Skip to main content

সফরনামায় পুজোর প্রাপ্তি

 সফরনামায় পুজোর প্রাপ্তি


পর্ব - ১ স্বপ্নের সফরে পুজোর স্মৃতি (২০১৯ ইং) 

লেখব, না দেখব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনের ভেতর লক্ষ কথার হিড়িক - বেরিয়ে আসতে চাইছে জলের তোড়ের মতো। ওদিকে বাইরে চোখ জুড়ানো সবুজের গায়ে কাশফুলের উৎসব। বিশাল পাহাড়ের গায়ে যেন ঢলে পড়া সোহাগের লুটোপুটি। সারা গায়ে শিশির মেখে শরতের জানান দিচ্ছে অহরহ। খানিকটা পথ এগোলেই এক একটি ঝরনা ধারা কিম্বা পাথুরে পাহাড়ি নদী যেন পৃথিবীর বুকে জল ও স্থলের ভারসাম্য রক্ষার গুরুদায়িত্ব নিয়ে মগ্ন হয়ে আছে আপন খেয়ালে।

###

এ এক অবাক করা ব্যাপার। প্রতিবার পুজো আসলেই বয়সটা যেন এক লহমায় পৌঁছে যায় সেই প্রাক যৌবনের দামাল বেলায়। সমগ্র সত্ত্বার অনিবার্য গন্তব্য হয়ে উঠে গ্রাম জীবনের সেই একমেবাদ্বিতীয়ম পূজামণ্ডপ। বাস্তবের কঠোর অনুশাসন বছরের পর বছর ধরে দেহটাকে আলাদা করে রেখেছিল মন থেকে। এবার সব বাধাকে প্রাণপণে দূরে সরিয়ে রেখে দীর্ঘ তিরিশ বছর পর আবারও একবার হারানো কৈশোরের ছোঁয়া গায়ে মাখব বলে সপরিবারে বেরিয়ে পড়েছি সেই আমার জন্মভূমির নিজের গ্রামের পুজোয় সামিল হতে।

###

মহাষষ্ঠীর রোদ ঝলমল সকালে রেলের জানালার পাশে বসে চলছে স্বপ্ন পথের সফরনামা। কিছু অজানা, অবাস্তব স্বপ্ন সবার জীবনে ফিরে ফিরে আসে একাধিক বার। আমারও তাই। তবে সেই স্বপ্ন হলো ঘুমন্ত মননের স্বপ্ন। আমার জাগ্রত মননে যে স্বপ্ন ফিরে আসে বারবার তার মধ্যে আছে সেই আমার গাঁয়ের পুজো আর এই স্বপ্নের রেলপথ।

ভোরে লামডিং পেরোতেই স্থাণু হয়ে বসেছি জানালার পাশে। চোখ ফেরানো দায়। পাহাড়ের গায়ে আঁকাবাঁকা রেলপথে একটার পর একটা স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছি আর চোখ দুটো যেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে নতুন করে জৌলুসবিধৌত হচ্ছে আবারও। আগেরই মতো। ভাষায় এই সৌন্দর্য বর্ণনা করা নিতান্তই অসম্ভব। সামনে পেছনে তাকালে গোটা রেলগাড়িটাই দেখা যাচ্ছে। স্টেশন আসলেই ডাইনে বাঁয়ে ছবির মতো পরিপাটি করে পাহাড়ের গায়ে খাঁজ কেটে কেটে স্থাপিত জনবসতি। মনে হয় এখানেই শান্তি ছায়ায় কাটিয়ে দিই অবশিষ্ট বেঁচে থাকা দিনগুলো।
গাড়ি দিবলং স্টেশন পেরিয়ে মুপা পৌঁছনোর মুখেই শুরু হয়ে গেল সুড়ঙ্গ বা টানেল। এই রেলপথের বিশেষত্ব। গর্বও বটে। স্থানীয় ভাষায়- 'বোগ্দা'কারিগরি কলার উৎকৃষ্ট নিদর্শন।কয়েক মাইল জোড়া পাহাড়গুলোর বুকটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে তৈরি করা একাধিক সুড়ঙ্গ গিলে নেয় গোটা গাড়িটাকে। দৈর্ঘ্য নিয়ে করা রেলগাড়ির যাবতীয় গরিমাকে সমূলে নস্যাৎ করে দেওয়া এই 'বোগ্দা'গুলো সফরকারীদের কাছে এক পরম আশ্চর্য। আমার স্বপ্নের ইতিহাসে কখনো ভুলতে না পারা সেই কৈশোরের রোমাঞ্চ। কয়লা চালিত ইঞ্জিন থেকে বেরিয়ে আসা কালো হীরের গুঁড়ো আর নিকষ কালো অন্ধকারে ক্ষ্যাপাটে যাত্রীর চিল চিৎকারের প্রতিধ্বনিতে নাভিঃশ্বাসের সেই মুহূর্তগুলোও এখন মনে হয় মনের মণিকোঠার হারানো রত্ন। গাড়িটা সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এলে মনে হতো পুনর্জন্ম। এখন উন্নত হয়েছে সব ব্যাবস্থা।

