ঈশ্বর প্রণামী
ভালো করে ঘুম হয়নি রাতে। বিয়ে বাড়িতে অধিবাসের রাতে ঘুম
ভালো হয় না কারোরই। গান, বাজনা, নানা রকমের কথাবার্তার শব্দে আধো ঘুমে জেগে থাকে
সবাই - যারা বাইরে থেকে আসে নিমন্ত্রিত হয়ে। আর বয়স্কা মহিলাদের একসাথে বসে সেই
পুরোনো দিনের খেয়াল কিংবা ঠুমরির সুরে গাওয়া ‘গীত’ যদিও এখন প্রায় ‘হারিয়ে যাওয়া
গান’-এর পর্যায়ে চলে গেছে কিন্তু ‘ধামাইল’ ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। বলা ভালো নতুন
রূপে সুসজ্জিত হয়ে। ধামাইলের ছন্দে এখন পায়ে পা মেলায় কুঁড়ি থেকে বুড়ি। বিহু,
ভাঙড়া, ট্যুইস্ট এর ব্লেণ্ডিং হয়ে ধামাইল এখন নাগরিক উদযাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। তা
সারা রাত ধরে এসবের মধ্যে ঘুম তো ভালো হওয়ার কথাও নয়। তবে অভীকের ঘুম না হওয়ার
আরোও একটি কারণও আছে। আগামী সূর্যোদয় যে তার কাছে এক স্বপ্নপূরণের সূর্যোদয় সেই
কথাটি বারবার ফিরে আসছিল তার মননে, চিন্তনে। দীর্ঘ চল্লিশ বছরের আকুল অন্বেষণের
শেষে কোন ছন্দে রূপে যে ফিরে পাবে তার বালক বেলার দিনগুলি সেই স্বপ্নটাই শুধু
ঘুরপাক খাচ্ছিল তার সমগ্র সত্ত্বা জুড়ে।
ঘুমোনোর চেষ্টায় কতক্ষণ আর জেগে
পড়ে থাকা যায় বিছানায় ? শেষমেশ বিছানা ছেড়ে উঠেই পড়ে অভীক। হাতঘড়িটা আজকাল ঝাপসা
দেখায়। তাই মোবাইল খুলে সময় দেখে। সকাল সাড়ে ছ’টা। ঘুম ভাঙে মোবাইলেরও। মহূর্তে
একগাদা মেসেজ এসে জড়ো হয়। অন্যদিন হলে এক্ষুনি পড়তে বসে যেত। কিছু প্রিয়জনের হাতের
ছোঁয়ায় ভেসে আসা মেসেজ পড়ার জন্য রীতিমতো মুখিয়ে থাকে অভীক। কোনও এক অখ্যাত কবির
একটি কবিতার শিরোনাম খুব পছন্দ হয়েছিল অভীকের। ‘তোমার সাড়ায় বৃষ্টি ঝরে’। কিছু
কিছু সাড়া জাগানো মেসেজ যেন সকাল বেলার আমেজে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে হৃদয় জুড়ে। স্নিগ্ধ
করে তোলে ধূসর, খটোমটো জীবনটাকে। কিন্তু আজ অন্য কিছুই আর ভালো লাগছে না। হোটেলের
রুমে সে একাই। বিছানাটা গুছিয়ে নিজেকে তৈরি করে নিতে বেশ খানিকটা সময় লেগে যাবে।
সুতরাং দেরি না করে লেগে পড়াই ভালো।
হলোও তাই। অনেকটাই দেরি হয়ে গেল
বেরোতে বেরোতে। স্নানটান সেরে বেরোতে সাড়ে আটটা বেজে গেল। সকালের চা আজ আর খাওয়া
হবে না। কারণ আজকের এই বিশেষ দিনটি একটু বিশেষ ভাবেই শুরু করতে চায় অভীক। কাল
রাতেই দেখে এসেছে হোটেলের খুব কাছেই ছিমছাম সুন্দর একটি মন্দির। তখনই ভেবে রেখেছে
