এবার পুজোয় - নতুন ‘ভাবনা’
আমি হলফ করে বলতে পারি বাঙালির
পুজো মানে শতকরা পাঁচ ভাগ পুজো, বাকি পুরোটাই আমোদ আহ্লাদ। অনেকেই খেপে যাবেন নির্ঘাত। কিন্তু
আমি নিরুপায়। বছরের
পর বছর ধরে যা দেখে আসছি
- পুজো এলেই নতুন কাপড়, নতুন জুতো, নতুন প্রসাধনে সজ্জিত হয়ে শুধুই ঘোরাঘুরির পরিকল্পনা। কোথায়
যাবো, কী খাবো, কী পান করবো ? প্যাণ্ডেলের
বাহার দেখবো, আলোর রোশনাই দেখবো, মূর্তির
উচ্চতা দেখবো, পথচলতি জনতার সাজগোজ দেখবো। গভীর
রাতে বাড়ি ফিরে দুপুর অবধি ঘুমবো আর সন্ধে হতেই আবার নতুনের নেশায় মাতবো। এই
হলো অধিকাংশ বাঙালির পুজো দেখা। তনসাচ্ছন্ন বাঙালির তামসিক পুজো। আবার
এরই মাঝে স্বার্থলাভের উদ্দেশে একদিন সকালে সাত্ত্বিক সেজে মা’কে পুস্পাঞ্জলি প্রদান। অর্থাৎ
রথ দেখার চাইতে কলা বেঁচতেই বেশি আগ্রহ। পুজো মানেই রাজসিক উদযাপন। বিত্তের
বেহিসেবি প্রদর্শন ও অপচয়।
অথচ এই উন্মাদনার রূপায়ণে
যাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম তাঁদের কথা ক’জন ভাবি আমরা ? নিম্ন
মধ্যবিত্ত ঘরের একমাত্র উপার্জনশীল মানুষটি বলতে গেলে সারা বছর ধরেই এই দিনগুলোর জন্য
শঙ্কিত হয়ে থাকেন। নিজের মনের সাধ আহ্লাদকে পাথরচাপা দিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে
হাসি ফোটানোর চিন্তায় চিন্তিত থাকেন বছরভর। তার মধ্যে এখন কিছু বিত্তশীল মানুষের
সীমাহীন বিত্তপ্রদর্শনের চাপে এরা হয়ে পড়েছেন আরোও কোণঠাসা। পরিবারের বাইরেও আত্মীয় স্বজন, ছোট বাচ্চারা,
বৃদ্ধ বৃদ্ধারা, আত্মীয়স্য আত্মীয় - এঁদের সবার জন্যও এখন পুজোর কাপড় কিংবা তার সমমূল্যের টাকাপয়সা পাঠাতে হয় চক্ষুলজ্জার
ভয়ে, সামাজিকতা রক্ষায়। অথচ দেখা যায় যাদের জন্য ভালোবাসার
এইসব উপহার পাঠানো হচ্ছে তাদের নিজের কিন্তু ঢের আছে। অর্থাৎ কিনা তেলা মাথায় তেল দেওয়া
হচ্ছে। মোদ্দা
কথায় অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে সমাজের পরতে পরতে রুক্ষ সূক্ষ এবড়োখেবড়ো চুলসম্বলিত
মাথার কিন্তু অভাব নেই - ছিন্ন বস্ত্রের বাইরে যাদের বস্ত্র নেই।
পুজোর কাপড়ের এই আদান প্রদান
খেলায় কিন্তু রিটার্ণ গিফট হিসেবে নিজেদেরও প্রয়োজনের অতিরিক্ত পোশাক পরিচ্ছদ হয়ে যায়। পুরো
সিস্টেমটাই একটা অপচয়,
একটা আর্থিক অনাচার, অত্যাচার। যুক্তি
দিয়ে বিচার করলে ব্যাপারটা এরকম হয়ে দাঁড়ায় - আমার পকেটের ক্ষমতার চাইতে বেশি খরচাপাতি
করে নিজের জন্য অনাবশ্যক কাপড়চোপড় কিনছি। যা নিতান্তই অলীক এবং নির্বোধের মতো
কাজ। অনেকেই
বলে থাকেন বছরে তো এই একবারই। নিজেরও তো ইচ্ছে যায় নিজের মানুষদের
কিছু উপহার দেই। হ্যাঁ, সত্যিই তো। কিন্তু
এই ইচ্ছেটা শুধু তাঁদেরই আছে যাঁদের ট্যাঁকের জোর আছে। এবং এঁরা এই ইচ্ছেটাকে সমাজে চাপিয়ে
দিয়ে গরিব আর মধ্যবিত্তের পকেটের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছেন বলেই ভাবি। এই
অতি উৎসাহী বিত্ত প্রদর্শনের ব্যাপারটা কিন্তু বেশিদিন পুরোনো নয়। একটা
রোগের মতো ছড়িয়ে পড়ছে দিন দিন। বিয়ের ব্যাপারে যেমন হচ্ছে আজকাল। লোক
দেখানোর জন্য অপচয়ের হিড়িক। এটা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত অভিমত।
এবার তো পৃথিবী অসুস্থ। মা
আসবেন এরই মাঝে। অন্তত
আমাদের মননে। এবার
কিন্তু উল্লাস, আলোড়ন সব নিষিদ্ধ। কিন্তু আমি জানি পঙ্গপাল বাঙালিকে
