শ্রদ্ধার্ঘ - মহেন্দ্র সিং ধোনি ও কিছু ক্রিকেটীয় আত্মকথা
না, কিম্ভূতকিমাকার শিরোনাম দেখে মোটেও হতচকিত
হবেন না। এতটা ধৃষ্টতা কিংবা এলেম আমার
নেই। তবে আজ আমার মন শুধু ঘুরপাক খাচ্ছে
তাঁরই চারপাশে। তাই কিছু স্মৃতি রোমন্থন আর কিছু
আত্মনিবেদন। তবে প্রথমেই স্পষ্ট করে
দেওয়া উচিত যে আমি মাহির ফ্যান নই।
মনে আছে নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে
তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। আমার অগ্রজ তখন বাইরে চাকরি করত। একবার
ডাক মারফৎ ক্যালেণ্ডারের মতো দু’টো বিশাল মাপের ছবি পাঠালো। একটায় ছিল তখনকার মন্ত্রীসভার
সদস্যদের ছবি আর অন্যটাতে ছিল তখনকার ভারতীয় ক্রিকেটারদের ছবি।
খুলে দেখে খুব ভালো লাগলো।
ইতিমধ্যেই এই দু’টো বিষয়ে আমার কিছুটা ‘পছন্দ’ তৈরি
হওয়া শুরু হয়েছিল। তাই ছবি দেখে সেই সব ক্রিকেটারদের যেন অনেকটাই পরিচিত মনে
হতে লাগলো। কারণ
নামগুলো তো প্রায় জানাই ছিল। বাইরের জগৎটাকে চেনার, সাধারণ জ্ঞানের
উন্মেষ ঘটানোর তাগিদেই সম্ভবত অগ্রজের এই কৌশল। যাই হোক, ঘরে তখন একটা
ফিলিপ্স-এর রেডিও ছিল। সেই শুরু হলো চলন্ত ধারা বিবরণী
শুনে শুনে ক্রিকেটকে গিলে ফেলার কাহিনি।
গাওস্করের প্রাচীরের মতো অনড় অবস্থান, বিশ্বনাথের
কেতাদুরস্ত খেলার ভঙ্গি, ভেঙসরকারের কর্ণেল সুলভ আচার আচরণ,
চেতন চৌহানের সেঞ্চুরি না পাওয়ার দুঃখ, কিরমানির
ভরসার হাতের কামাল, ঘাঊড়ির বলের গতির বিভিন্নতা মায়
চন্দ্রশেখরের সব অনিশ্চিত বলের ভেল্কি।
ক্রিকেটকে ভালোবাসার সেই শুরু। ধারা বিবরণী
শুনে শুনেই প্রত্যেকটা ক্রিকেটীয় শব্দের পরিচিতি, মাঠের কোন স্থানকে কী বলা হয়, ব্যাটসম্যানের আউট হয়ে যাওয়ার সব নিয়মাবলি – সব তখন
নখদর্পণে। এরপর
পাকিস্তান সফরে কপিলদেবের আবির্ভাব আর একই সাথে জাহির আব্বাসের ত্রিশতক – সব রোমাঞ্চকর
ঘটনাবলি। এমনি করে
ধীরে ধীরে ক্রিকেটটাকে গুলে ফেলে শেষে শুরু হলো এর ব্যাবহারিক প্রয়োগ। অর্থাৎ
আর রেডিওতে নয় এবার সরাসরি মাঠে নামতে হবে।
মনের মধ্যে প্রচণ্ড তাগিদ - ক্রিকেট খেলব। আর এখানে
প্রথমেই খেলাম হোঁচট। তখন আমার কিশোর বেলা। দূরদর্শন দূর অস্ত্। দেখে শেখা
আর শোনে শেখার যা আকাশ পাতাল তফাৎ হাড়ে হাড়ে টের পেলুম সেটা। পত্র পত্রিকায় ছবি দেখে ও রেডিওর
কমেন্ট্রি শুনে শুনে ক্রিকেটের থিওরি অধ্যায় সম্পন্ন হওয়ার পর এবার
প্র্যাকটিকেলের আশায় মশগুল হয়ে উঠলাম ঠিকই কিন্তু অন্তরায় একাধিক। মাঠ নেই, ক্রিকেটার বন্ধু নেই,
সাজ সরঞ্জাম কিছুই তো নেই। কিন্তু মনের মধ্যে পোষে রাখা
স্বপ্নকে সার্থক করে তোলার জন্য একেবারে মরিয়া হয়ে উঠলাম। কথায় আছে - যেখানে ইচ্ছা আছে
সেখানে উপায় আছে। তীব্র আর্থিক অনটনের কারণে বাজার থেকে সরঞ্জাম কেনার কথা