সকাল বেলার শুরুটা এখান থেকেই করবে। এমনিতে ধর্মীয় কাজেকর্মে বড় একটা জড়ায় না
নিজেকে কিন্তু ভেতরে ভেতরে সর্বশক্তিমানের নীরব পূজারি অভীক। বিশ্বাসে মেলায়
কৃষ্ণ। এ নিয়ে কারোও সাথে তাই জড়ায় না তর্কে। হাল আমলে তো স্বধর্মবিরোধিতা এক
ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এসব আঁতলামোতে বড্ড অনীহা অভীকের।
ন’টার মধ্যেই মন্দিরে পৌঁছে গেল
অভীক। প্রান্তিক এই শহরের লোকসংখ্যা সীমিত। তাই এ সময়টিতে ভক্তবৃন্দের তেমন
আনাগোণা থাকে না। অমলিন একটা পরিবেশে গড়ে ওঠা এই দ্বিতল মন্দিরে যেন এক অনাবিল
শান্তির পরিস্থিতি বিরাজ করছে সবদিকে। এমনটাই চাইছিল অভীক। নির্ঝঞ্ঝাটে খানিকটা
সময় এখানে অতিবাহিত করাই তার মূল উদ্দেশ্য। তাছাড়া স্বপ্নপূরণের আগে
ঈশ্বরসান্নিধ্যে এসে নিজেকে কিছুটা মানসিক ভাবে প্রস্তুত করে নিতেও চেয়েছিল অভীক।
জুতোজোড়া খুলে বাইরে রেখে মন্দিরে
ঢুকে ইতস্ততঃ এদিক ওদিকে তাকিয়ে পরম এক মানসিক প্রশান্তি অনুভব করে অভীক। যেন ছবির
মতো করে সাজিয়ে রাখা আছে চৌপাশ। ঝকঝকে মেঝেতে ভগবানের আসনের সামনে ফরাস পেতে
প্রার্থনার স্থান করে দেওয়া আছে। চারদিকের দেয়ালে মহাপুরুষদের বিশাল আকারের ছবি
টাঙিয়ে রাখা আছে। দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে স্বাভাবিক ভাবেই। সকালের পূজা
ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। ভগবানের মূর্তির সামনে ফরাসে বসে পড়ে অভীক। পরম
নিশ্চিন্ততায় চোখ দু’টো বুজে নিমগ্ন হয়ে যায় জপ ধ্যানে। বেশ খানিকটা সময় ধ্যানের
শেষে চোখ খুলেই দেখতে পায় পূজারি হাতে প্রসাদ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। হাত পেতে প্রসাদ
নিয়ে খেতে খেতে আবারও চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখে অভীক। প্রসাদ খাওয়া হয়ে গেলে আবার
গিয়ে বসে আসনের সামনে। তাকিয়ে থাকে ভগবানের বিগ্রহের দিকে। সর্বনিয়ন্তা
অন্তর্যামী। সৃষ্টি, স্থিতি, বিনাশের একমেবাদ্বিতীয়ম কারিগর। অপরূপ এই পৃথিবীর
অগুনতি প্রাণীর নিত্যদিনের ভাগ্যনিয়ন্তা। ছুটে চলে অভীকের মন দূর দূরান্ত ছাড়িয়ে
মহাবিশ্বের আনাচে কানাচে। স্ন্যাপশটের মতো ঘুরে ফিরে আসে জীবন ছবি। আবারও মনে পড়ে
কোনও এক অখ্যাত কবির একটি কবিতার কিছু ভালো লাগা পংক্তি -
“যা কিছু সত্য শিব যা কিছু প্রিয়,
যত আছে ভালোবাসা, প্রেম যাবতীয়।
পাহাড়ের সবুজাভা দিগন্ত নীলিমা
বিস্তৃত প্রান্তর, সুখ শ্যামলিমা।
