাই পঞ্চাশ হবে। তবে জল থাকে বারোমাস। এ দু’য়ের মাঝে চাতালের দু’পাশে ভক্তদের বসার জন্য সিমেন্টের বাঁধানো একাধিক বেঞ্চ। চাতালের
পিছন দিকে কিছুটা জায়গা জুড়ে ফুলের বাগান। বলা বাহুল্য নানা জাতের জবা ফুলের
গাছই এই বাগানের সংখ্যাগুরু বাসিন্দা। আদিও বটে। আর প্রবেশ পথের সামনে চাতালের ঠিক
মাঝখানে আছে বলির স্থান। মায়ের মূর্তির ঠিক সামনে। রোববারের আগের রাতেই এই জায়গাটি ঠিকঠাক
করে রাখে হারাণ। আড়গড়াটি
উপযুক্ত ভাবে মাটিতে প্রোথিত করে অনেকগুলি কলাগাছের কাণ্ডের টুকরা জড়ো করে জায়গাটাকে
ধুয়ে মুছে সব প্রস্তুত করে রাখতে হয়। খড়্গটাকে ধারালো করে রাখাটাও তার একান্ত
কর্তব্য। পূজার
বলি যদি কোনও কারণে আটকে যায় তাহলে খুব ঝামেলা। ভক্ত হৃদয় কেঁপে উঠে অজানা আশংকায়। হারাণ
তা চায় না। তাই
এ কাজে সে খুব যত্নবান। আজ অবধি মোটে একবার এমনটা হয়েছিল। না হলে এই ব্যাপারে সে খুব পটু। ভক্তরা
ও হারাণকেই চায় এই কাজে। হারাণেরও মূল দায়ত্ব এটাই। এই কাজের জন্য যা পায় হারাণ তাতে করেই
সংসার চলে ওর। রোববার
ছাড়াও প্রায়ই থাকে দু’
চারটে বলি। তাই হারাণ আর অন্য কাজে নিযুক্ত করতে
পারে না নিজেকে। আর
রোববার কিংবা বিশেষ বিশেষ তিথিতে তো ওর দম ফেলার ফুরসত নেই।
হারাণের সংসারে এক বৃদ্ধা মা, ওর স্ত্রী আর এক কন্যা
সন্তান। অন্তরে
শান্তি নেই হারাণের। মেয়েটি দেখতে শুনতে মন্দ নয় যদিও কিন্তু জন্মাবধি বোবা ও কালা। শিশু
বয়ষে ঔষধপাতি খাইয়েছে যদিও সারার নয় বলে জানিয়ে দিয়েছেন ডাক্তার। সেই
থেকে এক রকমের বোঝা হয়েই হারাণের সংসারে তার দিনযাপন।
বিয়ের আগে থেকেই মন্দিরের কাজে লেগে
পড়েছিল হারাণ। কী
করে যেন এই পশুবলির কাজে ধীরে ধীরে পটু হয়ে উঠেছিল তা সে নিজেও জানে না। তবে
এই ব্যাপারে যার কিছুটা প্রভাব ছিল সে হলো হারাণের বাল্যবন্ধু কাশেম। একই
গাঁয়ের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে একই সাথে স্কুলে পড়তে যেত দু”টিতে। তবে
পড়াশোনায় বিশেষ সুবিধে করে উঠতে পারেনি কেউই। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে তাই ওদিকের
পাট সাঙ্গ করে দিল দু’জনেই। এরপর কিছুদিন বাউণ্ডুলের নতো এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে দায় হয়ে
উঠলো নিজেদের সংসারে। কাশেম যদিও হাত লাগিয়েছিল কিছু খেত খামারের কাজে কিন্তু
খুব থিতু হতে পারল না সেখানে। হারাণও কিছুদিনের জন্য চলে গিয়েছিল দূরে তার মামার
বাড়িতে। কিন্তু বেকার হয়ে আর কতদিন কোথায় থাকা যায় ? তাই একদিন ফিরে এল গাঁয়ে।
বলতে গেলে রেল লাইনের দুই সমান্তরাল পাতের মতোই জীবন পথে এগোতে থাকল দুই বালক
