সুস্থ সংস্কৃতির দায়বদ্ধতা ও একটি কবিতা পাঠের বৃত্তান্ত
বাঙালি আত্মঘাতী জাতি। এটা কবেই
প্রমাণিত হয়ে গেছে। মেধা ও খ্যাতিকে টেনে নামাতে বাঙালির জুড়ি নেই। সেই কোন অতীত
থেকেই বাঙালি ল্যাং মারার গোঁসাই। নিজের অকৃতকার্যতা, অন্তরে লালিত ঈর্ষাই যে তাঁর
মূল কারণ এতে কোনও দ্বিমত থাকার কথা নয়। না হলে বাঙালির চিরন্তন পিতৃপুরুষ
রবীন্দ্রনাথকেও কি আর যুগ যুগ ধরে এমন গঞ্জনা সহ্য করতে হতো ? না হলে কি মহাসাগরের
বালুতটের এক ক্ষুদ্র বালুকাসম ব্যক্তি মহাসাগরসম রবীন্দ্রনাথের রচনায় কুৎসিত
অশ্লীলতার সংমিশ্রণের স্পর্ধা দেখাতে পারে ? আপামর বাঙালি আমাদেরই অতি আপন
বিশ্বকবিকে বুঝে উঠতে না পারলেও তিনি কিন্তু সেই কবেই আঁচ করতে পেরেছিলেন এই
অধঃপতন। তাই তো লিখেছিলেন - “অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে, তব ঘৃণা তারে যেন
তৃণসম দহে”।
তাই সাহিত্য, সংস্কৃতির জগতে এমন
ঈর্ষা কোন নতুন কথা নয়। অন্যের সাফল্যে নিজের অপারগতার বোধ
থেকেই এরকমটা হয়। তবে
আমি এ ব্যাপারে সততই উদার। কারণ আমার তো ভাঁড়ে মা ভবানী। নিজের
আছেই বা কী যে ঈর্ষা করতে যাব ? তাই ভালো লাগলে প্রশংসা করতে আমি কখনো পিছপা হই না আর
খারাপ লাগলে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকি। কে বলতে পারে আজ যাঁর কোনও সৃষ্টি আমার
খারাপ লাগছে ভবিষ্যতে তাঁরই কাছ থেকে আসবে না কোনও উৎকৃষ্ট সৃষ্টি ? তবে এই ঈর্ষাজনিত
ব্যাপারে কখনো কখনো বেশ মজাদার আবার কখনো বেশ বিড়ম্বনাময় কিছু ঘটনাও ঘটে থাকে। এই
ছোট্ট পরিসরে সেরকমই এক ঘটনার উল্লেখ করতে চাই।
আমার এক সজ্জন বন্ধু সৌমেন বন্দ্যোপাধ্যায়।
রিয়েল লাইফ ক্যারেক্টার। সহজ সরল নিরহঙ্কার এই বন্ধুর সঙ্গের পারস্পরিক সম্বোধন আবার 'দাদা' - উভয় তরফে। উজান অসমের এক নিছক বাণিজ্যিক শহর
যে সাহিত্য সংস্কৃতিতে অসম তথা উত্তর পূর্বাঞ্চলের বহু স্থান থেকে প্রকৃত অর্থেই
এগিয়ে রয়েছে বেশ খানিকটা তা অনেকেরই অজানা। সেখানে আমার দীর্ঘ ১১ বছরের বসবাসের সময়ে
আমরা দু’জন খুবই কাছে চলে এসেছিলাম নিজেদের। সৌমেন-দার সংস্কৃতি-অন্ত
প্রাণ। কত দিন দেখেছি নিজে অসুস্থ হয়েও বলতে গেলে নাওয়া খাওয়া ভুলে দিনভর জড়িয়ে
রয়েছে সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকাণ্ডে। নিজে খুব উঁচু দরের আবৃত্তিকার ও বিশিষ্ট অভিনেতা। বস্তুত
এ অঞ্চলের অন্যতম বলিষ্ঠ আবৃত্তিকার। আকাশছোঁয়া সাংস্কৃতিক কর্মদক্ষতা। অগুনতি সফল
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সফল উদ্যোক্তা।
আগেই লিখেছি শহরটির বাংলা সংস্কৃতির
জগৎ খুবই পোক্ত। তাই সৌমেন-দার বারো মাসে তেরো পার্বণের মতো প্রায় প্রতিদিনই এটা ওটা লেগে থাকত। আমি
ছিলাম কর্মসূত্রে প্রচণ্ড ব্যস্ত। কিন্তু তারই ফাঁকে প্রায়ই মিলিত হতাম আমরা।
মূলতঃ সাহিত্য সংস্কৃতির ব্যাপারেই চলতো আলোচনা। বছর পাঁচেক আগে সেখানকার এক
