সফরনামায় পুজোর প্রাপ্তি
পর্ব -
১ স্বপ্নের সফরে পুজোর স্মৃতি (২০১৯ ইং)
লেখব, না দেখব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনের ভেতর লক্ষ কথার হিড়িক - বেরিয়ে আসতে
চাইছে জলের তোড়ের মতো। ওদিকে বাইরে চোখ জুড়ানো সবুজের গায়ে কাশফুলের উৎসব।
বিশাল পাহাড়ের গায়ে যেন ঢলে পড়া সোহাগের লুটোপুটি। সারা গায়ে শিশির মেখে শরতের
জানান দিচ্ছে অহরহ। খানিকটা পথ এগোলেই এক একটি ঝরনা ধারা কিম্বা পাথুরে পাহাড়ি
নদী যেন পৃথিবীর বুকে জল ও স্থলের ভারসাম্য রক্ষার গুরুদায়িত্ব নিয়ে মগ্ন হয়ে
আছে আপন খেয়ালে।
###
এ এক অবাক করা ব্যাপার। প্রতিবার পুজো আসলেই বয়সটা যেন এক লহমায় পৌঁছে
যায় সেই প্রাক যৌবনের দামাল বেলায়। সমগ্র সত্ত্বার অনিবার্য গন্তব্য হয়ে উঠে
গ্রাম জীবনের সেই একমেবাদ্বিতীয়ম পূজামণ্ডপ।
বাস্তবের কঠোর অনুশাসন বছরের পর বছর ধরে দেহটাকে আলাদা করে রেখেছিল মন থেকে। এবার সব বাধাকে প্রাণপণে দূরে
সরিয়ে রেখে দীর্ঘ তিরিশ বছর পর আবারও একবার হারানো কৈশোরের ছোঁয়া গায়ে মাখব বলে
সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছি সেই আমার জন্মভূমির নিজের গ্রামের পুজোয় সামিল হতে।
###
মহাষষ্ঠীর রোদ ঝলমল সকালে রেলের জানালার পাশে বসে চলছে স্বপ্ন পথের সফরনামা।
কিছু অজানা, অবাস্তব স্বপ্ন সবার জীবনে ফিরে ফিরে আসে একাধিক বার। আমারও তাই। তবে সেই
স্বপ্ন হলো ঘুমন্ত মননের স্বপ্ন। আমার জাগ্রত মননে যে স্বপ্ন ফিরে আসে বারবার তার
মধ্যে আছে সেই আমার গাঁয়ের পুজো আর এই স্বপ্নের রেলপথ।
###
এতগুলো বছরে হয়তো পুজোর সাবেকিয়ানায়ও এসেছে অনেক পরিবর্তন। কিন্তু আমার
লক্ষ্য সেই হারানো ছবির পুনর্দৃশ্যাবলোকন। সেই ভোর বেলার শেফালি আর গুলাইচ্ (কাঠগোলাপ) এর ফুল কুড়িয়ে
মালা গাঁথার দৃশ্য। সাত সকালে চান করে ফুল হাতে মণ্ডপমুখী দৌড়। অবাক হয়ে এক-কাঠামের মূর্তির
চুলচেরা পর্যবেক্ষণ। শিব থেকে সিংহ, কলাবৌ থেকে হাঁস - বাদ পড়ত না কিছুই। মুখের আদল দেখে আঁচ করে নিতাম দেবদেবীর মনের কথা। আহা
সারল্যের সে কী পবিত্র পর্যায়।
###
###
তল্লাটের তিন গাঁ মিলে এক পুজো। অঞ্জলিতে ভিড়, সন্ধে হতেই আরতি দেখার ভিড়। সংলগ্ন ভট্টাচার্য বাড়ির অভিভাবকরা তিনদিন
গোটা মণ্ডপ চত্বরেরও অভিভাবক। মহানবমীর দুপুরে মণ্ডপ সংলগ্ন মাঠে হতো মহাপ্রসাদ
বিতরণ। বনভোজনের মনস্তত্বে মহানন্দে মনের খোরাক আহরণ। সন্ধে হতেই শুরু হতো এ
সন্ধ্যার বিশেষ আরতির তোড়জোড়। মূল আরতি যিনি করতেন তাঁর পাশাপাশি ছায়াসঙ্গী
হয়ে এক মনে খালি হাতেই লাগাতার আরতি করে যেত আধপাগলা গোপাল। মনে পড়ে পুজোর এক
বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় অস্থায়ী মণ্ডপের ছাদকে ঝড়ের হাত থেকে বাঁচাতে কয়েকজন বন্ধু
মিলে কী অমানুষিক প্রচেষ্টা।
স্বপ্ন সফরের ইতি সমাগত। এরপর শুরু হবে আরেক হারানো স্বপ্নের অনুসন্ধান।
হারিয়ে যাওয়া স্বজন বন্ধুর সান্নিধ্যে ফিরে আসবে কি সেই দুর্গা দেখার দিনগুলো ?
