ঠাট
গান বাজনা ভালোবাসি যদিও কিন্তু
গাওয়ার সাহস করে উঠতে পারিনি কোনও দিন। তাই রাগ রাগিনীর ধারণা নেই মোটেও। এমনিতে রাগ উঠে যাওয়াতে আমার
জুড়ি পাওয়া ভার কিন্তু সংগীতের রাগ রাগিনীর বেলায় আমার ভাঁড়ে মা ভবানী। আর রাগ রাগিনী যেখানে বুঝিই
না সেখানে ঠাট বুঝার তো প্রশ্নই উঠে না। তবে আজ যে কথাটি লিখব বলে বসেছি সে
হলো এক অন্যরকম ঠাট। দেখনদারি ঠাট।
আমাদের অর্থাৎ মনুষ্য নামক
প্রাণীটির মধ্যে ঠাট দেখানোর একটা প্রবণতা প্রায়শই দেখা যায়। একটি হাস্যরসাত্মক গল্প মনে পড়ছে। গল্প হলেও সত্যি।
তখন সাধারণ্যে সদ্য এসেছে
বোকাবাক্স। সারা গাঁয়ের মানুষ টিভি থাকা
ঘরে হুমড়ি খেয়ে পড়ে সকাল সন্ধ্যা। অনেকে আবার হত্যে দিয়ে পড়ে থাকেন ঘন্টার
পর ঘন্টা। ঘরের মালিকও খানদানি বংশের
মানুষ। ঠাট দেখানোর একটা ব্যাপার
তাঁর মধ্যেও থাকাটাই স্বাভাবিক। তাই ‘কুছ পরোয়া নেহি’
বলে সবাইকে চা বিস্কুট খাইয়ে একটা আত্মপ্রসাদে মগ্ন থাকেন তিনিও। কিন্তু কতদিন আর এভাবে পকেট
ফাঁকা করে ঠাট বজায় রাখা যায় ? তাই অচিরেই সমাপন ঘটলো চা-পর্বের। ধীরে ধীরে উৎসব শেষে ঘরে ফেরার
মতো দর্শকরাও আসা কমিয়ে নিজ নিজ কাজেকর্মে মনোনিবেশ করলো।
ইতিমধ্যে তল্লাটে আরোও দু’ চার ঘরে পদার্পণ ঘটলো
বোকাবাক্সের। টি আর পি নিম্নমুখী হলো বোকাবাক্সের প্রথম খরিদ্দারের। আমাদের নূন আনতে পান্তা ফুরায়। বিলাসিতার সুযোগ নেই। তাই ঠাট দেখানোর বালাইও নেই। তা বলে মন নামক মুক্ত বিহঙ্গের
তো আর ছোটাছুটির বিরাম নেই। আর বেলাগাম মনের পায়ে বেড়ি পরানোর
দরকারই বা কী ? ছুটন্ত মনের দূরন্ত ওড়াওড়িকে সম্বল করে - ‘এমনি করে যায়
যদি দিন যাক না’। মনের ভাবনা তাই কখনো সখনো স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয় অলস যাপন বেলায়।
রোজ বিকেলে গাঁয়েরই এদিক ওদিক
থেকে দু’চারজন অবসরবিলাসী প্রতিবেশী এসে খোশ গল্পে মেতে ওঠেন আমাদের প্রশস্ত চাতালে। কথায় কথায় স্বপ্নবিলাসের প্রসঙ্গও
উঠে আসে আড্ডায়। নিরক্ষর নিশিকান্ত কাকা চাষবাষ
করেই সংসার চালান। কিন্তু প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন
মানুষ। আমার আজো মনে আছে বাবার স্বপ্নকে
ভুল বুঝে সেদিন মোক্ষম একটি উপায় বাতলেছিলেন নিশিকাকা। “দাদা, এক কাম করইন। ঘরো টিভি না থাকলে কিতা অইল, উচা দেখিয়া বাশ একটা
আমি ওউ দিমু নে। আর থুড়া কিছু টেকা খরচ করিয়া আপনে একটা এন্টেনা কিনিয়া আনইন। ব্যস, ঘরর চালর উপরে দেখা
যাইব এন্টেনা, হকলে জানবা আপনেও টিভির মালিক”। হো হো করে হেসে উঠেছিলেন সবাই। পরে অবশ্য বাবা নিশিকাকাকে
তাঁর ভুলটা ধরিয়ে দিতে পেরেছিলেন। তবে আমার কিন্তু দারুণ লেগেছিল তাঁর
বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তাটি। সেদিন থেকেই ঠাট দেখানোর ফন্দিফিকির আমার মধ্যে দারুণ হাসির
খোরাক জোগায়। আর এই ঠাটের ফল নিরেট কিছু
চিন্তারও উদ্রেক ঘটায় বৈকি।
আজো সমানে চলছে সেই ঠাট দেখানোর
ট্র্যাডিশন। সন্তানের বিয়েতে ঠাট দেখাতে
গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছেন কত পিতা। সমান্তরাল ভাবে সমাজের নিম্ন ও মধ্যবিত্তের
জীবনে সৃষ্টি করছেন নিঃস্ব হওয়ার এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। ছেলেমেয়েদের বাইরে পড়তে পাঠানোর মধ্যেও