###

এতগুলো বছরে হয়তো পুজোর সাবেকিয়ানায়ও এসেছে অনেক পরিবর্তন। কিন্তু আমার লক্ষ্য সেই হারানো ছবির পুনর্দৃশ্যাবলোকন। সেই ভোর বেলার শেফালি আর গুলাইচ্ (কাঠগোলাপ) এর ফুল কুড়িয়ে মালা গাঁথার দৃশ্য। সাত সকালে চান করে ফুল হাতে মণ্ডপমুখী দৌড়। অবাক হয়ে এক-কাঠামের মূর্তির চুলচেরা পর্যবেক্ষণ। শিব থেকে সিংহ, কলাবৌ থেকে হাঁস - বাদ পড়ত না কিছুই। মুখের আদল দেখে আঁচ করে নিতাম দেবদেবীর মনের কথা। আহা সারল্যের সে কী পবিত্র পর্যায়।

###

দেখতে দেখতে গাড়ি হাফলং এসে গেল। আবারো নস্টালজিয়া। এখানে গাড়ি এসে থামলে দৌড়ে গিয়ে হোটেলে ভাত খেতে হতো। দুই মিনিটে ভাত খাওয়ার বিশ্বরেকর্ডটা এখানেই গড়তাম আকছার।
নতুন রেল লাইন হয়েছে এখন। দূরে নিচে পুরোনো লাইন দেখা যাচ্ছে। মনোরম দৃশ্যাবলিতে এও এক নবতম সংযোজন। অতীত আর বর্তমানের মনমাতানো মেলবন্ধন।

###

তল্লাটের তিন গাঁ মিলে এক পুজো। অঞ্জলিতে ভিড়, সন্ধে হতেই আরতি দেখার ভিড়। সংলগ্ন ভট্টাচার্য বাড়ির অভিভাবকরা তিনদিন গোটা মণ্ডপ চত্বরেরও অভিভাবক। মহানবমীর দুপুরে মণ্ডপ সংলগ্ন মাঠে হতো মহাপ্রসাদ বিতরণ। বনভোজনের মনস্তত্বে মহানন্দে মনের খোরাক আহরণ। সন্ধে হতেই শুরু হতো এ সন্ধ্যার বিশেষ আরতির তোড়জোড়। মূল আরতি যিনি করতেন তাঁর পাশাপাশি ছায়াসঙ্গী হয়ে এক মনে খালি হাতেই লাগাতার আরতি করে যেত আধপাগলা গোপাল। মনে পড়ে পুজোর এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় অস্থায়ী মণ্ডপের ছাদকে ঝড়ের হাত থেকে বাঁচাতে কয়েকজন বন্ধু মিলে কী অমানুষিক প্রচেষ্টা।

###
প্রকৃতির বুকে আপন সৌন্দর্যে মহিমান্বিত কিছু রেল স্টেশনের মধ্যে এই লামডিং বদরপুর পাহাড় লাইনের রাস্তায় অবস্থিত জাটিংগা হারাঙ্গাজাও ইত্যাদি জায়গাগুলো ইতিমধ্যেই পেরিয়ে এসেছি। অদূর গন্তব্য বদরপুর জংশন। সেখান থেকে সটান সেই আমার ছেলেবেলার পূজা মণ্ডপ। করিমগঞ্জ জেলার রামকৃষ্ণ নগর মহকুমার লক্ষ্মীনগর গ্রামের প্রায় সত্তর বছর অতিক্রান্ত সেই পূজা এখন স্থায়ী মণ্ডপে অনুষ্ঠিত হচ্ছে কয়েক বছর ধরে।

স্বপ্ন সফরের ইতি সমাগত। এরপর শুরু হবে আরেক হারানো স্বপ্নের অনুসন্ধান। হারিয়ে যাওয়া স্বজন বন্ধুর সান্নিধ্যে ফিরে আসবে কি সেই দুর্গা দেখার দিনগুলো ?