বেলার সাথী। এক সাথে কিন্তু আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে।
এদিকে বয়োবৃদ্ধির সঙ্গে সমাজের ও
পরিবারের কিছু পরিবর্তিত পরিস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রভাবও পড়তে থাকল ওদের উপর।
ইতিমধ্যেই পিতৃবিয়োগ হয়েছে হারাণের। সংসারের দায় দায়িত্ব এবার সামলে নেওয়ার চিন্তা
এসে ভিড় করেছে অন্তরে। কাশেমের ঘরেও শয্যাশায়ী বৃদ্ধ পিতা। পরের জমিতে কৃষিকাজ
করে রোজগারের ইচ্ছে নেই তার। কিছু একটা ব্যাবসা করতে পারলে মন্দ হতো না – ভাবে
কাশেম। প্রায়ই দেখা হয় দুই বন্ধুর। এ নিয়েই চলে আলাপ আলোচনা। এরই মধ্যে সম্পর্কীয়
কাকুর মাধ্যমে মন্দিরের খবর পায় হারাণ। তখন মন্দিরে আজকের মতো এত ভক্ত সমাগম হতো
না। কিন্তু যতটুকু হতো তাতেই অবণী ঘোষালের একজন সাগরেদ না হলে চলছিল না। খবর পেয়ে
আর দেরি না করে সটান কাজে লেগে পড়ে হারাণ। গ্রামের কিছু কিছু লোকের বাড়িতে পূজা
অর্চনা করার অভিজ্ঞতা তার ছিলই – আর সেই সূত্রে পশুবলিতেও হাত পাকিয়েছিল হারাণ।
তাই এই কাজে তার আর বিশেষ অসুবিধা হলো না।
আশ্চর্যজনকভাবে হারাণকে দেখেই যেন
নিজের ভবিষ্যৎটাকে খুঁজে পেল কাশেম। মন্দিরের সামনের রাস্তায় মন্দির থেকে খানিকটা
দূরে খুলে বসল কসাইয়ের দোকান। প্রাথমিক অবস্থায় খরিদ্দার তেমন ছিল না। বুদ্ধিমান কাশেম তখন নিয়ে বসল এক মোক্ষম পদক্ষেপ। সে
আশেপাশের গ্রাম থেকে কিনে আনতে থাকল বলিযোগ্য পাঁঠা। আর এই খবর চাউর হতেই বলির
মানসে মন্দিরে আসা ভক্তরা কাঠ খড় না পুড়িয়ে সোজা কাশেমের দোকান থেকেই নির্ঝঞ্ঝাটে
কিনে নিতে শুরু করল বলির জন্য উপযুক্ত ছাগপশু। কাশেমের ভাগ্যে খুলে গেল আশার নতুন
দিগন্ত। আর হয়তো কৃতজ্ঞতাবশতই - রোববারের দিনটা মাংসের দোকান বন্ধ রাখে কাশেম।
ইতিমধ্যে আশেপাশের গাঁয়ে গঞ্জে ছোঁয়া লেগেছে বিশ্বায়নের। লোকজন বেড়েছে দেদার।
নিত্য নতুন গজিয়ে উঠেছে ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান। অনেকটাই আধা শহরের রূপ পেয়েছে এলাকাটা।
খুলেছে নতুন বাজার, উন্নত হয়েছে যোগাযোগ ব্যাবস্থা। একাধিক স্কুল কলেজের পত্তন
হয়েছে শহর জুড়ে। বাইরে থেকে আগমন ঘটেছে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের। কাশেমের দোকানে নতুন
নতুন খরিদ্দারের ভিড়। একা হাতে সামলে উঠতে পারে না কাশেম। সবকিছু হারাণের চোখের
সামনে। প্রায়শই এ নিয়ে আলোচনা হয় কাশেমের সঙ্গে। পালটে যাওয়া দিন কাল অবাক হয়ে
উপভোগ করে দু’টিতে। দোকান খোলার প্রায় বছরের মাথায় বিয়ে করে কাশেম। রেলের অপর