সাহিত্য-সংস্কৃতি মূলক প্রতিষ্ঠান দ্বারা আয়োজিত হয়েছিল অঞ্চল ভিত্তিক এক কবিতা আবৃত্তি
প্রতিযোগিতা। ওই অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল একটি স্মরণিকা - যার সম্পাদক ছিলাম
আমি। সেই
স্মরণিকাতে আমার একটি কবিতাও ছিল। অকবিতাও বলা যায়। অর্থাৎ যেমন ছাইপাশ আমি লিখি আর
কি। তো সেই ছাইপাশ পড়ে সৌমেন-দার এতই ভাল লাগলো যে অনুষ্ঠান শেষে আমাকে বললেন
- "আপনার কবিতাটি পড়ে আমার খুব ইচ্ছে হয়েছিল মঞ্চে পাঠ করি কিন্তু
সময় করে উঠতে পারলাম না। আপনার লিখা আরো কিছু কবিতা আমাকে দেবেন তো"। বলা
বাহুল্য যে দু'দিনের ওই অনুষ্ঠানের সঞ্চালকও ছিলেন সৌমেন-দা। যাই হোক
অবাক হলেও কথা মতো কয়েক দিন পর তাঁর হাতে সমঝে দিলাম আমার আরোও কয়েকটি অকবিতা।
তার প্রায় দু’বছর পর কোনও এক বিশেষ দিনে সেখানকার এক অগ্রণী প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে
এক সাহিত্য সংস্কৃতিমূলক অনুষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান আয়োজিত প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই
আগে আমি আমন্ত্রিত হতাম স্বরচিত কবিতা পাঠ করার জন্য। কিন্তু সেবার আমাকে বলা হয়নি।
এর পেছনে হয়তো সেই ঈর্ষাজনিত কিছু ব্যাপার থাকতেও পারে কারণ প্রথমত ওই
প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্তাব্যক্তির সাথে তৈরি হয়েছিল আমার কিছু মানসিক দূরত্ব এবং
দ্বিতীয়ত ওখানে এমন কিছু ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল যাদের স্বরচিত কবিতা আমার
মতো অকবির কাছেই ছিল নিতান্ত আটপৌরে এবং শ্রুতিকটু। আর আবৃত্তিকার হিসেবে আমন্ত্রণ
জানানো হয়েছিল সৌমেনদাকে।
আমন্ত্রিত না হলেও কিন্তু
অন্তরাত্মার টানে, নিজের গরজেই গিয়ে হাজির হয়েছিলাম খোলা মঞ্চে আয়োজিত সেই
অনুষ্ঠানে। মোটামুটি পেছনের দিকের একটি আসনে বসেই উপভোগ করছিলাম অনুষ্ঠান। কিছু বক্তৃতা, কিছু অন্যান্য পরিবেশনার
পর এবার ডাক পড়ল সৌমেন-দার। আমিও একটু নড়েচড়ে গুছিয়ে বসলাম,
কারণ তাঁর উদাত্ত কণ্ঠের আবৃত্তি আমার কাছে চিরদিনই আকর্ষণীয়। আর সেই
মুহূর্তে আমাকে হতবাক করে দিয়ে ভেসে এল সৌমেন-দার বক্তব্য
- "আজ আমি পাঠ করব আমাদেরই খুব কাছের প্রিয় কবি শ্রীযুক্ত
অমুকের একটি দীর্ঘ কবিতা - নাম না জানা নদীনামা"। এক
পলকে স্তব্ধ হয়ে গেল উদ্যোক্তাদের যাবতীয় উদ্যোগ। মঞ্চের আশেপাশে এতক্ষণ ধরে
এদিকে ওদিকে ইতস্তত ঘোরাঘুরি করতে থাকা পা’গুলো যেন নিমেষেই স্তব্ধ হয়ে পড়লো
চলৎশক্তি হারিয়ে। সমবেত শ্রোতৃমণ্ডলীর কানাঘুষো ফিসফাস। অনেকেই মাথা ঘুরিয়ে একবার
যেন দেখে নিল আমাকে। সবাই হয়তো ভাবছিল - সৌমেন ব্যানার্জির মতো আবৃত্তিকার এ করছেটা
কী ? ব্যাটা আর কবি খুঁজে পেল না ? এদিকে
আমি তো পালানোর পথ খুঁজে হয়রান। কোথায় মুখ লুকোব বুঝতে পারছি না। উঠে চলে যাব কি