মাথায়ও আসেনি। গ্রামে
বিকেল বেলা ফুটবল খেলতাম
'জাম্বুরা' (বাতাবি লেবু) দিয়ে। জাম্বুরার ক্রিকেট ভারসন হিসেবে বেছে নিলাম 'আমড়া'কে।
৮-১০ টি আমড়া ও কাঠের টুকরো কেটে তৈরি
ব্যাট কে সঙ্গী করে শুরু হলো আমার ক্রিকেট যাত্রা।
সামনের বাড়ির কৃষক বন্ধুকে জোর করে
ধরে এনে বললাম - আমড়াগুলো ছুঁড়ে মার। ব্যাট হাতে দাঁড়ালাম গাছের ডাল
কেটে তৈরি স্ট্যাম্পগুলোর সামনে। কিন্তু এখানেও হ্যাপা। ব্যাটটা ধরব কোন দিকে ? ডান দিকে, না বাঁ দিকে ? বুঝে উঠতে না পেরে যেদিকে সাবলীল লাগল,
সেদিকেই ধরে দাঁড়ালাম ব্যাট। (পরে শুনেছি আমি নাকি
ন্যাটা)। এভাবেই দিনের পর দিন চলল
ক্রিকেটের অনুশীলন।
ধীরে ধীরে গ্রামের অন্য বন্ধুদেরও
সামিল করলাম এ খেলায়। কাঠের ব্যাট বজায় থাকলেও বল এল বাজার থেকে। জানি না
কীভাবে।
কিন্তু ধানের খেতে কাজ করা বন্ধুরা
কতদিন আর ক্রিকেট নিয়ে থাকবে ? তাই গ্রাম ছেড়ে এবার পাড়ি জমালাম একটু দূরের ক্রিকেট
আড্ডায়। পরিচিত
হলাম অন্য বন্ধুদের ক্রিকেটীয় পারদর্শিতার সঙ্গে। আমি সবদিকেই 'ফিল আপ দ গ্যাপ'
- এর মতো হাত চালাই। দু ওভার বল - কখনো এক আধটা উইকেট
আবার কখনো দু ওভার ব্যাটিং - দু চারটে রান।
আমাদের এই ক্লাব ক্রিকেট টিমের
সবচেয়ে অভাব ছিল একটা মাঠ,
ক্রিকেটের আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম এবং একজন ভালো উইকেট কীপারের। এক বন্ধু
যদিও উইকেট কিপিং করত কিন্তু ও ছিল খুব কেয়ারলেস টাইপের। আমার খুব প্রিয় ছিল এ কাজটা। তাই
ফাঁকে ফাঁকে শুরু করলাম উইকেট কিপিং এবং একটা সময় উইকেট কীপার হিসেবেই জায়গা
পেয়ে গেলাম টিমে।
এমনি করে একটা সময় পার্শ্ববর্তী আধা শহরের
ক্রিকেট লীগের কয়েকটি ম্যাচেও খেলেছি। ওই মাঠে একটি ম্যাচে একবার
আম্পায়ারিংও করেছিলাম। মনে আছে ওই ম্যাচে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র
ক্রিকেটের দায়বদ্ধতার সৌজন্যে এক প্রিয় বন্ধুকে এল বি ডাব্ল্যু আউট দিয়েছিলাম। খুব খারাপ লেগেছিল। বন্ধুদের সঙ্গে ক্রিকেট মাঠের সেই সব
অগুনতি সুখস্মৃতি এখনো মনের আয়নায় ভেসে উঠে স্পষ্ট হয়ে।
পরবর্তীতে ভিন রাজ্যে থাকাকালীন
সময়ে রাজ্যের এক ডি এস এ মাঠেও দুটি ম্যাচ খেলেছিলাম বিভাগীয় ক্রীড়া উৎসবের অঙ্গ
হিসেবে।
সেদিনের খেলার আনন্দ আর আজকের স্মৃতি
রোমন্থনের যে সুখানুভব তার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই সব ক্রিকেটীয় বন্ধুদের।
তো সেই যে ক্রিকেট পাগলামির শুরু এর পর থেকে দেশের প্রিয় দলের খেলায় পুরোপুরি একাত্ম হয়ে গেলাম। চুটিয়ে উপভোগ করলাম চেতন শর্মা, মনোজ প্রভাকর, সঞ্জয় মঞ্জরেকর, হিরওয়ানি, দিলীপ দোশি, বিনোদ কাম্বলি থেকে শুরু করে শচীন, সেহবাগ, রাহুল, লক্ষ্মণ, জাডেজা, আগারকর, আশিস নেহরা, শ্রীনাথ, ভেঙ্কটেশ প্রসাদ, যুবরাজ, হরভজন, অশ্বিন, রোহিত, জাহির আদি তুখোড় ও বর্ণিল চরিত্রের খেলা।