পাত কী করে ভিন্ন হয় ? কাশেমের বিয়ের ছ’মাসের মাথায় হারাণও গিয়ে দাঁড়ায় ছাদনাতলায়।
রোজগার যা হচ্ছিল তা প্রথম অবস্থায় প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম হলেও এখন বেড়েছে
অনেকটা। নিশ্চিন্ত হারাণ তাই বিয়ে করে বউ নিয়ে এল ঘরে। আর এ নিয়ে মাঝে মাঝেই খোশ
গল্পে মেতে উঠে হারাণ আর কাশেম।
**
আজ এমনি এক অলস বিকেলে গুটি গুটি
পায়ে হারাণ গিয়ে উঠে কাশেমের দোকানের বারান্দায়। বাইরে পেতে রাখা বেঞ্চে তাকে বসতে
বলে দোকানের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কাশেম। ইতিমধ্যে দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও
সামাজিক পরিবেশে ঘটে গেছে বেশ বড়সড় পরিবর্তন। বদল হয়েছে সরকার। কাশেমের চেহারা
দেখে বুঝতে পারে হারাণ যে ওর মনেও পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে। আগের মতো হাসিখুশি
ভাবটা কেমন যেন স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে। এর কোন সঠিক কারণ খুঁজে পায়না হারাণ। সমাজটা
সত্যিই কেমন বদলে যাচ্ছে।
বারান্দায় হারাণের পাশে বসে
কাশেমই প্রথম কথা বলে
-
- তোর সঙ্গে কিছু জরুরি কথা আছে
রে হারু।
উৎসুক হয়ে তাকায় হারাণ। কাশেম বলে
-
- বেশ ক’দিন থেকেই শুনছি কথাটা।
সেদিন হাইস্কুলের হেডস্যার এসেছিলেন মাংস কিনতে। কথায় কথায় আমাকে কিছু সাংঘাতিক
খবর শুনালেন। সেসব শুনে আমার তো রাতের ঘুম উবে গেছে। কিন্তু তোকে বলার ফুরসত
পাচ্ছিলাম না।
ভ্রু কুঁচকে আগ্রহী হারাণ বলে -
কী কথা ?
- স্যর বললেন আমাদের ব্যাবসা নাকি
এবার লাটে উঠবে। মন্দিরে বলির প্রথাটা নাকি বন্ধ হয়ে যাবে। এ নিয়ে কিছু শিক্ষিত
মানুষ নাকি কীসব লেখালেখি করছে। কী যেন বললেন ওরা - হ্যাঁ, বুদ্ধিজীবী। তা ওই সব
বুদ্ধিজীবীরা বুঝি বলেছেন তোদের ভগবান নাকি বলি চান না। আর এ ভাবে অবুঝ পশুগুলিকে
পূজার নামে কেটে মেরে ফেলার ঘটনাটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও নীরব প্রাণীগুলোর উপর
মানুষের চূড়ান্ত অবিচার। আরোও কী কী অনেক শব্দের ফুলঝুরি ছুটিয়ে গেলেন রে। শুনে তো আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেছিল। হন্যে হয়ে তাই
খুঁজছিলাম তোকে। কী হবে এবার ? তুই শুনিসনি কিছু ?
প্রথমে বিশ্বাস করতে চায়নি হারাণ
কিন্তু কাশেমের চোখ মুখের ভঙ্গি দেখে এবার সত্যিই ঘাবড়ে যায়। মন্দিরের বিশালাকায়
ঘণ্টার সশব্দ আওয়াজের মতোই বুকের ভেতরটায় কে যেন ঘা মেরে সব অসাড় করে দেয় হারাণের।
কোন অনন্ত মহাকাশ থেকে যেন আকাশবাণীর মতো ভেসে আসে কাশেমের ছুঁড়ে দেওয়া প্রশ্ন -
কী হবে এবার ?
