‘সুচেতনা’ - একটি ব্যতিক্রমী ছোট পত্রিকা
লিটল ম্যাগাজিন বা ছোট পত্রিকা একটি
আন্দোলনের নাম। এখানে ‘আন্দোলন’ শব্দটির ব্যাপ্তি বহুমুখী। ভাষা ও সাহিত্যের নবিশ থেকে কেউকেটা - আপামর পূজারির স্বতঃস্ফূর্ত
যোগদানে ছোট পত্রিকার যাত্রাপথ যেমন এক অর্থে এক আন্দোলন তেমনি ছোট পত্রিকাকে বাঁচিয়ে
রাখা তথা এর ভরণ পোষণে সংশ্লিষ্ট সাহিত্যানুরাগী ও সম্পাদকবৃন্দের আত্মনিয়োগও এক আন্দোলন। এই
আন্দোলনের ফলে জন্ম নেওয়া অগুনতি ছোট পত্রিকার মধ্যে কিছু পত্রিকা সত্যিকার অর্থেই
ভাস্বর হয়ে ওঠে আপন মহিমায়। পাঠক মহলে সমাদৃত হয় বিস্তর। এই ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠার
পেছনেও থাকে একাধিক কারণ। সেটি তোলা থাক প্রসঙ্গান্তরে আলোচনার জন্য।
সাহিত্যের ভুবন বিন্যাসে অনাগ্রহী
হয়েও এ কথা আজ অনায়াসেই বলাই যায় যে সাহিত্যের তৃতীয় ভুবনও আজ আর বিশেষ পিছিয়ে নেই
কোনও অংশে। এক একটি সমৃদ্ধ ছোট পত্রিকা তারই এক উৎকৃষ্ট নিদর্শন। বরাক উপত্যকার
শিলচর শহর থেকে ডিসেম্বর ২০১৬তে প্রকাশিত হয়েছিল ‘সুচেতনা’ সাহিত্য পত্রিকার
চতুর্থ সংখ্যা। এর পরে আর কোনও সংখ্যা বেরোয়নি। এখন ২০২০ পঞ্চম সংখ্যা প্রকাশিত
হওয়ার অপেক্ষায়। সেই অর্থে চতুর্থ সংখ্যার আলোচনা আজও প্রাসঙ্গিক।
‘কিছু কথা’ শিরোনামে সম্পাদকীয়তে
প্রথমেই বিভিন্ন কারণের উল্লেখ করে অনিয়মিত প্রকাশনার দায় স্বীকার করে নিয়েছেন
বিশিষ্ট কবি তথা একাধিক বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পাদক সুশান্ত ভট্টাচার্য। শ্রীনগরের
প্রসিদ্ধ ডাল লেকের সুশোভন সূর্যোদয়ের ছবিযুক্ত প্রচ্ছদে প্রথম অবলোকনেই সুস্পষ্ট
চেতনার উদ্রেক জাগিয়েছেন সম্পাদক নিজে। যদিও ‘সুচেতনা’র এই সংখ্যায় রয়েছে একগুচ্ছ
গল্প, কবিতা তথা একটি করে রম্য রচনা ও ভ্রমণ কাহিনি কিন্তু প্রবন্ধ রয়েছে সাকুল্যে
একটি। সম্পাদকের নিজের লিখা “রবীন্দ্রনাথ ও গদ্য কবিতা - পুনশ্চ কাব্যগ্রন্থের
একটি আলোচনা”। অথচ আশ্চর্যজনক ভাবে তথ্যবহুল সম্পাদকীয় এবং এই একটি প্রবন্ধই
সম্পূর্ণ পত্রিকাটিকে নিয়ে গেছে এক অলঙ্ঘ্যনীয় উচ্চতায়। মোট বারো পৃষ্ঠা জোড়া
প্রবন্ধটিতে গদ্যকবিতার পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় যে অসাধারণ নৈপুণ্য তথা
পঠনসুখের মুন্সিয়ানার পরিচয় রেখেছেন সম্পাদক তাতেই তিনি নিজেকে তথা পত্রিকাটিকে
নিঃসন্দেহে করে তুলেছেন অনতিক্রমণীয়।
অন্যান্য বিভাগেও প্রতিটি রচনা
অত্যন্ত সুচয়িত তথা সুখপাঠ্য। অসাধারণ কিছু কবিতা লিখেছেন একাধিক নবীন প্রবীণ কবি।
আলাদা করে উল্লেখ করার জো নেই। তালিকায় রয়েছেন অশোক বার্মা, চন্দ্রিমা দত্ত, শতদল