 

পর্ব - ২ সাবেকি পুজো - নতুন সফর

 

স্বপ্নের রেলযাত্রা শেষ হতেই শুরু হলো চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর তোড়জোড়। মাঝে আবার এক রাতের সাময়িক বিরতি। নিকটাত্মীয় সকাশে স্বস্তির খোরাক ঘেটে খোশ মেজাজে গল্পগুজব আর ছোট শহরের ভক্তিপূর্ণ আয়োজনে অনুষ্ঠিতব্য প্রাক পূজা দেবী দর্শন। লালাবাজারের মতো ছোট শহরে পুজোর উন্মাদনার আলাদা ধাঁচ।

অবশেষে এসেই গেল মাহেন্দ্রক্ষণ। মহাসপ্তমীর সকালে পরিপাটি হয়ে বেরিয়ে গেলাম আমার ছেলেবেলার সেই গাঁয়ের পূজা মণ্ডপ অভিমুখে। চেনা রাস্তার প্রতিটি মোড় পেরোচ্ছি আর তার সাথে জড়িত স্মৃতিকথার বর্ণনা দিচ্ছি সফরসঙ্গীদের। সকাল ন'টায় মূল রাস্তার পাশে স্থায়ী মণ্ডপের সামনে থামলো আমাদের গাড়ি। নেমে এদিক ওদিক তাকিয়ে স্মৃতি ভারে আপ্লুত আমার তখন হারিয়ে যাওয়া অবস্থা। ওই তো আমার বাড়ি যাওয়ার রাস্তা। ওই পথ ধরেই তো সাত সকালে ছুটে আসতাম ফুলের সাজি হাতে। ওই তো সেই আলপথ যেদিক থেকে ভট্টাচার্য বাড়ির রাঙাকাকু আর কাকিমা বারবার আসতেন যেতেন এই পুজোর গরজে। বিষণ্ণ হলো হৃদয়। রাঙাকাকু আজ নেই। অনুসারী হয়েছেন আমার মা ও বাবার। ক'দিন আগেই দেখা করে এসেছি কাকিমার সাথে। বন্ধু কাজল ছিল এই পূজার অপরিহার্য অঙ্গ। একাধারে ৭ বছর ধরে সম্পাদক ছিল। এখন বাইরে থাকে। আসতে পারেনি এবার। আরেক বন্ধু বাপ্পাও ছিল সক্রিয় কর্মী। ছেড়ে গেছে ইহজগৎ। ডুব মেরেছিলাম অতীতে। হঠাৎ করে - নিজের নাম শুনেই ফিরে পেলাম সম্বিৎ। আরে এ তো জয়ন্ত। আমাদের পাশের বাড়ির। মণ্ডপে বসে রয়েছেন অনেকেই। চেনা মুখের সন্ধানে তাকাচ্ছি এদিক ওদিক। কিন্তু বিফল প্রত্যাশা। জয়ন্ত বেরিয়ে এলো পূজা ঘরের ভেতর থেকে। মন্ত্র পড়ছেন পুরুতমশাই। সঙ্কল্প মন্ত্র। জানা মন্ত্রের ধ্বনিতে চেনা কণ্ঠের তলাশ। চোখের সামনে আনন্দময়ীর অপরূপ মূরতি। অবিকল সেই মা। আবারো মেতে উঠি চুলচেরা বিশ্লেষণে। দূর্গার হাতের সাপ, লক্ষ্মীর পেঁচা, সরস্বতীর হাঁস, কার্তিকের গোঁফ, গণেশের মুখ, সিংহের বিক্রম, অসুরের অসহায়তা, মহিষের কর্তিত মস্তক - বাদ যায় না কিছুই। তিরিশ বছর বাদেও একই আছে বিস্ময়ের জায়গাগুলো। প্রণাম সেরে উঠতেই ঘিরে ধরে জয়ন্ত। প্রশ্নোত্তর পর্ব চলতেই থাকে। দুজনে দুজনকে। সবাই তাকাচ্ছে এই অচেনা আগন্তুকের দিকে।
হঠাৎ 'কী রে ?' প্রশ্নে তাকিয়ে বড্ড কাছের বন্ধুটিকে আমতা আমতা করে বলি - 'গোবিন্দ নি ?' 'অয় অয়' বলে জড়িয়ে ধরে গোবিন্দ। চোখের পলকে আমার কল্পনায় ভেসে উঠে বিকেলের খেলার মাঠ আর দুরন্ত ছোটাছুটি। আলিঙ্গন শেষ হতে না হতেই ভেসে আসে - 'দাদা, আমারে চিনছো নি ?' হাতড়ে বেড়াই স্মৃতি। কিন্তু ব্যর্থ। নিজেই বলে উঠে - আমি বাপ্পার ভাই। মুহূর্তে দু ভাইয়ের চেহারা ভেসে উঠে চোখের সামনে। দাদার মৃত্যু জনিত উদাসীনতা ফুটে ওঠে ওর চেহারায়। সিক্ত হয় আমারও দু’চোখের কোণ। এভাবেই স্বর্গ ও মর্ত্যের ঈশ্বরদের সাহচর্যে পেরিয়ে যায় অনেকটা সময়। এবার ফেরার পালা। ফেরার বেলায় দেখা হলো আরোও কিছু চেনা মানুষের সাথে যাদের সান্নিধ্যে একদা কেটেছে আমার অগুনতি ক্ষণ। পুজোর প্রসাদ হাতে গাড়ি অবধি এগিয়ে এল আরেক অগ্রজ বন্ধু স্বপ্ন পূরণের যাত্রা শেষে কানায় কানায় তৃপ্ত আমার অন্তরের অনুভব তো আর ভাষায় প্রকাশ হওয়ার নয়। কবিগুরুর ভাষা ধার করে তাই বলি - "আমার জীবন পাত্র উচ্ছলিয়া মাধুরী করেছ দান, তুমি জানো নাই তুমি জানো নাই তুমি জানো নাই তার মূল্যের পরিমাণ।"