কোনওক্রমে কাশেমের দোকান থেকে
বেরিয়ে সোজা চলে যায় অবণী ঘোষালের বাড়ি। আলোচনা চলে দীর্ঘক্ষণ। কিন্তু কোনও সমাধান
সূত্র বেরিয়ে আসে না এই আলোচনায়। বৃদ্ধ বয়সে চোখে ষর্ষেফুল দেখেন অবণী পণ্ডিতও।
সিঁদূরে মেঘের তাড়নায় আন্দোলিত হতে থাকে দু’টি হৃদয়। শেষ অবধি কী হবে কেউ জানে না।
এর পরের দু’টি দিন উদভ্রান্তের মতো
এদিক ওদিক ছুটে বেড়ায় হারাণ। যত পরিচিত জন, বন্ধু বান্ধব সবার সাথে দেখা করে
পরিস্থিতির সত্যতা যাচাই করতে লেগে পড়ে। এই দু’দিনে শিক্ষিত সমাজের সাথে কথাবার্তা
বলে যতটুকু জানতে পেরেছে তাতে বুঝতে পেরেছে যে এখন শিক্ষিত সমাজের লোকেরা সমাজের
যত সব প্রচলিত রীতি নীতি আছে তা পালটে ফেলে সবাই সমাজ সংস্কারক হতে চায়। তাই পূজা
আচ্চা, ভগবানে বিশ্বাস, ধর্মীয় আচার আচরণ এসব কিছুর বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ভাবে
আঘাত হেনে সাম্যের দূত হওয়ার চেষ্টায় আদা জল খেয়ে মাঠে নেমেছে। কেউ কেউ আবার
নিরামিষ খাওয়ার সপক্ষে যথাযথ যুক্তি দেখিয়ে বলির বিরোধিতায় নেমেছেন। এটা অস্বীকার
করে না হারাণ। কিন্তু জন্মাবধি ধর্ম কর্মে বিশ্বাসী হারাণ মায়ের মন্দিরে নিবেদিত
প্রাণ। তাই এসব প্রচারকে তার অপপ্রচার বলেই মনে হয়। মাঝে মাঝে এসব কথায় বিচলিত হয়ে
পড়ে তার ভেতরটা। চিন্তা করে করেও এর কোন সুরাহা খুঁজে পায় না।
কিছুদিনের মধ্যেই খবর পেল হারাণ
এবার সত্যি সত্যিই মন্দিরে বলির প্রথাটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে
সব মহলে। চোখের সামনে অন্ধকার ভবিষ্যতের চিন্তায় তটস্থ হয়ে উঠে হারাণ। ছুটে যায়
কাশেমের কাছে। সব শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়ে কাশেম। যা কোনওদিন করেনি কাশেম সেই বলে উঠে
-
কী রে তোদের ধর্মের লোকগুলো ?
তোদের তো যুগ পুরোনো ধর্মপুস্তকে তোদের ভগবানের কত কথা লেখা আছে। তোদের পুজোর কথা,
বলির কথা - সবই তো আছে। না পড়লেও আমি জানি তো সব। অবণী কাকা আমাকে সব বলেছেন। যুগ
যুগ ধরে চলে আসছে তোদের পূজা পার্বণ। দেখ হারু - ধর্ম কাউকে কুশিক্ষা
দেয় না। সৎ
পথে থেকে জগতের স্রষ্টাকে অনুসরণ করতে শেখায়। এই মন্দিরের উপর নির্ভর করছে কতগুলো
মানুষের জীবন। বলি
যদি বন্ধ হয়ে যায় তাহলে ক’জন আসবে মন্দিরে পুজো দিতে ? দেখিস তুই - এমন হলে একদিন বন্ধ হয়ে যাবে মন্দির। এত এত অগণিত মানুষের বিশ্বাস, ভাব ভক্তি
- এগুলো কী আজকের ? এখন এরা কারা, যারা এসবের
বিরুদ্ধে বলছে ? এরা তো তোদেরই লোকজন। এরা কী করে জানলো যে ভগবান বলি চায় না ?
