"জীবন ধারা" - শব্দবন্ধটি আমার খুব প্রিয়।
একটি জীবনের আদ্যন্ত পাঠ শুধুমাত্র 'মুসকিল'ই নয়, 'না-মুমকিন'ও। তবে একটি কথা হলফ করে বলতে পারি যে অন্য সবারই
মতো আমিও আমার জীবনের সবচাইতে সেরা - সোনালি অধ্যায়টা পেরিয়েছি আমার একমাত্র
সন্তানটির শৈশব ও কৈশোরকে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেই।
'স্ত্রীয়াশ্চরিত্রং দেবা ন জানন্তি'। শিশু থেকে বালিকা, কিশোরী হয়ে আজ মেয়েটি আমার যুবতী হওয়ার পথে। ধীরে ধীরে 'জীবন ধারা'য়
স্নাত হতে হতে এখন স্নাতক স্তরের ছাত্রী। বুদ্ধির সাথে সাথে বোধেরও ঘটে চলেছে
বিকাশ।
'কোমল হাতের চাপড়ি' আর 'পষ্ট
ভাষার দাবড়ি'
পেরিয়ে এখন স্বভাবতই তৈরি হচ্ছে ওর
নিজস্ব মনোজগৎ।
চৌষট্টি রকম কলার অস্তিত্ব থাকলেও
সংগীতকলাতেই ওর যা কিছু ঝোঁক। আর আছে কিছু 'ছলাকলা'। সেই 'স্ত্রীয়াশ্চরিত্রং' এর অঙ্গ হিসেবেই হয়তো। এই ছলাকলার অধিকাংশই আবার
পরীক্ষিত হয় এই ভাবকল্পক বাবাটিরই উপর। আজও আমরা দুজনের মধ্যে চলে আসছে সেই একই
নকল ছলাকলার সরল খেলা। আর কখনো এরই মাঝে অবাক বিস্ময়ে উপভোগ করি আমার এই 'কলাবতী' কন্যার
বয়সানুপাতিক বিকশিত চিন্তাধারা।
****
তিনসুকিয়ার কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে যখন
দ্বিতীয় শ্রেণিতে এসে ভর্তি হয়েছিল তখন সামনের পাটির দুটো দাঁত ছিল না। কিন্তু
সেই বয়সে তো আর সে ভ্রুক্ষেপ থাকার কথাও নয়।
সেই তখন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত একই
বিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সুবাদে বিদ্যালয়টির প্রতি কী পরিমাণ আন্তরিকতার সৃষ্টি
হয়েছে ওর অন্তরে সেটি দেখতে পেলাম সেদিন ওর চোখে, ওর কার্যকলাপে। দীর্ঘ দিন পর তিনসুকিয়া ভ্রমণের ফাঁকে হন্তদন্ত হয়ে
গিয়ে হাজির হয়েছে বিদ্যালয়ে। সঙ্গে অবশ্যই সবচাইতে নিরাপদ 'দেহরক্ষী' এই
বাবাটি। বিদ্যালয়ের প্রতিটি কোণে কোণে উঁকি মেরেছে স্মৃতি ভারাক্রান্ত হৃদয়ে।
পাগলের মতো গিয়ে বসেছে অধ্যয়নকালীন শ্রেণিকক্ষগুলিতে। আর আমার উপর বর্ষিত হয়েছে
সেই 'পষ্ট ভাষার দাবড়ি' - "বাবা, ফটো
ওঠাও"।
আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়েছিলাম আমার
হৃদয়ের একান্ত কাছের - আমারই আত্মজার বেড়ে ওঠার দিকে।
ফটো ওঠানোর ফাঁকে ফাঁকে ওর নজর এড়িয়ে
বার কয়েক যে মুছতে হয়েছে চোখের কোণ - সে কথাটি কি আর বলা যায় সেদিনের আমার 'কোমল হাতের চাপড়ি' দেওয়া - আজকের 'কলাবতী' মেয়েটিকে
?
এ তো বড়ো রঙ্গ, জাদু,
এ তো বড়ো রঙ্গ
চার মিঠে দেখাতে পার
যাব তোমার সঙ্গ।
বরফি মিঠে, জিলাবি মিঠে,
মিঠে শোন-পাপড়ি
তাহার অধিক মিঠে, কন্যা,
কোমল হাতের চাপড়ি।
এ তো বড়ো রঙ্গ, জাদু,
এ তো বড়ো রঙ্গ
চার সাদা দেখাতে পার
যাব তোমার সঙ্গ।
ক্ষীর সাদা, নবনী সাদা,
সাদা মালাই রাবড়ি
তাহার অধিক সাদা তোমার
পষ্ট ভাষার দাবড়ি।

Comments
Post a Comment