ছাইপাশ
“এভাবেই অপমৃত্যু হয় কিছু ভাবনার, কিছু সিদ্ধান্তের”
- নিজেরই অজান্তে স্বগতোক্তি করেন বিমলেন্দুবাবু।
ঘটনার
সূত্রপাত লক ডাউন শুরু হওয়ার কয়েকদিন পরেই। পোড় খাওয়া অন্তরে তা আঁচ করতে পারছিলেন
বেশ কিছু দিন ধরেই। মাস তিনেক হলো রিটায়ার
করেছেন বিমলেন্দু সেনগুপ্ত। পাঁচ বছর আগেই নিয়ে নিয়েছেন অকাল অবসর। দেশের টালমাটাল
অর্থনীতির জেরে সময় থাকতেই অবসর নিয়ে এখন বাড়িতেই কাটাচ্ছিলেন দিন। উচ্চ পদে
যথেষ্ট দক্ষতা ও সম্মানের সঙ্গে চাকুরি করেছেন দীর্ঘ ৩০টি বছর। কিছু বিশেষ বিশেষ
ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর্মদক্ষতার সুবাদে গোটা উত্তর পূর্বাঞ্চল তথা দেশের অন্যান্য
অংশেও এক আলাদা দাম ছিল তাঁর বিভাগ জুড়ে। নানারকম সমস্যার নিরসনে তাই প্রায়শই ব্যস্ত
থাকতে হতো। সেদিক দিয়ে নিজেও তাই উপভোগ করছিলেন তাঁর কর্মজীবন। কিন্তু অবসরের পর
আজকাল কেমন একটা নিঃসঙ্গতা যেন ক্রমাগত পীড়া দিয়ে যাচ্ছে চিন্তায় মননে। এমনিতে একা
নন তিনি মোটেও। ঘরে স্ত্রী সুপ্রিয়ার পাশাপাশি পুত্র,
পুত্রবধু আর একমাত্র কন্যাসন্তানটিকে নিয়ে বলতে গেলে ভরপুর সংসার
তাঁর। প্রাইভেট ফার্মে চাকুরি করে ছেলে শুভাশিস। দু’বছর হলো
বিয়ে দিয়েছেন ছেলের। মেয়ের পড়াশুনার পাটও প্রায় শেষ হয়ে এল বলে।
চাকুরি
আর সংসারের পেছনে ছুটে বেড়িয়েছেন এতকাল। চিন্তা ভাবনার সময় ছিল না তেমন। এবার অবসর
সময়ে তাই পেছনে ফেলে আসা জীবনের নানা কথা নানা ভাবনা প্রায়ই উড়ে এসে যেন জুড়ে বসে
তাঁর উপর। মনে পড়ে উঠতি যৌবনে স্বামী বিবেকানন্দের একটি বাণী পড়ে তাঁর মনোজগতে
এসেছিল এক বিরাট পরিবর্তন। স্বামীজী বলেছিলেন - মানুষ হয়ে জন্মেছিস, একটা দাগ রেখে যা। অভিভূত হয়ে
গিয়েছিলেন বিমলেন্দুবাবু। সত্যিই তো। শুধুমাত্র খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্যই কি
জীবন ? সেই থেকে কিছু একটা করার ইচ্ছে জেগে উঠেছিল মনে।
কিন্তু সেরকম ফুরসত তো আর হয়নি জীবনে। খেয়ে পরে বেঁচে থাকার লড়াইটাই শুধু লড়ে
গেছেন এতগুলো বছর ধরে। কিন্তু সুপ্ত ইচ্ছেটা থেকেই গিয়েছিল চিন্তায়। আজ সেই সুযোগ
পেয়ে লেখালেখিতে মনোনিবেশ করেছেন বিমলেন্দু বাবু। কত যে ভাবনা, কত অভিজ্ঞতা - সব লিখে রাখেন সযতনে। গদ্যে, পদ্যে অসাধারণ মুন্সিয়ানায় লিপিবদ্ধ করে রাখেন একের পর এক জীবন নাট্যের
সারাংশ। লেখালেখির শুরুটা হয়েছিল সেই যুবাবস্থায়ই। কিন্তু
ধারাবাহিকতা বজায় থাকেনি। বিয়ের পর সুপ্রিয়ার সাথেও এ নিয়ে কথা হয়েছিল। যথেষ্ট
উৎসাহ যোগাত সুপ্রিয়া। আজও সমানে উদ্বুদ্ধ করে রাখে বিমলেন্দু বাবুকে। তাঁর
প্রতিটি লেখার প্রথম পাঠিকা নিঃসন্দেহে তাই সুপ্রিয়া। সুপ্রিয়ার চোখেমুখে ফুটে ওঠা
বাহবার প্রচ্ছন্ন প্রতিছবিতে আরোও ক্ষুরধার হয়ে উঠে বিমলেন্দু বাবুর কলম। এই কলমকে
হাতিয়ার করেই যে জীবনে কিছু একটা দাগ রেখে যাওয়ার ব্রতে আজ ব্রতী হয়েছেন তিনি সেই
অমোঘ সত্যটি আর কেই বা জানে ? সময়ের সাথে সাথে চাকুরি জীবনের
দক্ষতারই মতো তাঁর সাহিত্য কর্মেরও প্রসার ঘটতে লাগলো স্বাভাবিক ভাবেই।
অবসর
নেওয়ার পর কিছু একটা করার ইচ্ছে ছিল বিমলেন্দু বাবুর। কিছুটা সময় কাটানোর আর
বাকিটা শরীরকে চালু রাখার তাগিদে। সুপ্রিয়া এই ব্যাপারে একটু বেশিই উদ্যোগী। মাঝে
মাঝেই জিজ্ঞেস করে - “কিছু হলো তোমার ?”