ভগবান কি এদের বলেছেন ? মনগড়া কাহিনি সেজে এরা আসলে কী করতে চায় ? কেউকেটা হতে চায়
? শালা ছাগলের দুঃখে কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে আর এদিকে প্রতি সপ্তাহে এসে মাংস কিনে
নিয়ে যায় দোকান থেকে। যত্তসব স্বার্থপর আঁতেলের দল। জানিস, এসব
দুঃখ ফুঃখ কিছু না। এ নিশ্চয় কোন ইচ্ছাকৃত ষড়যন্ত্র। আছে
যদি বুকের পাটা - বলুক দেখি এসে আমাকে ছাগল কাটা বন্ধ করতে।
কাশেমকে দেখে অবাক হয়ে যায় হারাণ।
এ কোন কাশেম ? ও এত কিছু কী করে জানে ? পড়াশোনার পাট একসাথে চুকিয়ে দিলেও জীবনের
পাঠশালায় কাশেম বোধ করি এগিয়ে গেছে বহু দূর। বিমর্ষ হয়ে ঘরে ফিরে আসে হারাণ।
**
এরপর পরিস্থিতি আর হারাণ বা কাশেমের
হাতের নাগালে রইল না। ক্রমাগত হাইটেক প্রচারের ফলে মন্দিরে বলির সংখ্যা এবং একই সাথে
ভক্ত সমাগমও কমে যেতে থাকল। প্রচারের ছোঁয়া থেকে বাদ পড়েনি হারাণও। মাঝে
মাঝে ব্যাপারটা তলিয়ে দেখে হারাণ। এসব প্রচার কি সত্যিই যথার্থ ? কিছু বুঝে উঠতে পারে
না। সে
তো ধারালো বলিচ্ছেদ এর ঘায়ে এক কোপেই পশুর মুণ্ডটা ধড় থেকে আলাদা করে দেয়। ওদিকে
কাশেমকে তো দেখেছে কেমন পোঁচ দিয়ে দিয়ে পশুর শ্বাসনালী ও খাদ্যনালীটা কেটে ফেলতে। সেখানেও
তো পশুখেকো মানুষের লম্বা লাইন। তবে এদিকটাতেই কেন সবার নজর ?
বলি চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার কিছুদিনের
মধ্যেই আকস্মিক মাতৃবিয়োগ যেন ভাবনার আর চিন্তার সাগরে নিমজ্জিত হারাণকে সাময়িক স্বস্তি
এনে দিল। কিন্তু
এই অবুঝ মেয়েটার চিন্তায় বিমর্ষ হয়ে থাকে সে সারাক্ষণ। তিনটে প্রাণীর কী করে করবে উদরপূর্তি ? এখন এই বয়সে তো নতুন
কোন কাজও সে জোগাড় করতে পারবে না। না আছে বিদ্যা, না অন্য কোনও কাজের
অভিজ্ঞতা। পথে
বসার আর বুঝি বাকি রইল না হারাণের।
মায়ের শ্রাদ্ধশান্তির কাজ চুকে যাওয়ার
বেশ ক’দিন পর বিষন্ন হারাণ এক জদঈদলূ বিকেলে ঘুরতে ঘুরতে গেল কাশেম এর দোকানের দিকে। সাধারণত
এই সময়টাতে কাশেম অবসরেই থাকে। কিন্তু আজ গিয়েই দেখল দোকানের বাইরে
বেশ ক’জন খরিদ্দার দাঁড়িয়ে আর কাশেমও ব্যস্ত তাদের সঙ্গে কথাবার্তায়। হাতের
ঈশারায় কশেম বসতে বলে হারাণকে। হারাণ দেখতে পেল কাশেমের দোকানে আমদানিকৃত
ছাগপশুর সংখ্যা আগার চাইতে অনেক বেশি। অর্থাৎ কাশেম এর ব্যাবসা এই ক’দিনে অনেকটাই বেড়েছে। অবাক
হয়ে তাকিয়ে থাকে হারাণ। মাথায় কিছুই ঢুকে না তার।
বেশ খানিকটা সময় বসে থাকার পর খরিদ্দারদের
বিদেয় করে কাশেম একটু গুছিয়ে নিয়ে পাশে এসে বসে হারাণের। বলে-
- ক’দিন থেকে বেশ ব্যাস্ত হয়ে পড়েছি রে দোস্ত। খবর নিতে পারিনি তোর।
আমতা আমতা করে হারাণ বলে- ব্যাবসা বেড়েছে না
রে কাশেম ?
