Skip to main content

পাঠশালা

পাঠশালা



কাল সন্ধ্যায় বরকে সঙ্গে নিয়ে (নববিবাহিত নয়) আমার ঘরে এল ছোট বোন একটি বোন আমার অনেক ছোট হলেও ছোট্টটি আর নেই এখন তার দুই সন্তান বড়টি স্নাতক চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা দিচ্ছে অর্থাৎ ওর মেয়ে আমার একমাত্র সন্তানটির চাইতে বছর দুয়েক এর বড়

*****
বোনের নাম শান্তা শান্তা নাথ সম্পর্কের সূত্রে গ্রথিত না হলেও যেহেতু আমার নিজের কোনও ছোট বোন নেই তাই এই সম্পর্কের কাউকে কাছে পেলেই আমি ভীষণ রকমের ভাবুক কল্পক হয়ে উঠি
সত্যি বলতে দীর্ঘদিনের অনুপস্থিতিতে শান্তাদের কথা আমার মনেই ছিল না ফেসবুকের কল্যাণে আর অনেকখানি বন্ধু কৌশিকের বদান্যতায় শান্তা ওরা তিন বোন আমার খোঁজ পায় এবং ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ গড়ে তোলে
এরপর আর দেরি না করে কাল সটান একেবারে ঘরে এসে হাজির দীর্ঘ ক্ষণ গল্প গুজব অতীত স্মৃতি চারণের মধ্য দিয়ে আমি যেন ফিরে পেয়ে গেছিলাম আমার হারানো বালক বেলাকে
*****
তখন আমি পাঠশালা (প্রাথমিক বিদ্যালয়)-তে পড়তাম সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন আমাদেরই পাশের বাড়ির নিয়মিত তাঁরই সঙ্গে বিদ্যালয়ের পথ মাড়াতাম আজও মনে পড়ে তাঁর এক হাতে ধরা থাকত আমার একটি হাত আর আরেক হাতে থাকত ছাতা - পুরো রাস্তাই যে ছাতার ছায়া থেকে কখনও আমাকে আড়াল হতে দিতেন না সেই আমার প্রথম পরম পূজনীয় মাতৃসম শিক্ষা গুরু যাঁকে জ্যেঠিমা বলে ডাকতাম শিক্ষা দানের বাইরেও আমাদের বেঁচে থাকার পিছনে জ্যেঠিমার অবদান ছিল অপরিসীম সে কথা পাঠান্তরে উল্লেখ করব
*****
শান্তাদের বাড়ি ছিল আমার সেই বিদ্যালয়ের একেবারে মুখোমুখি একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ার সূত্রে অবাধ যাতায়াত ছিল সবার বাড়িতে শহরাঞ্চলে সময় আন্তরিকতা - এই দুটোর খুবই অভাব থাকলেও গ্রামাঞ্চলে সাধারণত এর উল্টোটাই চোখে পড়ে আমাদের বালক কিংবা কৈশোর বেলায় গ্রামময় ঘুরে বেড়াতাম নিজের ইচ্ছে - খুশি মতো যার বাড়িতে ইচ্ছে হতো - সোজা চলে যেতাম সারা ঘরে অবাধ বিচরণ কেউ চোখ কোঁচকাত না সবাই সবার আপন মাসি, মেসো, কাকা, কাকি, দাদা, দিদি বলে ডাকতাম অবাধে আদর যত্নে নিজের আর পরের ঘরের সন্তানদের মধ্যে ভেদভাব ছিল না কারোও মনে চিত্রটা কম বেশি বজায় আছে আজও
*****
মেয়ে মানুষের স্মৃতিশক্তি ভীষণ প্রখর তাই আমার স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেলেও শান্তাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাইনি আমি খবর পেয়েই তাই ছুটে এসেছে চূড়ান্ত রকমের আন্তরিক স্বামীটিকে সঙ্গে নিয়ে আমার ভেতরের আনন্দকে চেপে রাখতে পারছিলাম না কিছুতেই অনর্গল কথার ফাঁকে বারবারই হারিয়ে যাচ্ছিলাম সেই সব বিন্দাস দিনগুলোতে
মনে পড়ে গেল সেই আমার প্রথম বিদ্যায়তনিক বন্ধুগুলোর কথা সামনে পেছনে দু'টো বেঞ্চে বসতাম আমি, তাপু, রঞ্জন (নাথ), ইসলাম (উদ্দিন), মালা (চক্রবর্তী), বুলবুল (নাথ), মিনতি (নাথ) - আমরা এই সাত জন
পড়াশোনার অকাল সমাপ্তি ঘটিয়ে ইসলাম গ্রামেরই পাশে শহরতলীতে রিকশা চালাত পরবর্তীতে যতবার সেখানে গেছি - এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরত আর সবাইকে বলত - দেখো, আমি ওর সহপাঠী বন্ধু ছিলাম হয়তো এভাবেই সে তার অতৃপ্ত বাসনার ঘায়ে সান্ত্বনার প্রলেপ মেখে মানসিক তৃপ্তি আদায় করে নিত তাপু আর রঞ্জনের পাশাপাশি তিনটি মেয়ে বন্ধুই হারিয়ে গেছিল কোথায় জানতাম না কিন্তু মনের গভীরে স্থায়ী ভাবেই ছিল এবং আছে ওরা - সেই নিষ্পাপ, অকপট দিনগুলো থেকে আজ অবধি অবসর মুহূর্তে পেছন ফিরে তাকালেই ওদের চেহারাগুলো স্পষ্ট ভেসে উঠত চোখের সামনে
*****
শান্তার আগমন সূত্রে প্রায় সবক'টি বন্ধুরই হদিশ পেয়ে গেলাম এক বিরাট প্রাপ্তি কথায় কথায় মনে হচ্ছিল যেন বসে আছি আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী পূর্বের আমার প্রথম বিদ্যামন্দিরের সেই বিশেষ কক্ষটিতে - যেখানে বসে জীবনে প্রথম বারের মতো লিখতে শিখেছিলাম কালির কলম দিয়ে, (আজও স্পষ্ট মনে আছে - আমার, রঞ্জনের, তাপুর আর ইসলামের - সবার শার্টেরই পকেট থাকত সেই কলমের কালিতে অতিশয় রঞ্জিত), যে কক্ষটিতে বসে নিয়েছিলাম জীবনের প্রথম পাঠ, যে কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে গেয়েছিলাম হিসেবি নামতার সুর
*****
কাল এক বেহিসেবি বেলায় সব কিছু ফিরিয়ে দিল বোন শান্তার চকিত আগমন আমি নিশ্চিত - শান্তার এই ঝটিতি আগমনের পিছনে সম পরিমাণ উদ্যোগ ছিল তার স্বামী দেবতাটির নিরঞ্জন - এর মতো প্রাণখোলা উদ্যমী পুরুষের আজকাল বড়ই অভাব 
অনেক ধন্যবাদ শান্তা দীর্ঘতর হোক তোমাদের সুখী বিবাহিত জীবন