বহমান তটিনী, ঝরনা ফেনিল
অনন্ত জলরাশি, সাগর সুনীল।
সমাহিত বনানীর সুরেলা কূজন
মানসী বিশ্বের অগুনতি সুজন।”
চোখের সামনে স্পষ্ট ভেসে আসে সেই
ছবির মতো সাজানো তিন দিক পাহাড় ঘেরা পর্ণকুটিরটির কথা। পাহাড় না বলে অবশ্য ওগুলোকে
টিলা বলাই শ্রেয়। তবে সু-উচ্চ টিলা বটে। সবুজে সবুজ অভীকের সেই শৈশব, কৈশোরের
নিজের গ্রামের পায়ে হাঁটা পথ পেরিয়ে দীপক-দা’দের সেই সুখ-বনানীর কোলে থাকা ঘরটি
যেখানে কেটে যেত অভীকের বালক বেলার দিনের পর দিন। নিজের ঘরের চাইতেও যেখানে থাকতে
বেশি ভালো লাগতো অভীকের। তখন কি আর এমন জগৎ ভুলানো প্রাকৃতিক দৃশ্যের মহিমা বুঝতে
পারতো অভীক ? মোটেই না। কিন্তু তার আকর্ষণ ছিল সেই ছবি-ঘরের জীবন্ত মানুষগুলো। দু’ভাই
অশোক-দা আর দীপক-দা। আর ছিল বন্দনা-দি, বাসনা-দি। সবার উপরে মাসিমা - ওদের মা।
ওদের বাবা কেন নেই - সে প্রশ্ন করার মতো বয়স তখনও অভীকের হয়নি। চারটে দাদা দিদির
ন্যাওটা ছিল ভিন ঘরের অভীক। কিন্তু সে বোধটি যেমন অভীকেরও ছিল না তেমনি ওবাড়ির
কারুরই হয়তো ছিল না। আজ ভাবলে অবাক হতে হয় বৈ কি।
বড় ভাই অশোক-দা কবিতা লিখত। অভীক সেখানে গেলে মাঝে মাঝেই তার হাতে কাগজ আর
কলম ধরিয়ে দিয়ে নিজে লেগে যেত ঘরের পেছনের খালি জায়গাটুকুতে কোদাল দিয়ে পরিচর্যার
কাজে। নতুন
মাটিতে তরতরিয়ে ফলতো শাক সবজি। পরিচর্যার ফাঁকেই অনর্গল বলে যেত কবিতার একের পর এক
লাইন। নতুন নতুন শব্দের মাধুরীতে এক অবাক করা ভালো লাগার ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে যেত
অভীক। কাঁচা হাতে লিখে রাখত সব। সেদিন বুঝেনি, আজ বুঝতে পারে সেই সব কবিতা ছিল
হারিয়ে যাওয়া সব অনবদ্য আধুনিক কবিতা। হাতে কোদাল নিয়ে পৃথিবীর বুকে সৃষ্টি করত
জীবন ধারণের রসদ আর অন্তর চিরে মুখ দিয়ে সৃষ্টি করত অমূল্য সব সাহিত্য। অশোক-দার
সাথে সাথে কোথায় যে হারিয়ে গেল সেই শৈশব। ছোট ভাই দীপক-দার ছিল আখের খেত।
বাড়বাড়ন্ত নাদুসনুদুস আখের তলায় তলায় কত রকমের ফলমূলের চাষ। সবখানে অভীকের অবাধ
প্রবেশাধিকার। অনন্ত সময় ধরে ফলের রসে টইটম্বুর হয়ে থাকত অভীক। ছোট বোন বাসনা-দি
অভীকের চেয়ে সামান্যই বড়। কিন্তু বন্দনা-দি ছিল সবার বড়। ডানাকাটা পরি না হলেও
চেহারায় যথেষ্ট চাকচিক্য ছিল বন্দনা-দির। অভীকের খুব ভালো লাগতো তেকোণা চিবুক,
ডাগর চোখ আর ফর্সা রঙের বন্দনা-দির দিকে তাকিয়ে থাকতে।
এমনিধারা জীবন যাপনের মধ্যেই
