Skip to main content

উমা ও দুর্গার প্রেক্ষাপটে অত্যাধুনিক দুর্গোৎসব ও ঐতিহ্যের অবমাননা

 উমা ও দুর্গার প্রেক্ষাপটে অত্যাধুনিক দুর্গোৎসব ও ঐতিহ্যের অবমাননা

 

কেমন করে হরের ঘরে ছিলি উমা বল মা তাই
কত লোকে কতই বলে শুনে প্রাণে মরেই যাই
মার প্রাণে কি ধৈর্য ধরে জামাই নাকি ভিক্ষা করে
এবার নিতে এলে পরে বলব উমা ঘরে নাই।।
আবার দাশরথির পাঁচালিতে পাই -
গিরি গণেশ আমার শুভকারী।
পূজে গণপতি, পেলাম হৈমবতী
যাও হে গিরিরাজ, আন গিয়ে গৌরী।
বিল্ববৃক্ষমূলে পাতিয়ে বোধন
গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন।
 
এই গৌরী কিংবা শাক্তপদাবলীর উমা আমাদের ঘরের মেয়ে প্রতিবছর বাপের বাড়িতে  আসেন দুর্গা উমা হয়েই আসেন সাধারন বাঙালি বাড়ির অন্দরমহলে, জীবন যাত্রার অঙ্গ হয়ে মা সারদার মধ্যে স্বামী বিবেকানন্দ দেখেছিলেন এক দেবী শক্তিকে যাকে তিনি জ্যান্ত দুর্গা বলেছিলেন স্বামী বিবেকানন্দই বেলুড়মঠে দুর্গা পুজা শুরু করেছিলেন তিনি সমাজের নারীশক্তির আধারকে দেখেছিলেন মাটির দুর্গার অন্তরালে জ্যান্ত দুর্গা সারদা দেবীকে স্বামী শিবানন্দকে একটি চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন,"আমার চোখ খুলে যাচ্ছে দিন দিন সব বুঝতে পারছি আগে মা আর মায়ের মেয়েরা"
এই ঘরের মেয়ের আহ্লাদের আতিশয্যে আর নতুনত্বের নেশায় আজকাল অনেককেই সনাতন ধর্মীয় ঐতিহ্যের অপমানে মত্ত হয়ে উঠতে দেখা যায়। সস্তায় নাম কামানোর অছিলায় দেব দেবীর নরারোপত্বে কার থেকে কে বেশি আধুনিক তার প্রমাণে ব্যতিব্যস্ত নব্য অবতারবৃন্দ। তাই দেখা যায় প্রতি বছর পুজো এলেই দেবী দুর্গাকে নিজের মতো করে ‘আমার দুর্গা’ শিরোনামে মর্ত্যে নামিয়ে যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হয়ে ওঠেন কলমচিরা। নতুনত্বের এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। কার থেকে কে বেশি আধুনিক তারই প্রতিযোগিতা। মায়ের মূর্তি কিংবা ছবি আঁকিয়েরাও কম যান না এই খেলায়। শ্লীলতার সীমা কে কতটা টপকাতে পারেন ততই নাম কামানোর সুযোগ।
প্রথমেই শুরু হয় মেমে বা মীম দিয়ে। সানাজিক মাধ্যমেই প্রথম জানতে বা দেখতে পাওয়া যায় যে মা দুর্গা কৈলাশ থেকে সপরিবারে যাত্রা শুরু করেছেন। গণেশকে কোলে করে বাকি সন্তানদের নিয়ে পায়ে হেঁটে গ্রামগঞ্জ পেরিয়ে এবড়োখেবড়ো পথে চলছে তাঁদের যাত্রা। এ যাবৎ মেনে নেওয়া গেলেও এর পরে দেবদেবীগণকে বর্তমানের মোড়কে আধুনিকতার