পর্ব - ২ সাবেকি পুজো - নতুন সফর
স্বপ্নের রেলযাত্রা শেষ হতেই শুরু হলো চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর তোড়জোড়।
মাঝে আবার এক রাতের সাময়িক বিরতি। নিকটাত্মীয় সকাশে স্বস্তির খোরাক ঘেটে খোশ
মেজাজে গল্পগুজব আর ছোট শহরের ভক্তিপূর্ণ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য প্রাক পূজা দেবী
দর্শন। লালাবাজারের মতো ছোট শহরে পুজোর উন্মাদনার আলাদা ধাঁচ।
পর্ব - ৩ নানা রূপে দশভূজা - সম্পর্কের সফর
##
অষ্টমীর সকাল হতেই আত্মীয় স্বজন সহ সদলবলে রওয়ানা হয়ে গেলাম - গন্তব্য উত্তর
ত্রিপুরার সদর শহর ধর্মনগর। আগে ভর যৌবনের তিনটি মূল্যবান বছর কাটিয়ে গেছি এই শহরে। স্বভাবতই অনেক
স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এখানে। এখানেই মা বাবার শেষ অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য। রাতে
সুসজ্জিত মণ্ডপে মণ্ডপে আগেরই মতো বেরিয়ে গেলাম পূজা দেখতে। মণ্ডপে মণ্ডপে সীমিত
আওয়াজে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মূর্ছনায় অপরূপ পরিবেশ। আসামে আশা করা অন্যায়। এক
মণ্ডপে বৃদ্ধা মায়ের আকুতি নানা ভাবে ফুটিয়ে আয়োজকরা। নবমীর সন্ধ্যায় পুরোণো
বন্ধুর সঙ্গে পুজোর ঘোরাঘুরি আর দশমীর বিদায় বেলায় যে বাড়িতে থেকেছিলাম সেই
বাড়ির পুজোর আধ্যাত্মিকতার মধ্যেই সমাপ্ত হলো এবারের পূজা পরিক্রমা।
পর্ব - ৪ শেষের কথা
'শেষ হয়েও হলো না শেষ' গোছের কিছু অব্যক্ত কথা সবার সাথে ভাগ করে নিতে না পারলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এই পরিক্রমা, এই সফরনামা। তাই এই সংযোজন পর্বের অবতারণা।
দশমীর সকাল থেকেই কানে ভেসে এল বিসর্জনের সুর। সাবেকি আনুষ্ঠানিকতার ছন্দে হৃদয়ে অনুভূত হলো এক গভীর দুঃখবোধের সকরুণ ব্যথা। দুপুরে আবেগমন্থিত বিসর্জন অনুষ্ঠানের স্মৃতি ভুলব না কখনো। ঘরের মেয়ের বিদায় বেলায় যা কিছু দুঃখবোধ, যত কিছু আনুষ্ঠানিকতা কোথাও রইল না খামতি। ছলছল চোখে আপামর ব্যথিত হৃদয়ের আকুল আকুতি - আবার এসো মা - পুনরাগমনায়চ। বিশ্বজননীর সাথে এই
যে একাত্ম হয়ে যাওয়া - জানি না
পৃথিবীর অন্য কোথাও এই অনন্য আধ্যাত্মিক মেলবন্ধনের কোনও উদাহরণ আছে কি না।
বাড়ির পেছনেই পুকুর। সেখানেই পুরোপুরি নিয়ম মেনে হলো বিসর্জন। এই সুযোগে দীর্ঘদিন পর সাঁতার কাটার অভ্যেসটা ঝালিয়ে নিলাম। স্বপ্নের সফরে হাতছাড়া করতে রাজি নই
কোনও সুযোগ। মননে বারবার ফিরে আসে সেই বালক বেলার সাঁতার শেখার মুহূর্তগুলো। রাতে চিরাচরিত প্রথায় জলপূর্ণ শান্তিঘট থেকে শান্তিবারি ছিটিয়ে অনুষ্ঠিত হলো পুজোর শেষ আনুষ্ঠানিকতা। সঙ্গে উদাত্ত কণ্ঠের মন্ত্রোচ্চারণ - "এতাস্তামভিষিঞ্চন্তু মন্ত্রঃপুতেন বারিনা"। শেষে - হাতে অপরাজিতা ধারন করে বছরভর কৃতকার্যতার বর প্রার্থনা। শুরু থেকে শেষ অবধি চূড়ান্ত রকমের তাৎপর্যপূর্ণ সব