 

পর্ব - ৩ নানা রূপে দশভূজা - সম্পর্কের সফর

 

শৈশব কৈশোরের মনমাতানো স্মৃতির স্বপ্নসফর শেষের পরবর্তী গন্তব্য দ্বিতীয় পূজা মণ্ডপ লক্ষ্মীনগরের সেই পূজা মণ্ডপ থেকে আধ কিলোমিটার দূরত্বের কদমতলার লক্ষ্মীনারায়ণ মন্দির। সেও আমার ছেলেবেলার অবাধ বিচরণ ভূমি। ফেলে আসা প্রতিদিনের সন্ধ্যারতির স্থায়ী খোলবাদক এর ভূমিকার হারানো স্মৃতির উপভোগ্য রোমন্থন। বাঁশের মণ্ডপ সজ্জায় রাত্রি জাগরণ ফিরে এল মননে। কাছের বন্ধু দিবাকর এখন স্থায়ী পুরোহিত। আমাকে দেখে পুরোহিতের আসন ছেড়ে উঠে আসার উদ্যোগ নিতেই বারণ করি হাতের ইশারায়। মন্দিরের চালায় পরলোকগত মা ও বাবার স্মৃতিফলকে আমাদের পরিবারের সবার নাম দেখে রোমাঞ্চিত হয় আমার সফরসঙ্গী পরবর্তী প্রজন্ম। মন্দির থেকে বেরিয়ে সটান বন্ধু মহলের আড্ডাখানায়। আগেই সেখানে এসে হাজির এক ঝাঁক অকৃত্রিম বন্ধু। বন্ধুভাগ্যে ভাগ্যবান আমি মাঝে মাঝেই ভাবি - একদিন শেষ যাত্রায়ও মনে হয় কোনও বন্ধু এসে বলবে, চল ঘুরে আসি। সহপাঠীদের সান্নিধ্যে কেটে গেল কিছু স্বর্গীয় ক্ষণ। সেখান থেকে বেরিয়ে সোজা চলে গেলাম গায়ক বন্ধু সঞ্জীব এর বাড়িতে পুজোয় সামিল হতে। সেখানে আমার পরিচয় গীতিকার। অদ্ভুত ব্যাপার। এখন পর্যন্ত আমার লিখা চারটি গানে সুর ও কণ্ঠ দিয়েছে অসাধারণ মিষ্টি গলার অধিকারী বন্ধুবর সঞ্জীব।
সময় গড়িয়ে যায় কিন্তু জন্মভূমির সফর আর শেষ হতে চায় না। অবশেষে শেষ ফেরার পালা। ফেরার পথে বেলতলা বলে এক জায়গায় এসে থামাতে বললাম গাড়ি। সেখানে নেমে দেখা করতে গেলাম এক বিশেষ জ্যেষ্ঠ বন্ধুর দোকানে। যতটা প্রাণের টান ততটাই গরজ। তিরিশ বছর বাদে আমাকে দেখেই 'ভাই' বলে বুকে জড়িয়ে ধরে অজয়-দা। দু'চোখে আমার অশ্র টলোমল।