এই পাগলামির চূড়ান্ত রূপ প্রকাশ পেল সৌরভের আগমনে। এরপর দীর্ঘ দিন ধরে বলতে গেলে নিমজ্জিত হয়ে গেছিলাম ফিনিক্স পাখির খেলোয়াড়োচিত শোভায়। ভারতীয় ক্রিকেটকে যে কোন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন এই খেলোয়াড় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিশ্ব ক্রিকেটে ভারতকে সমীহ করার যে প্রয়োজন রয়েছে সেই শিক্ষা সৌরভই শিখিয়েছিলেন। কপিলদেবের নেতৃত্বে বিশ্বকাপ জিতলেও ভারতকে কেউ বিশেষ পাত্তা দিত না বিশ্ব ক্রিকেটে। সেই ধারা ভেঙ্গে দিয়েছিলেন পাশের বাড়ির ছেলে। স্বভাবতই ফ্যান যদি বলতে হয় – সেটা গাঙ্গুলি বাড়ির ওই ছোট ছেলেটারই ছিলাম এবং থাকবও। বস্তুত ক্রিকেটের ইচ্ছেটাই হারিয়ে গেছে সৌরভের সাথে সাথে।
কিন্তু সৌরভের আমল থেকেই শুরু করে আজ ক’দিন আগে অবধি ভারতীয় ক্রিকেটের যে উত্থান হয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটে তার মূল দাবিদার কিংবা কারিগর কিন্তু ঝাড়খণ্ডের সেই ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মহেন্দ্র সিং ধোনি – যার হয়তো টি আর পি রেট ততটা নেই কিন্তু রয়েছে সেই ক্ষমতা যার ফলে সমৃদ্ধ হয়েছে ভারতীয় ক্রিকেটের সম্ভার। ক্রিকেটের এমন কোনো আঙ্গিক নেই যেখানে ভারতকে জগৎ সভায় শ্রেষ্ঠ আসনে তিনি না বসিয়েছেন। তারই হাত ধরে বিশ্ব ক্রিকেটে ধারাবাহিক ভাবে শীর্ষস্থান দখল করে রাখার পাঠ শিখেছে ভারতীয় ক্রিকেট।
মাঠের মধ্যে সব ধরণের পরিস্থিতিতে ঠাণ্ডা মাথায় কীভাবে পরিচালনা করতে হয় দলকে সেটাও শিখিয়েছেন তিনি। তারই হাত ধরে আজ বিরাট, শিখর, হার্দিক, কার্তিক, পূজারা, ঋষভ, ভুবনেশ্বর, সামি, বুমরারা তৈরি করছেন ভারতীয় ক্রিকেটের সাফল্যমণ্ডিত ভবিষ্যৎ গাথা।
কোনও ধরণের সমালোচনার অবকাশ না দিয়েই যথাসময়ে ক্রিকেটের বিভিন্ন আঙ্গিক থেকে অবসর নিয়েছেন এই স্বনামধন্য ক্রিকেটার – যা সচরাচর দেখা যায় না।
আজ হয়তো আবেগের বশে শুধুমাত্র বর্তমানেই বেঁচে থাকা কিছু নব্য ক্রিকেট পাগলরা ধোনিকে সমালোচনা করছেন কিন্তু তাদের জেনে রাখা উচিৎ যে ধোনি ভারতীয় ক্রিকেটে যতটুকু অবদান রেখে গেছেন – কারোও পক্ষে তার ধারে কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা কিন্তু নিতান্তই ক্ষীণ। শচিনকে যদি ক্রিকেটের ঈশ্বর বলা হয়, ধোনি তাহলে আমার কাছে ভারতীয় ক্রিকেটের গরিমা। বিদায় বেলায় তাই আমার অন্তরের উজাড় করা শ্রদ্ধা জানাই এই মহান ক্রিকেটার কে – যার কাছে অবিসংবাদিত ভাবে যুগ যুগ ধরে ঋণী থাকবে ভারতীয় ক্রিকেট।
------------------------------
Comments
Post a Comment