দিবাস্বপ্ন
আমার স্বপ্ন দেখাই নেশা,
স্বপ্ন ফেরিই পেশা।
উজান ফেরিতে যাবই যাব -
যাব আজ আজব সুখের ঘরে।
ঘরে অহর্নিশি ঝরেই চলে -
দিবাস্বপ্ন, বৃষ্টি ধারার মতো।
আমি রাতেও দেখব দিবাস্বপ্ন
আমার বহু যুগের সখের লালন-স্বপ্ন।
আমি ছুটব আপন খেয়াল খুশি নিয়ে।
দেখব আমার সোনার দেশের
সোনালি সব স্বপ্ন ছবি জ্যান্ত চোখে।
এমনি করেই হয়তো যদি
সুপ্ত দুখের হবেই অবসান –ক্ষণিক
যদি দূরেই থাকে – হয়রানি, হাহাকার।
বিভেদ ব্যাথা, বিদ্বেষ বীজ – যদি থাকে
খানিক অন্তরালে, সে স্বপ্ন আমার -
সুখের স্বপ্ন - তার দাম যে বড্ড বেশি।
আজ খেয়া পারাপারেই হলো
স্বপ্ন-সুখের ঘরে আমার স্বেচ্ছা পদার্পণ।
এবার দুচোখ বুজে করব আবাহন
রাত্রিকালীন দিবাস্বপ্নে ভিত্তি রোমন্থন।
আরে ? এ যে সোনার দেশে আমূল বিবর্তন -
এ আমার কালের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া
বড্ড চেনা, কালান্তরের পথগুলো সব
বিবর্তনে পাল্টেছে রূপ – রাজপথ শুধু আজ।
পথের পাশে সেই যে ছিল ব্যাথার আঁতুড় ঘর -
এ যে গুঁড়িয়ে দিয়ে কবে যেন - সব ক’টি ঘর,
কী যেন নাম ? ও হ্যাঁ - বন্দি শিবির।
শিবির তো নয় - মানবতার বধ্যভূমি সব,
চাপিয়ে দিয়ে জবরদস্তি – উদোর পিণ্ডি
বুধোর ঘাড়ে, অত্যাচারীর ভয়াল ফরমান।
বন্দি শিবির – যেন মানুষখেকো খোপ,
প্রতিশোধ আর হিংসানলের নিলাজ প্রতিফলন।
কোনঠাসা কত অসহায় নাগরিক
উপচে পড়া খোপগুলো সব বড্ড পাশবিক।
নীরবে নিভৃতে গুমরে মরে নিরপরাধের শোক
নিঃশেষ হয় যত প্রতিরোধ, যত ক্রোধ।
উফ্ ! বুকের মাঝে এখনও সেই ব্যথা,
স্বাধীন দেশের অসহায় কত গাথা।
জীবন তো নয়, ফুটবল যেন – ঘুরপাক শুধু
এপার থেকে ওপার, এ দেশ থেকে ও দেশ।
মধ্যে শুধু বিপর্যস্ত, মর্মান্তিক সেই
রেডক্লিফ লাইন – অপমান সীমারেখা।
বিষণ্ণ অপমানে মৃতের মতোই বেঁচেছিল সব
হার মেনেছিল নিষ্ফল ইতিহাস।
আমার বড্ড চেনা যে এই দেশ
এই মাটি, এই মাটির মানুষ –
এই জল, এই হাওয়া। দেখি সেই গাছ
যেখানে অভাগা রাষ্ট্রকে ঘৃণা - বিদ্রুপে
তছনছ করে, আত্মগরিমায় মাথা উঁচু করে
শেষ বিদায়ে শাখায় বাঁধা বীর অর্জুনের লাশ।
অত্যাচারের অগণিত রূপ – ভুলের খেসারতে
অনন্ত কাল ভোগান্তি খায় অসহায় জনগণ।
দগদগে কালো ছোপে ছেয়ে যায়
মহান দেশের নিকৃষ্টতম কোণ।
সুখের বেলায় কিছু প্রাণে একচেটিয়া অধিকার
দুখের জন্য মুখের ভাষাই সব শেষ পরিচয়।
কেঁদে কুটে এখানে নীরবে নিভৃতে, শেষ যাত্রায়
বিচারের বাণী – অধরাই থেকে যায়।