##

অষ্টমীর সকাল হতেই আত্মীয় স্বজন সহ সদলবলে রওয়ানা হয়ে গেলাম - গন্তব্য উত্তর ত্রিপুরার সদর শহর ধর্মনগর আগে ভর যৌবনের তিনটি মূল্যবান বছর কাটিয়ে গেছি এই শহরে। স্বভাবতই অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে এখানে। এখানেই মা বাবার শেষ অন্তরঙ্গ সান্নিধ্য। রাতে সুসজ্জিত মণ্ডপে মণ্ডপে আগেরই মতো বেরিয়ে গেলাম পূজা দেখতে। মণ্ডপে মণ্ডপে সীমিত আওয়াজে রবীন্দ্র সঙ্গীতের মূর্ছনায় অপরূপ পরিবেশ। আসামে আশা করা অন্যায়। এক মণ্ডপে বৃদ্ধা মায়ের আকুতি নানা ভাবে ফুটিয়ে আয়োজকরা। নবমীর সন্ধ্যায় পুরোণো বন্ধুর সঙ্গে পুজোর ঘোরাঘুরি আর দশমীর বিদায় বেলায় যে বাড়িতে থেকেছিলাম সেই বাড়ির পুজোর আধ্যাত্মিকতার মধ্যেই সমাপ্ত হলো এবারের পূজা পরিক্রমা।

 

পর্ব - ৪ শেষের কথা

 

'শেষ হয়েও হলো না শেষ' গোছের কিছু অব্যক্ত কথা সবার সাথে ভাগ করে নিতে না পারলে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এই পরিক্রমা, এই সফরনামা তাই এই সংযোজন পর্বের অবতারণা
দশমীর সকাল থেকেই কানে ভেসে এল বিসর্জনের সুর সাবেকি আনুষ্ঠানিকতার ছন্দে হৃদয়ে অনুভূত হলো এক গভীর দুঃখবোধের সকরুণ ব্যথা দুপুরে আবেগমন্থিত বিসর্জন অনুষ্ঠানের স্মৃতি ভুলব না কখনো ঘরের মেয়ের বিদায় বেলায় যা কিছু দুঃখবোধ, যত কিছু আনুষ্ঠানিকতা কোথাও রইল না খামতি ছলছল চোখে আপামর ব্যথিত হৃদয়ের আকুল আকুতি - আবার এসো মা - পুনরাগমনায়চ বিশ্বজননীর সাথে এই যে একাত্ম হয়ে যাওয়া - জানি না পৃথিবীর অন্য কোথাও এই অনন্য আধ্যাত্মিক মেলবন্ধনের কোনও উদাহরণ আছে কি না
বাড়ির পেছনেই পুকুর সেখানেই পুরোপুরি নিয়ম মেনে হলো বিসর্জন এই সুযোগে দীর্ঘদিন পর সাঁতার কাটার অভ্যেসটা ঝালিয়ে নিলাম স্বপ্নের সফরে হাতছাড়া করতে রাজি নই কোনও সুযোগ মননে বারবার ফিরে আসে সেই বালক বেলার সাঁতার শেখার মুহূর্তগুলো রাতে চিরাচরিত প্রথায় জলপূর্ণ শান্তিঘট থেকে শান্তিবারি ছিটিয়ে অনুষ্ঠিত হলো পুজোর শেষ আনুষ্ঠানিকতা সঙ্গে উদাত্ত কণ্ঠের মন্ত্রোচ্চারণ - "এতাস্তামভিষিঞ্চন্তু মন্ত্রঃপুতেন বারিনা" শেষে - হাতে অপরাজিতা ধারন করে বছরভর কৃতকার্যতার বর প্রার্থনা শুরু থেকে শেষ অবধি চূড়ান্ত রকমের তাৎপর্যপূর্ণ সব আনুষ্ঠানিকতা