আনুষ্ঠানিকতা।
##
শেষ হলো চার দিনের দুর্গোৎসব। উৎসব শেষে আবার এক দিনের স্বপ্ন যাপন। আগেই ভাবা মতো পরদিন ঘুম থেকে উঠেই সোজা পুকুর পাড়ে। বরশি তৈরিই ছিল। একাগ্রতার কৃচ্ছসাধনা। অবশেষে ধরা দিল সেই দু'কুড়ি বছর আগের রোমাঞ্চ। বরশিতে মাছ ধরার দারুণ অনুভূতি - যা বলে বা লিখে বোঝানো দুষ্কর। বীর বিক্রমে মাছের রাজপুত্তুরকে (রুই মাছের পোনা) বরশিবন্দি করে বুক ফুলিয়ে মোবাইল ক্যামেরার সামনে পোজ। সবাই এসে ধন্য ধন্য করলো আর দুপুরে ভাতের থালায় আস্ত সেই মাছ ভাজা পেয়ে ভোজন রসিক আমিও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম পুরো এপিসোড।
##
মাছ ধরা ও খাওয়ার মাঝে আবার হয়ে গেল সপরিবারে একপ্রস্থ ঘোরাঘুরি। বিশ বছর আগে এই ধর্মনগর শহরের যে বাড়িতে কাটিয়েছিলাম তিনটি বছর সেই বাড়িতে গেলাম পুরনো স্মৃতির টানে। বাড়ি মালিক দাদা ও বৌদি তো
আনন্দে উচ্ছ্বসিত। এতগুলো বছর পরেও এত আন্তরিকতা পেয়ে আমরাও আপ্লুত। দাদার বয়স ৮৫। একনাগাড়ে কথা বলে গেলেন। বিস্তারিত শোনালেন এমন কিছু কথা যেগুলো আমি নিজেই এতদিনে ভুলতে বসেছিলাম। বলতে গেলে উসকে দিলেন স্মৃতির সরণি। ওই তো, ওখানেই তো
ছিল আমার মায়ের বিছানা। এইখানে ছিল আমাদের সোফা যেখানে বসে থাকতেন বাবা। আজ কোথায় তাঁরা। গুমরে ওঠে হৃদয়টা। সহধর্মিণীও দেখছি সেই স্মৃতিভারেই আক্রান্ত। মেয়ে আমার ছ'মাস বয়সে এসে কয়েক মাস ছিল এখানে। বলতেই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে থাকলো অপরিচিত আত্মীয়র অতিপরিচিত সমাদর। প্রায় দু'ঘণ্টা পর
বেরিয়ে এলাম স্মৃতির সরণি থেকে। বিকেলে ছাত্র জীবনের এক পরম মিত্রের ঘরে আরেক প্রস্থ ভ্রমণ। ধর্মনগর থেকে আধ
ঘণ্টার দূরত্বে পানিসাগরে। অঝোর বৃষ্টিতে আক্ষরিক অর্থেই পানির সাগর হয়ে উঠেছিল জায়গাটি সেদিন।
##
রাতে ঘরে এসে পুজো শেষের ঘরোয়া আসরে সটান প্রবেশ। বসেছে গানের আসর। আমাদের অপেক্ষায় বসে সবাই। গান শোনালো কন্যা রুবি এবং কাছের আত্মীয় নেহা, বুলটি ও
কুটুস। তবলায় আমি ও কুটুস। সবার শেষে সমবেত স্বরে "মিলন হলো কত দিনে - - -" । সত্যি পরমাত্মীয় সব
মনের মানুষদের সাথে কতদিন পরে হলো দেখা। পরমানন্দে কেটে গেল কতগুলো সুখের বেলা।
আবার কবে যে হবে দেখা।
##
বন্ধু বান্ধবী আত্মীয় পরিজনের সান্নিধ্য থেকে বেরিয়ে এই মুহূর্তে আবার সেই স্বপ্নের রেলপথ ধরে শুরু হলো আমার ফেরত যাত্রা।
- - - - - - - - - - - - -

Comments
Post a Comment