পরাকাষ্ঠায় দাঁড় করিয়ে দেওয়ার প্রবণতা নিঃসন্দেহে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সরস্বতীর মোবাইল নিয়ে নাচানাচি কিংবা কার্তিকের মাইক্রোফোন হাতে গান গাওয়ার মতো দৃশ্যসম্বলিত মেমে কোনও অবস্থায়ই ঘরের মেয়ে উমার সঙ্গের নৈকট্যের সূত্রে অকপট ভাবনা বলে মেনে নেওয়া যায় না। জাগতিক নৈকট্যের সূত্রে ধর্মীয় গরিমা তথা ঐতিহ্যের অপমান উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছাড়া আর কিছু হতেই পারে না। অপমান একাধারে ধর্মীয় পরম্পরা এবং নারীসত্ত্বার।
অথচ নারী মানে দুর্গা। দুর্গা মানে নারী। নারীর অসীম শক্তির প্রতীক মা দুর্গা। সংসারী এক নারীর প্রতিচ্ছবি মা দুর্গা। অথচ আজকের অত্যাধুনিক মানসিকতার যুগেও এই নারীকে সইতে হয় কত অবমাননা কত অত্যাচার। কী অদ্ভুত দ্বিচারিতা আমাদের। দুর্গাকে দুই রূপে দেখি আমরা। বাঙালীর কাছে দুর্গা দেবী নন, তিনি ঘরের মেয়ে উমা। চারদিনের দুর্গাপুজোয় আমাপর বাঙালী শুধুমাত্র শক্তির অধিষ্ঠাত্রী দেবী দুর্গার আরাধনা করতেই মেতে ওঠে না, ঘরের মেয়ের চারদিন রাজকীয়ভাবে আদরযত্নটাই মুখ্য হয়ে ওঠে এখানে। আবার বিজয়া দশমীর দিনে বেজে ওঠে বিষাদের সুর। ফলে এখানে কন্যার বাপের বাড়ি আসা ও শ্বশুরবাড়ি ফিরে যাওয়াটই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দুর্গাপুজোর চারদিন পুজোর রীতিনীতি, আচার অনুষ্ঠান পর্যালোচনা করলেই বোঝা যায়, মূল ব্যাপারটি বা এর অন্তরালের কাহিনি।
ষষ্ঠীর দিন বোধন, সন্ধ্যায় হয় আমন্ত্রণ অধিবাস। এরপর সপ্তমীর দিনটাকেই মূলত প্রথমদিনের পুজো বলে ধরা হয়। মার্কণ্ডেয়চণ্ডীতে বর্ণিত কাহিনি অনুসারে, মহিষাসুরের প্রবল বিক্রমে দেবতারা স্বর্গ থেকে লাঞ্ছিত ও অত্যাচারিত হয়ে সেখান থেকে বিতাড়িত হন। পুরো ঘটনা তাঁরা জানান দেবাদিদেব মহাদেব, বিষ্ণু এবং সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে। তবে ব্রহ্মার বরে যেহেতু রম্ভাসুরের পুত্র মহিষাসুর সকল পুরুষের অবধ্য, সেই কারণে, দেবতারা মহাকালীরূপী মহাশক্তির অধিষ্ঠাত্রীদেবীকে স্মরণ করেন।