না ভাবছি আবার মনে হলো এরকম আচরণ খুবই বিসদৃশ দেখাবে। কোনওরকমে মুখ লুকিয়ে স্থানু
হয়ে বসে রইলাম আসনে। এরকম অভিজ্ঞতা তো আর আগে হয়নি। মনে মনে জানতাম সৌমেন-দা যখন
কবিতা নিয়েছে তখন কোথাও সেটা পড়বে। কিন্তু আজ আমার সামনেই যে এই কাণ্ডটি ঘটিয়ে
ছাড়বে এরকম কল্পনা আমার মাথায় আসেনি। তবে এত দ্বিধার মাঝেও একটা চাপা সুখও যে খেলে
বেড়াচ্ছিল সমগ্র সত্ত্বা জুড়ে তাও অস্বীকার করার নয়। আজ বন্ধুর হাত ধরে যেন মনে
হচ্ছিল আমার রাজ অভিষেক হচ্ছে।
ধীরে ধীরে এগোতে থাকে অন্তঃসলিলা কবিতা
আর নিস্তব্ধ হতে থাকে প্রেক্ষাগৃহ।
জানি না এ সেই কবিতার গুণে না উপস্থিত শ্রোতৃবৃন্দের অসীম ধৈর্যের গুণে। কবিতার
মাঝে ডুবে গিয়ে আমিও ভুলে গিয়েছিলাম যাবতীয় বাস্তব বোধ। নিজের সৃষ্টিকে বন্ধুর
উদাত্ত তথা সাবলীল উপস্থাপনার স্নেহে, মাধুর্যে যেন ভেসে গিয়েছিলাম এক অনাবিল
পরাবাস্তবতার তরঙ্গায়িত মহাসমুদ্রে। দীর্ঘ কবিতা শেষে একটা সময় ক্ষান্ত হলেন আবৃত্তিকার। হাঁফ
ছেড়ে বেঁচে বাস্তবে ফিরে আসতে খানিকটা সময় লাগলো আমার।
খোলা প্রেক্ষাগৃহে কতটা হাততালি পড়েছিল
সেদিন সেটা আজ আর মনেও নেই আর বিচার্যও নয়। তবে এরপর যে একটি অবাক কাণ্ড ঘটেছিল সেটি
ভোলার নয়। অগ্রজা সম এক উদ্যোক্তা আমার দিকে এগিয়ে এলেন। আমি মনে মনে ভাবছিলাম
হয়তো কিছু সাধুবাদ আমার জন্য সঞ্চিত করে এনেছেন। কিন্তু আমাকে হতবাক করে এগিয়ে এসে
বললেন - "বাহ্, মশাই ভালো বুদ্ধি করলেন তো" ? আমার বিধ্বস্ত অন্তরাত্মায় এক তীব্র ঘৃণার
শক্তিশেল যেন আছড়ে পড়লো নিমেষে। এ যেন সেই ঈর্ষারই প্রতিফলন। এক বাল্টি দুধে এক ফোঁটা চোনা।
নির্বাক চেয়ে রইলাম সেই মহান পরিচিতার দিকে।
যাই হোক - সৌমেন-দার সাথে সেই যে বন্ধুত্ব, শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে তা
আজও চলছে সমানে। নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এক
অগ্রণী সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান। এর অনেক শাখা প্রায় কর্মহীন হলেও ওই শহরে
অবস্থিত শাখাটি খুবই কর্মচঞ্চল। নিয়মিত অনুষ্ঠানাদির বাইরেও প্রতি বছর প্রকাশিত হয়
ছোট পত্রিকা। পত্রিকাটিরর সাথে অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে রয়েছেন বন্ধু সৌমেন
ব্যানার্জী। এই রচনাটির মাধ্যমে তাকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই সেদিনের
সেই অসম সাহসী সিদ্ধান্তের জন্য। কারণ সেই ছিল আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে এক নতুন
সঞ্চয়, বাঙালির সংস্কৃতি মনষ্কতার এক অনুন্মোচিত দিক এবং একাধারে আমার সাহিত্য
সাধনায় এক নতুন যুগের শুরু যা আজও চলছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে - এপারে, ওপারে। সৌজন্যে
সাহিত্য, সংস্কৃতির অগণিত সহৃদয় বোদ্ধা ও ঈর্ষাহীন নিমগ্ন পূজারি।
- - - - - - - - - - - - - - - - - -
Comments
Post a Comment