-
না, চেষ্টায় আছি।
-
কিন্তু এভাবে কতদিন আর বসে থাকবে ?
-
কী করব বলো, বললাম তো চেষ্টা করছি।
সুপ্রিয়ার
ঘনঘন এমন প্রশ্নের ঠেলায় মাঝেমাঝে সন্দেহ হয় বিমলেন্দু বাবুর। ভাবেন -
আমার ঘরে থাকাটা কি পছন্দ নয় সুপ্রিয়ার ? কেমন
একটা বিষণ্ণতার ছায়ায় যেন ঢাকা পড়ে যান বিমলেন্দু বাবু। এতগুলো বছরের একান্ত ভরসার
ছায়াসঙ্গী সুপ্রিয়াও কি তবে তাঁকে অন্যদেরই মতো বাতিলের খাতায় - - - - ? জট পেকে উঠে ভাবনায়। শেষমেশ সামলে নিতে হয় নিজেকেই।
করোনা
ঝড় অবশেষে সারা পৃথিবীর সাথে ধেয়ে আসলো এ দেশেও। কঠিন হয়ে উঠলো
দিনযাপন। লক ডাউনে গৃহবন্দি হয়ে ঘোরালো হয়ে উঠলো ঘরোয়া কোন্দল। একঘেয়ে সূর্যোদয় আর
সূর্যাস্ত দেখে দেখে চলছিল বৈচিত্রহীন কালযাপন। ‘কিছু একটা’ করার বাসনায়ও সাময়িক যতি পড়লো
বিমলেন্দুবাবুর। পক্ষান্তরে পোয়াবারো হলো লেখালেখির। এদিকে বিমলেন্দু বাবুর কলম
ছুটতে লাগলো তরতরিয়ে আর অন্যদিকে সুপ্রিয়ার বিরক্তির পারদও বাড়তে লাগলো পাল্লা
দিয়ে। দিনভর বিমলেন্দু বাবুর ঘরে বসে থাকাটা যেন আজকাল একেবারে অসহ্যকর হয়ে উঠেছে
সুপ্রিয়ার কাছে। লেখালেখির বাইরেও ঘরোয়া কাজেকর্মে বিমলেন্দু বাবু আজকাল হাত
লাগাচ্ছেন অনেকটাই। কিন্তু সারা জীবনের অনভ্যাসে ঠিক যেন খাপ খাওয়াতে পারছেন না।
সেখানেও আজ ব্রাত্য বিমলেন্দু বাবু। আসলে একটু বৈচিত্রের জন্যই এসব করা। কিন্তু সে
আর কে বোঝে ? স্ত্রী আর বউমা মিলে সেখান থেকে সরিয়ে দেয়
তাঁকে। আজ বিমলেন্দু বাবুর বড় বিষাদময় দিন যাপন। সব থেকেও কী যেন নেই। হৃদয়ের
দুঃখবোধ ভাগ বাটয়ারা করার মতো কেউ যেন নেই চারপাশে।
আজ
সকাল থেকেই মেঘে কালো হয়ে আছে চারদিক। তুফান উঠবে বলে মনে হচ্ছে। সকালে একটু দেরি
করেই বিছানা ছাড়লেন বিমলেন্দু বাবু। আসলে জেগেই থাকেন। কিন্তু উঠে কী হবে ভেবে
বিছানাতেই এপাশ ওপাশ করে কিছুটা অবসন্ন সময়ের বিনাশ ঘটান। মুখ ধুয়ে খানিকটা সময়
ব্যালকনিতে বসে তাকিয়ে থাকলেন প্রায় জনমানবশূণ্য রাস্তার দিকে। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে
আছে একটি বাঁদর ছানা। অবাক হয়ে তাকাচ্ছে অপরিচিত চারপাশ। প্রতিদিনের মতোই অস্ফুট
স্বরে আপন খেয়ালে গান গেয়ে গেয়ে পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে মাতাল লোকটি। সকাল সন্ধের এক
পরিচিত চিত্র। প্রচলিত লোকগানের ভাণ্ডার যেন। আজ সকাল সন্ধে গুলিয়ে ফেলেছে লোকটি।