একদিন কোথায় যে হারিয়ে গেল সবাই তার কোনও খবরই পেল না অভীক। যখন শুনলো প্রথম তখন
এক দলা শুকনো শূণ্যতা যেন গলায় এসে আটকে রইল দীর্ঘক্ষণ। ছেলে হলে কাঁদতে নেই বলে
প্রাণপনে চেপে রাখল সব কষ্ট। কিন্তু সেদিন থেকেই বুকের ভেতর এক প্রতিজ্ঞার জন্ম
হলো অভীকের। একদিন খুঁজে বের করতেই হবে ওদের। যেভাবেই হোক, যেখানেই থাকুক।
কোনও এক দর্শনার্থীর ঘন্টাধ্বনির শব্দে
আচমকাই সম্বিৎ ফিরে পেল অভীক। বাস্তবে ফিরতেই মনে হলো বড্ড দেরি হয়ে গেছে। তড়িঘড়ি বেরিয়ে এসে জুতো গলিয়ে নিল
পায়ে। দীর্ঘ দিন ধরে পোষে রাখা স্বপ্নপূরণের
লক্ষ্যে বেরিয়ে আসে মন্দির থেকে। হারানো কৈশোরের খোঁজে সেই যে তার অক্লান্ত প্রচেষ্টা তারই ফলে
দীর্ঘ চল্লিশটি বছর পর ফিরে এসেছে এই মুহূর্ত। তখনকার দিনে যোগাযোগের পথ ছিল সীমিত। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মানুষের সান্নিধ্যে
এসেছে অভীক। বছরের পর বছর ধরে সবাইকে জিজ্ঞেস
করে করে বিফল হয়ে হাল প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল একটা সময়। প্রায় বছর পাঁচেক আগে শেষে ফেসবুকের
পাতায় ছড়িয়ে দিয়েছিল এই হারানো দিনের অন্বেষণ বার্তা। কিন্তু এতেও কিছু হলো না। বছর খানেক আগে হঠাৎ করে একটা খবর এলো - দীপক-দা নাকি এই প্রান্তিক শহরের কোর্ট চত্বরে টাইপিস্ট এর কাজ করে। বানভাসির খড়কুটো দেখার মতো আনন্দে
লাফিয়ে উঠে অভীকের দেহ মন। সঙ্গে সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে এ শহরে থাকা বন্ধু সঞ্জীব এর
সাথে। ভরসা দেয় সঞ্জীব - খুব তাড়াতাড়ি খবর
নিয়ে জানাবে। কিন্তু
এখানেও সে গুড়ে বালি। মাস
খানেকের খানা তল্লাশির পর সঞ্জীব একদিন জানালো দীপক-দা এখন আর বসে না কোর্ট চত্বরে। ঘরেই নাকি কাজকর্ম করে। কিন্তু ঘরের ঠিকানা বলতে পারে না কেউই। আবারও বিমর্ষ হয়ে পড়ে অভীক। স্বপ্ন থেকে যায় স্বপ্ন হয়েই।
এরপর মাস ছয়েক আগে একবার নিজস্ব কিছু
কাজে আবার এই শহরে আসতে হয় অভীককে। একদিনেরই কাজ ছিল। বিকেলে ফেরার টিকিট। কাজের ফাঁকে একটু সময় বের করে সোজা চলে যায় কোর্ট চত্বরে। কিছুতেই হাল ছেড়ে দিতে রাজি নয় অভীক। তাই দেখে নিতে চায় শেষটা। ওখানে সারি পেতে বসে রয়েছেন বেশ কয়েকজন
টাইপিস্ট। তাঁদেরই একজনকে জিজ্ঞেস করে
অভীক - “আচ্ছা, এখানে দীপক ভট্টাচার্য বলে একজন টাইপিস্ট কাজ
করেন কি” ?
সেই একই উত্তর ভদ্রলোকের - “আগে করতেন। এখন ঘরেই করেন।“
- ঘরটা কোথায় বলতে পারেন
? কিংবা তাঁর ফোন নম্বর ?