এক ঠাটবাটের ব্যাপার আছে। অনেককেই দেখেছি মোটামুটি মধ্যমানের সন্তানদেরও লক্ষ লক্ষ টাকা
খরচ করে বাইরে পড়তে পাঠিয়ে দিয়ে এক নকল আত্মপ্রসাদ লাভে আত্মনিমগ্ন হয়ে থাকতে। অমুক বাবুর ছেলেটি ব্যাঙ্গালোরে
পড়ছে। সুতরাং ঠাট বজায় রাখতে তমুক
বাবুও সামান্য বি এ পড়ার জন্য তাঁর ছেলেটিকে পাঠিয়ে দিলেন দিল্লীতে। এ এক অলিখিত ঠাট দেখানোর প্রতিযোগিতা। যেন এ অঞ্চলে বি এ পড়ার মতো
কোনও কলেজই নেই।
মাঝে মাঝে ঠাট দেখিয়ে সমাজে
বেশ কিছু প্রাপ্তিও হয়। মনে পড়ছে একটি কথা। সে বেশ কয়েক বছর আগের কথা। আমার পাশেই একটি ঘরে ভাড়া
থাকত একটি ছেলে। বাউণ্ডুলের হদ্দ। মদ ভাং খেয়ে কাটিয়ে দিত সময়। ঠগ ঠগামি করেই চালাতে হতো
পেট। কিন্তু তার একটি স্বভাব ছিল
এই যে সে সব সময় খুব ফিটফাট থাকত। ধোপদুরস্ত ইস্ত্রি করা পোষাক পরিচ্ছদ
পরে বাইরে বেরোত আর একটা ঠাট বজায় রেখে চলত। ফলে তার জোচ্চুরি মাখা দেখনদারি কথাবার্তায়
ঠগে যেতেন অনেকেই। মোটামুটি
ঠাটের ব্যবসা করেই এদিকের মাল ওদিকে করে বেশ চলে যেত তার সংসার।
কখনোসখনো ঠাটে ঘা-ও লাগে বৈকি। ঠাটে
ঘা মানে আঁতে ঘা। সন্তানকুল
কোনও প্রতিযোগিতায় অকৃতকার্য হলেই ঠাট বজায় রাখতে অভিভাবককুলের রেডিমেড বাহানা - পক্ষপাতদুষ্ট বিচার। খেলায়
কোনও দল হেরে গেলেই ঠাট বজায় রাখতে সমর্থককুলের মন্তব্য - খেলেছে কিন্তু আমাদের
দলই ভালো। অনেক
সময় আমরা অনেকেই ঠাট বজায় রাখার স্বার্থে মিথ্যে জেনেও তার সমর্থনে হাজারটা কুযুক্তি
খাড়া করি।
আমার এক নিকটাত্মীয় গেলবার
হঠাৎ করে নির্বাচনে দাঁড়ালেন। খবর শুনে আমি তো অবাক। নিছক
সংসারী গোবেচারা টাইপের এই মানুষটি কী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতায় নামলেন সেই
কারণটি আমার বোধগম্য না হওয়ায় শেষে একদিন ফোন করে জিজ্ঞেস করেই নিলাম। তিনি
তখন হাওয়ায় ভাসছেন। বোধ
করি মসনদের অলীক স্বপ্নে বিভোর। তাই আমার ফোন ধরে বেশি সময় নষ্ট করার
মুডে নেই। যাহোক
চক্ষুলজ্জার খাতিরেই হয়তো বা আমার ফোনটি ধরলেন। কিন্তু উত্তরে তিনি নিতান্ত দুই শব্দেই
যা বললেন তাতেই আমার
‘কর্ণ চড়কগাছ’। বললেন - “নাম ফাটুক”। এই
নাম ফাটানো আর ঠাট দেখানো একে অপরের সমার্থক। নাম ফাটিয়ে কেউকেটা হতে যাওয়ার প্রাথমিক
শর্তই হলো ঠাট দেখানো।
এই শর্তটি আমাদের পাড়ার অকাল
কুষ্মাণ্ড বিশুও বিলক্ষণ জানে। বিশুর যত ঠাট তার গোঁফে। তল্লাটে
আড়ালে আড়ালে যে অনেকেই তাকে ‘মুছুয়া বিশু’ বলে ডাকে সে খবর ইতিমধ্যেই
তার কানেও পৌঁছেছে। ভেতরে ভেতরে এ নিয়ে বিশু একটা আত্মপ্রসাদও
অনুভব করে। আর
তাই নিত্যদিন যারপরনাই যত্ন করে তার গোঁফের।
এখন নতুন সমস্যা সৃষ্টি হতেই
মহা ফাঁফরে পড়েছে বিশু। যে ঠাটে বাইরে বেরিয়ে মস্তি করতো বিশু সেই গোঁফকে এখন ঢেকেঢুকে
বেরোতে হচ্ছে। এটা
কোনওভাবেই মেনে নিতে পারে না বিশু। তাই ঠাট দেখাতে মাস্ক না পরেই বেরোয়
বাইরে। এ
নিয়ে চাপা ফিসফাস থেকে শেষে বিশুকে সতর্ক করে দিল পাড়ার লোকজন। কিন্তু
পাত্তাই দিল না বিশু। দু’একদিন পুলিশের ধমক খেয়েও শায়েস্তা হয়নি।
শেষমেশ একদিন যখন সবাই মিলে
কলার ধরে পাড়ার সেলুনে নিয়ে বসালো বিশুকে তার পর থেকে আজ বহুদিন হলো আর দেখিনি ‘ঠ্যাঁটা বিশু’কে।
Comments
Post a Comment