আমাদের সান্ধ্যকালীন আড্ডায় সাধারণত বিস্কুট সহযোগে চা-ই চলে। বলাই বাহুল্য বিস্কুট আমি চায়ে ডুবিয়েই খাই। না হলে চা পানের মজাটাই যেন থাকে না। সে যাই হোক কাল কিন্তু চায়ের সঙ্গে বিস্কুট ছিল না। শুনলে কেমন যেন অদ্ভুত মনে হবে কিন্তু আসলেই কাল চায়ের সঙ্গে ছিল জিলিপি আর কাঁঠাল। কাঁঠাল ? আজ্ঞে তাই।
আসলে হয়েছে কি, কাল সন্ধ্যায় আরতি দেখে মন্দির থেকে প্রসাদ নিয়ে সরাসরি চলে
গিয়েছিলাম আড্ডায়। প্রসাদ দেখে সবাই খুশি,
কাঁঠাল দেখে আরোও খুশি।
আমি আর এখন কাঁঠাল খাই না। ভালো লাগে না। তবে কালকের প্রসাদ স্বরূপ কাঁঠাল এর অপরূপ
সৌন্দর্য আমাকে আকৃষ্ট করছিল খুব। তাই খাব বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। একটা ব্যাপারে
সবাই একমত যে বিস্কুটের দরকার নেই,
আজ জিলিপি দিয়েই চা
খাওয়া হবে। আর কাঁঠাল আলাদা করে খাওয়া হবে। এ যাবৎ সব ঠিকঠাকই চলছিল কিন্তু
সমস্যা হলো এই নিয়ে যে আগে কাঁঠাল না আগে চা-জিলিপি।
এই নিয়ে সবাই যখন
বিশেষজ্ঞের মতামত দিতে ব্যস্ত আমার তখন কাঁঠালের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সমাধিস্থ
হওয়ার মতো অবস্থা।
কাঁঠাল আর আমার যুগ
পুরনো যে সম্পর্ক সেটাই একেবারে স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠলো মননে চিন্তনে।
***
আমাদের
বাড়িটা ছিল একটা টিলার গায়ে। পেছনে অগভীর বনানী, সামনে
সবুজ ধানের ক্ষেত। ডাইনে বাঁয়ে আরোও তিনটে বাড়ি। একটি টিলার গায়ে মোট চারটে ঘর।
মালিকানা আলাদা হলেও উপভোক্তা সবাই। সবার ঘরের অন্দরমহল, রান্নাঘর থেকে শুরু করে গাছ গাছালির ফল ফুল আর পুকুরের মাছে সবার
ছিল অবাধ অধিকার। অনুমতির কোন বালাই ছিল না।আজকের দিনে এটা দিবাস্বপ্ন মনে হতেই
পারে।
স্বভাবতই আষাঢ়ের গরমে
শুরু হয়ে যেত আমাদের কাঁঠাল পর্ব। সব ঘর মিলে গোটা ছয়েক গাছ ছিল কাঁঠালের। সব
কয়টা গাছের কাঁঠালের ধরণ ছিল আমাদের জানা। কোনওটার কোয়া (আমরা বলতাম রোয়া বা
রওয়া) রসালো (আমরা বলতাম ঘোলা) তো কোনওটা শক্ত (আমরা বলতাম কড়চা)।
ডানদিকের ঘরের আমার
থেকে সামান্য বড় এক দাদা আর আমার তখন সময় প্রায় ছিলই না। দিনের অধিকাংশ সময়
গাছেই কাটতো। শুধু যে কাঁঠাল পেড়ে আনতে তা নয়। আরো অনেক কাজ ছিল। বেশি পেকে গেলে
কাঁঠাল নষ্ট হয়ে নিজে থেকেই পড়ে গিয়ে খাওয়ার অযোগ্য হয়ে যেত। তাই সঠিক সময়ে
গাছ থেকে পেড়ে আনাটা খুব জরুরী ছিল। এদিকে সমস্যা হলো প্রায় সব কটা গাছের কাঁঠাল
এক সাথে পাকা শুরু হতো। আর আমাদের আগেই পেকে যাওয়া কাঁঠালগুলোকে আস্বাদন করার
জন্য তৈরি হয়ে থাকত কাঠবিড়ালি (আমরা বলতাম কটা)।
আমরা দুই ভাই তাই একাধারে
কাঁঠাল পাড়া আর ইঁদুর-ধরা-ফাঁদ (আমরা বলতাম ছাট) দিয়ে কটা ধরার কাজে ব্যস্ত
থাকতাম খুব।
এই কাঁঠাল পেড়ে আনার
ব্যাপারটা কিন্তু মোটেই সহজ ছিল না। দস্তুর মতো এক শিল্প ছিল বলা যায়। সামান্য
ভুল হলেই কাঁঠালের অকালপতন আর সাথে আমাদের ভাগ্যে জুটত বকুনি। তাই আমরা দু'ভাই ছিলাম এ ব্যাপারে খুব সতর্ক। পরিশ্রান্ত হয়ে গেলে গাছের ডালে
হেলান দিয়ে সামান্য বিশ্রাম আর মাপ মতো একটি আস্ত কাঁঠালের দু'ভাই মিলে গলাধ:করণ।
এরপর ওই দাদাটির
নির্দেশ মতো শুরু হতো আবার কাঁঠাল পাড়ার কাজ। প্রথমেই কাঁঠালের বোঁটায় দড়ি
দিয়ে শক্ত করে বাঁধতে হতো। এরপর সেই দড়িকে উপরের কোনও শক্ত ডালে পাক খাইয়ে
বাঁধনের উপরে কাঁঠালের বোঁটাকে কাটতে হতো। সম্পূর্ণ অভিযানে এই পর্বটিই ছিল
সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ বৃন্তচ্যুত হতেই ঝুলে পড়তো কাঁঠাল আর সেই ঝাঁকুনিতে
কখনো দড়ির গিট ফসকে 'পপাত ধরণীতলে' হয়ে যেত। সে এক বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার। দাদাটি তাই প্রতি বারই এটা
দেখতো যে আমি গিট এর উপরে কাটছি না নিচে কেটে নিচ্ছি। কারণ চার ঘর মিলে আমিই ছিলাম
ওর একমাত্র ছড়ি ঘোরানোর পাত্র। বলা বাহুল্য ওর এই কাঁঠাল পাড়ার অগাধ জ্ঞানের উৎস
কিন্তু ছিল আমার নিজের দাদা যে কি না তখন চাকরি পেয়ে বাইরে থাকতো।
***
আজকের এই কাঁঠাল পর্বটি তাই উৎসর্গ করলাম আমার কাঁঠাল পাড়ার সহযোগী দাদাটিকে (ছবিতে আমাদের ডানদিক থেকে তৃতীয়।)
Comments
Post a Comment