##

শেষ হলো চার দিনের দুর্গোৎসব উৎসব শেষে আবার এক দিনের স্বপ্ন যাপন আগেই ভাবা মতো পরদিন ঘুম থেকে উঠেই সোজা পুকুর পাড়ে বরশি তৈরিই ছিল একাগ্রতার কৃচ্ছসাধনা অবশেষে ধরা দিল সেই দু'কুড়ি বছর আগের রোমাঞ্চ বরশিতে মাছ ধরার দারুণ অনুভূতি - যা বলে বা লিখে বোঝানো দুষ্কর বীর বিক্রমে মাছের রাজপুত্তুরকে (রুই মাছের পোনা) বরশিবন্দি করে বুক ফুলিয়ে মোবাইল ক্যামেরার সামনে পোজ সবাই এসে ধন্য ধন্য করলো আর দুপুরে ভাতের থালায় আস্ত সেই মাছ ভাজা পেয়ে ভোজন রসিক আমিও তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলাম পুরো এপিসোড

##

মাছ ধরা খাওয়ার মাঝে আবার হয়ে গেল সপরিবারে একপ্রস্থ ঘোরাঘুরি বিশ বছর আগে এই ধর্মনগর শহরের যে বাড়িতে কাটিয়েছিলাম তিনটি বছর সেই বাড়িতে গেলাম পুরনো স্মৃতির টানে বাড়ি মালিক দাদা বৌদি তো আনন্দে উচ্ছ্বসিত এতগুলো বছর পরেও এত আন্তরিকতা পেয়ে আমরাও আপ্লুত দাদার বয়স ৮৫ একনাগাড়ে কথা বলে গেলেন বিস্তারিত শোনালেন এমন কিছু কথা যেগুলো আমি নিজেই এতদিনে ভুলতে বসেছিলাম বলতে গেলে উসকে দিলেন স্মৃতির সরণি ওই তো, ওখানেই তো ছিল আমার মায়ের বিছানা এইখানে ছিল আমাদের সোফা যেখানে বসে থাকতেন বাবা আজ কোথায় তাঁরা গুমরে ওঠে হৃদয়টা সহধর্মিণীও দেখছি সেই স্মৃতিভারেই আক্রান্ত মেয়ে আমার 'মাস বয়সে এসে কয়েক মাস ছিল এখানে বলতেই তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে থাকলো অপরিচিত আত্মীয়র অতিপরিচিত সমাদর প্রায় দু'ঘণ্টা পর বেরিয়ে এলাম  স্মৃতির সরণি থেকে বিকেলে ছাত্র জীবনের এক পরম মিত্রের ঘরে আরেক প্রস্থ ভ্রমণ ধর্মনগর থেকে আধ ঘণ্টার দূরত্বে পানিসাগরে অঝোর বৃষ্টিতে আক্ষরিক অর্থেই পানির সাগর হয়ে উঠেছিল জায়গাটি সেদিন

##

রাতে ঘরে এসে পুজো শেষের ঘরোয়া আসরে সটান প্রবেশ বসেছে গানের আসর আমাদের অপেক্ষায় বসে সবাই গান শোনালো কন্যা রুবি এবং কাছের আত্মীয় নেহা, বুলটি কুটুস তবলায় আমি কুটুস সবার শেষে সমবেত স্বরে "মিলন হলো কত দিনে - - -" সত্যি পরমাত্মীয় সব মনের মানুষদের সাথে কতদিন পরে হলো দেখা পরমানন্দে কেটে গেল কতগুলো সুখের বেলা

আবার কবে যে হবে দেখা

##

বন্ধু বান্ধবী আত্মীয় পরিজনের সান্নিধ্য থেকে বেরিয়ে এই মুহূর্তে আবার সেই স্বপ্নের রেলপথ ধরে শুরু হলো আমার ফেরত যাত্রা

 

- - - - - - - - - - - - -

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...