কাশেম বলে – ব্যাপারটা বলছি শোন। বলি
বন্ধ হয়ে যাবে খবরটা শোনার পর প্রথমে খুব মুষড়ে পড়েছিলাম রে। তুই তো জানিস, বলির পশু বিক্রিটাই
ছিল আমার মূল আয়। আর এ জন্য মন্দিরের কাছে আমি রোববারের মতো জমজমাট দিনেও আমার
মাংসের দোকান বন্ধ রাখতাম। চিন্তিত হয়ে শেষে অন্য উপায় একটা খুঁজে
বের করলাম ব্যাবসাটা ধরে রাখার জন্য। প্রধান বাজারের মাংসের দোকানদারদের
সঙ্গে গোটা ছাগপশুর সাপ্লাই এর ঠিকা আদায় করে নিলাম। এবার তাই আমার কাজ আগের থেকেও অনেক
বেড়ে গেছে। আমাদের
পাশের বাড়ির আনোয়ারকে চিনিস তো ? ওকে কর্মচারী হিসেবে রেখেছি। তুই
তো জানিস, এখানে আজকাল কত বেড়ে গেছে মানুষ। বাজারে মাংসের প্রচণ্ড চাহিদা। অনেকগুলো
নতুন দোকানও খুলেছে। তাই আগে আমি যতগুলি পশু আনতাম এখন তার থেকেও বেশি আনতে হয়। তবে
পশুগুলো এখন আর তোদের মন্দিরে পৌঁছায় না। আমার দোকানে যতটুকু দরকার তার বাইরে
সবগুলো আমার হাত ধরে সরাসরি পৌঁছে যায় বাজারের মাংসের দোকানে। এখানে না মরে ওরা ওখানে মরে। সবকিছু
একই আছে রে হারু, শুধু মাঝখান থেকে তোদের মন্দিরটা বন্ধ হয়ে গেল। খুব
খারাপ লাগে। কেমন
জমজমাট থাকত এখানকার পরিবেশ। এখন দেখ কোথায় হারিয়ে গেল সবাই।
ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা হারাণ ফ্যালফ্যাল
করে তাকিয়েই থাকে কাশেমের দিকে।
উঠে আসে সেখান থেকে। কেমন
যেন উদাস হয়ে ঘুরতে ঘুরতে একবার দেখতে যায় অবণী কাকুকে। বৃদ্ধ বয়সে নিরুপায় অবণী কাকু শয্যাশায়ী
হয়ে মৃত্যুর প্রহর গোণায় ব্যাস্ত। কিছু ভালো লাগে না হারাণের। অসাড়, অবসন্ন পা চালায় মন্দিরের
দিকে। দীর্ঘ
দিনের সংস্কারের অভাবে হতশ্রী চেহারা হয়েছে মন্দির চত্বরের। পুকুরের জলে কচুরিপানার সংসার। পেছনের
ফুল গাছে আগাছার বাড়বাড়ন্ত। মন্দিরের বারান্দায় ধুলোর আস্তরণ। সামনের
পথের পাশে থাকা সব ক’টি পূজা সামগ্রীর দোকান বন্ধ। ঝরে ঝরে পড়ছে চালের খড়।
মন্দিরের দিকে তাকিয়ে কান্না পেয়ে
যায় হারাণের। ধীরে
ধীরে এগিয়ে যায় মায়ের মূর্তির কাছে। আজ কতদিন পর মায়ের সামনে হাঁটু গেড়ে
বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মায়ের চোখে চোখ রেখে। যত কথা, যত ব্যথা সব উজাড়
করে নিবেদন করে চোখের ভাষায়। অনেকক্ষণ পর দৃষ্টি নামিয়ে এনে
মাথা ঠেকায় মায়ের পায়ে। দু’ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ে সিক্ত করে দেয় দু’টি শ্রীচরণ।
অষ্ফুট স্বরে বলে উঠে –
“মেয়েটাকে দেখিস মা। তোর কাছেই
সঁপে গেলুম”।
- - - - - - - - - - - - - - - - - -
Comments
Post a Comment