আচার্য, জ্যোৎস্না হোসেন চৌধুরী, দেবযানী ভট্টাচার্য, রত্নদীপ দেব, শিপ্রা দে,
শঙ্করজ্যোতি দেব, শ্যামলী কর, অজয় কুমার নাথ, স্মৃতি দাস, দীপঙ্কর বিশ্বাস,
কুন্তলা দে, জয়ন্তী পাল, কপোতাক্ষী ব্রহ্মচারী চক্রবর্তী, রাজীব ভট্টাচার্য,
দেবাশিস সায়ন চক্রবর্তী, সোমালী ভট্টাচার্য, অরুন্ধতী গুপ্ত, স্মৃতি দত্ত, অলক
চক্রবর্তী, শেলী দাস চৌধুরী, সুমন ভট্টাচার্য, সুশান্ত ভট্টাচার্য, প্রীতি দেশমুখ,
শুভব্রত দত্ত, পম্পা ভট্টাচার্য, মহুয়া চৌধুরী, শুক্লা ভট্টাচার্য, ঋতা চন্দ,
রমাপদ ভট্টাচার্য, অভিজিৎ চক্রবর্তী, মিতা দাস পুরকায়স্থ, অনুপা বিশ্বাস, লীনা
নাথ, অসমঞ্জ বিশ্বাস, সৌমিত্র বৈশ্য ও বিশ্বরাজ ভট্টাচার্য। পুনর্মুদ্রিত হয়েছে পী্যূষ রাউত ও
বর্ণশ্রী বক্সীর একটি করে কবিতা। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্ত ফরাসী ঔপন্যাসিক পাত্রিক
মদিয়ানোর একটি কবিতার অনুবাদ করেছেন সম্পাদক সুশান্ত ভট্টাচার্য।
মোট নয়টি গল্প রয়েছে পত্রিকায়।
লিখেছেন পম্পা ভট্টাচার্য, শিল্পা চৌধুরী, বৈশালী ঘোষ, সুমিতা দেব, শর্মিলা দত্ত,
মৌসুমী ভট্টাচার্য, লীনা নাথ, দোলনচাঁপা দাস পাল ও সুশান্ত ভট্টাচার্য। পম্পা
ভট্টাচার্যের ‘ঘুমের লাগি’ গল্পটি নিত্যদিনের ঘরকন্নার উপরে লিখা একটি নিটোল তথা
পরিপাটি রচনা। বৈশালী ঘোষের ‘উড়ান’ গল্পটিও পুনর্মুদ্রিত। আয়তনে ছোট হলেও শর্মিলা
দত্তের গল্প ‘ওম’ লেখিকার লিখনশৈলীতে অসাধারণ হয়ে উঠেছে। ‘কে তুমি নন্দিনী’
শিরোনামে লীনা নাথের গল্পটি নিখাদ আনন্দের ভরপুর এক সুখপাঠ্য পরিবেশন। দৃঢ়
প্রত্যয়ের এক সুস্পষ্ট বার্তার মাধ্যমে দোলনচাঁপা দাস পালের গল্প ‘উজান’ এই
বিভাগের এক অনবদ্য অবদান। সম্পাদক সুশান্ত ভট্টাচার্যের বড়গল্প ‘শেষ রাত্রি’
অনুবাদ গল্পের ধাঁচে লিখিত টানটান উত্তেজনার এক রোমাঞ্চকর গল্প - যদিও অনুবাদ গল্প
বলে উল্লেখ নেই।
শীলা বিশ্বাসের রম্য রচনা ‘কথার
কথকতা’ এ সংখ্যার এক উৎকৃষ্ট রচনা। কথার মায়াজালে কিস্তিমাত করেছেন লেখিকা।
অতি সংক্ষিপ্ত এক ভ্রমণ কাহিনি
লিখেছেন ভাস্কর দে। সুলিখিত হলেও স্বল্পকালীন পঠনে ভরে উঠেনি মন।
বরাক উপত্যকা তথা এই তৃতীয় ভুবনের
সাহিত্যাকাশে তারকার পাশাপাশি নবীন প্রজন্মেরও এক ঝাঁক কবি, সাহিত্যিকের উজ্জ্বল
উপস্থিতির মধ্যে কিছু পুনর্মুদ্রণ তথা একই লেখকের একাধিক রচনা ছোট পত্রিকার সাধারণ
ধর্ম ও দায়বদ্ধতাকে কিছুটা হলেও ব্যাহত করে। বানানের শুদ্ধতায় যেমন ত্রুটি নেই
কোথাও তেমনি সঈদ আহমদ লস্কর (মামন)-এর অক্ষর বিন্যাসেরও প্রশংসা করতেই হয়। তবে
অক্ষরের আকার (ফন্ট) এক ধাপ বড় হলে পাঠকের চোখ আরোও একটু স্বস্তি পেতে পারত।
Comments
Post a Comment