Comments

Popular posts from this blog

গুয়াহাটিতে বিদ্বৎসমাজের দেশ, ধর্ম ও সমাজ ভাবনা বিষয়ক আলোচনা সভা

সম্প্রতি গত ৫ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও প্রাবন্ধিক খগেনচন্দ্র দাসের আহ্বানে গুয়াহাটি, লালগণেশ অঞ্চলের শান্তিনগরে অবস্থিত পূর্বাশা বিদ্যানিকেতনে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় মিলিত হয়েছিলেন মহানগরের বিদ্বৎসমাজের একাধিক ব্যক্তি। আলোচনার বিষয় ছিল ‘বর্তমান সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মের অবস্থান ও প্রয়োজনীয়তা’। সভায় সাহিত্য, সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে জড়িত বহু ব্যক্তির বাইরেও উপস্থিত ছিলেন সুশীল সমাজের একাধিক গুণীজন। এদিন এই সান্ধ্যসভায় আহ্বায়কের বাইরে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন তাঁরা হলেন - বিজয় ভূষণ দে, সিদ্ধার্থ কুমার দত্ত, মনতোষ চন্দ্র দাস, নির্মল চন্দ্র দাস, পীযূষ দেব, শংকর পণ্ডিত, অসিত কুমার সরকার, শাশ্বতী চৌধুরী, ঋতা চন্দ, সুচরিতা সান্যাল, রবিশংকর দত্ত, তাপসী চৌধুরী, বিদ্যুৎ চক্রবর্তী, মধুমিতা দত্ত, মীনাক্ষী চক্রবর্তী, রুদ্রাণী দত্ত, বীণা রায়, মুক্তা সরকার, অনুরাধা দাস পাত্র, জয়া নাথ ও স্বর্ণালি চৌধুরী।     মূল প্রসঙ্গের ধারাবাহিক আলোচনায় উঠে এসেছে একাধিক প্রসঙ্গ - আজকের দিনে ঋষি অরবিন্দের ভাবনার প্রয়োজনীয়তা, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মানবিক দিক, হিন্দু সমাজে গুরুবাদ ও বিভেদ, ডিপস্টেটে...