- আজ্ঞে ঘর তো বলতে
পারবো না তবে ফোন নম্বর তো থাকার কথা। দেখছি।
অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছে যাবার মুহূর্তে
উদগ্রীব হয়ে ওঠে অভীক। ফোনটা
হাতড়ে শেষ পর্যন্ত পাওয়া গেল কাঙ্খিত সেই নম্বরটি। ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে সেখান থেকে
ছুটে বেরিয়ে আসে অভীক। বাইরে
খানিকটা নিরালায় এসেই ফোন করে দীপক-দাকে। রিং হচ্ছে। আশার পারদ চড়তে থাকে অভীকের। কিন্তু এক মিনিটেই আশা বদলে যায় নিরাশায়। ফোন ধরে না কেউ। মুষড়ে পড়ে অভীক। খানিক বাদে আবারও ব্যর্থ প্রচেষ্টা
চালায়। সব আশা যেন মিলিয়ে যেতে থাকে
চিরতরে। শেষ বেলায় বাকি থাকা কাজগুলো
শেষ করে ফেরার পথ ধরে বিধ্বস্ত অভীক। বাসের জানালার ধারে বসে সারা দিনের কাজের হিসেব কষতে থাকে মনে
মনে। সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে শহর
ছেড়ে তীব্র বেগে এগিয়ে চলে দূরপাল্লার বাস। পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের শব্দে তন্দ্রার ভাব কাটতেই হাতে
নেয় ফোন। আর ফোনে চোখ রাখতেই আনন্দে যেন একেবারে লাফিয়ে ওঠে অভীক। দীপক-দার ফোন !
তীব্র এক শিহরণ খেলে যায় সারা শরীরে। কোনও রকমে দু’টো রিং বাজতেই ফোন ধরে অভীক।
কথা এগোয় পরিচয়ের নতুন আবেগে,
উচ্ছ্বাসে, অদর্শনের কাতরতায়, ফিরে আসার প্রতিশ্রুতিতে - আপন ছন্দে।
####
মন্দির থেকে বেরিয়ে একটা অটো ভাড়া
নেয় অভীক। আগেই ফোনে কথা হয়েছে দীপক-দার সঙ্গে। গন্তব্যে ছুটতে থাকে অটো। খানিকটা
এগোতেই হঠাৎ খেয়াল হয় অভীকের - মন্দিরে কোনও প্রণামী না দিয়েই সে চলে এসেছে। এই
প্রথম এমনটা হলো। এর আগে যখনই কোনও মন্দিরে গেছে তখনই যথাসাধ্য প্রণামী দিতে ভুল
করেনি। মনটা খানিক বিষণ্ণ হয়ে গেল। কিন্তু কিছু করার নেই আর। অনেকটা পথ পেরিয়ে এসে
গেছে ইতিমধ্যেই। দীপক-দার বাতলানো পথের মোড়ে এসে ভাড়া চুকিয়ে নেমে এল অটো থেকে।
এরপর খানিকটা গলিপথের পায়ে হাঁটা রাস্তা। আবার ফোন করে কথা বলে নেয়। গলিতে ঢূকে
সোজা যেখানে পথের শেষ সেখানেই বাঁয়ে আরেকটা সরু গলির শেষ মাথায় দীপক-দা’দের বাড়ি।
কথামতো পৌঁছে যায় সেই বাড়িটির গেটে। গেটের বাইরে থেকেই এক অপরিচিত ভদ্রলোককে দেখতে
পেয়ে বলে- “দাদা, দীপক ভট্টাচার্যের বাড়িটা ?” ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বলেন - “আপনি
একটা গলি বেশি এসে গেছেন। আগের গলির শেষ বাড়িটা হবে।” একটু ধন্দে পড়ে যায় অভীক।
ধন্যবাদ জানিয়ে উল্টো পথে একই দিশায় দু’মিনিটেই পৌঁছে যায় ভদ্রলোকের বলে দেওয়া
বাড়িটার গেটে। বাঁশের জরাজীর্ণ একটা হাতে টানা গেট খুলে ভেতরে আসে। উঠোন ভর্তি
অগোছালো ঘাসের বাড়বাড়ন্ত। উঠোন ডিঙিয়ে বারান্দায় পৌঁছে যেতেই দেখতে পায় এক আলুথালু
পাগলী গোছের মহিলা পায়চারি করছেন সেখানে। একটু অপ্রস্তুত হয়ে যায় অভীক। ইনি কি
দীপক-দার স্ত্রী ? এমন কেন হাল ? অপ্রস্তুত অভীক তাঁকেই জিজ্ঞেস করে - “এটা কি
দীপক-দার ঘর ?”