পুজোর উন্মাদনা থেকে দমিয়ে রাখতে ভাইরাসও অপারগ। তবে একটা কথা মনে রাখতে হবে - এবার কাউকে পুজোর
কাপড় দেওয়া মানে তাকে বাইরে বেরোনোর জন্য উসকে দেওয়া। এর পর রোগাক্রান্ত হলে দায়ী থাকবেন
তো সেই অতি উৎসাহী উপহার দাতা ? কোনও কোনও পকেটভারী সজ্জন তাহলে কাপড় না দিয়ে সেই তেলা
মাথায় তেলের ফর্মূলায় কাপড়ের মূল্য পাঠাবেন। বিত্তের অপচয়ের খেলায় অপারগকে মানসিক
নির্যাতন করবেন।
বাঙালি কিন্তু আরেকটি ব্যাপারেও
বিখ্যাত। সেটি
হচ্ছে বুদ্ধিমত্তা। তাই
তো এবারের ব্যতিক্রমী পুজোয় বাইরের ঘোরাঘুরির বিরোধিতা করছেন অনেকেই। এটা
তো সত্যিই যে বছরের পর বছর ধরে ওই থোড় বড়ি খাড়া, খাড়া বড়ি থোড়ের মতো তামসিক পুজোয় মত্ত
হয়ে আমরা সাত্ত্বিকতা প্রায় ভুলেই বসেছি। এবার তারই প্রায়শ্চিত্তের আয়োজন। কিছু
সংখ্যক বাঙালি আবার বুদ্ধিমত্তার অপচয়েও চৌকশ। উল্টো বুঝলি রাম-এর ফর্মূলায় সব কিছুতেই
রাজনীতি আর প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা। তাই এবার পুজোয় সরকারি নিষেধাজ্ঞার
বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন কিছু সংখ্যক অতি বুদ্ধিমান সজ্জন। এরা কারা সেটা আর আলাদা করে বলে দেওয়ার
প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। জনগন খুব ভালো করেই চিনে নিয়েছেন এদের। অথচ
দেখুন গত সাত মাসে মুসলমান ধর্মাবলম্বীরা কত সুশৃঙ্খল ভাবে সরকারি নির্দেশাবলি মেনে
তাঁদের শ্রেষ্ঠ পর্ব ঈদ উদযাপন থেকে বিরত থেকেছেন। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় বিহুর উদযাপন
পর্বের প্রস্তুতি শুরু হয় অনেক আগে থেকেই। গোটা উপত্যকা জুড়ে গ্রাম শহর নির্বিশেষে
নাচে, গানে, বিহু উদযাপিত হয়ে থাকে সার্বিক উন্মাদনায়। অথচ
সরকারের নির্দেশনামায় সম্পূর্ণ সহযোগিতা করে বিহুর উদযাপন থেকে দূরে থেকেছেন সবাই। সব
বয়সের কলাকুশলীবৃন্দ যাবতীয় প্রস্তুতি, যাবতীয় আনন্দ থেকে নিঃশব্দে বিরত থেকেছেন। আর
এইসব অতি চালাক বাঙালিরা আপামর উদযাপনপ্রিয় বাঙালিকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রচারটা
এমন যে জনবিরোধী বা বাঙালিবিরোধী সরকার ইচ্ছে করেই পুজোর আনন্দ থেকে বাঙালিদের বঞ্চিত
করছে। কেউ
কেউ তো বলেই দিয়েছেন
- আমরা মানবো না সরকারি নির্দেশ। এতটুকু সাহসী বক্তব্যের পরেও আবার
সুযোগ পেলেই বলবেন -
সরকার আমাদের বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে। আমাদের
তো মুখ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। দ্বিচারিতা আর কাকে বলে। সরকারি
সিদ্ধান্ত না মানলে এদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। রাত দশটা পর্যন্ত চলাফেরা করার অনুমতি
দিয়ে এই সরকার বাঙালিদের একটু বেশিই ছাড় দিয়েছে বলে ভাবি। রাত সাতটার পরই কার্ফু লাগু করা উচিত
ছিল। প্রাণে
বাঁচলে পুজোর হৈচৈ থাকবে কিন্তু দেশের অগণিত ডাক্তার থেকে শুরু করে লাখের ঘরে
মৃত্যুও আমাদের হুজুগ আর বিষবাস্প ছড়ানোর মানসিকতাকে টলাতে পারে না - এ কেমন
বাঙালি মানসিকতা ?
মোদ্দা কথা এই যে এবার যদি
বাঙালি পুজোর হৈ হুল্লোড়ে মাত্রা ছাড়ায় তাহলে বলতে হবে বাঙালির বুদ্ধিমত্তায় ঘুণ ধরেছে। সমাজের
অন্যান্য ধর্ম তথা ভাষাভাষীদের কাছে এক ঘৃণার পাত্র হয়েই থাকতে হবে। প্রকাশ্যে
কটু কথা শোনার দায় নেবেন তো সেইসব সামাজিক পণ্ডিতরা ?
Comments
Post a Comment