বুঝি একটু বেশিই গিলে এসেছে আজ। সুর ধরেছে - হরি দিন তো গেল, সন্ধ্যা হলো, পার
করো আমারে। লোকটি পথ পেরিয়ে যেতেই ঘরে ঢুকে যান বিমলেন্দু বাবু। ইতিমধ্যে চা তৈরি
হয়ে গেছে। শুভাশিস উঠেনি এখনো। অন্যরা সবাই ঘরকন্নায় ব্যস্ত। সকালের চাটা খেয়ে
খানিকটা এদিক ওদিক দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে মেলে ধরেন খাতা কলম। কালকের অসমাপ্ত
কাহিনিতে আজ শেষ তুলির আঁচড়টা টানতেই হবে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে একটা সুন্দর সমাপ্তির
কথাচিত্র এঁকে রেখেছেন মনে মনে। এখন ঘুমটাও আসে
না গাঢ় হয়ে। জীবনধারার অসংখ্য ফেলে আসা অতীত ঘিরে ধরে তন্দ্রাচ্ছন্ন মননকে। ফেলে
আসা সব চরিত্র এসে ভিড় জমায় বুজে রাখা চোখের সামনে। সুখ দুঃখের অগণিত স্ন্যাপশট
যেন রিওয়াইণ্ড হতে থাকে আপন ধারায়।
সবে
লিখতে শুরু করেছেন বিমলেন্দু বাবু। এমন সময় এঘরে ঢুকলেন সুপ্রিয়া। বিমলেন্দুবাবুকে
দেখেই যেন অসহ্যকর বিরক্তিতে একেবারে ফেটে পড়লেন। স্বরগ্রামের বেশ খানিকটা চড়া
সুরেই যেন বেঁধে এসেছেন সুর - এমনি
আওয়াজেই বললেন - উঠেই বসে গেছ ? একটু
বাইরে বেরিয়ে পায়চারি করলেও তো হয়। শরীরটার তো বারোটা বাজিয়েই ছাড়বে দেখছি। অসহ্য
একেবারে।
ফিরে
তাকিয়ে বলতেই যাচ্ছিলেন বিমলেন্দু বাবু - কোথায় যাবো বলো ? দেখছ ন লক ডাউন ? কিন্তু বলা আর হলো না। তার আগেই আবার বলে উঠলেন সুপ্রিয়া - সারাটি দিন ধরে শুধু লেখালেখি। বলি, কী হবে এসব
ছাইপাশ লিখে ? কোন কাজে লাগবেটা শুনি ?
আরোও
অনেক কিছুই বলে যাচ্ছিলেন সুপ্রিয়া কিন্তু বিমলেন্দু বাবু আর কিছুই শুনতে পাচ্ছেন
না। এই মুহূর্তে একটি কালবৈশাখী ঝড়ে যেন বিধ্বস্ত হয়ে গেছে তাঁর সারা জীবনের তিলে
তিলে গড়ে তোলা বিশ্বাস আর সিদ্ধান্তের তাসের ঘর। শুধু একটি শব্দই তাঁর সমগ্র
অন্তরাত্মা জুড়ে ঘুরপাক খাচ্ছিল বিভিষীকাময় ঘুর্ণিঝড়ের মতো -
ছাইপাশ, ছাইপাশ। বিমলেন্দু বাবুর মনে হচ্ছে
পৃথিবীর একেবারে শেষ প্রান্তে তিনি বসে রয়েছেন রিক্ত হাতে নিঃস্ব হয়ে। সামনে
শুধু অনন্ত শূণ্যতা।
এই
বয়সেও অঝোর ধারায় বন্যার তোড়ের মতো বয়ে এলো বাঁধভাঙা জল দু’চোখের কোণ বেয়ে। ঘুরে অস্ফুট মুখে কোনওক্রমে শুধু সুপ্রিয়ার দিকে তাকিয়ে
কাতর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন - সুপ্রিয়া, তুমিও
? ---- ছাইপাশ ?
রুদ্ধ
হলো কণ্ঠ, হাত থেকে খসে পড়লো ব্যর্থ কলম।
দাগ রেখে যেতে পারলেন কি বিমলেন্দু বাবু ?
Comments
Post a Comment