প্রতিবাদী শরৎ

এ কেমন শরৎ এল এবার ? বর্ষা শেষের পক্ষকাল আগে থেকে চারপাশ জুড়ে যে অস্থিরতার সূত্রপাত তা এসে নতুন করে প্রকাশিত হল শরতের সূচনায় । বাংলাদেশের পর পশ্চিমবঙ্গে । এমন শরৎ আগে দেখিনি কখনও । আমরা হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষদের জন্য শরতের এক অন্যরকম মাহাত্ম্য । পেঁজা তুলোর মেঘের ফাঁকে ফাঁকে একদিকে যেমন রংবেরং - এর ঘুড়ি ওড়ে আকাশে অন্যদিকে তেমনই শিশিরসিক্ত সকালের ঘাসবনে লুটিয়ে পড়ে রাতের বৃন্তচ্যুত শিউলি মা দুর্গার চরণপথে । দিকে দিকে এক গন্ধমাতন আলোড়ন । নদীচরে , পাহাড়ের ঢালে গুচ্ছ কাশের দোলায় দোলে ওঠে অঙ্গ । কাশের বনে খেলে বেড়ায় নব্যদুর্গারা।   আলোড়ন মনাকাশ জুড়েও । মাতন মনন জুড়েও । দোলন আবালবৃদ্ধের অঙ্গে অঙ্গে । আকাশে বাতাসে কান পাতলে , চোখ রাখলেই মাতৃমুখ - মননসুখ । মা আসছেন । দুর্গতিনাশিনী মা । বরাভয় হাতে তিনি ঘুচিয়ে দেবেন যত দুঃখশোক । অসুরশূন্য হবে এ পৃথিবী । প্রতিবারই এভাবে শরৎ আসে পৃথিবীর বুকে , প্রতিবারই আমরা এমনই ভাবনায় ডুবে থেকে এমনই কল্পনায় করি দিনাতিপাত । অথচ চোখের সামন...

নিবেদিত সাহিত্যচর্চার গর্বিত পুনরাবলোকন - ‘নির্বাচিত ঋতুপর্ণ’

সাধারণ অর্থে বা বলা যায় প্রচলিত অর্থে একটি সম্পাদনা গ্রন্থের মানে হচ্ছে মূলত অপ্রকাশিত লেখা একত্রিত করে তার ভুল শুদ্ধ বিচার করে প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সম্পাদনার পর গ্রন্থিত করা । যেমনটি করা হয় পত্রপত্রিকার ক্ষেত্রে । অপরদিকে সংকলন গ্রন্থের অর্থ হচ্ছে শুধুই ইতিপূর্বে প্রকাশিত লেখাসমূহ এক বা একাধিক পরিসর থেকে এনে হুবহু ( শুধুমাত্র বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে ন্যূনতম সংশোধনসাপেক্ষে ) একত্রীকরণ । সেই হিসেবে আলোচ্য গ্রন্থটি হয়তো সম্পাদনা গ্রন্থ নয় , একটি সংকলন গ্রন্থ । বিস্তারিত জানতে হলে যেতে হবে সম্পাদক ( সংকলক ) সত্যজিৎ নাথের বিস্তৃত ভূমিকায় । পুরো ভূমিকাটিই যদি লেখা যেতো তাহলে যথাযথ হতো যদিও পরিসর সে সায় দেয় না বলেই অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো এখানে - ‘ সালটা ১৯৯০ । ‘ দৈনিক সোনার কাছাড় ’- এ একবছর হল আসা - যাওয়া করছি । চাকরির বয়স হয়নি তাই চাকরি নয় , এই ‘ আসা - যাওয়া ’ । …. হঠাৎ করেই একদিন ভূত চাপল মাথায় - পত্রিকা বের করব । ‘… সেই শুরু । অক্টোবর ১৯৯০ সালে শারদ সংখ্যা দিয়ে পথচলা শুরু হল ‘ঋতুপর্ণ’র। পরপর দুমাস বের করার পর সেটা হয়ে গেল ত্রৈমাসিক। পুরো পাঁচশো কপি ছাপাতাম ‘মৈত্রী প্রকাশনী’ থেকে।...