Skip to main content

নাম না জানা নদীনামা

 নাম না জানা নদীনামা

 

হাসপাতালে মৃত্যুর মুখোমুখি শুয়ে
কী ভাবছিলে রঞ্জনা ?
নদী থেকে তোমার উত্তরণ ?
নাকি তুমি থেকে নদী ?
 
ওই যে নদীর সাথে তোমার সখ্যতা
ওটাই তো তোমার পরিচয়
তোমারও তো প্রবহমান জীবন
আমৃত্যু কলকল ছলছল
 
না, মৃত্যুকে ভয় পাওয়ার মেয়ে তুমি নও
তোমার ইচ্ছায় মরণও পালায়
জীবনকে যেখানে তুড়ি মেরে করেছ পার
মরণ সেখানে কোন ছার ?
 
পাহাড় ছাড়িয়ে সাগর পথের জলোচ্ছ্বাস
বাঁধতে পেরেছে কেউ কখনো ?
তোমার পথেও খড়-কুটো সব
জ্বলতে চেয়েও নিভেছে সব তুবড়ির মতো
 
বাঁধা ছকের বাইরে তোমার রোজনামচা
দৃপ্ত আপন খেয়াল খুশি
শরিক হয়েছেশক হুন দল
তুমি কিন্তু গেয়েছিলে সবারই গান, মনে আছে ?
 
নদীর দুটো পার ছিল-
তোমার ছিল দুটো দরাজ হাত
শষ্য শ্যামল দুটো পারের মতোই
তোমার আনাচে কানাচে কত সুখের পায়রা

ধীর, অবিচ্ছেদ্য ধারাকে ছিন্ন করে
এপার ওপারযাত্রী গাদাগাদি
রঞ্জনা তুমি অগুনতি লোলুপকে
নির্দ্বিধায় করেছ নপুংসক
 
কুল ভাঙার ছলাৎ ছল
ভূমির স্খলন, নিত্যদিনের তালকাটা রব
তোমার আনাচে কানাচে পতন
নাম না জানা কতই কিশোর- যৌবন দূত
 
ভরা ভাদরের বর্ষাবনের গর্ভে প্রবেশ
চিরসবুজের আলিঙ্গনে স্ফীতবক্ষ
তোমার- প্রিয় রঞ্জনা, একুল ওকুল
সামলে নিয়ে সে কী দৃপ্ত দুঃসাহস
 
মীন-বিষধর একই ধারায় সন্তরণ
অবাক করা চাতক দৃষ্টি ক্ষেত মজুরের
এক, দুই, তিন কুসুমের বৃন্ত তোমার নখদর্পণে
তোমার নিদান স্বস্তি সুখের প্লাবন
 
জুড়িয়ে ছিল পরাণ কোল জুড়ানো
শীতল হাওয়ার পরশ পেয়ে
তোমার ছোঁয়ায় আগুয়ান
মিছিল গেল হারিয়ে হাওয়ায়
 
বক্ষ জুড়ে অবগাহন অগুনতি
দুচার-পেয়ের ক্লান্তি, শ্রমের অবসান
জীবনটাকে হারিয়ে দিয়ে চৌদিশে
শীতলতার প্রলেপ মাখা তোমার কাহন- কল্পনা
 
এমনি জীবন বাঁচে জলে অলক্ষ্যে
চরাচরের বৃক্ষ, মানব, তামাম সৃষ্টি যত
মানবতায় নির্ভেজাল হৃদয় জুড়ে
তুমিই বাঁচাও ধরণীরে শান্তি, সুখে
 
অন্তরে স্বচ্ছ কণা স্ফটিকসম
অন্তঃস্থলে অনন্ত ভিত ভাণ্ডার
আস্তানার উপাদানে স্বতঃস্ফুর্ত
অগুনতি ভিত, তুমিই গাঁথ ভিত্তিপ্রস্তর
 
আটকে রেখে ধারার- সৃষ্টি অবাক করা
আলোকমালায় ঝলসে উঠে তিন ভুবন
তোমার আলোয় উদ্ভাসিত পৃথ্বী
অন্ধকারের অতীত খোলে দীপ্ত একাধিক
 
ওই স্বপ্নিল, ওই সর্পিল, ওই
ছান্দসিকের সৃষ্টিকর্মে চঞ্চল
তুমি আপন ছন্দসুধায় বর্ণমগ্ন
বসুন্ধরায় অনুভবে তোমার স্পর্শ যত্রতত্র
 
নাম না জানা ওই নদীটার সাতকাহন
নিঃশেষহীন দানছত্র যেমন যোজন
বিশ্বপ্রেমের মূর্ত প্রতীক- প্রিয়
তুমিই নদী- নদীই তুমি, তুমি অবিচ্ছেদ্য
 
ছিন্ন বাঁধন মোহনায় ধীর বিলীন মত্ত
যাত্রাপথের সালতামামির রোমন্থন
তোমার জীবন সায়াহ্নের এই সন্ধিক্ষণ
নদীর কাছেই নিঃশর্ত আত্মসমর্পন
 
পূর্বাদ্রির বুক চিরে সেই মসৃন পথ চলা
আপনভোলা মন মর্জির আপনি মালিক
এবার জীবন জোড়া যোগবিয়োগের হিসেবনিকেশ
রঞ্জনা- তুমি নদীর গানেই প্রতিষ্ঠিত সত্য
 
মোহনা আর হাসপাতাল আজ ছন্নছাড়া একাকার
আবার আসিবে ফিরে, রঞ্জনা- তুমি
ফের ওই নদীরই নামটি ধরে
ভাসিয়ে বিশ্ব ভালোবাসার সুখ প্লাবনে

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...