“হুঁ” - ছোট্ট জবাব দেয় মহিলাটি।
- দীপক-দা আছেন ?
- হুঁ, আবারও সংক্ষিপ্ত জবাব।
বারান্দায় পা রাখে অভীক। আর পা
রাখতেই চোখ বড় বড় করে তাকায় মহিলা - “জুতো ?”
সত্যিই তো। অভীকের খেয়ালই ছিল না।
আবেগের তাড়নায় জুতো না খুলেই বারান্দা পেরিয়ে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল সে। পিছিয়ে এসে এবার
জুতো খুলে বারান্দায় উঠেই হাঁক পাড়ে - “দীপক-দা”। বলেই দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে ঘরে।
ঘরের ভেতরে বিছানায় শুয়েছিল দীপক-দা। ডাক শুনে নেমে আসে। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসির
ছোঁয়া। সামনে পেয়ে একেবারে বুকে জড়িয়ে ধরে অভীক। আনন্দের বান বইতে শুরু করার মুখেই
কোথা থেকে যেন একরাশ বিষণ্ণতা এসে জড়িয়ে ধরে অভীককে আষ্টেপৃষ্ঠে। এত দারিদ্র্য, এত
দুস্থিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে দীপক-দা ওরা। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাসই করতে পারছিল না
অভীক। ঘরদোরের জরাজীর্ণ অবস্থা। বিছানাপত্রে, চেহারায় হতদরিদ্র ছবি। কিছুই যেন
মেলাতে পারছিল না। খানিক সন্দেহ
জাগে মনে। সঠিক জায়গায় এসেছে তো সে ? দু’একটা প্রশ্ন করে দীপক-দাকে। দু’কুড়ি বছর আগের কথা
অনেকটাই ভুলে গেছে দীপক-দা কিন্তু যতটুকু বলছে তাতেই সন্দেহ দূর হয়ে গেল অভীকের।
কথায় কথায় এগোতে থাকে সময়। শারীরীক অসুস্থতার পাশাপাশি মানসিক ভাবেও যে অনেকটাই
অসুস্থ হয়ে আছে দীপক-দা সেটা স্পষ্ট ধরতে পারে অভীক। নিজে থেকে কিছুই বলছে না
দীপক-দা। অভীকের প্রশ্নেরই শুধু উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। বাইরে থেকে পায়চারিরতা মহিলাটি
মাঝে মাঝে উঁকি দিয়ে দেখেন অভীককে। মাঝে মাঝে রহস্যজনক একচিলতে মুচকি হাসি।
কথা চলতে থাকার মধ্যেই হঠাৎ ঘরে
এসে ঢোকেন পরের গলির সেই ভদ্রলোক। দীপক-দা খালি পড়ে থাকা
চেয়ারটা বাড়িয়ে দেয় তাঁর দিকে। অভীক বলে - “ আপনাকেই না জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি ?”
ভদ্রলোক ঘাড় নাড়েন। বলেন - “এই তো পাশের ঘরটিই আমার। গলিটাই শুধু আলাদা।”
অভীক এবার খোঁজ খবর নিতে থাকে
সবার।
- অশোক-দা কোথায় থাকে ?
- জানি না। শুনেছিলাম দিল্লি
থাকে। কোনও যোগাযোগ নেই - জানায় দীপক-দা।
- বাসনা-দি, বন্দনা-দি ?
- জানি না। কারোও কোনও খবর পাই
না।
অবাক হয়ে যায় অভীক। বলে - কেন এমন
হলো ? কেন কেউ তোমার খবর রাখে না দীপক-দা ?