বয়স এখানে হার মেনে যায় ধর্ম নির্বিশেষে
বৃদ্ধ – বৃদ্ধা – গৃহবধু সব ভাষার অপরাধে
সার বেঁধে হয় বাক্সবন্দি – বেআব্রু কারাবাসে।
সেখানেই আজ সৌধ গড়েছে - চোখ ধাঁধানো,
একের পর এক মন্দির সব - রামের নামে।
আহা ! অবাক কাণ্ড। চেনামুখ যে -
পুরোহিত সব, ওই তো উনি
অর্জুন - মূল পুরোহিত। তাঁর অধীনে
ওই তো সবাই - বুলু, রবীন্দ্র, মঙ্গল।
আমার কত কাছের, কত সহৃদয় পুরুষেরা।
আছেন দেখি রেবতী, প্রাণহরি - সব, সব চেনামুখ।
আরোও আরোও – ওই তো, ওরাও
মনোতোষ, সন্তোষ - এ তো রমেশ।
আছেন একই গ্রামের মাণিক, অনন্তও আছেন।
পুজোর শেষে এবার আরতি। আজব ধুনুচি নাচ,
ওরাও তো চেনা। ওই তো ওরা -
উনমতি, রাধিকা, বন্দনা, মধুবালা।
বালিকা বয়সী মধুমালিকার বকলম ধরে
পার করেছেন বৃদ্ধ বয়সে অনভিপ্রেত
শিবির জীবন - দীর্ঘ আড়াই বছর।
দুমড়ে মুচড়ে জীবন ধারার কালো অধ্যায়
কে দিল মুছে প্রায়শ্চিত্ত অভিপ্রায়ে ?
আরতি দলে সবার পেছনে – ওই তো তিতিলাবালা।
সবার উপরে মধ্যমণি - আরে এ তো সুচন্দ্রা।
বকলমের আরেক ভুক্তভোগী নিরন্ন উপবাসে
নীরব কালাতিপাতে হয়েছিল যার ভুলুণ্ঠিত
আজন্ম লালিত বিশ্বাস – সংস্কার।
ওদিকে আবার মন্দির সমুখে আলোক সজ্জিত
উপাসনা ঘরে - ভজন আরতি শেষে
বেজে উঠে সুরে - অরূপ জিকির।
তাকাই সেদিকে - আরে আরে ওরা
ওরা তো সেই, সেই যে আমার রোজকার দেখা
সোফিয়া, হাফিজা, জয়নাল, আসগর,
চোখের সামনে সারি পেতে আজ বসে আছে সব
তরাই বিবি, জহির আর হাফজা, হায়দর।
সঙ্গে জুটেছে আরো কত সব
নাম না জানা ভাগ্যবানের দল।
ভজনে জিকিরে একাকার হয়ে বেজে উঠে এক
অরূপ মূর্ছনা – আমার চোখ জুড়ানো আলোর মাঝে-
জিকির দলের মধ্যমণি এ যে মিঞাঁ সারাউল্লা,
বীর সেনানীর বেশেই তাঁকে চিনি
আজকে সবাই সবার মাঝে সুখী।
উফ্ ! এ কী দুঃস্বপ্ন। না, আর নয়,
এ যে দুঃসহ দিবাস্বপ্ন – আমার দুঃখ
একই আছে – রোজকার মতো অসহনীয়।
লক্ষ লোকের ক্রন্দন রোলে বিষিয়ে আছে
অলীক সোনার দেশের আকাশ বাতাস।
এবার আমি সত্যি যাব। বন্দি শিবিরে।
হাতিয়ার হোক কাঠপেন্সিল এক,
আর একটি শক্তপোক্ত কলম।
তরবারি থেকে শক্ত কলমে আমিই এবার
গুঁড়িয়ে দেব - যত বন্দি শিবির,
আমিই হব রাজা এবার, আর হবে না
কথার খেলাপ, হব না মশগুল দিবাস্বপ্নে।
উলটে দিয়ে কাঠপেন্সিল মুছব এবার
কলঙ্কিত রেডক্লিফ লাইন আর
ঘাম ঝরিয়ে বুকের রক্তে নতুন করে
লিখব ইতিহাস। স্বপ্ন হবে তবেই সাকার
প্রতিবাদের স্বপ্ন দিয়েই করব
বাজিমাত।
Comments
Post a Comment