মহাসপ্তমীর সকালে দশভুজা, মহাতেজরূপীণী এক মহাদেবী কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে আবির্ভুতা হন। দেবীকে ঋষি কাত্যায়ন কন্যারূপে আমন্ত্রণ করেন, সেই কারণেই, দুর্গাপুজোর সঙ্গে কন্যার বাপের বাড়ি আসার বিষয়টি জড়িত। সেদিন দেবীকে নানা অলঙ্কারে সজ্জিত করা হয়।  অষ্টমীর দিন দেবীকে অস্ত্র প্রদান করে রণসাজে সজ্জিত করেন দেবতারা। সেই কারণে, এই দিনটিতে অস্ত্রের পুজো, বীরাষ্টমী ব্রত পালন, লাঠিখেলা ইত্যাদি হয়। সন্ধিক্ষণে অর্থাৎ অষ্টমী-নবমীর সন্ধিকালে মহিষাসুরের ও তাঁর সৈন্যদের সঙ্গে দেবীদুর্গার প্রবল লড়াই শুরু হয়। নবমীর দিন দেবী দুর্গার জয় কামনায় যজ্ঞ করেন দেবতারা। সেই কারণে দুর্গাপুজোয় নবমীতে যজ্ঞের বিধান। দশমীর সকালে মহিষাসুরকে বধ করেন দেবী দুর্গা, অর্থাৎ দেবী দুর্গা বিজয়ী হন। পরাজিত হয় অশুভ শক্তি।
দেবী দুর্গার বিজয় সংবাদে উৎসবে মেতে ওঠেন দেবতারা। একে অপরকে আলিঙ্গন করেন। সেই থেকেই দশমীতে শুভ বিজয়ার আলিঙ্গন, শুভেচ্ছা জানানোর রীতি। আবারও দুর্বৃত্তের অত্যাচার থেকে উদ্ধারে ফিরে আসার বর দিয়ে দেবী চলে যান। মন খারাপ হয়ে যায় ঋষি ক্যাতায়নের। সেই কারণে এদিনটি কন্যাবিদায়ের সঙ্গে যুক্ত।
দেবী দুর্গা শাশ্বত, তাঁর আবাহন হয়, বিসর্জন হয় না। ভক্তরা সাধ্যমত চারদিন দেবীদুর্গার আরাধনা করে আবারও তাঁকে ভক্তিরসে ডুবিয়ে রাখেন, এরই নাম বিজয়া বা বিসর্জন। আবারও একটি বছরের প্রতীক্ষার মধ্য দিয়ে এবারের মতো দুর্গোৎসবের সমাপ্তি।
করজোড়ে মা দুর্গার কাছে ভক্তদের আবেদন - স্ববৎসরঃ ব্যাতিতে তু পুনরাগমনায়চ।
তাই দেখা যায় এক দিকে দেবী দুর্গা একরূপে ঘরের মেয়ে উমা যার জীবন সাদামাটা। অন্যদিকে অসুরবিনাশকারী অসীমশক্তিধারিনী, দশপ্রহরণধারিণী মহামায়া। কিন্তু প্রতিনিয়ত অসুরদলনী অবমাননার শিকার। এ কীসের ইঙ্গিত ? উমা ও দুর্গা, শান্তি ও শক্তির সহাবস্থান । একই সঙ্গে গৃহকন্যা তথা দশভুজা সর্বংসহা। শুভ  আর কল্যাণের প্রতিই তার আকর্ষণ। আর অশুভের প্রতি রণচণ্ডী মূর্তি। অসুরের মতো পুরুষেরা তাকে সহ্য করতে পারেন না। পুরুষতান্ত্রিক মানস ও সমাজ কাঠামোয় আজ বার বার নারীকে অবমাননা ও নির্যাতন সইতে হচ্ছে। প্রশ্ন জাগে - মাটির দুর্গাকে নিয়ে যত উন্মাদনা জ্যান্ত দুর্গা কে নিয়ে ততই অবমাননা কেন ? আসলে নিজেদের পূর্বপুরুষ তথা মাতৃভূমির শাশ্বত ঐতিহ্যের ক্রমাগত অবমাননাই এই অধঃপতনের মূল কারণ। নীতিহীন মানসিকতা, স্বার্থসর্বস্ব চিন্তাধারা ইত্যাদির বশে মোহময় জাগতিক ভ্রান্ত শিক্ষা ও তার অনুসরণেই আমাদের মানসিক ও সামাজিক ভিতটা দিন দিন অবক্ষয়ের দিশায় আগুয়ান। এই তমসাচ্ছন্ন মানসিকতার নির্মূলই হোক মহাশক্তি, মহামায়ার কাছে আজকের প্রার্থনা।

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...