এতক্ষণ চুপ হয়েই বসে রয়েছিলেন
পাশের বাড়ির আগন্তুক। এবার মুখ খুললেন। অভীকের দিকে তাকিয়ে বললেন - “আমি বাসনার
স্বামী”।
ঘরে যেন ছোটখাটো একটা বিষ্ফোরণ
হলো। চমকে উঠলো অভীক। এবার সব বলতে শুরু করলেন ভদ্রলোক। বাসনা-দির বিয়ে হয়েছে। ওরা
নিঃসন্তান। ভদ্রলোকের ক্যান্সার ধরা পড়েছে। চিকিৎসায় আছেন। অশোক-দার সত্যি সত্যিই
কোনও খবর নেই। দীপক-দা বিয়ে করেছে। সন্তানাদি হয়নি তাঁদেরও। বৌদি একটু বেরিয়েছেন।
এখনই ফিরবেন। সব কথা খুব মনযোগ দিয়ে শুনে যাচ্ছিল দীপক-দা। আর মাঝে মাঝে
স্বগতোক্তির মতো খুব মিনমিনে গলায় কীসব যেন বলে যাচ্ছিল।
কথা বলতে বলতেই দীপক-দার স্ত্রী
ঘরে ঢুকলেন। দেখেই বোঝা গেল গরিবি আর অসুস্থতার বিরুদ্ধে যুদ্ধবিধ্বস্ত এক মহিলা।
এত কিছু সামলেও আন্তরিকতার ছোঁয়ায় ভরিয়ে দিলেন মুহূর্তে। অবাক হয় অভীক। এত
প্রাণবন্ত কী করে হয়ে আছেন ইনি। এ বোধ করি শুধু স্ত্রী জাতির পক্ষেই সম্ভব। গল্পের
ফাঁকে চা বিস্কুটও এসে গেল। খেতে ইচ্ছে করছিল না অভীকের। আজ স্বপ্নপুরণের পাশাপাশি
যে স্বপ্নভঙ্গও হবে এ তো তার কল্পনায়ও ছিল না। মুষড়ে আছে দস্তুর মতো। সদা হাস্যরত
উচ্ছল দীপক-দার এমন শ্রীহীন অবস্থা অভীকের স্বপ্নেরও ছিল অগোচর। খুব একটা কষ্টের
অনুভূতি যেন মাঝে মাঝেই কান্নার মতো দলা পাকিয়ে এসে আটকে যাচ্ছিল গলায় এসে।
আর যেন বসে থাকতে ভালো লাগছিল না
অভীকের। সময়ও ফুরিয়ে আসছে। হঠাৎ মনে হলো সেই সুন্দরী বন্দনা-দির তো খবরই নেওয়া হলো
না। তাই জিজ্ঞেস করলো - “বন্দনা-দি কোথায় থাকে এখন ?”
প্রশ্ন শেষ হতে না হতেই তিনটে
হাতের তর্জনীর ঈশারায় ভেসে এল যে নির্বাক উত্তর সেই উত্তরের অকল্পনীয় তীব্রতায়
মুহুর্তেই যেন খসে পড়লো অভীকের শৈশব- কৈশোরের যত সঙ্গসুখের যাবতীয় অন্বেষণের পালা।
চমকে উঠে হতবিহ্বল অভীক - বাইরে বারান্দায় চলমান আলুথালু মহিলা বন্দনা-দি ? হে
ঈশ্বর, কেন এদের খুঁজে পেলুম ?
আর সহ্য করতে পারে না অভীক।
বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। কোনও রকমে জুতো জোড়া পায়ে গলিয়ে পেছনে না তাকিয়ে ছুটে চলে
যেতে উদ্যত হয়। কিন্তু পারে না। চোখ আটকে যায় বারান্দার এক পাশে দেয়ালে টাঙানো
ভগবানের ছবির দিকে। কে যেন কানের পাশে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে - আমার প্রণামীটা দিবি না
? ফিরে তাকায় অভীক।
- - - - - - - - - - - - - - - -
Comments
Post a Comment